
জিন্নাহর সেই ভাষণ
সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে ভাষা আন্দোলন নিয়ে জিন্নাহর একটি বক্তব্য যাতে দাবী করা হচ্ছে তিনি নাকি আমাদের ওপর উর্দু যেভাবে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে বলে এতকাল “প্রচার” করা হয়েছে সেটা নাকি খণ্ডিত বক্তব্য, পুরো বক্তব্য নাকি আসলে আমাদের শোনানো হয়নি। আমাদের নাকি ভুল বোঝানো হয়েছে, ভারতীয় ষড়যন্ত্র এর মধ্যে আছে ইত্যাদি ইত্যাদি। ইউটিউবে আজকাল এসব নিয়ে বেশ কিছু ভিডিও বেরিয়েছে। সব ভিডিওর একটাই মূল থিম সেটা হল খণ্ডিত বক্তব্য দিয়ে জিন্নাহকে নাকি ভুল বোঝানো হয়েছে।
প্রথমে এই ভিডিওগুলোর ব্যাপারে বলি। ভিডিওগুলি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে এগুলোর কোনও কোনটায় জিন্নাহর বক্তব্য তার নিজের গলায় না বলিয়ে জিন্নাহর একটি ছবি টাঙ্গিয়ে বাঙ্গালী একজনের গলায় পুরো ভাষণটি শোনানো হয়েছে। জিন্নাহর বক্তব্য এখানে শোনানো হয় অল্প একটু। বাদবাকী বড় অংশটা সেই বাঙ্গালী একজনের গলায়। জিন্নাহর খণ্ডিত বক্তব্য দেয়া হয়েছে এখানেও। এখানেই আছে শুভঙ্করের ফাঁকি। স্ক্রিপ্টটা জিন্নাহর নিজের গলায় না বলে বাংলায় একজনকে দিয়ে যে বলানো হল সেখানে যে ভাষণটার তাৎপর্যপূর্ণ অংশটি (অর্থাৎ যে অংশটুকু বাংলায় শোনানো হয়েছে) যে সত্যমিথ্যার মিশ্রণ ঘটিয়ে কারো বানানো নয় সেটার কি কোনও নিশ্চয়তা আছে? আরেকটি ভিডিও দেখেছি ইউটিউবে যাতে জিন্নাহর নিজের বক্তব্য দিয়ে শোনানো হচ্ছে যে তিনি নাকি উর্দু আমাদের ওপর সেভাবে চাপিয়ে দেয়ার কথা বলেন নি।
লক্ষণীয় বিষয় যে এই ভিডিওগুলো এমন এক সময়ে রিলিজ করা হচ্ছে যখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টালিজেন্স (এ আই) ব্যবহার করে নানা জালিয়াতিপূর্ণ বক্তব্য সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়ে পড়ছে। এ আই দিয়ে আজকাল তো অরিজিনাল ভয়েসকেও ভয়েস ক্লোনিং করে একেবারে আসলের মতো তৈরি করাও সম্ভব হচ্ছে। এ আই এর ওপর এক্সপার্ট যে কাউকে দিয়ে এসব ফেইক ভিডিও তৈরি করা অসাধ্য কোনও কিছু নয় আজকাল। তার ওপরে খুব ভালো কোনও প্রফেশনাল ভিডিও এডিটিং সফটওয়্যার ব্যবহার করেও এক্সপার্ট কাউকে দিয়ে এসব জালিয়াতি করা মোটেই অসম্ভব কিছু নয়। আর তাছাড়া এসব জালিয়াতি সাধারণ মানুষের পক্ষে ধরাটাও সহজ নয়। পশ্চিমা দেশগুলোতেই আজকাল এই এ আই দিয়ে তৈরি নানা কাহিনীর কারণে তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে। এ আই নিয়ে ভালোরকম বিতর্ক শুরু হয়ে গেছে খোদ সেসব দেশেই।
কথা হচ্ছে জিন্নাহর এই কথাগুলো যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে এগুলো এই দীর্ঘ সত্তর বছর কোথায় ছিল? সেগুলো তো ভাষা আন্দোলন যখন চলমান তখনই পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ পুরো ভাষণটি দেশের সবাইকে শোনাতে পারতো যাতে ভাষা আন্দোলনের কোনও যৌক্তিকতা না থাকে। পাকিস্তানী আমলের দীর্ঘ ২৪ বছরেও তো তা করতে পারতো।তাছাড়া যারা পাকিস্তান প্রেমী তারাও তো এসব “সত্য ইতিহাস” শোনানোর জন্য এতো দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতো না। ঠিক কি না? কৈ, সেসব তো কিছুই হয় নি। কেন? এখন এসব কথাবার্তা চাউর হতে শুরু করেছে কখন? যখন থেকে ভিডিও এডিটিং সফটওয়্যার আর এ আই এর সাহায্যে গোঁজামিল দিয়ে জালিয়াতি মার্কা ইউটিউব ভিডিওগুলি বানানো সহজ হয়ে গিয়েছে তখন থেকেই।
হোয়াট এ টাইমিং!! ব্যাপারগুলো ভারী গোলমেলে।
