শার্লি হেবদোর উপর সন্ত্রাসী হামলায় সম্পাদক ও ৪ জন কার্টুনিস্টসহ ১২ জন হত্যা কিছু পরেই ইহুদিদের কোশের দোকানে আরো ৪ জন খুনের হলে ফরাসি প্রধানমন্ত্রী ম্যানুয়েল ভালস ঘোষণা করলেন,
"সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, যুদ্ধ জিহাদিজমের বিরুদ্ধে, ইসলামি কট্টর পন্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধ, এবং যা কিছু ভাতৃত্ব, স্বাধীনতা, ঐক্যের বন্ধনকে ভাঙ্গতে চায় তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ । "
লক্ষ লক্ষ মানুষ এই বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ভীতিকর কোরাস তুলে "আমি শার্লি" ব্যানারে বেরিয়ে এসেছিল । প্রবল ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশটা যথার্থভাবে তুলে ধরেছিলেন ইজরায়েলের লেবার পার্টির প্রধান আইজ্যাক হেরযোগ, যিনি আসন্ন নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দী। তার ভাষায়
"সন্ত্রাসবাদ হলো সন্ত্রাসবাদ । এর কোনো ভিন্ন পথ বা ব্যাখ্যা নেই ।....যে সকল জাতি শান্তি ও স্বাধীনতা কামনা করে তাদের এই বর্বর আক্রমণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয় ।"
এই অপরাধ সংঘটনের পরেই বিপুল হৈ চৈ আর মন্তব্যের ঝড় উঠলো ।সন্ধান হলো হলো কিভাবে ইসলামিক সংস্কৃতির মাঝে এই ধরনের ভীতিকর সহিংসতার মূলটা লুকিয়ে আছে । নিজেদের (পশ্চিমা) মূল্যবোধকে টিকিয়ে রেখে ইসলামিক সন্ত্রাসের এই খুনে স্রোতের মোকাবেলা করার পথ ও পদ্ধতি নিয়ে বাতচিত হলো । নিউ ইয়র্ক টাইমস এই আক্রমণকে বলেই বসলো "সভ্যতার সংঘাত", কিন্তু পরেই টাইমসের কলামিস্ট আনন্দ গিরিধারাদাস সেটিকে শুধরে টুইটারে লিখলেন
"এটা কখনই দুই পক্ষের মাঝে সভ্যতার যুদ্ধ নয়, এটা সভ্যতার জন্য যুদ্ধ, অপরপক্ষের বিরুদ্ধে যারা (সভ্যতার) সীমারেখার ওপাশে অবস্থিত " হ্যাস ট্যাগ শার্লি হেবদো
নিউ ইয়র্ক টাইমসের ইউরোপ প্রতিনিধি ঝানু সাংবাদিক স্টিফেন অর্লেনগার শার্লি হেবদোর ঘটনা স্থলের খুব জ্যান্ত স্বচ্ছ একটা বর্ণনা তুলে ধরেছেন
"সাইরেনের দিন, আকাশে হেলিকপ্টার, উন্মত্ত সংবাদ শিরোনাম, পুলিশ বাহিনী, উদ্বিগ্ন জনতার, শিশুদের নিরাপদে বাড়িতে পৌছানো, এটা আগের দুটো দিনের মতই রক্তাক্ত ও আতংকিত প্যারিস ।"
অর্লেনগার বেঁচে যাওয়া এক সাংবাদিককে উদ্ধৃত করে লিখেছেন
"সব কিছু ভেঙ্গে পড়েছে, বের হবার পথ নেই, চারিদিক ধোয়াতে আচ্ছন্ন, ভয়ংকর, মানুষ চিত্কার করছে, যেন দুঃস্বপ্নের মত ।"
আরেকজন বলেন "ব্যাপক বিস্ফোরণ, চারিদিক অন্ধকার হয়ে পড়ল, "। অর্লেনগার এর ভাষায় ঘটনা স্থলটি
"যেন সেই ...ভাঙ্গা গ্লাস, ধসে যাওয়া দেয়াল, বেকে যাওয়া কাঠ, আস্তরণ, রং উঠে যাওয়া যেন আবেগী বিধস্ততা ! "
