somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যেখানে খোদা নেই; সেই ঠিকানার সন্ধানে( একটি দীর্ঘ সুফি দার্শনিক আত্মজিজ্ঞাসা)

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


প্রথমেই জানাই আমার এই লেখাটি ব্লগার মরুভুমির জলদস্যুর লেখা “শরাব পিনে দে”
হতে উৎসারিত, তাই তাঁর প্রতি জানাই কৃতজ্ঞতা ।

সেই লেখাটিতে তিনি মির্জা গালিব এর বিখ্যাত শেরটি শোনান যা এখানে মির্জা গালিবের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে দিয়ে আলোচনা শুরু করব ।
ছবি-১ - মোঘল রাজদরবারে উর্দূ কবি মির্জা আসাদুল্লাহ বেগ(১৮৬৮ এ মির্জা গালিব) মির্জা গালিব নামে অধিক পরিচিত


মির্জা গালিবের বিখ্যাত শের-
জাহিদ শরাব পিনে দে মসজিদ মে ব্যায়ঠ কর,
ইয়া ওহ জাগা বাতা দে যাঁহা খুদা নেহি।

ভাবানুবাদ
(খোদার ঘরে বসেই আমায় পান করতে দাও শরাব,
নয়তো এমন জায়গা দেখাও, যেখানে নাই আমার রব।)
এমন জায়গা দেখাও, যেখানে খোদা নেই…

কী আশ্চর্য এক প্রশ্ন!এ যেন কোনো কবির মুখ থেকে উচ্চারিত সাধারণ বাক্য নয় এ যেন একজন পথিকের হাতে তুলে দেওয়া এমন একটি প্রদীপ, যার আলো বাইরে পড়ার আগে নিজের মুখটিকেই আলোকিত করে।

মির্জা গালিবের এই শেরকে যদি কেবল মদ্যপানের পক্ষে একটি রসিক যুক্তি হিসেবে পড়ি, তবে আমরা হয়তো শব্দের শরীরটুকু দেখব; কিন্তু তার অন্তর্নিহিত রহস্যের দরজা খুলবে না।

কারণ সুফি কাব্যের জগতে শরাব সবসময় শরাব নয়, মসজিদ সবসময় মসজিদ নয়, কাফের সবসময় কাফের নয়, আর জান্নাতও কেবল কোনো দূরবর্তী বাগান নয়।
এসব কখনো কখনো মানুষের অন্তর্জগতের প্রতীক।
শরাব -ইশ্‌কের নেশা।
সাকি -রহমতের বাহক।
মসজিদ -অন্তরের মেহরাব।
কাবা -হৃদয়ের কেন্দ্র।
কাফের -অজ্ঞাত নফস।
জান্নাত -বিচ্ছিন্নতার অবসান।
আর খোদা -সেই হকিকত, যার বাইরে আর কোনো হকিকত নেই।


তখন গালিবের প্রশ্নটি হঠাৎ অন্যরকম হয়ে যায় এমন কোনো জায়গা দেখাও, যেখানে তিনি নেই।
মানুষের এক অদ্ভুত স্বভাব আছে সে জানতে চায় খোদার ঠিকানা কোথায়?

সে আকাশের দিকে তাকিয়ে স্রষ্টাকে খোঁজে, পাহাড়ে যায়, মরুভূমিতে যায়, মসজিদে যায়, খানকাহে যায়, দরগাহে যায়, কাবার দিকে মুখ ফেরায়, তসবিহ গোনে, জিকির করে, কিতাব পড়ে।সবই সুন্দর।কিন্তু কখনো কখনো সে নিজের হৃদয়ের দরজায় গিয়ে কড়া নাড়তে ভুলে যায়।

সে জানতে চায় আল্লাহ কোথায়?কিন্তু খুব কম মানুষ প্রশ্ন করে আমার অন্তর কোথায়?
আমার অন্তর কি সত্যিই তাঁর দিকে মুখ করে আছে? নাকি কেবল আমার শরীর সিজদায় যায়, আর আমার নফস দাঁড়িয়ে থাকে অহংকারের মসনদে?আমি কি সত্যিই তাঁকে চাই?নাকি তাঁর কাছ থেকে শুধু তাঁর দানগুলো চাই?আমি কি তাঁকে ভালোবাসি? নাকি তাঁর দেওয়া জান্নাতকে ভালোবাসি?আমি কি তাঁর সন্তুষ্টি চাই?নাকি মানুষের চোখে ধার্মিক হওয়ার সম্মান চাই?
এই প্রশ্নগুলোই সুফির পথের শুরু।

কারণ শরিয়ত মানুষকে পথ দেখায়, তরীকত তাকে পথে হাঁটায়, মারিফাত তাকে পথের অর্থ বোঝায়, আর হকিকত তাকে দেখায় পথিক, পথ ও গন্তব্যের রহস্য কত গভীর।
মসজিদ বাইরে, মেহরাব ভেতরে, মসজিদ অবশ্য অবশ্যই পবিত্র স্থান।সিজদা সেও অবশ্যই পবিত্র।ইবাদতের স্থান অবশ্যই সম্মানের।

