somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এক কাপ চা, আর ফিরে দেখা ২০০৯-এর সেই দিনগুলো

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



এক কাপ চা, আর ফিরে দেখা ২০০৯-এর সেই দিনগুলো

কিছু জায়গা শুধু জায়গা নয়—সেগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আমাদের জীবনের একটি সময়, কিছু মানুষ, কিছু অভ্যাস আর অসংখ্য ছোট ছোট স্মৃতি। অনেক বছর পর সেই জায়গার মতো কোনো পরিবেশে দাঁড়ালে মনে হয়, সময়টা বুঝি আবার পেছনে ফিরে গেছে।

২০০৯ সাল। তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়তাম। নানী বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করতাম। আমার কৈশোরের অনেকটা সময় কেটেছে সেই বাড়ির চারপাশের প্রকৃতির সঙ্গে।

নানী বাড়ির সামনে ছিল বিস্তীর্ণ সবুজ ঘাস আর জলাভূমি। চারপাশে কাশফুল, ঝোপঝাড় আর নানা ধরনের গাছপালা। একটু দূরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বড় বড় গাছ। সামনে ছিল খোলা বিস্তীর্ণ মাঠ। দূরে বিদ্যুতের টাওয়ার ও কিছু স্থাপনা দেখা যেত। আর সন্ধ্যার সময় ধূসর মেঘলা আকাশের নিচে চারপাশটা কেমন যেন শান্ত, নরম আর মায়াবী হয়ে উঠত।

সন্ধ্যা হলেই আমার একটা নিয়ম ছিল।

হাত-পা ধুয়ে পড়তে বসতাম।

দিনের ব্যস্ততা শেষ করে বই-খাতা নিয়ে পড়তে বসা—সেই সময়টাও আজ মনে পড়লে ভালো লাগে। তখন জীবন ছিল অনেক সহজ। পড়াশোনা, বন্ধু, মাঠ আর নানী বাড়ির সেই পরিচিত পরিবেশ—এই ছিল আমাদের ছোট্ট পৃথিবী।

পড়া শেষ হলে শুরু হতো আরেক আনন্দ।

এফএম রেডিও।

রেডিওটা হাতে নিয়ে কোনো অনুষ্ঠান শুনছি, কখনো গান, কখনো উপস্থাপকের কথা, কখনো শ্রোতাদের ফোন—সবকিছুই তখন বেশ উপভোগ করতাম। আজকের মতো হাতে স্মার্টফোন ছিল না, ইউটিউব বা ফেসবুকে যখন-তখন কিছু দেখা বা শোনা যেত না। তাই একটি এফএম রেডিওই ছিল আমাদের বিনোদনের অন্যতম সঙ্গী।

আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিল—পরের দিন সেই অনুষ্ঠান নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করা।

কে কী শুনেছে, কোন গান ভালো লেগেছে, উপস্থাপক কী বলেছে, কোন অনুষ্ঠান কখন হবে—এসব নিয়েই কত কথা!

মাঝে মাঝে তো কয়েকজন বন্ধু মিলে কড়ই গাছের নিচে বসে এফএম রেডিও শুনতাম। চারপাশে তখন প্রকৃতির নিজস্ব শব্দ, মাথার ওপরে কড়ই গাছের ছায়া, হাতে রেডিও—সেই মুহূর্তগুলো কতটা সাধারণ ছিল তখন, কিন্তু আজ বুঝি, সেগুলোই ছিল জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলোর একটি।

আজ এত বছর পর আবার এমন একটি পরিবেশে চা খেতে এসে বসেছি।

সামনে সবুজ ঘাস। পাশে জলাভূমি। কাশফুল বাতাসে দুলছে। দূরে বড় বড় গাছ। খোলা মাঠের ওপরে ধূসর আকাশ। সন্ধ্যার নরম আলো ধীরে ধীরে চারপাশকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

হাতে এক কাপ চা।

আর হঠাৎ করেই মনে পড়ে গেল সেই নানী বাড়ির কথা।

মনে হলো, একটু পরেই হয়তো হাত-পা ধুয়ে পড়তে বসব। পড়া শেষ করে এফএম রেডিওটা চালু করব। তারপর পরের দিন বন্ধুদের সঙ্গে বসে আগের রাতের অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা করব।

