somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমাকে ক্ষমা করবেন, আমি চুপ থাকতে পারলাম না..........................................

০৩ রা জানুয়ারি, ২০১৩ রাত ৩:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নিচের লেখাটা আমার খুব কাছের একজন মানুষের লেখা। তার অনুমতি সাপেক্ষে শেয়ার করলাম।

ছোটবেলা থেকেই ‘ধর্ষণ’ শব্দটাকে আমি বড় বেশি ভয় পাই। আমার মনে হয় প্রতিটি মেয়ের মনেই এই ভয় লুকানো থাকে। মনে পড়ে, খুব ছোটবেলায় আমি ছোট্ট মেয়ে তৃষাকে ধর্ষণ এবং হত্যার খবরটি খুব মনোযোগ দিয়ে পত্রিকাতে পড়েছিলাম। ভয়াবহ সেই ঘটনাটা আমার শিশুমনে এত বেশি দাগ কেটেছিল যে সেই থেকে ‘ধর্ষণ’ শব্দটা ভয়ঙ্করতম শব্দ হয়ে আমার মস্তিষ্কে ঢুকে গেছে। তারপর থেকে এই জাতীয় কোন খবর পড়া এবং দেখা থেকে আমি নিজেকে বিরত রেখেছি। এরপর মনে পড়ে বাঁধনের ঘটনাটা, অনেক দিন পর মনে অনেক সাহস সঞ্চয় করে একদিন ঐ ঘটনাটাও মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। তখনও পত্রিকাতে নানা জনের নানা মত ছাপা হল, সেসব কথার পরিপ্রেক্ষিতে আমার মনে অনেক প্রশ্ন জেগেছিল কিন্তু আমি প্রশ্নগুলো করতে পারি নি। আজও ভেবেছিলাম চুপ থাকব কিন্তু ফেসবুকে কিছু কিছু স্ট্যাটাস বা মতামতের কারণে আর নিশ্চুপ থাকতে পারলাম না। দিল্লীর ঘটনার পর কিছু মানুষ, যাদের কেউ সরাসরি তির্যক ভাষায়, কেউ ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে, কেউ বা আবার নানা দিকে সমতা রক্ষা করে একটি প্রশ্নই করে যাচ্ছেন। আর তা হল মেয়েটি কেন রাতের শোতে সিনেমা দেখতে গেল? কেউ কেউ এই সুযোগে মেয়েদের সামগ্রিক পোশাক পরিচ্ছদ নিয়ে মন্তব্য করেছেন। কেউ কেউ আমাদের মানে মেয়েদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন এটা ইউরোপ বা আমেরিকা নয়। এত গেল সামাজিক আক্রমণের কথা। আমাদের দেশে কোন মেয়ে নির্যাতনের শিকার হলে অবধারিতভাবে আরেক দিক থেকে আক্রমণ আসে আর তা হল ধর্মীয় দিক। আমি খুব সচেতন, সোচ্চার বা প্রতিবাদী কোন নাগরিক নই, খুব সাধারণ ছোটখাট একজন মানুষ। আর তাই আমার মনে খুব সাধারণ কিছু প্রশ্ন এসেছে যা নারী হিসেবে নয় একজন মানুষ হিসেবে আমি আমি তাদেরকে করতে চাই।

১ দিল্লীর মেয়েটা না হয় হবু স্বামীর সঙ্গে (ফেব্রুয়ারিতে তাঁদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল) রাতের শোতে সিনেমা দেখতে গিয়ে বিশাল পাপ করে ফেলেছে যার প্রায়শ্চিত্ত তাঁকে মরে গিয়ে করতে হল। কিন্তু কাল যদি আমার প্রয়োজন পড়ে আমার অসুস্থ বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কিংবা মোড়ের দোকান থেকে হঠাত রাতে ওষুধ কিনে আনার, আমি কথা দিচ্ছি অত্যন্ত শালীন পোষাকে পর্যাপ্ত আবরণ সহকারে আমি বের হব কিন্তু আপনি কি আমাকে নিশ্চিন্ত করতে পারবেন যে আমার সাথে এমনটি ঘটবেনা? ঐ ছয় নরপশু এমন কোন নারীকে দেখলেও কি ছেড়ে দিত বলে মনে করেন?