কিন্তু সুফি প্রশ্ন করেন যে হৃদয় সিজদা করছে, সেই হৃদয়টির অবস্থা কী?কারণ মানুষ মসজিদের মেঝে পরিষ্কার করতে পারে, কিন্তু নিজের অন্তরের ধুলো পরিষ্কার করা অনেক কঠিন।সে অজু করতে পারে পানিতে, কিন্তু নফসের অহংকার ধুতে পারে কি?সে কিবলার দিকে মুখ করতে পারে,কিন্তু নিজের স্বার্থপরতার দিক থেকে মুখ ফিরাতে পারে কি?সে কোরআন পড়তে পারে,কিন্তু কোরআনের আয়না নিজের ওপর ধরতে পারে কি?সে তসবিহ গুনতে পারে,কিন্তু এমন একটি মুহূর্ত আসে কি, যখন তসবিহের দানা গোনা বন্ধ হয়ে যায় এবং হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনই জিকির হয়ে ওঠে?এইখানেই বাহ্যিক ইবাদত আর অন্তরের ইহসান একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়।

নফস অন্তরের সবচেয়ে গোপন পর্দা সুফি সাধনায় সবচেয়ে বড় শত্রু অনেক সময় বাইরে নয়।সে বসে আছে ভেতরে।তার নাম নফস।নফস সবসময় বলে আম আমি জ্ঞানী, আমি ধার্মিক, আমি পবিত্র, আমি সত্যের মালিক, আমি অন্যদের চেয়ে ভালো,আমি জানি কে কাফের, আমি জানি কে মুমিন, আমি জানি কে পাপী, আমি জানি কে জান্নাতে যাবে।

কিন্তু মারিফাতের দরজায় এসে মানুষ যখন সত্যিই নিজের দিকে তাকায়, তখন সে বুঝতে শুরু করে সবচেয়ে বড় অজ্ঞতা অন্যকে না চেনা নয়;নিজেকে না চেনা।লালনের ভাবনার সঙ্গে এখানেই সুফি পথের আশ্চর্য মিল।লালন বলেন মনের মানুষ কে খুঁজতে হলে আগে নিজের মনকে চিনতে হবে।
কারণ যে নিজের ঘর চেনে না, সে কীভাবে পরমের ঠিকানা চিনবে? আমরা সারাজীবন খোদা শব্দটি উচ্চারণ করি, কিন্তু যে আমি শব্দটি উচ্চারণ করে খোদাকে ডাকছি সেই ‘আমি’ কে?
এই প্রশ্নের মধ্যে ঢুকতে ঢুকতেই শুরু হয় নফসের পর্দা সরানোর কাজ।

ইশ্‌ক যেখানে যুক্তির প্রদীপ নিভে যায় রুমি-প্রেরিত সুফি ভাবনার সবচেয়ে উজ্জ্বল শব্দগুলোর একটি ইশ্‌ক।
ছবি : তুরস্কের বুকাতে রুমির ভাস্কর্য


মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি ১৩শ শতাব্দীর একজন ফার্সি সুন্নি মুসলিম, কবি,
আইনজ্ঞ, ইসলামি ব্যক্তিত্ব, ধর্মতাত্ত্বিক, অতীন্দ্রিয়বাদী এবং সুফী ছিলেন

রুমির মরমি কাব্যের সেই চিরন্তন সুর
ইশ্‌কের কসাইখানায়
কেবল শ্রেষ্ঠরাই নিহত হয়;
দুর্বলদের জন্য সেখানে কোনো স্থান নেই।
প্রেমের এই মৃত্যুকে ভয় পেয়ো না-
যে প্রেমে নিহত হয়নি,
সে তো এখনও সত্যিকার অর্থে বাঁচেনি।

এখানে ‘মৃত্যু’ দেহের মৃত্যু নয়; এটি নফসের মৃত্যুঅহংকারের মৃত্যু, পৃথক আমি’-র মৃত্যু। সুফির কাছে এটাই ফানা নিজেকে হারিয়ে ফেলা সেই পরম প্রেমে, যার মধ্যে হারিয়েই আবার বাকা বা নতুন অস্তিত্বের সন্ধান পাওয়া যায়।
তাই রুমির ইশ্‌ক যেন বলে-
তুমি প্রেমকে পেতে যেও না;
প্রেমের হাতে নিজেকে সমর্পণ করো।
কারণ প্রেম যখন সত্যিই আসে,
সে তোমাকে তোমার কাছ থেকেই নিয়ে যায়।
আর তখন প্রশ্ন থাকে না;
আমি কোথায় তাঁকে খুঁজব?
কারণ ইশ্‌কের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ আবিষ্কার করে;
যাঁকে এতদিন বাইরে খুঁজেছি,
তাঁরই নূর আমার অন্তরের গভীরে
নীরবে জ্বলে ছিল।


তাই ইশ্‌ক কেবল ভালোবাসা নয়।এ এমন আগুন, যেখানে প্রেমিকের পুরোনো পরিচয় পুড়ে যায়।ইশ্‌ক বলে তুমি যতক্ষণ বলছ আমি, ,ততক্ষণ তুমি দূরে।যেদিন তোমার আমি ধীরে ধীরে গলে গিয়ে শুধু তুমি থাকে সেদিন দূরত্বের অর্থ বদলে যায়।
রুমি-সুলভ সেই প্রেমে মানুষ খোদাকে ভালোবাসতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের অহংকারকে হারায়।
এ কারণেই সুফি পথের প্রেম কখনো আরামদায়ক নয়।এ প্রেম নীজকে ভেঙে দেবে।নীজ অহংকার ভাঙবে।নীজের মিথ্যা নিরাপত্তা ভাঙবে। নিজের সম্পর্কে বানানো গল্প ভাঙবে।