এই শেষ বাক্য গুলো আবার আরেকজন সাংবাদিক ডেভিড পিটারসন স্মরণ করিয়ে দেন, তবে জানুয়ারি ২০১৫ নয়, সেটি অর্লেনগার এর আরেকটি রিপোর্ট এপ্রিল ২৪, ১৯৯৯ সালের । ঘটনাটি খুব সামান্যই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছিল । অর্লেনগার ন্যাটোর বাহিনীর রিপোর্ট করছিলেন,
"সার্বিয়ান স্টেট টেলিভিসন সদর দপ্তরে মিসাইল হামলা" যা কিনা সার্বিয়ার রেডিও, টিভি সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছিল, সাথে হত্যা করেছিল ১৬ জন সাংবাদিককে ।
ন্যাটো বাহিনী ও আমেরিকার অফিসাররা এই হামলার পক্ষে সাফাই গাইলেন । অর্লেনগার রিপোর্ট করলেন
"যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট স্লবোদান মেলোসভিচের শাসনকে দমন করার প্রচেষ্টা স্বরূপ (এই হামলা) " বলে জানালেন পেন্টাগনের মুখপাত্র কিনেথ বেকন এবং জানালেন "সার্বিয়ান টিভি মেলোসভিচের হত্যা যন্ত্রেরই একটা অংশ ঠিক যেমন তার মিলিটারি "। সেই হিসেবে এই হামলা নায্য ।
সেদিন কোনো কান্না, ক্ষোভ, ঘৃণা, বা প্রতিবাদ সমাবেশ ছিলনা । ছিলনা কোনো কোরাস স্লোগান (আমি শার্লির মত )
"আমরা আর টিভি !"
এই আক্রমণের গোড়ামূলে কেউ খ্রিস্টান সংস্কৃতি বা ইতিহাস তদন্ত করতে যায়নি । তার বদলে প্রেসের বিরুদ্ধে আক্রমনটাকেই প্রশংসা করা হলো । তত্কালীন যুগোস্লাভ এ আমেরিকার রাষ্ট্রদূত, উচ্চ সম্মানিত মার্কিন কুটনৈতিক রিচার্ড হলব্রুক একই সুরে আর টিভির উপর সফল হামলার পরে বললেন
"খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং আমি মনে করি আশা ব্যঞ্জক উন্নতি "
এরকম অসংখ্য ঘটনা আছে যেসব কখনো পশ্চিমা সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে পাল্টা প্রশ্নবিদ্ধ করেনি । ইউরোপে সাম্প্রতিক জঘন্যতম সন্ত্রাসী বর্বরতার নমুনা আছে জুলাই ২০১১ । এন্ডারস ব্রেইভিক, একজন খ্রিস্টান, উগ্র জীয়নিস্ট ও ইসলাম বিদ্বেষী ৭৭ জন মানুষকে হত্যা করেছিলেন, যাদের বেশির ভাগই ছিলেন টিনেজার ।
এ ছাড়াও উহ্য রাখা হয় "war against terrorism" বর্তমান সময়ের সবচাইতে উগ্র বর্বর সন্ত্রাসী কর্মকান্ড । বারাক ওবামার বৈশ্বিক হত্যাকান্ডের ক্যাম্পেন চলছে সেই সব লোকদের টার্গেট করে যারা 'সন্দেহভাজন' কিনবা ভবিষ্যতে আমাদের হামলা করার পরিকল্পনা করতে পারে । এদের পাশে ভুক্তভোগী হিসেবে আছে সেই সব হতভাগা যারা তাদের আসে পাশে ছিলেন (নিরপরাধী হয়েও মরতে হয়েছে । এই ডিসেম্বরেই ধরুন, সিরিয়াতে মার্কিন বোমা হামলায় ৫০ জন বেসামরিক লোক হতাহত হয়েছে --প্রায় কোনো খবরেই সেটা সেভাবে আসেনি ।
