
বাতিঘর নিয়ে সেই ছোট্টবেলা থেকেই আমার অনেক কৌতুহল ছিল। কেন ঐ বয়সেই বাতিঘর নিয়ে আমার এতটা আগ্রহ ছিল, তার কারণ আজও খুঁজে পাই না। অথচ আমি নিজ চোখে কোন বাতিঘর কখনো দেখিনি। শুধু ছোটবেলায় বড় ভাই বোনেরা যখন সাধারণ জ্ঞান সম্বন্ধে পড়তে গিয়ে কোন এলাকা কিসের জন্য বিখ্যাত, সেই তালিকাটা জোরে জোরে পড়তেন, তখন জেনেছিলাম যে আমাদের দেশে একমাত্র বাতিঘরটি আছে কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া নামক একটি দ্বীপে। মূল ভুখণ্ড থেকে কুতুবদিয়া চ্যানেল দ্বারা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ কুতুবদিয়া শুধুমাত্র ঐ একটি কারণেই বিখ্যাত ছিল। ‘বাতিঘর’ কী, বড়দেরকে জিজ্ঞাসা করে সে সম্বন্ধেও একটা মোটামুটি ধারণা পেয়েছিলাম, যদিও ধারণাটি পরিপূর্ণ ছিল না। যাহোক, যত বড় হতে থাকলাম, মুভিতে কোন বাতিঘর দেখলেই কিংবা গল্প উপন্যাসে বাতিঘর সম্পর্কে কিছু পড়লেই বিস্ময়াভিভূত হয়ে থেমে যেতাম এবং বাতিঘর নিয়ে ভাবতাম। যে সকল নাবিক আঁধার রাতে এত বড় একটা জাহাজ নিয়ে উত্তাল সাগর পাড়ি দেয়, বাতিঘর দেখে তাদের মনে কেমন অনুভূতি জাগ্রত হয়? বাতিঘরবিহীন পথটা তাদের জন্য কি খুবই বিপদ-সংকুল হতো? যে মানুষগুলো কষ্ট করে প্রতিদিন সন্ধ্যা নামার আগেই বাতিঘরে আলো জ্বালিয়ে দিত, তাদের প্রতি কি তারা কোন কৃতজ্ঞতা অনুভব করতো?
এ বছরের জানুয়ারি মাসে ফটোগ্রাফী সংক্রান্ত একটি ফেসবুক গ্রুপের (Dilettante Photographers Society- DPS) কিছু ছবির উপর চোখ বুলাচ্ছিলাম। সেখানে প্রতিভাবান ফটোগ্রাফার জনাব দুলাল উল্লাহ San Diego, California’র The Old Point Loma Lighthouse এর কিছু ছবি পোস্ট করেছিলেন। ছবিগুলো আমাকে ভীষণভাবে আকর্ষণ করেছিল। একটি ছবিতে দেখা যায়, আকাশে ঘনায়মান কালো মেঘ, মেঘকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে তিনটে পাখি মনের সুখে আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে। সুউচ্চ বাতিঘরের শীর্ষে ঠিক পেছনেই ছিল বাতিঘর রক্ষকের জন্য নির্মিত দু’কক্ষ বিশিষ্ট আবাস। আর তার পেছনে মাটির ঢালে ফুটে ছিল কাশফুলের ন্যায় কিছু সাদা সাদা ফুল। মনে প্রশ্ন জেগেছিল, জনমানবহীন বিরাণ এ ভূমিতে কে ফুল গাছ লাগায়? এগুলো কি অযত্নে বেড়ে ওঠা বনফুল? বাতিঘরের তত্ত্বাবধানে যে দু’জন মানব মানবী ভূমি থেকে এতটা উচ্চে এখানে একাকী বসবাস করেন, তারা বছরের পর বছর দিনের বেলায় সময় কাটান বিভাবে? (সাধারণতঃ যিনি বাতিঘর রক্ষক থাকেন, প্রশাসনিক সুবিধার্থে তার স্ত্রীকেই সহকারী রক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে।) রাতের বেলায় তো তাদের ব্যস্ত থাকতে হয় বাতিঘর অতিক্রমকারী নৌযানগুলোকে পর্যবেক্ষণ করে এবং তাদের সাথে পারস্পরিক আলো বিচ্ছুরণ ও সাংকেতিক বার্তা বিনিময় করে।