মানুষ যে নিজেকে এতদিন খুব ধার্মিক, খুব জ্ঞানী, খুব ভালো মানুষ মনে করেছিলে ইশ্‌ক এসে সেই আয়নাটি তার সামনে ধরে বলবে এবার নিজের সত্যিকারের মুখটি দেখো।
শরাব কোন নেশার কথা বলে কবি? হাফিজের কাব্যজগৎ আমাদের শেখায়, সুফি কবিতার “মদ”কে আক্ষরিক অর্থে পড়লে তার বহুস্তরীয় প্রতীকী ভাষা হারিয়ে যায়।সেখানে ময়খানা হতে পারে অন্তরের গোপন আঙিনা।সাকি হতে পারে রহমতের বার্তাবাহক।
ছবি : হাফেজ শিরাজি, মহাকবি হাফেজ


হাফেজ শিরাজি, মহাকবি হাফেজ, আসল নাম শামসুদ্দিন মোহাম্মদ হলেন একজন ইরানী বা ফার্সি কবি যিনি বুলবুল-ই-শিরাজ উপাধিতে ভূষিত হন।

আমাদের আলোচনার ইশ্‌ক, মদ, সাকি, প্রিয়তম এবং বাহ্যিক ধর্মের সীমা অতিক্রম করে অন্তরের সত্যের সন্ধান এই ধারার সঙ্গে হাফিজের একটি বিখ্যাত গজল বিশেষভাবে মানানসই। এটি তাঁর দেওয়ান-এর অন্যতম প্রসিদ্ধ গজল, যার প্রথম পংক্তি শুরু হয় শিরাজের তুর্ক যদি আমার হৃদয় জয় করে… দিয়ে।
হাফিজের গজল যদি সেই শিরাজি তুর্ক…
اگر آن ترک شیرازی به دست آرد دل ما را
به خال هندویش بخشم سمرقند و بخارا را
بده ساقی می باقی که در جنت نخواهی یافت
کنار آب رکن آباد و گلگشت مصلی را
ز عشق ناتمام ما جمال یار مستغنی است
به آب و رنگ و خال و خط چه حاجت روی زیبا را
حدیث از مطرب و می گو و راز دهر کمتر جو
که کس نگشود و نگشاید به حکمت این معما را
এর একটি ভাবানুবাদ হতে পারে-
হাফিজের ইশ্‌ক প্রিয়তমের কাছে সবকিছু বিসর্জন
যদি সেই শিরাজি তুর্ক আমার হৃদয়টি জয় করে নেয়,
তার মুখের একটি কালো তিলের বিনিময়ে
আমি দিয়ে দেব সমরকন্দ ও বুখারা।

হে সাকি, ঢেলে দাও সেই অবশিষ্ট মদ-
কারণ স্বর্গেও তো পাওয়া যাবে না
রুকনাবাদের তীর,
মুসাল্লার সেই ফুলে-ভরা পথ।
আমাদের অসম্পূর্ণ প্রেমের তো
প্রিয়তমের সৌন্দর্যের কোনো প্রয়োজনই নেই;
এত সুন্দর যে মুখ,
তার আবার রং, অলংকার, তিল কিংবা রেখারই বা কী প্রয়োজন?
তাই আজ গায়ক আর মদের কথা বলো,
জগতের রহস্যের হিসাব কষো না এত;
কারণ এই মহারহস্য
বুদ্ধির দ্বারা কেউ খুলতে পারেনি,কেউ পারবেও না।

হাফিজের কবিতার বিশেষ সৌন্দর্য এখানেই প্রিয়তমএকই সঙ্গে মানবপ্রেমের এবং সুফি-ভাবনায় পরম প্রিয়তমের প্রতীক হতে পারে। তাঁর “মদ”ও তাই কেবল পানীয় হিসেবে পড়লে কবিতার একটি স্তর ধরা পড়ে; সুফি পাঠে তা ইশ্‌কের নেশা ও আত্মবিস্মৃতির প্রতীক হিসেবেও ব্যাখ্যাত হয়েছে। তবে হাফিজের কবিতাকে সম্পূর্ণভাবে কেবল সুফি রূপক হিসেবে পড়া নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে।

আর আমাদের আগের ইবনুল আরাবি–রুমি–লালন প্রসঙ্গে সবচেয়ে সুন্দর সংযোগটি সম্ভবত এই জায়গায়:
ইবনুল আরাবির কাছে হৃদয় হয়ে ওঠে এমন এক স্থান, যেখানে অসংখ্য রূপে তাজাল্লি ঘটে; রুমির কাছে ইশ্‌ক মানুষকে তার ‘আমি’ থেকে মুক্ত করে; আর হাফিজের কাছে প্রেম এমন এক আগুন, যেখানে সমরকন্দ-বুখারার মতো সমগ্র জগতের মূল্যও প্রিয়তমের এক বিন্দু সৌন্দর্যের কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়।[/sb
অর্থাৎ তিনজনের ভাষা আলাদা হলেও অন্তর্গত প্রশ্নটি একই-

যাকে ভালোবেসেছি, তার কাছে আমি শেষ পর্যন্ত কী রেখে দিব আমার সম্পদ, আমার অহংকার, নাকি আমার ‘আমি’-টুকুও?
শরাব হতে পারে ইশ্‌কের সুধা।আর নেশা হতে পারে আত্মবিস্মৃতি।কিন্তু কেমন আত্মবিস্মৃতি?দুনিয়া ভুলে যাওয়ার নয়-
নিজের অহংকার ভুলে যাওয়ার যে নেশায় মানুষ অন্যকে তুচ্ছ করতে শেখে, তা নফসের নেশা।যে নেশায় মানুষ নিজের অহংকার ভুলে গিয়ে অন্যের জন্য কাঁদতে শেখে, তা ইশ্‌কের নেশা।এক নেশা মানুষকে অন্ধ করে।আরেক নেশা মানুষের অন্তরের চোখ খুলে দেয়।এক নেশা বলে আমি। অন্য নেশা বলে তুমি।আর ইশ্‌কের সর্বোচ্চ মুহূর্তে আমি আরতুমি। -র ব্যবধানও যেন এক রহস্যে বিলীন হতে থাকে।