আর টিভির উপর ন্যাটো বাহিনীর হামলায় একজনকে অবশ্যই শাস্তি দেয়া হয়েছে । দ্রাগলজুব মিলানভিচ --সেই টিভি স্টেশনের জেনারেল ম্যানেজার --ইউরোপের মানবাধিকার কোর্ট তাকে ১০ বছরের কারাদন্ড দিয়েছে সময়মত (ন্যাটোর হামলা করা) বিল্ডিং টা জনশূন্য করতে না পারার ব্যর্থতার কারণে ।এই তথ্য দিয়েছে সাংবাদিকদের অধিকার সংরক্ষণ কমিটি । এমনকি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত যুগোস্লাভিয়ার এই ন্যাটো হামলাকে বিচারের কাঠ গড়ায় এনে রায় দিয়েছে
এটি অপরাধ ছিলনা, যদিও সাধারণ মানুষ মরার সংখ্যাটা দুর্ভাগ্যজনকভাবে বেশি, তবে সেটি তুলনামূলক বিচারে খুব বেশি ছিলনা (সার্বদের গণ হত্যার অপরাধের তুলনায়)।
এ সমস্ত ঘটনার সাথে তুলনা --আমাদের নিউ ইয়র্ক টাইমসের ব্যাপারে বিশিস্ট মানবাধিকার বিষয়ক আইনজীবী ফ্লয়েড আব্রাহাম এর নিন্দা বাণী বুঝতে সাহায্য করে । আব্রাহাম বাক স্বাধীনতার পক্ষে তার জোরালো অবস্থানের জন্য বিখ্যাত ।
"কিছু কিছু সময় আত্ম-সংবরণ করতে হয় । কিন্তু সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে "স্মরনকালে" এই অতি সম্প্রতি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা হুমকি-আক্রমণ এর মাঝে, (টাইমস এর সাংবাদিক) তাদের উচিত হবে এই বাক স্বাধীনতার অনুকূলে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করা "--- মোহাম্মদকে ব্যঙ্গ করা শার্লি হেবদোর কার্টুন গুলো ছাপিয়ে, যেটি এই হামলার সূত্রপাত ঘটিয়েছে ।
আব্রাহাম শার্লি হেবদোর ঘটনাটিকে "সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে স্মরণ কালের সবচাইতে আক্রমনাত্মক হামলা " বলে সঠিক বলেছেন । এর কারনটা হলো "স্মরনকালের" ধারনাটি । এটি এমনভাবে তৈরি এক ধারণা যেটি সতর্কভাবে শুধু আমাদের বিরুদ্ধে তাদের অপরাধগুলোকেই লিপিবদ্ধ করে এবং ধূর্তের মত তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অপকর্মগুলোকে বাদ দেয়া হয় (স্মরনকালের মাঝে রাখা হয়না) । আমাদের অপরাধ গুলো অপরাধ নয়, সেটি মহান আত্মরক্ষা, সুমহান মর্যাদা সম্পন্ন, তবে মাঝে মাঝে অনিচ্ছাকৃত ভুলও হয় ।
এই "স্মরনকালের" ইতিহাস সংক্রান্ত আরো অনেক উদাহরণ আছে । ফাল্লুজার বিরুদ্ধে মেরিন সেনাদের হামলা নভেম্বর, ২০০৪ এ যেটি ছিল ইঙ্গ-মার্কিনদের ইরাক আগ্রাসনের মাঝে জঘন্যতম হামলা । ফাল্লুজা সাধারণ হাসপাতাল দখলের সাথে সাথেই হামলা শুরু হয়--এক বিশাল যুদ্ধাপরাধ সেটাই যেভাবেই হোক না কেন ।
এই অপরাধটির খবর নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রথম পাতায় এভাবে এসেছিল একটি ছবিতে যাতে
"হাসপাতালের রুগী ও কর্মচারীদের কিভাবে সশস্ত্র সেনারা ঘর থেকে বের করে এনে মেঝেতে বসার হুকুম করেছিল, এবং সবার হাত বেধে ফেলেছিল"
