somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পাহাড়ে বিপন্ন জনপদ (চার)

২১ শে মে, ২০০৭ রাত ৯:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


পাহাড়, অরণ্য, ঝর্ণাধারায় নয়নাভীরাম পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন পরিনত হয়েছে ‘সবুজ মরুভূমিতে’। গত তিন দশকের অশান্ত পাহাড়ে দিনের পর দিন অবাধে অরণ্য লুঠ রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানকে করেছে প্রাকৃতিক বনজ সম্পদশুন্য। অনেকটা প্রকাশ্যেই কাঠচুরি পাহাড়ের এখন প্রধান অবৈধ পেশা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের আগে পার্বত্যাঞ্চলে চলতো নিরাপত্তা বাহিনী ও সাবেক গেরিলা গ্র“প শান্তিবাহিনীর এক ধরণের সমান্তরাল দ্বৈত শাসন। আইন -- শৃংখলা রায় প্রকাশ্যে ছিলো নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রন। আর পাহাড় -- অরণ্যে গোপনে আইন -- শৃংখলা নিয়ন্ত্রণ করতো শান্তিবাহিনী। কিন্তু শান্তিচুক্তির পর এই দ্বৈত শাসন ভেঙে পরায় গত প্রায় এক দশকে কাঠচোরদের হয়েছে পোয়াবারো।

অভিযোগ উঠেছে, পেশাদার কাঠচোরদের সঙ্গে বনকর্মকর্তা ও বনরক্ষীদের একাংশের বরাবরাই যোগসাজস রয়েছে। এছাড়া সংগঠিত কাঠচোরদের একাধীক গ্র“পের কাছে রয়েছে বনরক্ষীদের চেয়েও অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাহড়ের প্রাকৃতিক, কি সংরক্ষিত বনাঞ্চল অনেক আগেই শেষ হতে চলেছে। কাঠচোররা সর্বত্র বড় বড় বৃ নিধনযজ্ঞ চালাচ্ছে তো বটেই, এমনকি এসব বনরাক্ষসদের কবল থেকে মাত্র ১০ -- ১২ বছর বয়সী শাল -- সেগুন কাঠও বাদ যাচ্ছে না। শুধু চোরাই কাঠের ওপর নির্ভর করে ছোট্ট পর্যটন শহর রাঙামাটিতে গড়ে উঠেছে দুশতাধীক আসবাবপত্রের দোকান।

এখন পার্বত্যাঞ্চলের সব ক’টি জেলা সদরে তো বটেই, এমনকি উপজেলা সদরেও দেখা যাবে একইচিত্র। চোরাই শাল, সেগুন, গর্জন, কড়ই, মেহগনি, কি আম বা কাঁঠাল কাঠের ওপর নির্ভর করে ব্যঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা এসব দোকান -- পাটের আবার অধিকাংশেরই নেই আইনগত বৈধতা।

সাবেক বনমন্ত্রী শাজাহান শিরাজ স্বয়ং অরণ্য উজারের এই অরাজকতার বিষয় স্বীকার করে কিছুদিন আগে এই প্রতিবেদককে বলেন, প্রায় দুদশকের বিদ্রোহ অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামের গহিন এলাকাগুলোতে এখনো শান্তিচুক্তির পে -- বিপরে পাহাড়ি সশস্ত্র গ্র“প ছাড়াও রয়েছে কাঠ চোরাকারবারিদের সশস্ত্র গ্র“প। এটি একটি বিশাল সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক। উপরন্তু কাঠচুরির ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো কোনো বনকর্মকর্তা ও বনরক্ষীও জড়িত হয়ে পড়েছে।

রাঙামাটির জেলা প্রশাসনের একজন শীর্ষ স্থানীয় কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অরণ্যচুরির ‘মহোৎসবে’র বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি স্বীকার করে বলেন, রাঙামাটিসহ পাহাড়ে সর্বত্র শুধুমাত্র চোরাই কাঠের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে অধিকাংশ আসবাবপত্রের দোকান -- পাট।

ওই কর্মকর্তা বলেন, এখানে তেমন ব্যবসা -- বানিজ্য নেই বলে আসবাবপত্রের ব্যবসাকে প্রশাসন শিথীল করে রেখেছে। পাহড়ের আসবাবপত্র রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইতিমধ্যে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছে। কিন্তু বৈধ জোত পারমিটের চেয়ে অবৈধ চোরাই কাঠ ব্যবসাই অনেক শক্তিশালী।

বাঘাইছড়ির সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন বলেন, বন বিভাগ এমন অনেক জোত পারমিট দিচ্ছে, পরে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, বাস্তবে এর অনেকগুলো বাগানেরই অস্তিত্বই নেই। উপরন্তু বন বিভাগ বৈধ কাঠ আনা -- নেওয়ার জন্য আবার জনসাধারণকে হয়রানীও করে প্রচুর।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাঙামাটির একজন বন কর্মকর্তা জানান, ফার্নিশ কাঠের ওপর বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণ নেই বলে চোরাই কাঠের আসবাবপত্রের আড়ালে এখন কাঠ পাচার হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমি অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, প্রকৃতির সন্তান আদিবাসী পাহাড়িরা ব্যক্তিগত প্রয়োজনের বাইরে গাছ -- বাঁশ কটেনা। জীবন বাঁচানোর স্বার্থেই তারা অরণ্য রা করে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে পাহাড়ে কাজ নেই, মানুষের হাতে টাকা নেই। বুনো আলু আর লতা -- পাতা খেয়ে কোনো রকমে জীবন ধারণে অতিষ্ট পাহাড়িদের অনেকে এখন বাধ্য হয়ে গাছ কাটছে। কয়েক বছর আগেও এখানে এমনটি দেখা যায়নি।’