ফানা-আমি কোথায় গেলাম? সুফি দর্শনের একটি গভীর শব্দ ফানা।ফানা মানে নিছক অস্তিত্বের ধ্বংস নয়।আধ্যাত্মিক অর্থে এটি অনেক বেশি সূক্ষ্ম অহংকারের বিলয়, পৃথকত্বের দাবির ক্ষয়, নিজের ‘আমি’-কেন্দ্রিকতার অবসান।যে মানুষ এতদিন বলত আমার জ্ঞান,আমার সম্পদ,আমার মর্যাদা, আমার ধর্মীয় পরিচয়, আমার সাধনা, আমার পুণ্য।একদিন সে বুঝতে শুরু করে কিছুই তো সত্যিকার অর্থে ‘আমার’ নয়।শ্বাসটিও ধার করা।

জীবনটিও আমানত।প্রতিভাটিও দান।সুযোগটিও দান।ভালোবাসার ক্ষমতাটিও দান।এমনকি তাঁকে খোঁজার আকাঙ্ক্ষাটিও তাঁরই দেওয়া।তখন মানুষ নিজের দিকে তাকিয়ে বলে আমি যে ‘আমি’কে এতদিন সত্য বলে ধরে রেখেছিলাম, সে আসলে কতটা ক্ষণস্থায়ী!এই উপলব্ধির আগুনেই নফসের অনেক পর্দা পুড়তে থাকে।

কিন্তু ফানার পরে? বাকা , সুফি পথ শুধু বিলীন হয়ে যাওয়ার কথা বলে না।আছে-
বাকা। অর্থাৎ সেই উপলব্ধির মধ্যে স্থিত হওয়া; এমনভাবে ফিরে আসা, যেখানে মানুষ পৃথিবী থেকে পালিয়ে যায় না, বরং পৃথিবীর মধ্যে থেকেই অন্যভাবে বাঁচতে শেখে।ফানার পরে মানুষ আর বলে না আমি সবার ওপরে।বরং বলে আমি সবার সেবক।ফানার পরে জ্ঞান অহংকার হয় না হয়ে ওঠে বিনয়।ধর্ম বিচার করার অস্ত্র হয় না হয়ে ওঠে করুণা।ইবাদত আত্মম্ভরিতা হয় না হয়ে ওঠে কৃতজ্ঞতা।আর মানুষ অন্যের ভুল দেখার আগে নিজের অন্তরের আয়না পরিষ্কার করে।

ইকবাল, ফারাজ ও সেই অন্তরের দরজা।

মুহাম্মদ ইকবাল বা আল্লামা/স্যার মুহাম্মদ ইকবাল


ধর্মীয় ও ইসলামী রাজনৈতিক দর্শনের জন্যও মুসলিম বিশ্বে বিশেষভাবে সমাদৃত
মির্জা গালিবের শের এর প্রেক্ষিতে ইকবালের জবাব-
মসজিদ খুদা কা ঘর হ্যায়, পিনে কি জাগা নেহি,
কাফির কে দিল মে যা, যাঁহা পার খুদা না হো।

ভাবানুবাদ
(মসজিদ খোদার ঘর, হেথা মদ্যপান মানা,
যাও কাফেরের দিলে, যেথায় খোদার নেই ঠিকানা)

এটি বাহ্যিক আদব ও পবিত্রতার কথা মনে করিয়ে দেয়।এটি গুরুত্বপূর্ণ।কারণ সুফিবাদ কখনো নৈতিকতা বা ধর্মীয় শৃঙ্খলার সম্পূর্ণ অস্বীকার নয়।

কিন্তু ফারাজের জবাব যেন আরেকটি জানালা খুলে দেয়।
ছবি : ফারাজ ওয়ারসি


ফারাজ ওয়ারসি তিনি একজন সুপরিচিত তরুণ সুফি কবি ও গীতিকার। Sufinama-এর মতো সুফি সাহিত্য প্ল্যাটফর্মে তাঁর আধ্যাত্মিক মনকবত, গজল এবং সুফি ঘরানার কালাম বেশ জনপ্রিয়।
কাফির কে দিল সে আয়া হুঁ মেঁ এ দেখ কার,
খুদা মওজুদ হ্যায় ওয়াহাঁ, পার উসে পতা নেহি।

ভাবানুবাদ
(কাফেরের মনে দিয়ে উঁকি এসেছি দেখে,
সেখানেও খোদা আছে, জানেই নেই কাফেরের।)
যাকে তুমি কাফের বলে দূরে সরিয়ে দিলে, তার হৃদয়ের গোপন কক্ষে হয়তো এমন এক নূর আছে, যার খবর সে নিজেও জানে না।কী গভীর কথা!

