মেয়েটি, ছেলেটির হাত ধরে ঐ দূরে রাস্তার পাশে পার্থিব সমস্ত লাল মেখে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়ার গল্প শোনাতো । ছেলেটি লাল বুঝতে পারতো না । মেয়েটি তখন বলতো লাল, রক্তের মতো । ছেলেটি তবুও বুঝতো না । একদিন ভরা বিকেলে মেয়েটি এসে বলল আকাশে আগুন লেগে ছাই হয়ে গিয়েছে মেঘগুলো । খুব ঝড় বৃষ্টি হবে আজ ! ছেলেটি মনে মনে ভাবছিল ছাই দেখতে কেমন ! মুখে বলতে হয়নি, মেয়েটি উত্তর বলে দিয়েছিল - "তুমি সারাক্ষণ যা দেখো, তার থেকে অনেক ফিকে রঙ হলো ছাই রঙ ।" ছেলেটি অনুভব করার চেষ্টা করলো ছাই রঙ । অনুভব অতিক্রম করে ছেলেটি ছাই রঙ দেখতে চেয়েছিল, ছেলটি ছাই-রাঙা-মেঘ দেখতে চেয়েছিল সেদিন । খুব ঝুম করে বৃষ্টি নেমছিল একটু দমকা হাওয়ার পরে । ছেলেটি বৃষ্টি দেখতে পেত না । শুধু বৃষ্টির পড়ার শব্দ শুনতো । মেয়েটি, ছেলেটিকে বৃষ্টির শব্দের ছবি দেখাতো । একটি ছবি সেদিন এঁকেছিল মেয়েটি, অবাস্তব ভর করা চারু-সাধিকার মতো সে গড়গড় করে বলতে থাকলো বৃষ্টি আর কৃষ্ণচূড়ার ছবি, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ।
- কৃষ্ণচূড়া ফুল গুলো যেন শ্বাস নিচ্ছে উত্তেজনার, বৃষ্টির যাচিত সংগমে মায়াবী উত্তেজনায় ঘেমে যাচ্ছে ফুলগুলো , তারপর চকিত হাওয়া এসে তাকে নেড়েচেড়ে দিচ্ছে ঘাম, টুপ করে ঘাম পড়ছে মাটিতে, তাতেও খুব একটা লাভ হচ্ছে না, আবার জমছে অলীকের আলো মাখা ঘাম । প্রিয়, আমি কৃষ্ণচূড়া ফুল হতে চাই, তুমি কি বৃষ্টি হবে?
এভাবে মেয়েটি অনুবাদ করছিল বৃষ্টি ও ভালোবাসা । হাত বাড়িয়ে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি নিয়ে নেয় সে ! ভিজিয়ে দেবে অন্ধ প্রমিকের মুখ, ভিজিয়ে দিবে তার যতসব খরা পদ্য ।
হাতে বৃষ্টির জল নিয়ে জানালা থেকে মুখ ফিরিয়ে মেয়েটি পেছন ফিরে দেখেছিল, ছেলেটির চোখে জলবিন্দুরা রেখায় রেখায় কতটা উজ্বল ! মেয়েটি হাত বাড়িয়ে ছেলেটির চোখ মুছে দিল । বৃষ্টির জল, কান্নার জল মিলে মিশে একাকার । মেয়টির হাতে কিছু কান্না লেগে গেল । বৃষ্টি যেমন ছোঁয় কৃষ্ণচূড়া ফুল !
মেয়েটি বলে উঠলো,
-দুঃখ করোনা প্রিয়, তুমি একদিন দেখতে পাবে শব্দের দৃশ্যগুলো, অলীক অথবা লীক !
কয়েক মাস থেকেই ছেলেটি চেষ্টা করছিল কর্ণিয়া ট্রান্সপ্লান্টের । একটি দাতব্য চক্ষু হাঁসপাতালে দরখাস্ত করে রেখেছিল, মেয়েটির চাপাচাপিতে । একদিন হঠাৎ পিয়ন এসে চিঠি দিয়ে গেল । কর্ণিয়া পাওয়া গেছে । ছেলেটি আনন্দে দিশেহারা ! সে দেখতে পাবে ! মেয়েটিকে জানালো আপ্লুত হয়ে ।
আরো একমাস পরে অপারেশন হলো । সফল অপারেশন । কিন্তু অপারেশনের পর ছেলেটি খুব অবাক হলো, মেয়েটি ওর আশে পাশে নেই । কয়েক দিন ধরে কেউ ওর খোঁজ পাচ্ছে না । ছেলেটি অস্থির হলো মেয়েটির নিরূদ্দেশে ।
কিছুদিন পরে চোখের বাধন খুলে দিল ডাক্তাররা । ছেলেটি দেখতে পেল । খুব আনন্দে দেখতে লাগলো চারপাশ, সুন্দর, যত রং আছে, মেঘ আছে, বৃষ্টির পতন যত আছে, যত লাল আছে, যত রংগীন আছে, যত আলো-অন্ধকার আছে । কিন্তু এতো দৃশ্যের মাঝেও কি যেন নেই,মেয়েটি নেই !
দিন কয়েক পরের ঘটনা, হঠাৎ একটি মেয়ে এসে দাড়ালো ছেলেটির পাশে । চোখে সানগ্লাস পরা । হাতে শাদা ছড়ি । মেয়েটি অন্ধ । ছেলেটি জিজ্ঞেস করলো
- কে তুমি?
- বৃষ্টি, আমি তোমার কৃষ্ণচূড়া ফুল !
ছেলেটি হতবিহবল হয়ে গেল । অনেক্ষণ চুপ থেকে বললো,
- তুমি অন্ধ ?????
- হুম । আমি অন্ধ । আমার অন্ধকারে কোন সমস্যা নেই, তুমি তো আছো ! আমার আলো !
- কিন্তু তুমি কখনও বলোনি তুমি অন্ধ ! আমার সাথে কথা বলার সময় তুমি কখনো বুঝতে দাওনি যে তুমি অন্ধ ! তুমি আমার সাথে প্রতারনা করেছো । কেন করলে , এমন ?
মেয়েটি নীরব । ছেলেটি ও নীরব । স্বস্তিহীন নীরবতা ভাংগলো মেয়েটি
- কি, তুমি আমার আলো হবে না ?
- দূর হও, তুমি । মিথ্যেবাদী, প্রতারক !
ছেলেটির মুখ বিকৃত, রাগে কাঁপছিল ।
মেয়েটি বসে ছিল । উঠে দাড়ালো, পেছন ফিরে হাটতে শুরু করলো । তার চোখে জল, পৃথিবীর পবিত্রতম জল । মুছে দেবার কেউ নেই , দরকারও নেই মুছে দেবার ।
যেতে যেতে মেয়েটি শব্দহীন ভাবে বলেছিলো,
- আমার চোখদুটোর যত্ন নিও, প্রিয় !
কেউ শোনেনি ।
[কাল রাতে একটি অসাধারন sms পেয়েছিলাম ।
john was a blind man who used to hate evry1 except his GF.He alws said 2 his gf tht i'l marry u if i could see u!suddenly 1day som1 donated eyes 2 him and John was soked 2 found that his gf is also blind.Thn his gf asked wil u marry me?He simply refused her.His gf told not a single word just smiled and went away with a letter,saying darling take care of my eyes!!!
গল্পটির অণুপ্রাণ এই sms টি ।]
[গতকাল রাতে গল্পটি পোষ্ট করেছিলাম । ফ্লাডিং শুরু হওয়াতে সরিয়ে নিয়েছিলাম ।]
বৃষ্টির শব্দ থেকে, অতঃপর আলোতে অথবা অন্ধকারে ...
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
২৫টি মন্তব্য ১টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
কে আমারে ডাকে?
কিছু কিছু গান তৈরির পর সৃষ্টির আনন্দে আমি অত্যধিক উচ্ছ্বসিত হই। এ গানটার ফিমেইল ভার্সনটা তৈরি করেও আমি অনেক অনেক তৃপ্ত। আপনারা যারা ফোক-ক্ল্যাসিক্যাল ফিউশন ভালোবাসেন, এটা তাদের জন্য উপযুক্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন
ইরানের ভুল বনাম যুদ্ধকৌশল

ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করেছিল এবং তার মাশুল দিচ্ছে হাড়ে-হাড়ে। যখন গাজার শিশু-মহিলা-আপামর জনসাধারণকে নির্বিচারে বোমা-ক্ষেপনাস্ত্রের আঘাতে নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছিল তখন আম্রিকা বলেছিল ঈসরাইলের উপর হামলায় ইরানের ভূমিকা নেই- মানে... ...বাকিটুকু পড়ুন
লোভে পাপ, পাপে ....

"মাংস সমিতি।" এরকম নাম শুনলে প্রথমে হাসি পায়। সঞ্চয় সমিতি শুনেছি, ঋণ সমিতি শুনেছি, এমনকি মহিলা সমিতিও শুনেছি। কিন্তু মাংস সমিতি? তারপর একটু ভাবলে হাসি থেমে যায়। কারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন
চর্যাপদঃ বাংলা ও বাঙালির ঐতিহ্য
চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত হলেও, এর ভাষা ও উৎস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলে আসছে। ১৯০৭ সালে নেপালের রাজগ্রন্থাগার থেকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এই পদগুলি আবিষ্কার করেন এবং... ...বাকিটুকু পড়ুন
রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ

আজ বাদে কাল ঈদ। ঈদ-উল-ফিতর প্রতি বছর আমাদের জীবনে নতুন নতুন অনুভূতি নিয়ে ফিরে আসে, তবে এই আনন্দের জোয়ার সবচেয়ে বেশি আছড়ে পড়ে শিশু-কিশোরদের মনে। সেই ছোটবেলার কথা মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।