somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমেরিকার অরিগণ থেকে এরিজোনায় রোড ট্রিপ (পর্ব এক): ভ্রমনের ইতিকথা

১৯ শে মে, ২০২৩ দুপুর ২:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


প্রফেসর হঠাৎ একদিন বললেন "আমি যেই রিসার্চ প্রপোজালটি পাঠিয়েছিলাম সেটা একসেপ্ট হয়নি। তোমাকে আর সাপোর্ট দিতে পারব না, তুমি তোমার রাস্তা দেখতে পারো"। যারা একাডেমিক লাইনে কাজ করনে তারা ভাল করেই জানেন এরকম ঘটনা একেবারেই অপ্রত্যাশিত না, বিশেষ করে আমেরিকায় একাডেমিক পজিশনগুলোতে এরকম ঘটনা হুট-হাট করেই ঘটে থাকে। তবে এটা একটি মেডিকেল ইউনিভার্সিটি, এদের ফান্ড অনেক বলেই জানতাম, তাই ঘটনার আকস্মিকতায় আমি স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ এবং প্রবল হতাশ হলাম। একটু চুপ থেকে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম "ওকে কি আর করার, তুমি আর আমাকে কতদিন সাপোর্ট দিতে পারবে"? উওরে জানাল "প্রজেক্টের যেই অবশিষ্ট টাকা আছে সেটা দিয়ে সর্বোচ্চ আগামী তিন-চার মাসের-মত সাপোর্ট দিতে পারব।" আমি একটি প্রজেক্টের কাজ প্রায় শেষ করে নিয়ে এসেছি, প্রফেসর বললেন "এই তিন-চার মাসের মধ্যে তোমার কাজের উপর একটি জার্নাল লিখে শেষ কর এতে তোমার এবং আমার অনেক ফায়দা হবে"। আমি সম্মতি স্বরূপ মাথা ঝাঁকালাম।

ঘটনাটা গত ডিসেম্বরের শেষের দিকের। আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করেছি পোস্ট-ডক্টরাল রিসার্চর হিসেবে গত বছরের মে মাসে, আর চাকরিটা এই বছরের এপ্রিলেই শেষ হয়ে যাবে। বছর পার হবার আগেই যে এরকম একটি অঘটন ঘটবে সেটা হজম করতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছিল আমাকে। চাকরি হারানোর চেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে নতুন একটি জায়গায় এসে ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করিয়েছি, কিছু মানুষের সাথে সখ্যতা হয়েছে, বাসা গুছিয়ে মোটামুটি স্থির হয়েছি তখনি আবার ভাঙ্গনের সুরে বিষাদে মনটা ভরে উঠল। আমার ইচ্ছা ছিল আসতে ধীরে একাডেমী ছেড়ে ইন্ডাস্ট্রিতে অথবা ন্যাশনাল ল্যাবগুলোতে ঢুকার চেষ্টা করব, তবে হঠাৎ প্রফেসরের ফান্ড না পাওয়াতে সব প্ল্যান যেন ওলট-পালট হয়ে গেল! ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবে আমেরিকার চাকরির বাজার ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা, আর এদিকে আমি টেকনিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ডের, আর সব ঠাডাও যেন আমেরিকার টেক কোম্পানিগুলোর উপরই পরেছে। ফেইসবুক, এমাজন থেকে শুরু করে বড় বড় কোম্পানিগুলোতে হাজার হাজার লোক ছাটাই শুরু করেছে এবছর। আর ছোট ছোট কোম্পানিগুলোও লোক নেয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে!

অর্থনীতি যখন স্থবির হয়ে আসে ছোট-বড় সব কোম্পানিগুলো তখন নিজদের ঘুটিয়ে নেয় শামুকের ন্যায়, পুঁজিবাদের এই একটি অসুবিধা। আমি সাধারণত বেশীর ভাগ চাকরি Linked-in এপ্লাই করি, এর সুবিধা হল এখানে দেখা যায় কতজন একটি পজিশনে আবেদন করেছে, আমি লক্ষ করলাম কোন একটি পজিশন ওপেন হলেই সঙ্গে সঙ্গেই দুইশত এর অধিক প্রার্থী আবেদন করে বসে। তার মানে রিক্রুয়েটাররা হয়ত বেশিরভাগ সিভি পড়েও দেখবে না। যাইহোক এই বছরের শুরুতে আমি বেশ কিছু কোম্পানিতে এবং ন্যাশনাল ল্যাবে আবেদন করলাম। যেখানে গত বছর অনেক টেক কোম্পানির রিক্রুয়েটাররা Linked-in -এ নক করত ইন্টারর্ভিউ দেবার জন্য, যেমন গত বছর আমি ফেইসবুক, এমাজন, গুগল এবং টয়োটার সাবসিডিয়ারির এক কোম্পানি থেকে ডাক পেয়েছিলাম ইন্টারভিউ দেবার জন্য আর এবছর লক্ষ্য করলাম কেউ ডাকে না আবেদন করার পরও! তারপরও কয়েকটি কোম্পানি এবং একটি ন্যাশনাল ল্যাব থেকে ডাক পেয়েছিলাম, তবে কাম বারি দিতে পারিনি, ফলাফল শূন্য।