মানুষ নিজেই কখনো কখনো নিজের ভেতরের নূর সম্পর্কে অজ্ঞ।তার মধ্যে যে করুণা আছে, সে জানে না।তার মধ্যে যে প্রেম আছে, সে জানে না।তার মধ্যে যে অনুতাপ আছে, সে জানে না। তার মধ্যে যে সত্যের ক্ষুধা আছে, সে জানে না।সে শুধু নিজের পরিচয়ের খোলসটুকু জানে।আর খোদা হয়তো খোলসের চেয়ে গভীরে তাকান।

তাজাল্লি হঠাৎ আলো এসে পড়ে ইবনে আরাবির( ১১৬৫ খৃষ্টাব্দে আন্দালুসিয়া বা বর্তমান স্পেনের মূর্সিয়া নগরী তে জন্ম গ্রহণ করায় তাকে আন্দালুসি ও আল-মূর্সি বলা হয়।) সুফিতত্ত্বে তার অনবদ্য অবদানের কারণে তিনি শেখ আল আকবর মুহিউদ্দিন ইবনুল আরাবি নামেই সমধিক পরিচিত ।
ছবিঃ সুফি কবি ইবনে আরাবি



ভাবনার আলোয় তাজাল্লি পরম সত্যের প্রকাশ বা উদ্ভাসএক গভীর রহস্য।
ইবনুল আরাবির সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতাংশগুলোর একটি:
لَقَدْ صَارَ قَلْبِي قَابِلًا كُلَّ صُورَةٍ
فَمَرْعًى لِغِزْلَانٍ وَدَيْرٌ لِرُهْبَانِ
وَبَيْتٌ لِأَوْثَانٍ وَكَعْبَةُ طَائِفٍ
وَأَلْوَاحُ تَوْرَاةٍ وَمُصْحَفُ قُرْآنِ
أَدِينُ بِدِينِ الْحُبِّ أَنَّى تَوَجَّهَتْ
رَكَائِبُهُ فَالْحُبُّ دِينِي وَإِيمَانِي
এর একটি প্রচলিত ইংরেজি অনুবাদ হলো: My heart has become capable of every form…এবং শেষে: I follow the religion of Love… Love is my religion and my faith. এটি Tarjumān al-Ashwāq, কবিতা XI-এর ১৩–১৫ নম্বর পঙ্‌ক্তি হিসেবে সংরক্ষিত।
এর ভাবানুবাদ বাংলায় করলে দাঁড়ায়-
আমার হৃদয় এখন প্রত্যেক রূপ ধারণের উপযোগী-
সে কখনো হরিণের চারণভূমি, কখনো সন্ন্যাসীদের উপাসনালয়,
কখনো মূর্তির মন্দির, কখনো তীর্থযাত্রীর কাবা,
কখনো তাওরাতের ফলক, কখনো কুরআনের পবিত্র পৃষ্ঠা।
আমি প্রেমের ধর্ম অনুসরণ করি
প্রেমের উটের কাফেলা যেদিকে মুখ ফেরায়,
সেদিকেই আমার ধর্ম,
সেদিকেই আমার ঈমান।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ইবনুল আরাবির নিজের ব্যাখ্যার সঙ্গে এই পঙ্‌ক্তিগুলোকে পড়লে সব ধর্ম একই এমন সরলীকরণ করা ঠিক হবে না। তাঁর ব্যাখ্যায় ধর্ম-ই-ইশ্‌কমূলত আল্লাহর প্রতি প্রেম ও আকাঙ্ক্ষার আধ্যাত্মিক অবস্থাকে নির্দেশ করে; তাঁর Dhakhā’ir al-A‘lāq-এর ব্যাখ্যার সঙ্গে এই পঙ্‌ক্তির সম্পর্কও গবেষণায় বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।

মানুষ অনেক সময় ভাবে, আধ্যাত্মিক জ্ঞান মানে অনেক কিছু জানা।কিন্তু কখনো কখনো মারিফাত জ্ঞান সঞ্চয় নয়; বরং পর্দা সরে যাওয়া।যেমন সূর্য সবসময় ছিল,মেঘ সরে গেল, সূর্য নতুন করে জন্মাল না।তেমনি হয়তো হৃদয়ের গভীরে নূরের সম্ভাবনা সবসময় ছিল।শুধু নফসের মেঘ তাকে ঢেকে রেখেছিল।একদিন কোনো অশ্রু,কোনো বিচ্ছেদ,কোনো দুঃখ,কোনো প্রেম,কোনো নিঃসঙ্গ রাত,কোনো গভীর সিজদা,অথবা কোনো অপ্রত্যাশিত মুহূর্তে একটি পর্দা সরে গেল, আর মানুষ বলল আহা! তিনি তো এখানেই ছিলেন!

হয়তো এটাই সেই হৃদয়, যার সন্ধান লালনের মনের মানুষএর কাছে;
হয়তো এটাই রুমির ইশ্‌কএর আগুনে পুড়ে স্বচ্ছ হওয়া হৃদয়;হয়তো এটাই ইবনুল আরাবির সেই ক্বালবযেখানে তাজাল্লির অসংখ্য রূপ প্রতিফলিত হয়।

হৃদয় যখন নফসের সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হয়, তখন সে আর কেবল একটি পরিচয়ের ঘর থাকে না সে হয়ে ওঠে এক আয়না। আর সেই আয়নায় যত রূপই ফুটে উঠুক, প্রেমিকের চোখ শেষ পর্যন্ত এক নূরেরই সন্ধান করে।
এই জায়গাতেই গালিবের প্রশ্ন আবার ফিরে আসে
এমন জায়গা দেখাও, যেখানে খোদা নেই?
আর ইবনুল আরাবির হৃদয় যেন নীরবে উত্তর দেয়;
যে হৃদয় সত্যিকারের ইশ্‌কে প্রশস্ত হয়েছে,
সেখানে তাঁর নিদর্শনের জন্য আর কোনো স্থানই পর নয়।