পরের যে ব্যাপারটি এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ সেটি হল কনফার্মেশন বায়াস এবং ম্যানিপুলেশন। কনফার্মেশন বায়াস থাকলে মানুষ কেবল সেই তথ্যটি খুঁজে যা তার বিশ্বাস এবং ধারণার সাথে মিলে যায়, বাদবাকিটা খুঁজে না। এমনকি সত্য হলেও না। সেগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে প্রকৃত সত্য বা বাস্তবতাকে ম্যানিপুলেট করে সত্য মিথ্যার মিশ্রণ ঘটিয়ে ( মিথ্যা বা জালিয়াতি হলেও) সেটাকেই সত্য বলে চালিয়ে দিতে তৎপর হয়ে পড়ে অনেকে। আমাদের দেশের পাকিপ্রেমীদের এদিক দিয়ে জুড়ি নেই।
আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধ এবং ভাষা আন্দোলন নিয়ে বায়সনেস বা পক্ষপাতদুষ্টতার কোনও শেষ নেই। বিশেষ করে যারা পাকিস্তানের প্রতি নানাভাবে আনুগত্য লালন করে তারা সব সময় এগুলোর প্রতি বায়াসনেসে ভুগে। এই বায়াসনেস তাদের মধ্যেও প্রবল যারা ভারতবিরোধী মানসিকতা লালন করে গভীরভাবে। প্রত্যেকটি জিনিসকেই তারা দেখে ভারতের ষড়যন্ত্র হিসেবে। এসব কারণে আপনি আজ ভারতের বিরুদ্ধে যাই বলবেন সেটাই “মার্কেট” পেয়ে যাবে, এমনকি মিথ্যা হলেও। এসব নিয়ে হয়েছে ভারী বিপদ। কারণ এই মিথ্যা এরা বিনা দ্বিধায় কোনও সত্যমিথ্যা যাচাই না করেই বিশ্বাস করে এবং অন্যকে বিশ্বাস করতে উদ্বুদ্ধ করে।
ভাষা আন্দোলনে কোনও অবস্থাতেই ভারতের কোনও ভূমিকা নেই। এটা পুরোদস্তুর আমাদের দেশের তৎকালীন সচেতন ছাত্র-জনতার একটি ন্যায্য দাবীর একটি সঠিক আন্দোলন। এই আন্দোলন হয়েছিলো উর্দুর বিরুদ্ধে নয়, সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতি হিসেবে আমাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন। তৎকালীন পাকিস্তানে জনসংখ্যার অনুপাতে শতকরা ৫৬ জনই ছিল বাঙ্গালী। কাজেই আমরা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা চাইবো এতে দোষের কিছু ছিল না, আজও নেই। একটি দেশে একাধিক রাষ্ট্রভাষা থাকতে পারে। যেমন সুইজারল্যান্ডে ৪ টি রাষ্ট্রভাষা রয়েছে, কানাডায় ২ টি রাষ্ট্রভাষা রয়েছে। আপনি হয়তো বলতে করতে পারেন তৎকালীন পাকিস্তানে পাঞ্জাবি, পশতু, সিন্ধি ইত্যাদির ভিড়ে উর্দু ছিল মোস্ট আন্ডারস্টেনডেবল তাই উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে করতে চেয়েছিলেন জিন্নাহ। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এতে দোষের কিছু নেই এবং সেটাই একটা বড় অংশ মনে করে। কিন্তু সেকালের সচেতন ছাত্রসমাজ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে যে বাংলাকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা চেয়েছিল সেখানেই বা দোষ কোথায় ছিল? এখানে নোটেবল ফ্যাক্টর এটাই যে তারা কিন্তু উর্দুকে বাদ দিয়ে বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হোক এ দাবী করেনি। আপনি এ কথাও তুলতে পারেন যে তাহলে সিন্ধি, বালুচ এসব জাতিগোষ্ঠী তাদের ভাষার জন্য লড়েনি কেন? কারণ একে তো তারা সেসময় শিক্ষাদীক্ষায়-চিন্তাচেতনায় অনেক পশ্চাৎপদ ছিল, ফলে আমাদের মতো নিজেদের মাতৃভাষা নিয়ে অতোটা সচেতনতা তাদের মধ্যে ছিল না। আর তাছাড়া তারা আমাদের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ (৫৬%) ছিল না।