অতঃপর ভাবলাম আমার আবুল ভাই ভাল মানে যাক আবার একাডেমীতেই যাই পরিস্থিতি অনুকূল হবার আগ পর্যন্ত। একটি পিএইচডি ডিগ্রি আছে তাই অন্য কিছু নাহলেও একাডেমীতেই অন্তত চ্যালচ্যালাইয়ে পোষ্ট-ডক্টরাল রিসার্চর হিসেবে ঢুকে যেতে পারব। আমার চাকরী শেষ হবার কথা ছিল এপ্রিলে, মার্চ মাসে চারটি ইউনিভার্সিটিতে আবেধন করলাম এবং তিনটি থেকেই ডাক পেলাম। প্রথম ইন্টার্ভিউ ছিল ইউনিভার্সিটি অব এরিজোনাতে, প্রথম ইন্টার্ভিউতেই কেল্লা ফতে! প্রফেসরের সাথে কথা বলে মনে হল লোক ভাল, তিনিও বললেন আমার এখানে আস পোষ্ট-ডক্ট হিসেবে, এখানে ডেটা সাইন্টিস হিসেবে পজিশন ফাকা আছে সেখানে সামনের বছরগুলোতে তুমি চেষ্টা করতে পার, তুমি গুড ক্যান্ডিডেট। তার পামে কাজ হল, আমি চলে এলাম! আর অন্য যেই ইন্টার্ভিউগুলো চলছিল সবগুলোকেই না করে দিলাম।

এই মাসের পনের তারিখে নতুন চাকরিতে জয়েন করলাম ইউনিভার্সিটি অব এরিজোনাতে। আমি থাকতাম অরিগনে, এই মাসে এলাম এরিজোনাতে। অরিগণ থেকে এরিজোনার দুরুত্ব প্রায় ১৪০০ মাইল/২২৫৩ কিমি, চিন্তা করলাম ড্রাইভ করেই অরিগণ থেকে এরিজোনা যাব। ড্রাইভ করে যাবার শানে নুযুল হল এখানে মাল পানি খরচ কম হবে, তাছাড়া অনেক জায়গা ঘুরে ঘুরে যেতে পারব। আমার রুট ছিল অরিগণ থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রানসিসকো, সান-জোস এবং লস-এঞ্জেল হয়ে এরিজোনা।

প্রায় ছয়দিন ড্রাইভ করে এই মাসের নয় তারিখে এরিজোনাতে এসে পৌঁছলাম। আমার পুরো জার্নি ছিল রোমাঞ্চকর, ভৌতিক এবং অদ্ভুত সুন্দর। গত বছর আমি আমেরিকার এলাবামা থেকে ড্রাইভ করে অরিগণ গিয়েছিলাম, দুরুত্ব ছিল প্রায় ২৫০০ মাইল/৪০২৩ কিমি, তখন ভ্রমণটাকে তেমন আমার ল্যান্সে বন্ধী করতে পারিনি। তবে এবার আমার প্রথম থেকে ইচ্ছে ছিল এই ভ্রমণটা আমি আমার ল্যান্স বন্ধী করব এবং ব্লগের পাতায় শেয়ার করব। এই সিরিজটাতে কয়েকটি পর্বে ভাগ করে আমার ভ্রমনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করব। তাই এই পর্বে আজ কিছুটা ভূমিকা দিয়েই শুরু এবং শেষ করলাম।

ভ্রমণের কিছু বিচ্ছিন্ন ছবি।





চলবে...

ভ্রমণের ভিডিও ব্লগ ফেইসবুক পেইজে।

সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জুন, ২০২৩ দুপুর ১:৫৬
১৭টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন তার আকাশের বলাকা || নিজের গলায় পুরোনো গান || সেই সাথে শায়মা আপুর আবদারে এ-আই আপুর কণ্ঠেও গানটি শুনতে পাবেন :)

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ১৬ ই জুন, ২০২৪ রাত ১০:০০

ব্লগার নিবর্হণ নির্ঘোষ একটা অসাধারণ গল্প লিখেছিলেন - সোনাবীজের গান এবং একটি অকেজো ম্যান্ডোলিন - এই শিরোনামে। গল্পে তিনি আমার 'মন তার আকাশের বলাকা' গানটির কথা উল্লেখ করেছেন। এবং এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

লাইকা লেন্সে তোলা ক’টি ছবি

লিখেছেন অর্ক, ১৭ ই জুন, ২০২৪ সকাল ১১:৩০




ঢাকার বিমানবন্দর রেল স্টেশনে ট্রেন ঢোকার সময়, ক্রসিংয়ে তোলা। ফ্ল্যাস ছাড়া তোলায় ছবিটি ঠিক স্থির আসেনি। ব্লার আছে। অবশ্য এরও একরকম আবেদন আছে।




এটাও রেল ক্রসিংয়ে তোলা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনি কার গল্প জানেন ও শুনতে চান?

লিখেছেন সোনাগাজী, ১৭ ই জুন, ২০২৪ বিকাল ৫:৩১



গতকাল সন্ধ্যায়, আমরা কিছু বাংগালী ঈদের বিকালে একসাথে বসে গল্পগুজব করছিলাম, সাথে খাওয়াদাওয়া চলছিলো; শুরুতে আলোচনা চলছিলো বাইডেন ও ট্রাম্পের পোল পজিশন নিয়ে ও ডিবেইট নিয়ে; আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাবাকে আমার পড়ে মনে!!!

লিখেছেন সেলিম আনোয়ার, ১৭ ই জুন, ২০২৪ সন্ধ্যা ৭:৫২

বাবাকে আমার পড়ে মনে
ঈদের রাতে ঈদের দিনে
কেনা কাটায় চলার পথে
ঈদগাহে প্রার্থনায় ..
বাবা হীন পৃথিবী আমার
নিষ্ঠুর যে লাগে প্রাণে।
কেন চলে গেলো বাবা
কোথায় যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×