১০. লালনের মনের মানুষ[/sb
লালনের মনের মানুষ ধারণার মধ্যে যে অন্তর্মুখী রহস্য আছে, সেটিই এই আলোচনার সবচেয়ে মানবিক সেতু।
মনের মানুষকে বাইরে খুঁজে কী হবে?দরবেশের পোশাক পরলেই কি দরবেশ হওয়া যায়?জটা রাখলেই কি সাধু হওয়া যায়?তসবিহ হাতে নিলেই কি অন্তর জিকিরে ভরে যায়?মসজিদে গেলেই কি হৃদয় মসজিদ হয়ে যায়? না। ঘর বানানো আর ঘরকে পবিত্র করা এক কথা নয়।হৃদয়ও তেমন।তার মধ্যে হিংসা থাকতে পারে।অহংকার থাকতে পারে।লোভ থাকতে পারে।বিচারপ্রবণতা থাকতে পারে।কিন্তু তার মধ্যেই আবার প্রেম জন্মাতে পারে।ক্ষমা জন্মাতে পারে।করুণা জন্মাতে পারে।অনুতাপ জন্মাতে পারে।আর সেই অনুতাপ থেকেই শুরু হতে পারে প্রত্যাবর্তন।এই প্রত্যাবর্তনের নামই হয়তো তওবা।

আমরা সবাই পথিক এই পৃথিবীতে কেউই সম্পূর্ণ পথিক নয়।কেউ শরিয়তের পথে হাঁটছে।কেউ তরীকতের দরজায়।কেউ মারিফাতের সন্ধানে।কেউ কেবল নিজের নফসের সঙ্গে যুদ্ধ করছে।কেউ আবার এখনো জানেই না যে তার ভেতরে কোনো পথ আছে।তাই অন্যের অবস্থান নিয়ে চূড়ান্ত রায় দেওয়া কত সহজ!

কিন্তু নিজের অবস্থান জানা কত কঠিন!আমি জানি না অন্যের অন্তরে কী আছে।তাই আমার কাজ বিচারক হওয়া নয়।আমার কাজ নিজের অন্তরের দরজায় দাঁড়ানো।নিজেকে জিজ্ঞেস করা আমার ইবাদত আমাকে কতটা নম্র করেছে? আমার জ্ঞান আমাকে কতটা বিনয়ী করেছে?আমার ধর্ম আমাকে কতটা দয়ালু করেছে?আমার জিকির আমাকে কতটা মানবিক করেছে?আমার সিজদা আমাকে কতটা অহংকারমুক্ত করেছে?যদি ইবাদতের পরও আমার মধ্যে ঘৃণা বাড়ে,যদি জ্ঞানের পরও অহংকার বাড়ে, যদি ধর্মের পরও মানুষের প্রতি নিষ্ঠুরতা বাড়ে তবে হয়তো আমাকে আরও গভীরে যেতে হবে।কারণ sb]আচার শেষ হওয়ার পর যে মানুষটি বেরিয়ে আসে, আধ্যাত্মিকতার আসল পরীক্ষা তার মধ্যেই।


ছবি - লালন শাহ'র জীবদ্দশায় তৈরি করা একমাত্র চিত্র, ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে এঁকেছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর

খোদাকে পেতে হলে খোদার সৃষ্টি থেকে মুখ ফেরানো যায় না। এখানে এসে সুফি দর্শন এক গভীর মানবিক সত্যের সামনে দাঁড় করায়।তুমি যদি বলো “আমি আল্লাহকে ভালোবাসি,”তবে তাঁর সৃষ্ট মানুষের প্রতি তোমার আচরণেও সেই ভালোবাসার ছায়া থাকার কথা।তুমি যদি বলো “আমি নূর দেখেছি,”তবে তোমার আচরণে অন্যের অন্ধকারের প্রতি একটু করুণা থাকার কথা।তুমি যদি বলো “আমি মারিফাত পেয়েছি,”তবে তোমার ভাষায় অহংকার কমার কথা।তুমি যদি বলো “আমি ইশ্‌কের পথে,”তবে তোমার হৃদয় আরও কোমল হওয়ার কথা।কারণ সত্যিকারের তাজাল্লির একটি চিহ্ন হলো [মানুষের হৃদয় নরম হয়ে যায়।সে অন্যের কষ্টে কষ্ট পায়।
অন্যের ভুলে শুধু ঘৃণা করে না সংশোধনের সম্ভাবনাও দেখে।অন্যের পতনে আনন্দ পায় না।কারণ সে জানে আজ যে পড়ে আছে, কাল সে উঠতে পারে;আর আজ যে দাঁড়িয়ে আছে, কাল সে নিজেই পড়ে যেতে পারে।

জান্নাত কোথায়?আমরা জান্নাত চাই।এটি মানুষের স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা।কিন্তু সুফি প্রশ্ন করেন তুমি জান্নাত চাও, না জান্নাতের মালিককে? তুমি দান চাও, না দাতাকে?তুমি আলো চাও, না আলোর উৎসকে? তুমি শান্তি চাও, না সেই সত্তাকে, যার স্মরণে হৃদয় প্রশান্ত হয়?এখানেই প্রেম আর লেনদেনের পার্থক্য।লেনদেনের মানুষ বলে আমি এত ইবাদত করলাম, বিনিময়ে কী পেলাম?
প্রেমিক বলে তুমি আছ এটাই তো যথেষ্ট।এই জায়গায় এসে ইবাদতও বদলে যায়।ভয় থেকে ভালোবাসায়।দাবি থেকে কৃতজ্ঞতায়।লেনদেন থেকে আত্মসমর্পণে।

আর সেই অজ্ঞাত কবির শেষ শের?
পীতা হুঁ সাকি
গাম-এ-দুনিয়া ভুলানে কে লিয়ে
জান্নাত মে কৌনসা গাম হ্যায়,
ইস লিয়ে ওঁয়াহা মাজা নেহি।

