৪০টি গ্রাম স্থানীয় বাঙালি সেটেলারদের দখলে থাকায় মোট তিন হাজার ৫৫টি শরণার্থী পরিবার ফিরে যেতে পারছেন না নিজ বসত বাড়িতে। উপরন্তু মাঝে মাঝে সরকার আকস্মিকভাবে এই ৬৫ হাজার শরণার্থীর রেশন বন্ধ করে দেওয়ায় তাদের সঙ্কট আরো বাড়ে।
পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে সীমান্ত এলাকা দিঘীনালা, বরখালি, বেতছড়ি, ছোটা মেরুন, চঙরাছড়ির প্রত্যন্ত পাহাড়ি শরণার্থী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে ‘দেশহীন’ এই সব মানুষের দুদশকের গ্লানিময় সমস্যা -- সঙ্কুল জীবন।
দিঘীনালায় সরকারি আবসিক বিদ্যালয়ের ‘ট্রানজিট ক্যাম্পে’ পাহাড়ি শরণার্থী শিবিরে পৌঁছাতেই মিনতি চাকমা (৩৫) খেদ ঝেড়ে বললেন, ‘এখানে আমরা পশুর মতো জীবন কাটাচ্ছি। ঘরে চাল নেই, পারনে কাপড় নেই। েিদর জ্বালায় ছোট ছোট শিশুরা কাঁদছে। আমরা বড়রা না হয় পারি কোনো রকমে খেয়ে, না খেয়ে দিন কাটাতে, কিন্তু বাচ্চারা তা পারবে কি করে?’
প্রত্যাগত শরণার্থী এলাকাগুলোতে এখন উঠেছে এমনি হাহাকার, কান্নার রোল। শরণার্থীরা আহাজারী করে বলছেন, “আমরা এক যুগ ভারতে মানবেতর জীবন কাটিয়ে দেশে ফিরেছি। কিন্তু এখনো আমরা ঘর -- বাড়ি জমি -- জিরাত বুঝে পাইনি। নিজ দেশও আমরা রেশন নির্ভর শরণার্থী হয়ে আছি। এখানে কাজ নেই, কারো হাতে টাকা নেই, শিশুদের নেই কোনো ভবিষ্যত। মরণই বুঝি আমাদের একমাত্র নিয়তি!”
ভারত প্রত্যাগত জুম্ম (পাহাড়ি) শরণার্থী কল্যাণ সমিতির নেতা বকুল চাকমা শরণার্থী জীবনের প্রোপট প্রসঙ্গে এই প্রতিবেদককে জানান, পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বারের আগে অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতিতে ৮০র দশকে একটি বিশেষ মহলের উস্কানীতে বাঙালি সেটেলারা পর পর কয়েক দফায় দীঘিনালাসহ পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় একাধীক সা¤প্রদায়িক হামলা, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুঠপাঠ, অগ্নি সংযোগ ঘটায়। এরই পরিপ্রেেিত জীবন বাঁচাতে পাহাড় -- জঙ্গল ভেঙে এই ৬৫ হাজার পাহাড়ি মানুষ সীমান্তের ওপারে পাড়ি জমান। ত্রিপুরা সরকারের কল্যাণে তাদের সামান্য আশ্রয় জোটে সাবব্র“ম, টাকুমবাড়ি, তবলছড়ি, পঞ্চরামসহ আরো অনেক আশ্রয় শিবিরে।
আরেক শরণার্থী নেতা নরেন্দ্র কারবারি জানান, সে সময় ভারতের আশ্রয় শিবিরগুলোতে খাদ্যোর অভাবে, ম্যালেরিয়ায় ভুগে, অপুষ্টিতে মারা যায় শত শত শরনার্থী। শান্তিচুক্তিতে পার্বত্য সমস্যার সমাধানের চেষ্টার পরিপ্রেেিত দেশে ফেরেন তারা। সে সময় দেশে ফিরে আসা পাহাড়ি শরণার্থীদের পুনর্বাসনে সরকারিভাবে নিজেদের বসত -- বাড়ি ফেরত, ভূমিহীনদের খাসজমি বন্টন, গৃহনির্মাণ অনুদানসহ যে ২০ দফা প্যাকেজ প্রতিশ্র“তি দেওয়া হয়েছিলো, তার অনেকগুলোই এখনো কোনো সরকারিই পুরোপুরি বাস্তবায়ন করে নি। এ সব কারণে গত দুদশকেও অবসান হয়নি তাদের অমানবিক শরণার্থী জীবনের। এখনো শরণার্থী জীবনের নেই কোনো নিশ্চয়তা।