হাসপাতাল দখল করাটাকে দেখানো হয়েছিল ভীষণ "বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক এবং যথার্থ কাজ " কারণ অফিসারদের যুক্তি ছিল হাসপাতাল এবং তাতে মৃত মানুষের খবর জঙ্গিদের প্রোপাগান্ডা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল ।
খুব পরিস্কারভাবেই এখানে বাক স্বাধীনতার উপর কোনো হামলা হয়নি, এবং এসব সেই "স্মরনকালের" মাঝে প্রবেশ করার উপযুক্ততা রাখেনা । প্রশ্ন আরো আছে । একজন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করতে পারে, ফ্রান্স কিভাবে বাক স্বাধীনতা ধারণ করে এবং স্বাধীনতা, ঐক্যের পবিত্র চেতনা গুলো ধারণ করে ? Gayssot Law এর মাধ্যমে? যেটি রাষ্ট্রকে সত্য ইতিহাস নির্ধারণের অধকার দেয় এবং তার ব্যতিক্রমীদের শাস্তি দেয় । হলোকস্ট এ বেচে যাওয়াদের বংশধরদের বহিস্কার করে, পূর্ব ইউরোপের নির্যাতনের মুখে ঠেলে দিয়ে ? উত্তর আফ্রিকার অভিবাসীদের সাথে জঘন্য আচরণ করে এই ফ্রান্সের মাটিতেই যেখানে শার্লি হেবদোর সন্ত্রাসীরা জিহাদী হয়ে উঠেছে ? যখন কার্টুনিস্ট সিনেকে সাহসী সংবাদ শার্লি হেবদো ইহুদি বিদ্বেষী লেখার দায়ে বরখাস্ত করেছিল ? তখন ? আরো অনেক প্রশ্ন দ্রুত মাথায় আসে ।
খোলা চোখের যে কেউ এটা খেয়াল করবেন, বাকিরা প্রত্যাখ্যান করবেন । "বর্বর সহিংসতার থেকে বিরাট চ্যালেঞ্জ" (ইজরায়েলের সেই নেতার কথা মত) এর সম্মুখীন হতে হয় এরকম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো ফিলিস্তিনিরা । ২০১৪ গ্রীষ্মে গাজায় ইজরায়েলের বর্বর হামলা , অনেক সাংবাদিক মরেছে সেখানে, এমনকি সাংবাদিক লেখা গাড়ি, তার সাথে হাজার খানেক মানুষ ।
আমরা আরো অগ্রাহ্য করেছি এই ডিসেম্বরে ল্যাটিন আমেরিকাতে ৩ সাংবাদিকের হত্যাকান্ড --গোটা বছরে সব মিলিয়ে ৩১ জন সাংবাদিকের লাশ । ২০০৯ সালে হন্ডুরাসের মিলিটারী ক্যুতে এক ডজনের বেশি সাংবাদিক মারা গেছেন, যার পিছে আমেরিকার সমর্থন মদদ ছিল । কিন্তু এসব বাক স্বাধীনতার উপর হামলা নয়
"স্মরনকালের" পাতায় ।
আরো কথা বাড়ানো কঠিন নয় ।এই উদাহরণ গুলো প্রমাণ করে খুব সাধারণ একটা নীতি যাতে দেখা যা নিয়মিত ও আন্তরিকভাবেই হচ্ছে । শত্রুদের উপর আমরা যত দোষ'চাপাতে পারব, তত ঘৃণা-ক্ষোভ জাগ্রত করতে পারব --অপরাধের ব্যাপারে আমাদের দায় বাড়বে তত --ততই আমরা তাদের শেষ করাতে পদক্ষেপ নিতে পারব ।শত্রুর কনসার্ন গুলো বিস্মৃত হবে, ধামাচাপা দেয়া যাবে এমনকি অস্বীকার করা হবে ।
"সন্ত্রাসবাদ হলো সন্ত্রাসবাদ । এর কোনো ভিন্ন পথ বা ব্যাখ্যা নেই ।" এ জাতীয় ঝাঝালো বাগ্মী কথামালার বিপরীতে বলে যায় অবশ্যই তার (সন্ত্রাসের) দুটো দিক আছে, তাদের বনাম আমাদের ---সেটা শুধু (একতরফা) সন্ত্রাসবাদ নয় ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


