পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তৃর্ণ এলাকায় সরকারের বন বিভাগের সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের কারণে প্রায় তিন লাখ ভূমিহীন আদিবাসী পাহাড়ি জুম (পাহাড়ের ঢালে বিশেষ ধরণের চাষাবাদ) চাষী উচ্ছেদ হতে বসেছে। কয়েক বছর আগেও বন বিভাগ সংরতি বনাঞ্চলের নামে একই কায়দায় পাহাড়ে হতদরিদ্র জুমিয়াদের উচ্ছেদ করতে চেয়েছিলো। সে সময় বন বিভাগের বক্তব্য ছিলো, বনের স¤প্রসারণের স্বার্থে সরকারি জমিতে বন বিভাগ সংরতি বনাঞ্চল করবে। প্রয়োজনে তিগ্রস্থদের এ জন্য দেওয়া হবে উপযুক্ত তিপূরণ। সংগঠিত আন্দোলনের মুখে তখন রুখে দেওয়া হয় তাদের এই এ উদ্যোগ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এখন একই কায়দায় বন বিভাগ উদ্যোগ নিয়েছে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে সামাজিক বনায়নের। তিন পার্বত্য জেলায় মোট এক লাখ ৪০ হাজার একর সরকারি জমিতে এই সামাজিক বনায়ন হওয়ার কথা।
পাহাড়ি নেতারা আশঙ্কা করে বলছেন, সামাজিক বনায়নের ফলে প্রথম দফায় রাঙামাটির রাজস্থলিসহ বিভিন্ন এলাকায় অতি সংখ্যালঘু খুমি এবং বান্দরবানের ব্যাঙছড়ি, টংকাবতি এলাকাসহ অন্যান্য অঞ্চলে ম্রো ও বম জনগোষ্ঠি হবে সবচেয়ে তিগ্রস্থ।
এছাড়া পাহাড়ে সামজিক বনায়ন প্রকল্প নেওয়ার আগে আইন অনুযায়ী, পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদের মতামতও নেওয়া হয়নি।
১৯৯৭ সাল থেকে দেশের ৫২ টি জেলায় বানায়নের জন্য ফরেস্ট্রি সেক্টর প্রকল্পের কাজ চলছে। প্রায় ৪০০ কোটি টাকার এ প্রকল্পের অর্থ সংস্থান করছে এশিয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও পরিবেশ সংরণ কমিটির আহ্বায়কগৌতম দেওয়ান এই প্রতিবেদককে বলেন, বন বিভাগ প্রথমে ১৯৮৯ সালে পাহাড়ের ৮৪ টি মৌজায় দুই লাখ ১৮ হাজার একর জমিতে নতুন বনায়নের উদ্যোগের অংশ হিসেবে সংরতি বন সৃষ্টির প্রকল্প নেয়। বন আইনে আছে, নতুন এলাকায় কোনো প্রকল্প নেওয়া হলে সেই এলাকায় জন সাধারণের মধ্যে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে।
তিনি জানান, এছাড়া তিগ্রস্থ এলাকার লোকজন প্রকল্পের বিরুদ্ধে যাতে আপত্তি জানাতে পারে এজন্য তাদের তিন -- চার মাস সময় দিতে হবে। এসব আপত্তি নাকচ হলে তারা যেনো চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আবারো আপত্তি করতে পারেন, সে জন্যও তিন -- চার মাস সময় দেওয়ার বিধান আছে। কিন্তু বন বিভাগ এসব কিছুই করেনি।
গৌতম দেওয়ান বলেন, “আমাদের আন্দোলনের কারণে পরে সরকার আদিবাসী পাহাড়িদের উচ্ছেদ করে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারেনি। কিন্তু সরকার এখন একই কায়দায় সংরতি বনাঞ্চল স¤প্রসারনের বদলে উদ্যোগ নিয়েছে সামাজিক বনায়নের। আর আমাদের আশংকা, এ কারণে পাহাড়ে আড়াই থেকে তিন লাখ আদিবাসী হবেন উদ্বাস্তু।”
আদিবাসী উচ্ছেদ উদ্যোগের প্রতিবাদে বছর তিনেক আগে চাকমা রাজা ব্যরিস্টার দেবাশীষ রায় নিজেই নেতৃত্ব দিয়ে সম্ভাব্য তিগ্রস্থ এলাকা বান্দরবানের দুর্গম টংকাবতির পাহাড়ে আয়োজন করেন এক জনসভার। এতে স্থানীয় শত শত ম্রো, বম, মারমা ও চাকমা আদিবাসী অংশ নেন।
বন ও পরিবেশ সংরণ কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক জুমলিয়ান আমলাই বলেন, “আমরা কোনোভাবেই বনায়নের বিপে নই। কিন্তু এখানে বনায়ন হতে হবে আদিবাসী পাহাড়ি জনগোষ্ঠির জীবন ও জীবিকা ব্যহত করে নয়। বরং এসব বনায়ন তথা উন্নয়ন হতে হবে আদিবাসীদের অনুকূলে।”
বম নেতা জুমলিয়ান প্রশ্ন রেখে বলেন, “বন বিভাগের যেটুকু নিজেস্ব সংরতি বন আছে, তারা সেটুকুই রা করতে পারছে না; তা হলে তাদের কি অধিকার আছে নতুন বনায়নের নামে অহেতুক আদিবাসীদের জায়গা -- জমি কেড়ে নেওয়ার?”
বান্দরবান থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দূরে চিম্বুক পাহাড় ঘেষে টংকাবতির গহিন পাহাড়ি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ছবির চেয়েও সুন্দর পাহাড়ের পর পাহাড় আর দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তৃর্ণ প্রধানত: ম্রো এলাকাগুলোতে সামাজিক বনায়নের কারণে দেখা দিয়েছে উচ্ছেদ আতংক। টংকাবতির রমজুপাড়ায় মাচার ওপর বাননো বিশাল কয়েকটি ম্রো’দের বাঁশের ঘর। এরই একটিতে কথা হয় মেনিয়াম ম্রো (৪৫) এর সঙ্গে।
ভাঙ্গা বাংলায় তিনি বলেন, “আমরা জুম চাষী সাধারণ নিরর মানুষ। শুনেছি, আমাদের এখানে নাকি সামাজিক বনায়ন হবে। বনায়ন হলে তো আমাদের এই ছোট্ট গ্রাম উচ্ছেদ হবে; আমরা জুম চাষও করতে পারবো না। তখন আমরা যাবো কোথায়?”
জুমের ওপর নির্ভরশীলতা প্রসঙ্গে তিনি জানান, তার পরিবারের সারা বছরের ধান -- চাল আসে দেড় একরের মতো পাহাড়ি জমিতে জুম চাষ করে। তারপরেও নগদ টাকার প্রয়োজনে তাকে বন পরিস্কার কি মাটি কাটার মতো কাজে শ্রম দিতে হয়।
চেয়ারম্যান পাড়ার যুবক জুম চাষী রিংতুই ম্রো’র (২০) কন্ঠেও ফুটে ওঠে উচ্ছেদ আতংক। তিনি বলেন, “আমরা যেভাবে আছি, সেভাবেই কোনো রকমে খেয়ে পড়ে নির্বিঘেœ বাঁচতে চাই।” তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, “সরকার আমাদের জমির স্থায়ী বন্দোবস্ত না দিয়ে বনায়নের নামে উচ্ছেদ করবে কেনো?”
টংকাবতির না’ ইয়ান ম্রো (৭৫), ইয়া ইয়েন ম্রো (৪০), মেন পিয়াও ম্রো (৩৩) -- সকলেই সামাজিক বনায়ন নিয়ে বলেন একই কথা।
এদিকে চেয়ারম্যান পাড়ার বিস্তৃর্ণ পাহাড় জুড়ে দেখা গেছে বন বিভাগের উদ্যোগে পরিবেশ বিরুদ্ধ একাশিয়ার গাছের নিবিড় চাষাবাদ। স্থানীয় জুমিয়ারা জানান, কিছুদিন আগেও সেখানে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ও ঘন বাঁশ বাগান ছিলো। কিন্তু রাতারাতি এসব উজাড় করে এখন সেখানেই একাশিয়ার চাষ করা হচ্ছে! খাগড়াছড়ির মাটিরাঙা -- আলুটিলার পাহাড়েও দেখা গেছে একেবারে একাশিয়ার ঘন বন! #
আলোচিত ব্লগ
'মাহাথিরনোমিক্স'- মালয়েশিয়াকে যেভাবে নিজ পায়ে দাঁড় করালো (পর্ব - ১)

