somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রাপক- মৃত মজনু মিয়া, গ্রাম-বটবইট্টা, পো.অ.-পাকশী, থানা-মেলান্দহ, জেলা-জামালপুর

১০ ই অক্টোবর, ২০১১ সন্ধ্যা ৭:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মজনু মিয়া,
সালাম নিও।জানি না এই চিঠি তুমি পড়তে পারবে কি না।ওপারে বসে কেউ এই পাড়ের চিঠি পড়েছে শুনি নি কখনো।তারচেয়ে বড় কথা তুমি পড়তে পারো কিনা সেটাই জানি না।যদিও মানুষের বেশভূষা দেখে তার স্বাক্ষরতা বিচার করাটা দুরূহ কাজ।এই যেমন ওইদিন আমাকে অবাক করে দিয়েছিল সানা ফকিরের মা কিম্বা এই সদরের বাকীবিল্লাহ।আশি বছরের থুড়থুড়ে সানা ফকিরের মা নাম স্বাক্ষর জানত,অথচ বাকীবিল্লাহ জীবনে কলম ধরে নি কখনো।

যাহোক,বড় দুঃখ নিয়ে তোমাকে এই লেখা।তোমাকে যখন ট্রলিতে করে নিয়ে এল,তখন রাত তিনটা।নাইট ওয়াজ স্টিল ইউং দেন,কিন্তু সারাদিনের খাটুনী এবং পরের দিনের আশু ধকলের কথা চিন্তা করে খানিকটা ঝিমুনি ধরে গিয়েছিল।এত রাত্রে তোমার মত উৎপাতের অনাবশ্যক উপস্থিতি তাই আমাকে খুশী করতে পারল না।"রোগীর লোক কে?" বলে যখন তারস্বরে চেঁচাচ্ছিলাম,তখন ফ্যালফ্যাল করে তাকানো ছাড়া তাই তোমার কিছু করার ছিল না।তোমার প্রতিবেশী ছমেদ আলীকে দেখে বিরক্তি খানিকটা বেড়েছিল।এত রাতে যে বুড়ো নিজেই নিজেকে দেখে রাখতে পারবে না,সে তোমার জন্য করবে কি?তাই বিরক্তির সুরে তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,"আর লোক নাই?"

তোমাকে পেটে কয়েকবার হাত চালিয়ে আমার বুঝতে দেরি হল না যে তোমার intestinal obstruction হয়েছে।কি মিয়া,বুঝ নি এইটা কি রোগ?থাক অত বুঝার দরকার নাই,শুধু শুনে রাখ এইটা একটা জটিল রোগ যার জন্য অপারেশন লাগবে।পেট কেটে দেখতে হবে তোমার অন্ত্রের কোথায় সমস্যা এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।তাই ছমেদ আলীকে যখন বললাম যে তোমার অপারেশন লাগবে,সে আরো বেশী আহাম্মক হয়ে গেল।সে তোমার পাড়াপড়শী, ভেবেছিল কোন মতে হাসপাতালে তোমাকে পৌঁছে দিতে পারলেই তার দায়িত্ব শেষ।কিন্তু আমার ভাবলেশহীন পরামশ্য শুনে সে কিছুক্ষণ স্তম্ভিত না থেকে পারল না।

আমি তাকে আরো বেশি বিপদে ফেললাম,"এই রোগীর অবস্থা খুবই খারাপ,অপারেশন করলেও বাঁচে কিনা সন্দেহ।অপারেশন করতে চাইলে দুই ব্যাগ রক্ত যোগাড় করতে হবে।"লে বাবা, ঠেলা সামলা।ছমেদ অপারেশনের ওষুধ কোথায় পাবে,আর আর এতো রাতে সম্পুর্ন অচেনা এই শহরে রক্ত কোথায় পাবে?কিন্তু আমার মুখের পেশীগুলোর শক্ত অবস্থান দেখে সে কোন অজুহাত করার সাহস করল না।তখন আমার মাথায় প্রশ্নের উদয় হল,ছমেদকে জিজ্ঞেস করলাম,"রোগীর ছেলেমেয়ে কই?"ছমেদ উত্তরে যা বলল,তা শুনে আমার মেজাজ আরো তিরিক্ষ হয়ে গেল।তোমার নাকি চার ছেলে,তিন মেয়ে।মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে,আর ছেলেরা যার যার মত।তোমাকে দেখার তাদের সময় কই?

হায় রে মজনু মিয়া ! তিলতিল করে যাদের মানুষ করেছ,তারা আজ তোমায় বোঝা মনে করে রাস্তা ফেলে দিয়েছে।অথচ গত বছরই এক হাত জমির জন্য যার মাথা ফাটাতে বসেছিলে,সেই ছমেদ আজ তোমাকে কাধে করে নিয়ে এসেছে।এরেই বলে নিয়তি।"রক্ত যোগাড় করতে পারবা?"ছমেদকে আবার জিজ্ঞেস করলাম।ছমেদ তার ছাগুলে দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বলল,"সার,আমি রক্ত কই পাইবাম?""কই পাবা সেটা আমি জানি না।রক্ত ছাড়া এই রোগীর অপারেশন হবে না,আর অপারেশন ছাড়া এই রোগীকে বাঁচানো সম্ভব না।রোগীর আত্মীয়স্বজন খবর দাও।এই ওয়ার্ড বয়,রোগীকে ওয়ার্ডে নামিয়ে দাও।"এই বলে আমি চলে এলাম আমার কক্ষে।মনে মনে শুধু বিরক্তির ছড়াছড়ি,ধুর কোথ থেকে যে আধমরা বুড়া গুলা হাজির হয়?