দীঘিনালার চারটি ‘ট্রানজিট ক্যাম্পের’ মধ্যে একটি সরকারি আবসিক বিদ্যালয়ের ‘ট্রানজিট ক্যাম্পে’ গাদাগদি করে আশ্রয় নেওয়া এক সময়ের জুম (পাহাড়ের ঢালে বিশেষ ধরনের চাষাবাদ)চাষী লরিাম চাকমা (৩৬) বলেন, “১৯৮৬ সালে আমি সেটেলারদের হামলায় ঘরবাড়ি ফেলে পালিয়ে ভারতে শরণার্থী হই। দেশে ফিরে এখনো আমার সামান্য ভিটেমাটিতেও ফিরতে পারছি না। আমার ছোট্ট ভিটে -- ঘর, ফলের বাগান -- সবই এখন সেটেলাররা দখল করে সেই জায়গায় দোকান -- পাট তুলে বাজার বসাচ্ছে। এই ক্যাম্পে সরকারি সামান্য রেশনে চলে না; সব মিলিয়ে পরিবার -- পরিজন নিয়ে আমার এখন দিশেহারা অবস্থা!”
ছোট মেরুং এর জুম চাষী বিন্দু কুমার চাকমা (৪৫) জানান, ওই একই বছর তিনিও স্বপরিবারে পাড়ি জমান ভারতে। ১৯৯১ সালে দেশে ফিরে দেখেন তাদের ফুলচাঁন কারবারি পাড়া নামের পুরো গ্রাম, গ্রামের মহাজনী বৌদ্ধ বিহার -- সবই এখন সেটেলারদের দখলে। উপরন্তু বৌদ্ধ বিহারের জমি দখল করে বেশ কিছুদিন আগে সেখনে বানানো হয়েছে একটি আনসার ক্যাম্প।
শরণার্থী নেতা বকুল চাকমা অভিযোগ করে বলেন, একটি বিশেষ মহল পাহাড়ে শরণার্থী ও সেটেলার ইস্যু সৃষ্টির পেছনে দায়ী এবং এই মহলটি এখনো সক্রিয়। শরণার্থী জীবন নিয়ে সর্বত্র চলছে এমনি অরাজকতা।
তিনি জানান, পাহাড়ি -- বাঙালি সেটেলারদের জমিজমার বিরোধ নিস্পত্তি করার জন্য তারা সেটেলারদের পাহাড়ের বাইরে সন্মানজনক পুর্নবাসন করার বিষয়ে সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু কেউ তাদের কথা শুনছে না।
তিনি বলেন, শান্তিচুক্তি অনুযায়ী ‘পার্বত্য ভূমি কমিশন’ গঠন হয়নি বলে পাহাড়ের ভূমির বিরোধ বাড়ছেই। চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলোর বাস্তবায়ন নেই বলে জটিল হয়ে পড়ছে পার্বত্য পরিস্থিতি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সাবেক উপমন্ত্রি মনিস্বপন দেওয়ান স্বীকার করে বলেন, শরণার্থীদের মানবেতর জীবন পাহাড়ের একটি বাস্তব সমস্যা। এ সমস্যার সমাধান ছাড়া পার্বত্য সমস্যার সমাধান অসম্ভব।
তিনিও বলেন, শান্তিচুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য ভূমি কমিশন গঠন হলে পাহাড়ে ভূমির বিরোধও হৃাস পাবে।...
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই মে, ২০০৭ রাত ১:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