আমাদের প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া গেলেন। এটা খুব ভালো এক মুভ ছিলো। সারা বিশ্বকে একটি বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু, সারা বিশ্বে মালয়েশিয়াকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার অগ্রনায়ক মাহাথির মোহাম্মদের সাথে তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন
গোসাইপুর ১৯৭১

জুন মাসের পড়ন্ত বিকেল, ভ্যাপসা গরমে আগন্তুক ঘেমে একাকার। গায়ে ময়লা হাফ শার্ট আর নীল ফুলপেন্ট। শার্টের রঙ কোনো এক সময় হয়তো সাদা ছিলো, ময়লা হতে হতে এখন প্রায়... ...বাকিটুকু পড়ুন
নিউইয়র্কের ডায়েরী: ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া থেকে লং-আইল্যান্ড

আমাদের সামার ভেকেশন চলছে এখন। প্রায় তিন মাসের ছুটি। এই ছুটিতে বসে না থেকে নিউইয়র্কের একটি ন্যাশনাল ল্যাবে জয়েন করলাম ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি হিসেবে! গবেষণা করে যে পৃথিবীকে উদ্ধার... ...বাকিটুকু পড়ুন
কবিতাঃ মোহমায়া

খরস্রোতা নদীও একসময়
ক্ষীণ নালায় পরিণত হয়
কালের পরিক্রমায়,সময়ের চাহিদায় ।
তবু আশা বেঁধে রাখি।
ফিরবে সব আগের মত
চলবে জীবন অবিরত
কোন একদিন।
হারানো মুহুর্তরা কি সত্যিই ফিরে আসে?
শত ব্যস্ততায়- মায়ের মত... ...বাকিটুকু পড়ুন
মন্তব্যে অনন্য রাজীব নূর

অনন্য রাজীব নুর মন্তব্য বেলায়
পাওয়া ও দেওয়ায় লক্ষ করে পার
সম্মুখে এগিয়ে চলে গন্তব্যে অপার
প্রতিটি পোষ্টের ক্ষেত্রে তার আছে টান।
মন তার দোলে চলে আনন্দ ভেলায়
ব্লগেতে নিশ্চুপ দেখে পোষ্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।