রাতে আর তোমার সাথে দেখা হয় নি।সকাল বেলা যখন অন্য ডাক্তারদের সাথে রাউন্ডে বের হলাম,দেখলাম ছমেদ তোমাকে নিয়ে চুপচাপ বসে আছে।তোমার স্যালাইন চালু করা হয়েছে,জিজ্ঞেস করে জানলাম সরকারী সাপ্লাইয়ের কিছু ঔষধ তোমাকে দেয়া হয়েছে,স্বাভাবিকভাবেই রক্ত জোগাড় হয় নি,তোমার ছেলেপুলেও কেউ আসে নি,আসবেও না।নিজেরা নিজেরা তোমার রোগ নিয়ে আলাপ করলাম,ছমেদকে কয়েক প্রস্থ ধমকালাম।তারপর পরের রোগীর কাছে চলে গেলাম।তোমার ফ্যাল ফ্যাল করে তাকানো ছাড়া কিছু করার রইল না।

বিকেলে অপারেশন থিয়েটার থেকে অবসাদগ্রস্ত শরীর নিয়ে যখন বের হলাম,ভাবলাম ওয়ার্ডে একটু ঢুঁ মেরে যাই।ডক্টরস রুমের সামনেই ছমেদ দাড়িয়ে,খুব স্বাভাবিকভাবেই বলল,"সার,ডেত সাট্টিফিকেট"dead certificate" ইট্টু লিক্কা দিয়া যান।"স্বভাবতই চোখটা ছুটে গেল ওই দিকে যেখানে তুমি পড়ে ছিলে,ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলে আমার দিকে।দেখলাম,তোমার নিথর দেহখানা পড়ে আছে।আসে পাশে বসে আছে কয়েকজন,তার মধ্যে দুএকজনকে দেখেই চিনলাম,এরাই তোমার কুলাঙ্গার সন্তান।

মজনু মিয়া,ক্ষমা কর।ক্ষমা কর তোমার অকৃতজ্ঞ সন্তানদের,আমাকে,ছমেদ মিয়াকে,এই দেশকে।কেবল ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া মৃত্যুর আগে তোমার কিছুই করা হল না।

ইতি,
একজন ব্যর্থ মানুষ যে তোমার জন্য কিছুই করতে পারল না।
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়: সব কিছু ভেঙে পড়ে

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৬ ই মে, ২০২৬ দুপুর ২:২৮


"তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও - আমি এই বাংলার পারে
র’য়ে যাব; দেখিব কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে;
দেখিব খয়েরি ডানা শালিখের..."

জীবনানন্দ দাশ ''রূপসী বাংলা'র কবিতাগুলো বরিশালে তাঁর পৈতৃক বাড়িতে বসে লিখেছিলেন। জীবনানন্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপার কারণে দিদি হেরেছন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৬ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:০৩




আপা এপারের হিন্দুদেরকে স্নেহ করতেন তাতে ওপারের হিন্দু খুশী ছিল। আপা ভারতে বেড়াতে গেলে মোদীর আতিথ্যে আপা খুশী। কিন্তু আপার আতিথ্যে দিদি কোন অবদান রাখলেন না। তাতে হিন্দু... ...বাকিটুকু পড়ুন

লেখালিখি হতে পারে আপনার বিক্ষিপ্ত মনকে শান্ত করার খোরাক।

লিখেছেন মাধুকরী মৃণ্ময়, ০৬ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৪:২৯

এই যেমন আমি এখন লিখতে বসছি। সর্বশেষ লিখেছি ২০২১ সালে জুলাই এর দিকে। লিখতে গিয়ে আকাশে বাতাসে তাকাচ্ছি, শব্দ, বিষয় খুজছি। কিন্তু পাচ্ছি না। পাচ্ছি যে না , সেইটাই লিখছি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৭ ই মে, ২০২৬ রাত ২:৩৩


নট আউট নোমান ইউটিউব চ্যানেলের ক্রীড়া সাংবাদিক নোমান ভাই একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক। বাংলাদেশে এখন আমরা এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে বাস করছি যেখানে প্রকৃত দেশপ্রেমিক আর ভুয়া দেশপ্রেমিকের পার্থক্য করা... ...বাকিটুকু পড়ুন

রফিকুল ইসলামের ২য় বিয়ে করার যুক্তি প্রসঙ্গে chatgpt-কে জিজ্ঞেস করে যা পেলাম...

লিখেছেন বিচার মানি তালগাছ আমার, ০৭ ই মে, ২০২৬ দুপুর ১২:৫০



ইসলামে একাধিক বিয়ে বৈধ, তবে সেটা বড় দায়িত্বের বিষয়। শুধু “বৈধ” হলেই কোনো সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে উত্তম বা সবার জন্য উপযুক্ত হয়ে যায় না। Qur'an-এ বহু বিবাহের অনুমতির সাথে ন্যায়বিচারের শর্তও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×