দুলাল উল্লাহ সাহেবের পোস্টকৃত The Old Point Loma Lighthouse এর ছবিটা দেখতে দেখতে কিছুটা গুগল সার্চ করে এ সম্বন্ধে আরেকটু বিশদ জানলাম। এটি San Diego, California এর নৌপথের একটি ঐতিহ্য এবং বাতিঘরের এক টুকরো আদি ইতিহাস। পয়েন্ট লোমা উপদ্বীপের শীর্ষে অবস্থিত এই আলোকস্তম্ভটি বাতিঘরের একটি আইকনিক প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। দর্শনার্থীগণ এখানে এসে উপকূলীয় নৌ চলাচল ব্যবস্থার বিবর্তন সম্পর্কে এবং বাতিঘর রক্ষকদের কঠিন জীবন প্রণালী সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পেতে পারেন। এই বাতিঘরের নির্মাণ কার্য সম্পন্ন হয়েছিল ১৮৫৫ সালের অক্টোবর মাসের মধ্যেই। কিন্তু এখানে প্রথম দীপশিখাটি জ্বালানো হয়েছিল ১৫ নভেম্বর ১৮৫৫ এর সূর্যাস্তের ঠিক আগে আগে। সাংকেতিক ক্রমসংখ্যা হিসেবে এটির নম্বর ছিল ৩৫৫। এটি ইউএসএ’র পশ্চিম ঊপকূলের (ওয়েস্ট কোস্ট) প্রথম আটটি বাতিঘরের মধ্যে অন্যতম ছিল। ৩৬ বছর ধরে সামুদ্রিক জাহাজ ও নাবিকদেরকে নিরাপদে স্যান ডিয়েগো উপসাগরে পৌঁছে দেয়ার পর এ বাতিঘরটিকে স্থানীয় আকাশ ঘন ঘন অত্যন্ত কুয়াশাচ্ছন্ন হওয়া ও নিম্নভাসী মেঘের (লো-ক্লাউড) আধিক্যের কারণে ১৮৯১ সালে ডি-কমিশন করা হয়। যদিও সমুদ্রতট থেকে নিকটতর একটি এলাকায় আরেকটি নতুন বাতিঘর নির্মাণ করা হয়, পুরাতন পয়েন্ট লোমা বাতিঘরটি আজও একটি ঐতিহাসিক সামুদ্রিক নিদর্শন হিসেবে সমুদ্রপ্রেমী মানুষের মনে রয়ে গেছে এবং মেরিটাইম ইতিহাসেও একটি আইকনিক ভূমিচিহ্ন হিসেবে এটি ঠাঁই পেয়েছে।
Old Point Loma Lighthouse Tower টি যতদিন অপারেশনে ছিল, ততদিন এটাই ছিল ইউএসএ’র সর্বোচ্চ বাতিঘর। একটি খাড়া পাহাড়ের ৪০০ ফিট উঁচু কিনারায় (Cliff এ) অবস্থিত হবার কারণে এটা প্রায়শঃই ঘন কুয়াশা ও লো-ক্লাউড দ্বারা আচ্ছাদিত থাকতো। ফলে, কাছে না আসা পর্যন্ত অতিক্রমকারী নৌযানগুলো থেকে এর আলো দেখা যেত না। তখন বাতিঘরে কর্তব্যরত ব্যক্তি শটগানের গুলি ছুঁড়ে নৌযানের চালকদেরকে হুঁশিয়ার করে দিত। এ কারণে নিকটবর্তী এলাকায় আরও কম উচ্চতায় আরেকটি বাতিঘর নির্মাণ করে ২৩ মার্চ ১৮৯১ তারিখে সেখানে আলো জ্বালিয়ে একই তারিখে এই বাতিঘরের আলো চিরতরে নির্বাপিত করা হয়। তবে এই বাতিঘরটি উদ্বোধনের ১৩০ তম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে আলো নির্বাপনের ৯৩ বছর পর ১৯৮৪ সালে আবার এটির আলো জ্বালিয়ে ৩০০০ অভ্যাগত দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেয়া হয়। তাদের মধ্যে প্রাক্তন বাতিঘর রক্ষক রবার্ট ইসরায়েল ও মারিয়া ইসরায়েল এর পারিবারিক বংশোদ্ভভূত শতাধিক ব্যক্তি আমন্ত্রিত ছিল। ‘ইসরায়েল’ নামটিকে আমরা একটি দেশের নাম হিসেবে চিনলেও, এখানে উল্লেখিত নামটি মানুষের নামের অংশ বিশেষ।
আমেরিকার পেনসিলভেনিয়ার পিটসবার্গে জন্ম নেয়া Robert Decatur Israel ছিলেন এই পুরনো বাতিঘরের সর্বশেষ ও সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী (১৮ বছরব্যাপী) লাইটহাউসকীপার। তার বাবা ছিলেন ওলন্দাজ বংশোদ্ভভূত এবং মা স্কচ-আইরিশ। তিনি ধর্মবিশ্বাস মতে ইহুদি ছিলেন না, যদিও নামের কারণে অনেকে তাকে তাই মনে করে থাকেন। বিখ্যাত Battle of Chapultepec সহ তিনি মেক্সিকান-আমেরিকান যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। একজন খৃষ্টীয় ধর্মযাজকের হাতে ১৮৫২ সালে মারিয়ার সাথে তাদের বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। তাদের চার পুত্রসন্তান ছিল। ওদেরকে নিয়েই তারা বাতিঘর সংলগ্ন নিবাসে সংসার পাতেন এবং ১৮ বছর সেখানে স্থায়ী ছিলেন। কোন ব্যত্যয় ব্যতিরেকে প্রতিদিন সন্ধ্যার আগেই বাতিঘরে আলো জ্বালানো ছিল তাদের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য। সেখানেই তারা তাদের সন্তানাদি ও নাতি-নাতনিদের বড় হওয়া প্রত্যক্ষ করেন। ১২ জানুয়ারি ১৯০৮ সালে রবার্ট ইসরায়েল মৃত্যুবরণ করেন। তাদের বংশধরগণ এখনও নতুন বাতিঘরটিতে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করতে আসেন।