২ এটা ভারত। (আমাদের দেশে হলে বলা হত এটা বাংলাদেশ) ইউরোপ, আমেরিকা নয়। এটা আমাদের, মানে মেয়েদের মনে রাখতে হবে, হ্যাঁ, তাতো রাখতেই হবে। না রাখলে যে মনে রাখানোর জন্য প্রতিদিন নতুন নতুন খবর তৈরি করা হবে। সেখবরে জানতে হবে টাঙ্গাইলে গণধর্ষণের শিকার মেয়েটা ‘পুরুষ’ দেখলেই ভয়ে চিৎকার করে উঠে। কাজেই আমরা কেবল বাংলাদেশ বা ভারত নয়, খুব বেশি করে ‘পুরুষ’ শব্দটা মনে রাখব। আর মনে রাখার পাশাপাশি একটা প্রশ্নও করতে চাই, ইউরোপ, আমেরিকাতে তো মেয়েরা তাদের ইচ্ছামত পোশাকে ঘুরে বেড়ায় তাহলে ঐসব দেশের ছেলেরা ঐসব পশুদের মত এত বেশি ‘provoked’ হয়না কেন বলুন তো?

৩ 31st night উদযাপন তো পশ্চিমা বিশ্বের culture. এই culture টাই কোন ভাবে দেশে চলে আসল এবং ছেলেমেয়ে অনেকেই গ্রহণ করল, এরকম একটা সময়ে যখন বাঁধনের ঘটনা ঘটল তখন অনেকেই শুরুতে যে প্রশ্নটা তুললেন, তা হল মেয়েটা ওরকম সময়ে কেন বের হল। মানছি, নিজের নিরাপত্তা বা সামাজিক দিক সব কিছু বিবেচনা করে হয়ত তাঁর বের হওয়াটা তাঁর জন্য বিরাট ভুল ছিল (এবং তার শাস্তি দেওয়ার মহান দায়িত্ব কিছু পুরুষ তাদের নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিল), কিন্তু আপনারা এটা কেন প্রশ্ন করেন না যে 31st night এ একটা মেয়েকে দেখলেই কি পুরুষকে এরকম উন্মত্ত হয়ে যেতে হবে? আপনাদের প্রশ্নটা সবসময় মেয়েটাকে দিয়ে কেন শুরু হয়?

৪ ভিকারুন্নিসার আমদের যে ছোট বোনটা নির্যাতিত হল, তার ক্ষেত্রে রাতের issuটা না পেয়ে প্রশ্ন তোলা হল তার পরিধেয় পোশাক নিয়ে। সুতরাং Victim মেয়ে হলে প্রশ্ন তাকে করতেই হবে এবং সেক্ষেত্রে প্রশ্নগুলো গোছানোই থাকে এবং issu র কোন অভাব হয় না, তাই নয় কি?

৫ বিশ্বজিত কে পিটিয়ে মারার ঘটনা যখন মিডিয়ায় আসল আমি, আপনি সবাই যে যার যার মত প্রতিবাদ করেছি। মনে করে দেখুন তো একটা বার কি তখন এ প্রশ্নটা করেছিলেন, এই হরতাল অবরোধের দিনে ছেলেটা কেন বের হয়েছিল? আমাদের সবার ক্ষোভ ছিল ঐ খুনীগুলোকে যেন দ্রুত ধরা হয়। কিন্তু দিনের বেলাই হোক আর রাতের বেলাই হোক একটা মেয়ে কোন রকমের নির্যাতনের স্বীকার হলে শুরুতেই প্রশ্ন আসে তার পোশাক কি রকম ছিল, কেন সে বাইরে বেরিয়েছিল, আর রাতের বেলা হলে তো কথাই নেই। রাতের বেলা কি কোন ভদ্র মেয়ে বাইরে বের হয় নাকি?