রাঙামাটির কাপ্তাই, রাজস্থলি, চন্দ্রঘোনা, দুর্র্গম বিলাইছড়ি, ফারুয়া, তক্তানালা, জগ্নাছড়ার বিস্তৃর্ণ এলাকা ঘুরে চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গা এবং বম আদিবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বছরের পর বছর ধরে পাহাড়গুলোকে ‘ন্যাড়া’ করা হচ্ছে একেবারে প্রকাশ্যে। কাপ্তাই লেক এলাকার দু’পাড়ে সংরক্ষিত বনাঞ্চল দেখা গেলেও বনের ভেতরে গেলে দেখা যাবে এসব বন একেবারে ফাঁকা করে দিচ্ছে বনচোরচক্র।

কাপ্তাই, রাজস্থলি ও চন্দ্রঘোনার উপজেলা সদরে লেকের বিস্তীর্ণ পাড়ে দেখা গেছে, ট্রলারভর্তি করে এনে ফেলা গাছ ও বাঁশের স্তুপ। চোরাই গাছের গুড়ি রদ্দা কাঠে পরিনত করার জন্য লেকের পাড়েই গড়ে উঠেছে অসংখ্য করাত -- কল।

পাহাড়ের পরিবেশবিদরা বরাবরই সুপারিশ করছেন -- ১৯২৭ সালের বন আইনের সংশোধন, বনভূমিকে কৃষি বা বন বাগানে পরিনত করা নিষিদ্ধ, লুপ্ত প্রায় বন্য প্রানী শিকার ও পাচার বন্ধ, সংরক্ষিত বনে বসবাসকারী আদিবাসীদের বনজ সম্পদের আয়ের একাংশ প্রদান, সংরক্ষিত বনের প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনায় জেলা পরিষদকে সম্পৃক্ত, সরকারি বন ও বাগান ব্যবস্থাপনা ও সংরণে স্থানীয়দের অংশগ্রহণ, সংরক্ষিত বনের বাইরে ব্যক্তিমালিকানাধীন বনজ সম্পদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে বন বিভাগের অনুমতি নেওয়ার নিয়ম বাতিল, সংরক্ষিত বনের বাইরে গ্রামীণ বনাঞ্চলকে স্থানীয়দের সাধারণ ও সমষ্ঠিগত মালিকানায় দেওয়া, আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদের অনুমতি ছাড়া সংরক্ষিত বনের কোনো অংশকে সংরক্ষিত বনের আওতামুক্ত না করা -- ইত্যাদি ইত্যাদি।

তবে কার্যত গত ১০ বছরে এ সব সুপারিশের একটিও কোনো সরকারই বাস্তবায়ন করেনি। #
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'মাহাথিরনোমিক্স'- মালয়েশিয়াকে যেভাবে নিজ পায়ে দাঁড় করালো (পর্ব - ১)

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৬ শে জুন, ২০২৬ রাত ১২:৪৭



আমাদের প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া গেলেন। এটা খুব ভালো এক মুভ ছিলো। সারা বিশ্বকে একটি বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু, সারা বিশ্বে মালয়েশিয়াকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার অগ্রনায়ক মাহাথির মোহাম্মদের সাথে তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

গোসাইপুর ১৯৭১

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৬ শে জুন, ২০২৬ ভোর ৪:৫০



জুন মাসের পড়ন্ত বিকেল, ভ্যাপসা গরমে আগন্তুক ঘেমে একাকার। গায়ে ময়লা হাফ শার্ট আর নীল ফুলপেন্ট। শার্টের রঙ কোনো এক সময় হয়তো সাদা ছিলো, ময়লা হতে হতে এখন প্রায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিউইয়র্কের ডায়েরী: ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া থেকে লং-আইল্যান্ড

লিখেছেন কাছের-মানুষ, ২৬ শে জুন, ২০২৬ ভোর ৫:৫৪


আমাদের সামার ভেকেশন চলছে এখন। প্রায় তিন মাসের ছুটি। এই ছুটিতে বসে না থেকে নিউইয়র্কের একটি ন্যাশনাল ল্যাবে জয়েন করলাম ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি হিসেবে! গবেষণা করে যে পৃথিবীকে উদ্ধার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ মোহমায়া

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৬ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৪৬



খরস্রোতা নদীও একসময়
ক্ষীণ নালায় পরিণত হয়
কালের পরিক্রমায়,সময়ের চাহিদায় ।
তবু আশা বেঁধে রাখি।

ফিরবে সব আগের মত
চলবে জীবন অবিরত
কোন একদিন।


হারানো মুহুর্তরা কি সত্যিই  ফিরে আসে?
শত ব্যস্ততায়- মায়ের মত... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন্তব্যে অনন্য রাজীব নূর

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৬ শে জুন, ২০২৬ রাত ১০:৩২



অনন্য রাজীব নুর মন্তব্য বেলায়
পাওয়া ও দেওয়ায় লক্ষ করে পার
সম্মুখে এগিয়ে চলে গন্তব্যে অপার
প্রতিটি পোষ্টের ক্ষেত্রে তার আছে টান।
মন তার দোলে চলে আনন্দ ভেলায়
ব্লগেতে নিশ্চুপ দেখে পোষ্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

×