এবারে আবার ফিরে আসি আমাদের দেশের বাতিঘরের কথায়। কুতুবদিয়া বাতিঘর বাংলাদেশের একটি প্রাচীন বাতিঘর, যা কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া দ্বীপে অবস্থিত। এটি বঙ্গোপসাগরে চলাচলকারী জাহাজগুলিকে দিকনির্দেশনা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং দেশের একমাত্র দ্বীপভিত্তিক বাতিঘর হিসেবে পরিচিত। এটির নির্মাণকাজ ১৮২২ সালে শুরু হয়ে ১৮৪৬ সালে সম্পন্ন হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে নির্মিত এই বাতিঘরটি ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাতে একাধিকবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরবর্তীতে এটি একটি নতুন কাঠামো দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। এটি ছাড়াও স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে আরও ৬টি বাতিঘর বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করা হয়। যেমনঃ কক্সবাজার বাতিঘর, হিরণ পয়েন্ট বাতিঘর, পতেঙ্গা বাতিঘর, নর্মান পয়েন্ট বাতিঘর, সেন্ট মার্টিনস বাতিঘর, চট্টগ্রাম আউটার বার রেঞ্জ বাতিঘর, ইত্যাদি।
একটি বাতিঘরের কাজ কী? প্রধান কাজ হলো সমুদ্রে অথবা অভ্যন্তরীণ নৌপথে চলাচলকারী নৌযানকে এবং মেরিটাইম পাইলটদেরকে আলোর সংকেতের মাধ্যমে আঁধারে পথ দেখানো। এছাড়া তট সংলগ্ন বিপজ্জনক চোরা বালুচর, প্রবাল প্রাচীর ইত্যাদি সম্পর্কে ওদেরকে সতর্ক করা। একটু ভাবলেই আমরা অনুভব করতে পারি যে আমাদের এই জীবন তরীতে চলার পথেও আমরা এক বা একাধিক বাতিঘরের সন্ধান পাই, যে বা যারা একই ধরণের কাজ করে আমাদেরকে আমাদের জীবনযাত্রা সম্পন্ন করতে সহায়তা করে। একটু ভেবে দেখুন তো, আপনার জীবন পরিক্রমায় আপনি এইরূপ কয়টা ‘বাতিঘর’ এর সন্ধান পেয়েছেন? আঁধার পাড়ি দেয়ার সময় আলোর ইশারা পেয়েছেন? আজ থেকে বহুকাল পূর্বে যখন বাতিঘর ছিল না, তখন নৌ-চলাচলের সময় নাবিকগণ ‘ধ্রবতারা’ এর সাহায্য নিয়ে রাতের আঁধারে দিক নির্ণয় করতেন। কবিগুরু বলে্ছেন, "তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা, এ সমুদ্রে আর কভু হব নাকো পথহারা"! আসল ধ্রবতারাকে তো আকাশে খুঁজলেই পাওয়া যায়। কিন্তু সত্যিই কি কবির উপমার এ ধ্রবতারাকে এ জীবনে কখনো খুঁজে পাওয়া যায়?
তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া।
ছবিসূত্রঃ প্রথম দুটোর জনাব দুলাল উল্লাহ, বাকিগুলোর গুগল সার্চ।
ঢাকা
০৫ অগাস্ট ২০২৬
শব্দ সংখ্যাঃ ১০৫৮

আকাশে ঘনায়মান কালো মেঘ, মেঘকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে তিনটে পাখি মনের সুখে আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে।
মাটির ঢালে ফুটে ছিল কাশফুলের ন্যায় কিছু সাদা সাদা ফুল। মনে প্রশ্ন জেগেছিল, জনমানবহীন বিরাণ এ ভূমিতে কে ফুল গাছ লাগায়? এগুলো কি অযত্নে বেড়ে ওঠা বনফুল?




নির্জন সাগরে, নিস্তব্ধ তিমিরে, একা দাঁড়িয়ে, পথের দিশারী হয়ে……


সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