এখন এর মধ্যে ভারতীয় ষড়যন্ত্র যারা খোঁজে তারা সেটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই সেটা করে। যাতে ভাষা আন্দোলনের ব্যাপারটা বিতর্কিত করা যায়। আমাদের দেশটা যে পাকিস্তানের অংশ হয়ে গিয়েছিলো এটা মূলত তৎকালীন মুসলিম লীগ আর কংগ্রেস উভয়ের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি আর ব্রিটিশদের কূটকৌশলের সুবাদেই। শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে, দ্বিজাতি তত্বের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তান কখনোই আজীবন এক থাকার মতো কোনও পরিস্থিতি বাস্তব ক্ষেত্রে ছিল না। সেটা যে ছিল না সেটা পশ্চিম পাকিস্তান তার আমলেই সেটা প্রমাণ করে ছেড়েছে। রাষ্ট্রভাষা নিয়ে দুই পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব এবং পরবর্তীকালের ঘটনাবলী সেটাই প্রমাণ করেছে। এখন আপনি ভারত বিরোধিতার ধুয়া তুলে এসব সত্যকে বিতর্কিত করতে চাইলে বা আপনার মনগড়া মিথ্যেকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেই তো আপনার মনগড়া মিথ্যেটা সত্য হয়ে যাবে না। একটু আগেই বলছিলাম কনফার্মেশন বায়াস নিয়ে। এখনকার প্রজন্মের একটা বড় অংশ সেটাই লালন করে। এসব বিশ্বাসের পালে সবচেয়ে বেশী হাওয়া দিয়েছে জামাতপন্থী নানা মিডিয়া আর জামাতপন্থী নানা প্রকাশনা। এসবের প্রচারণার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে এরা বিশ্বাস করতে চায় যে দেশের সমস্ত কিছুর মুলেই রয়েছে ভারতীয় ষড়যন্ত্র। এরা বিশ্বাস করতে চায় আমাদের এতকাল যা শেখানো হয়েছে প্রত্যেকটি জিনিসই হচ্ছে ভারতীয় ষড়যন্ত্র। এরা বিশ্বাস করতে চায় যে পাকিস্তান আমাদের জন্য খারাপ কিছু করেনি, বরং অনেক উপকারই করেছে! তাদের আমলে আমরা নাকি ভালোই ছিলাম! পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানের শোষণের কথা সবই নাকি ভারতীয় ষড়যন্ত্র। To make these matters even more worse, অবস্থাটা আরও বেশী শোচনীয় দিকে গেছে আওয়ামী লীগের আমলের স্বৈরশাসন আর তাদের নানা মিথ্যাচার আর প্রোপাগান্ডা, বিশেষ করে সমস্ত কিছুর মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে ঢোকানো, সবকিছুতে আওয়ামী লীগের ক্রেডিট দাবী করা। ইতিহাস নিয়ে আওয়ামী লীগের নানা মিথ্যাচার আর সব কিছুতে বঙ্গবন্ধুর ক্রেডিট দাবী করা এখন অনেকটাই উন্মোচিত। একদিকে আছে সবকিছুতে বঙ্গবন্ধুর মিথ্যে ক্রেডিট দেয়া আবার অন্যপক্ষে আছে সবকিছুতে বঙ্গবন্ধুকে ডিসক্রেডিট করা। যার কারণে ইতিহাসের ওপর এখনকার প্রজন্মের বিশ্বাসের ভিতটা নষ্ট হয়ে গেছে। আর এই সুযোগে পাকিপ্রেমীরা তাদের মনগড়া ইতিহাস সবাইকে গেলানোর এক মস্ত বড় মওকা পেয়ে গেছে। এসবের চক্করে পড়ে সত্যনিষ্ঠ ইতিহাস চর্চা করা মহা কঠিন হয়ে পড়েছে এদেশে।
হ্যাঁ, বাংলাদেশ তৈরি হওয়ার পেছনে, মুক্তিযুদ্ধের পেছনে ভারতের হাত অবশ্যই আছে। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রে তো তা নেই। আপনি হয়তো এমন দাবীও করতে পারেন এসব আসলে র-এর ষড়যন্ত্র। ভালো কথা, র তৈরি হয়েছিলো কখন? র তৈরি করা হয়েছিলো ১৯৬৮ সালে। এখন আজকের যুগে এসে আপনি এ আই দিয়ে তৈরি করা ম্যানিপুলেটেড ভিডিও দিয়ে জিন্নাহকে আর পাকিস্তানী আমলকে জাস্টিফিকেশন দিতে চাইলেই সেটা সত্য ইতিহাস নামে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় না। বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ার পর ভারত আমাদেরকে নানাভাবে শোষণ করেছে অবশ্যই, তাই বলে পাকিস্তানী শোষণ মিথ্যে হয়ে যায় না, রাষ্ট্রভাষা নিয়ে জিন্নাহর নীতি বা স্ট্যান্ডপয়েন্টটাও তাই বলে গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