৬ এবার আসি ধর্মের প্রসঙ্গে। আগেই স্বীকার করে নিচ্ছি যে আমার ধর্মের জ্ঞান অনেক সীমিত। তার পরও এই সীমিত জ্ঞান দিয়ে বুঝেছি আমাদের ধর্মে নারীদের যতটা স্বাধীনতা, স্বকীয়তা, অধিকার আর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে অন্য কোন ধর্মে বোধ করি তা দেওয়া হয়নি। অথচ সে সব পুরুষেরা সবসময় ধর্মের এই দিক গুলোকে zoom out করে বিধিনিষেধগুলোতে zoom in করেন। বিধিনিষেধের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখেই বলছি, ধর্ম কি কেবল নারীদের জন্য বিধি-নিষেধ নির্ধারণ করেছে নাকি পুরুষদের জন্য-ও? নারী যদি এই বিধি নিষেধ না মানার জন্য এত বড় শাস্তি পায়, তাহলে একজন পুরুষ তার মনের পশুটাকে নিয়ন্ত্রণ না করতে পারার পরও কি শাস্তি পাচ্ছে? ধর্ম কি আপনাকে বলেনি আপনার চোখ ও মনকে সংযত রাখতে?

যদি একটুখানি কষ্ট করেন তাহলে উত্তরগুলো পেয়ে যাবেন। আর এতগুলো প্রশ্নের একটাই উত্তর, তা হল ‘মূল্যবোধ’, ‘আত্মার শুদ্ধতা’, যেদিন প্রত্যেকটা মানুষ কেবল মানুষ হিসেবে নিজেকে চিন্তা করতে পারবে সেদিন হয়ত এসব অনাচার বন্ধ হবে। আর পরিবার থেকেই এই শিক্ষাগুলো শুরু করা উচিত। আমার মেয়েকে আমি যেমন শালীনভাবে চলার শিক্ষা দিব ঠিক একই ভাবে আমার ছেলেকে শিক্ষা দিব যেন সে একজন মেয়েকে উপযুক্ত সম্মান দিতে জানে, এমনভাবে তার মুল্যবোধ গড়ে দিতে হবে যেন কোন সময়ে, কোন পরিস্থিতিতেই সে একটা পশুর মত ‘provoked’ না হয়। মূল্যবোধের এই শিক্ষাটাই সবচেয়ে বেশি জরুরী।

নির্যাতিত হচ্ছে নারী আর নির্যাতন করছে পুরুষ। তাই আগে বদলাতে হবে সেইসব তথাকথিত পুরুষকে। আগে তাদের বদলানোর জোর দাবি তুলুন তারপর না হয় কথা বলবেন নারীর করণীয়-অকরণীয় নিয়ে। তা না হলে যেখান থেকে শুরু সেখানেই ফিরে আসতে হবে বারবার। ব্যক্তি মানুষ হিসাবে আমরা আমাদের মেয়েদের নানা সাবধানতা অবলম্বনের কথা বলতেই পারি কিন্তু আমি যখন জাতীয়ভাবে কোন সমস্যা নিয়ে ভাবব তখন ভাবনাটা হওয়া উচিত মাথার অসুখ পুরোপুরি ভাল করা নিয়ে, মাথা কেটে ফেলার জন্য নয়।

আমরা আমাদের সন্তানদের সুশিক্ষা দিব, ধর্মীয় শিক্ষা দিব, সামাজিক মূল্যবোধ দিয়ে বড় করব, কিন্তু অন্যের যে মেয়েটাকে এভাবে কতগুলো নরপশু ছিঁড়েকুঁড়ে খেল, তার দিকে আমরা প্রশ্ন তুলতে পারি না। কারণ সে নির্যাতিত, সে ‘victim, যে নিজেই ভয়াবহ সব প্রশ্ন বুকে নিয়ে মারা গেল তার প্রশ্নগুলোর জবাবটা আগে আপনারা দিন তারপর না হয় প্রশ্ন তুলবেন। এখন একজন মানুষ হিসাবে ‘Victim’ মেয়েটার আর তার পরিবারের পাশে দাড়িয়ে কেবল ঘাতকদের দিকেই প্রশ্ন তুলুন, কেবল তাঁদের বিচারই দাবি করুন।
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×