হয়তো আবার কড়ই গাছের নিচে বসে সবাই মিলে রেডিও শুনব।

কিন্তু বাস্তবতা হলো—সেই দিনগুলো আর ফিরে আসবে না।

নানী বাড়ির সেই সময়, সেই বন্ধুরা, সেই কড়ই গাছের নিচের আড্ডা, সেই এফএম রেডিও—সবকিছু এখন স্মৃতির পাতায়।

তবুও কিছু স্মৃতি আশ্চর্যভাবে বেঁচে থাকে।

একটি পরিচিত দৃশ্য, কাশফুলের দোলা, মেঘলা আকাশ কিংবা এক কাপ চা—হঠাৎ করেই সেই পুরোনো দিনগুলোর দরজা খুলে দেয়।

আজ এখানে চা খেতে এসে তাই শুধু চা খাওয়া হলো না।

আজ একটু ২০০৯-এ ফিরে যাওয়া হলো।

ফিরে দেখা হলো সেই কিশোর বয়সকে—
যে সন্ধ্যায় হাত-পা ধুয়ে পড়তে বসত,
পড়া শেষে এফএম রেডিও শুনত,
পরের দিন বন্ধুদের সঙ্গে অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা করত,
আর কখনো কখনো কড়ই গাছের নিচে বসে বন্ধুদের সঙ্গে রেডিও শুনে সময় কাটাত।

জীবন আমাদের অনেক দূরে নিয়ে এসেছে।

কিন্তু কিছু বিকেল, কিছু সন্ধ্যা আর কিছু মানুষকে আমরা যত দূরেই যাই, সঙ্গে করে নিয়ে চলি।

সময় চলে যায়। মানুষ বড় হয়। জায়গা বদলে যায়।
কিন্তু শৈশব-কৈশোরের কিছু স্মৃতি—এক কাপ চায়ের মতোই, বহু বছর পরও মনে উষ্ণতা ছড়িয়ে দেয়।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:০৪
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গালিব সাহেব, মিথ্যারও তো একটু সামাজিক মর্যাদা আছে!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৩



মির্জা গালিব বলেছেন -
“পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মিথ্যা বলা হয় ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে, যেটা আদালতে। আর সবচেয়ে বেশি সত্য বলা হয় মদ ছুঁয়ে, যেটা পানশালা।”

গালিব সাহেব, আপনার কথায় যুক্তি আছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

লাউঞ্জ এন্ড ফুড রিভিউ; দ্যা সেন্স

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৪২


নিয়মিত-অনিয়মিত গত এক যুগ ধরে ভ্রমণ করছি এবং প্রায়োরিটি পাস দিয়ে বিভিন্ন দেশের এয়ারপোর্টে লাউঞ্জ ব্যবহার করছি প্রায় ৪ বছর ধরে। দীর্ঘ ফ্লাইট, লং ট্রানজিটের মধ্যে এয়ারপোর্টে ফ্রিতে দৃষ্টিনন্দন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

অধরা বালিকা

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:১৮




লোভনিয়া তুমি এক অধরা বালিকা
ঘুমগুলো কেড়ে নাও ধুম করে তুমি
অথচ আমার জন্য তুমি মরুভূমি
পর ঘরে মহারানি হয়ে থাক চাই।
পরের হৃদয় রাজ্যে থাকবে মালিকা
তেমনটা আশাকরি। তাতেই যে আমি
অনেক প্রশান্তি... ...বাকিটুকু পড়ুন

যেখানে খোদা নেই; সেই ঠিকানার সন্ধানে( একটি দীর্ঘ সুফি দার্শনিক আত্মজিজ্ঞাসা)

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:১৮


প্রথমেই জানাই আমার এই লেখাটি ব্লগার মরুভুমির জলদস্যুর লেখা “শরাব পিনে দে”
হতে উৎসারিত, তাই তাঁর প্রতি জানাই কৃতজ্ঞতা ।

সেই লেখাটিতে তিনি মির্জা গালিব এর বিখ্যাত শেরটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৮ বছর পর ঋণের খোঁজে সন্তান বনাম হাজার কোটি টাকার খেলাপি: আমাদের ব্যাংকিং ও শেয়ারবাজারের ট্র্যাজেডি

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৯

সংবাদের পাতার দুটি বিপরীতমুখী ছবি সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের চরম এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈপরীত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

একদিকে আমরা দেখি, ২৮ বছর আগে বাবার নেওয়া মাত্র ১০ হাজার টাকার দাদন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×