ভাবানুবাদ -
(পান করি হে সাকি, সংসারের দুঃখ ভুলে যেতে;
জান্নাতে নেই দুঃখই কোনো,
তাই সেথায় মধ্যপানে মজা নাই।)
কী আশ্চর্য মানবিক স্বীকারোক্তি!মানুষ দুঃখ থেকে পালাতে চায়।কেউ মদে পালায়।কেউ অর্থে।
কেউ ক্ষমতায়।কেউ প্রেমে।কেউ ধর্মীয় অহংকারে।কেউ ব্যস্ততায়।কেউ নিঃসঙ্গতায়।কেউ আবার নিজের তৈরি কোনো পরিচয়ের আড়ালে।কিন্তু দুঃখকে যতই ভুলতে চাই, দুঃখ আমাদের ভেতরে থেকে যায়।

সুফি পথ অন্য কিছু শেখায় দুঃখকে ভুলে যেও না।দুঃখের কাছে বসো।তাকে জিজ্ঞেস করো“তুমি কেন এসেছ?”হয়তো সে বলবে তোমার নফস ভাঙতে।হয়তো বলবে তোমাকে মানুষের কষ্ট বুঝতে শেখাতে। হয়তো বলবে তোমাকে সেই দরজায় নিয়ে যেতে, যেখানে তোমার সমস্ত অহংকারের কোনো মূল্য নেই। তখন দুঃখ শত্রু থাকে না।দুঃখ হয়ে ওঠে মুর্শিদ।

শেষ পর্যন্ত মদ নয় প্রশ্নটাই আসল এই পুরো শায়েরির আসল সৌন্দর্য হয়তো এখানেই এটি আমাদের মদ্যপান শেখাতে আসে না। বরং দেখতে শেখায়।বাহ্যিকতার আড়ালে অন্তরকে।নামের আড়ালে নামহীনকে।রীতির আড়ালে রহস্যকে।শব্দের আড়ালে নীরবতাকে।আর ‘আমি’-এর আড়ালে সেই অসীম সত্যকে, যার সামনে সমস্ত অহংকার ক্ষুদ্র।তাই গালিবের প্রশ্নটি আজও আমাদের পিছু নেয়-
এমন জায়গা দেখাও, যেখানে খোদা নেই।
কারণ যতদূর তাকাই নূর।নূরের মধ্যে নূর।সৃষ্টির মধ্যে নিদর্শন।নিঃশ্বাসে রহস্য।অশ্রুতে ভাষা।প্রেমে তাজাল্লি।আর নীরবতায় এক গভীর উপস্থিতি।

হয়তো খোদার সবচেয়ে কাছের জায়গাটিই আমার অজানা, হয়তো আমি মসজিদের মেহরাব চিনি, কিন্তু নিজের হৃদয়ের মেহরাব চিনি না।হয়তো আমি কাবার দিক জানি,কিন্তু আমার নফস কোন দিকে ছুটছে তা জানি না।হয়তো আমি তসবিহের দানা গুনি,কিন্তু নিজের অহংকারের দানা গুনি না।হয়তো আমি অন্যের ঈমান মাপি,কিন্তু নিজের অন্তরের অন্ধকার মাপি না।হয়তো আমি জান্নাতের দরজা খুঁজি,কিন্তু আমার হৃদয়ের দরজা বন্ধ করে রেখেছি।আর হয়তো-
খোদা সেই দরজার ওপারেই দাঁড়িয়ে আছেন,
যে দরজা খুলতে চাবি হিসেবে লাগে না কোনো সম্পদ,
লাগে শুধু আত্মসমর্পণ।


শেষ কথা: আমি থেকে তুমি সুফি পথের সমস্ত শব্দকে যদি এক বিন্দুতে এনে দাঁড় করাই
নফস,ইশ্‌ক,মারিফাত,হকিকত,তাজাল্লি,ফানা,বাকা,তবে হয়তো এদের অন্তর্নিহিত যাত্রাটি এমন প্রথমে মানুষ বলে আমি আছি।তারপর ইশ্‌ক এসে প্রশ্ন করে এই আমি কে?মারিফাত এসে বলে নিজেকে চিনো।হকিকত এসে বলে যা সত্য, তার সামনে নিজের ধারণাগুলো ছোট করো।তাজাল্লি এসে বলে পর্দার ফাঁকে আলো দেখো।ফানা এসে বলে অহংকারকে বিলীন হতে দাও।আর বাকা এসে শেখায় এবার ফিরে যাও মানুষের কাছে কিন্তু আগের মানুষ হয়ে নয়।এবার তোমার চোখে করুণা থাকবে।কণ্ঠে কোমলতা থাকবে।হৃদয়ে বিনয় থাকবে।অন্যের জন্য দোয়া থাকবে।নিজের জন্য অশ্রু থাকবে।আর সর্বোপরি থাকবে ইশক

তাই আজ গালিবের সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আমি আর মসজিদ, ময়খানা, কাফের কিংবা জান্নাতের মানচিত্র আঁকতে চাই না। আমি শুধু নিজের হৃদয়ের দরজায় গিয়ে দাঁড়াতে চাই।একবার নিঃশব্দে জিজ্ঞেস করতে চাই;
হে আমার অন্তরের অচেনা পরিচিত,
আমি সারাজীবন তোমাকে কোথায় কোথায় খুঁজেছি!
মসজিদে খুঁজেছি, কাবায় খুঁজেছি, কিতাবে খুঁজেছি, মানুষের মুখে খুঁজেছি, কবিতায় খুঁজেছি, অশ্রুতে খুঁজেছি, প্রেমে খুঁজেছি, কিন্তু কখনো কি সত্যিই নিজের অন্তরে ফিরে এসে তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি তুমি কি এখানেই ছিলে?

