সংবাদের পাতার দুটি বিপরীতমুখী ছবি সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের চরম এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈপরীত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
একদিকে আমরা দেখি, ২৮ বছর আগে বাবার নেওয়া মাত্র ১০ হাজার টাকার দাদন শোধ করার জন্য পুরান ঢাকার অলিগলিতে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন পিরোজপুরের এক খামারি, কাঞ্চন শিকদার। ২০১১ সালে বাবা মারা যাওয়ার আগে জানিয়ে যাওয়া ঋণের দেনা শোধ করতে আজ যখন তাঁর সামর্থ্য হয়েছে, তিনি বাবার আত্মাকে মুক্ত করতে পাওনাদারকে খুঁজে ফিরছেন।
আর অন্যদিকে সংবাদপত্রের অন্য পৃষ্ঠায় চোখ রাখলে দেখা যায়—দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ কোটি টাকারও বেশি! বিতরণ করা ঋণের প্রতি ১০০ টাকার ৩৩ টাকাই এখন খেলাপি। অথচ মজার বিষয় হলো, এই বিশাল খেলাপি ঋণের সিংহভাগই কেন্দ্রীভূত মাত্র গুটিকয়েক বড় ব্যাংকে এবং অল্প কিছু নামীদামী শিল্পগোষ্ঠীর হাতে।
এই দুটি চিত্র পাশাপাশি রাখলে আমাদের দেশের আর্থিক ব্যবস্থার একটি উল্টো ও নির্মম সত্য দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আমাদের দেশের প্রচলিত ব্যবস্থাটি এমনভাবে তৈরি যে, ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতা বা সাধারণ মানুষের ওপর ব্যাংকের নিয়মকানুনের খড়্গ সবসময়ই চড়া। কৃষক, ছোট ব্যবসায়ী বা মধ্যবিত্ত মানুষ ঋণ নিতে গেলে গ্যারান্টার, জামানত আর নথিপত্রের হাজারো চক্করে পিষ্ট হতে হয়। কিস্তি আদায়েও তাদের ওপর ব্যাংকের চাপ থাকে আকাশচুম্বী। আর কাঞ্চন শিকদারদের মতো মানুষরা তো নিজের নৈতিকতার তাড়নায় দেনা শোধ করতে জীবনের শেষ সম্বলটুকু নিয়েও পাওনাদারের দ্বারে দ্বারে ঘোরেন।
কিন্তু বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে গল্পটা একদম উল্টো! সেখানে ব্যাংকের চেয়ারম্যান বা এমডি মহোদয়েরা নিজেরা গিয়ে নামীদামী গ্রাহকের এসি রুমে বসে সৌজন্য চা খেতে খেতে অফার দিয়ে আসেন—"স্যার, আমাদের ব্যাংক থেকে কয়শ কোটি টাকা লোন নেবেন বলুন? এই এই প্রদেয় সুবিধা আমরা গুছিয়ে দিচ্ছি।"
পরিণাম? এই পরম আদরে দেওয়া বড় বড় লোনগুলোর বড় একটা অংশই শেষ পর্যন্ত আর ফেরত আসে না। হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে এই বড় ঋণগ্রহীতারা পার পেয়ে যান, আর খেলাপি ঋণের বিশাল বোঝা এসে পড়ে সাধারণ আমানতকারীদের ঘাড়ে।
অর্থনীতির মৌলিক নীতি বলে—বড় বড় দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ বা মেগা প্রজেক্টের জন্য ব্যাংক কখনোই আদর্শ স্থান হতে পারে না। ব্যাংক মূলত স্বল্পমেয়াদী আমানত বা ডিপোজিট নিয়ে কাজ করে, তাই তাদের কাজ হওয়া উচিত স্বল্পমেয়াদী বা ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল লোন দেওয়া।
বিশ্বের যেকোনো সুসংগঠিত অর্থনীতিতে বড় ও দীর্ঘমেয়াদী প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট আসে শেয়ারবাজার (Capital Market) থেকে। সেখানে বড় বড় কোম্পানি তাদের শেয়ার বা বন্ডের অংশ বাজারে ছেড়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ তোলে। এতে ব্যাংকের ওপর দীর্ঘমেয়াদী ঋণের চাপ তৈরি হয় না।
কিন্তু আমাদের দেশের ট্র্যাজেডি হলো—আমাদের পুঁজিবাজার এবং ব্যাংকিং খাত দুটিই যেন এক গভীর বিভ্রান্তির গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেছে!
একদিকে আমাদের শেয়ারবাজার সুশাসনের অভাবে পরিণত হয়েছে এক ধরনের ফটকাবাজির আখড়ায়, যেখানে ভালো কোম্পানিগুলো শেয়ার ছেড়ে মূলধন তোলার ভরসা পায় না। আর অন্যদিকে, পুঁজিবাজারের সেই বিকল্প পথ বন্ধ থাকায় দেশের পুরো দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নের চাপ এসে পড়েছে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর। ফলে ব্যাংকগুলো একদিকে ভুল জায়গায় বড় ঋণ দিয়ে খেলাপি ঋণের সাগরে ডুবছে, আর অন্যদিকে ছোট উদ্যোক্তারা তাদের প্রয়োজনীয় মূলধন না পেয়ে ধুঁকছে।
তবে এই আঁধারের মাঝেও কিছুটা আলোর ঝলক দেখা যায় সেই ১৩টি বেসরকারি ব্যাংকে, যেখানে খেলাপি ঋণের হার ৫ শতাংশের নিচে (যেমন ব্র্যাক ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ইত্যাদি)। তাদের সাফল্য এটাই প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক বিবেচনা বা অনৈতিক চাপ এড়িয়ে যদি নিরপেক্ষভাবে প্রফেশনাল ঝুঁকি মূল্যায়ন (Risk Assessment) করা যায় এবং এসএমই (SME) ও ভোক্তা ঋণে বেশি জোর দেওয়া হয়, তবে ব্যাংক খাতকে নিরাপদ রাখা সম্ভব।
কাঞ্চন শিকদারের ২৮ বছর পর বাবার ঋণ শোধের আকুলতা আমাদের শেখায় সাধারণ মানুষের সততা আর নৈতিকতার জোর কতটা গভীর। অন্যদিকে হাজার কোটি টাকার খেলাপির পাহাড় আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভঙ্গুরতা।
যেদিন আমাদের ব্যাংকগুলো বড় বড় খেলাপিকারীদের কাছে জিম্মি হওয়া বন্ধ করে কাঠামোগত সুশাসন নিশ্চিত করবে এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নের জন্য একটি সুস্থ ও শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে উঠবে—একমাত্র সেদিনই এই অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। নইলে সততার জয় কেবল কাঞ্চন শিকদারদের গল্পের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে, আর অর্থনীতির আসল চালিকাশক্তি আটকে থাকবে অসাধু খেলাপিকারীদের পকেটে।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