হয়তো কোনো উত্তর আসবে না।হয়তো শুধু চোখের কোণে জল জমবে।হয়তো বুকের ভেতর নিঃশব্দে কিছু একটা কেঁপে উঠবে।আর সেই কাঁপনই হয়তো হবে প্রথম তাজাল্লি।সেই অশ্রুই হয়তো হবে প্রথম জিকির।সেই আত্মসমর্পণই হয়তো হবে প্রথম ফানা।আর সেই নীরব প্রশান্তিই হয়তো হবে বাকার প্রথম স্বাদ।তখন বুঝব খোদাকে খুঁজতে গিয়ে আমি যে পৃথিবী ঘুরেছি,তিনি কখনোই আমার কাছ থেকে দূরে ছিলেন না। আমি দূরে ছিলাম।আমার নফসের পর্দা দূরত্ব তৈরি করেছিল।আমার অহংকার দেয়াল তুলেছিল।আমার অজ্ঞতা তাঁকে আড়াল করেছিল।তিনি হারিয়ে যাননি আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম।
আর তাই সুফির শেষ যাত্রা খোদার দিকে নয় নিজের মিথ্যা ‘আমি’ থেকে বেরিয়ে সেই সত্যের দিকে,যার আলোয় আমিও একদিন নীরব হয়ে যায়।তখন আর বলা যায় না খোদা কোথায়?
বরং হৃদয় ধীরে ধীরে বলে ওঠে যেদিকে তাকাই, তাঁরই নিদর্শন।যেদিকে ফিরি, তাঁরই দরজা।
যে হৃদয়কে এতদিন নিজের বলে জানতাম সেখানেও তাঁরই আমানত।

আর তখন লালনের মনের মানুষ, রুমির ইশ্‌ক, ইবনে আরাবির হকিকত, হাফিজের মদখানা সব যেন এসে একই নীরব বিন্দুতে মিলিত হয়।শব্দ আলাদা, পথ আলাদা, উপমা আলাদা কিন্তু আকুলতা এক।সেই আকুলতার নাম ইশক।সেই ইশ্‌কের আগুনে নফস পুড়ুক,অহংকার গলুক,পর্দা সরুক,নূর প্রকাশিত হোক।

আর মানুষ একদিন নিজের অন্তরের দরজায় দাঁড়িয়ে খুব আস্তে করে বলুক আমি তোমাকে খুঁজতে বেরিয়েছিলাম শেষে আবিষ্কার করলাম,আমার খোঁজাটিও তোমারই দেওয়া।হয়তো এটাই মারিফাতের প্রথম বিস্ময়।এটাই ইশ্‌কের প্রথম অশ্রু।এটাই হকিকতের প্রথম দরজা।আর এটাই মানুষের দীর্ঘতম সফরের সবচেয়ে নীরব গন্তব্য।
এমন জায়গা দেখাও, যেখানে খোদা নেই…হয়তো উত্তরটি কোনো কবিতায় নেই।হয়তো উত্তরটি আমাদের নিজের হৃদয়ের গভীরতম নীরবতায়।

ছবি সুত্র : গুগল উইকিপিডিয়া ।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৪৬
৮টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ব্যাস্ততম শহরে এক ছুটির দিন

লিখেছেন ঢাকার লোক, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:১২

নিউ ইয়র্ক দুনিয়ার অন্যতম ব্যাস্ততম শহর। বলা হয় The City that never sleeps! এরই মাঝে এবার মিলে গেলো এক ছুটির দিনে পিকনিকে যাওয়ার সুযোগ। শহরের সীমানা ছেড়ে প্রায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৯৯

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১৭



সিরাজ ভাই বললেন, টেংরা মাছের ডিম আপনার কাছে কেমন লাগে?
আমি বললাম, ভালোই লাগে। শুধু রুই মাছের ডিম আমার ভালো লাগে না। সিরাজ ভাই বললেন, রুই মাছের ডিম সঠিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাষ্ট্রভাষা নিয়ে জিন্নাহর বক্তব্য। কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১০


জিন্নাহর সেই ভাষণ
সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে ভাষা আন্দোলন নিয়ে জিন্নাহর একটি বক্তব্য যাতে দাবী করা হচ্ছে তিনি নাকি আমাদের ওপর উর্দু যেভাবে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে বলে এতকাল “প্রচার”... ...বাকিটুকু পড়ুন

গালিব সাহেব, মিথ্যারও তো একটু সামাজিক মর্যাদা আছে!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৩



মির্জা গালিব বলেছেন -
“পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মিথ্যা বলা হয় ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে, যেটা আদালতে। আর সবচেয়ে বেশি সত্য বলা হয় মদ ছুঁয়ে, যেটা পানশালা।”

গালিব সাহেব, আপনার কথায় যুক্তি আছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

লাউঞ্জ এন্ড ফুড রিভিউ; দ্যা সেন্স

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৪২


নিয়মিত-অনিয়মিত গত এক যুগ ধরে ভ্রমণ করছি এবং প্রায়োরিটি পাস দিয়ে বিভিন্ন দেশের এয়ারপোর্টে লাউঞ্জ ব্যবহার করছি প্রায় ৪ বছর ধরে। দীর্ঘ ফ্লাইট, লং ট্রানজিটের মধ্যে এয়ারপোর্টে ফ্রিতে দৃষ্টিনন্দন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×