ফকরুল চৌধুরী তার গল্পে দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রের কথা বলেন, বলেন অসুস্থ নষ্ট রাজনীতি, সামগ্রিক অবয়, নৈতিক চরম ধ্বস, দুষিত পাঁকে নষ্ট হওয়া যুবকদের কথা। বলেন ব্যক্তির বিপন্ন একা হয়ে ওঠা এবং জলের মতো ঘুরে ঘুরে কল্পনালতা বেয়ে বেয়ে আবর্তিত সংকটের কথা। নিমগ্নতায় আবিষ্ট হয়ে কাহিনীর ভেতরে ঢুকে তিনি গল্প বানান অনপনেয় কুশলতায়। তার গল্পে প্রবলভাবে সমাজ উপস্থিত। তিনি গল্পে নিম্নবর্গ: মার খাওয়া মানুষের খাওয়া: প্রান্তিক মানুষের কথা বলেন। সাথে সাথে ফটোগ্রাফি ও পেইন্টিংয়ের অদ্ভুত মিশেল তুলে ধরেন তাদের জীবন; জীবনের নির্মম, কঠিন, রূঢ় বাস্তবতা। তিনি মতা কাঠামো দেখান তবে একটু আড়াল রেখে। মতা কাঠামোর মূল কেন্দ্র অর্থাৎ সরকার যে সব অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠানের ভেতরগত ধ্বস তিনি চিত্রিত করেন কখনও ইঙ্গিতে কখনও বিবৃতিতে। পুলিশ; বিশ্ববিদ্যালয়; আমলাতন্ত্র; কলমবাজ ও বিবৃতিবাজ বুদ্ধিজীবিরা সামপ্রতিক সময়ের সবটুকু গুন অথবা বেগুন (অ-গুন এবং পিছলা অর্থে) ভেতরে ধারন করে উপস্থিত থাকে তার গল্পে। তার গল্পে ব্যক্তির অস্তিত্ব সংকটাপন্ন। এই ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাশ দিয়েও কোন চাকরী পান না; এই ব্যক্তি কবিতাকে দূত বানিয়ে প্রেমিকার কাছে নীল খামের কথা জানাতে দীর্ঘ মানষিক যাত্রা করেন অথচ চিমটি কাটলে তার শরীর থেকে কয়লার টুকরো খসে পড়ে। ফকরুল গল্প বলেন এমন আঙ্গিকে যেখানে বাস্তবতা ও পরাবাস্তবতা মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়।
তিনি বেশ সহজ ও সাবলীলভাবে মৃত মানুষদের তার গল্পের চরিত্র বানান। এই মৃত মানুষেরা আবার ভাষা শহীদ, যাদের তিনি বাংলা একাডেমীর দেয়ালে ্াঁকা মু্যরাল থেকে বের করে নিয়ে এসে একাডেমী সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান; টিএসসি; বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখান সামপ্রতিক অবয় এবং অসাড়তা এবং গল্পকার সালাম, রফিক ও শফিকের দ্বারা বলিয়ে নেন কিছু ভাষা সৈনিকের কথা যাদের আমরা বর্তমানে পুজা করি '52 সালে তাদের নামও শোনা যায় নি। গল্পকার এখানে কতটা ইতিহাসের উপর নির্ভর করেছেন আর কতটা আবেগ দিয়ে প্রভাবিত হয়েছেন সেটা তলিয়ে দেখার বিষয়।
ভাবালুতা বাস্তবায় যখন একাকার হয়ে যায় তখন ফকরুলের গল্পে জলকন্যা হাজির থাকেন কাম্য পৃথিবীর প্রেরনাদাতারূপে আর কুকুরগন হাজির থাকেন প্রতিবন্ধকতার রূপক হিসাবে। ব্যক্তিক ঘোর; ভাবালুতা; কল্পনা ও স্বপ্নের মাঝে বাস্তবতার প্রবেশ ঢুকিয়ে াথবা বাস্তবতার ভেতরে উপরোক্ত বিষয়গুলোর প্রাধান্য বিস্তার করে গল্প রচনার একটা প্রবণতা ফকরুলের ভেতর বেশ ভালভাবেই আছে। 'সময়ের চোখ' গ্রন্থে তার এ জাতীয় গল্পগুলো হচ্ছে 'শীতের রাত ও তিনটি কবিতা', 'জলকন্যা ও কুকুরগন', 'বৃষ্টি জ্যোৎস্না ও অগি্নকান্তা' ইত্যাদি। আর কিছু কিছু গল্পে ব্যক্তিক ভাবালুতা; ঘোর; স্বপ্ন থাকলেও প্রধান হয়ে ওঠে বাস্তবতা যেমন, 'উষ্ণদেশের দিকে শীতের দেশের বৃরে অভিবাসন যাত্রা', 'কাঠবিড়ালীর প্রয়োজনীয়তা ও অপ্রয়োজনীয়তা' ইত্যাদি। যে কারণে শীতের বৃ যার শরীরে এক সময় ছিল রকমারী পাতা। রকমারী যেস সব পাতা_ সুখ; আনন্দ; মমতা; সহায়তা; সততা; অর্থ প্রভৃতি তিনি অকাতরে বিলিয়েছেন সন্তানদের জন্য। অথচ বৃদ্ধ বয়সে তার কোন ঠাঁই নাই। একমাত্র যে ছেলেটি শীতের বৃকে বোঝে, সে বহুদিন যাবত বেকার এবং কিছুটা চাঁদের পাওয়া মানুষ। আবার অনেক প্রতিশ্রুতি পাওয়া স্বত্ত্বেও, শেষ পর্যন্ত এই শহর থাকে কাঠবিড়ালীর শূন্য অর্থাৎ যানযট; বুদ্ধিজট; লিটলম্যাগকর্মীদের গোষ্ঠীবদ্ধতাজনিত অসাড়তাজট পরিপূর্ণ।
ফকরুলের কিছু গল্পে শুধু বাস্তবতা নিয়ে খেলা করেন। তবে এই বাস্তবতা সংবাদপত্রের বাস্তবতা নয়; এই বাস্তবতা গল্পের বাস্তবতা যেখানে বিষয় ও সমাজ ও সামপ্রতিকতা, 'ধাতব এক জোড়া চোখ' দিয়ে তিনি দৃশ্যেও পর দৃশ্য দেখান, স্থান কাল ও পাত্র ভিন্ন ভিন্ন; সংবাদপত্রের নিউজ পর্যায়ক্রমে উপস্থাপন; বিমূর্থভাবে দেশের ইতিহাস বর্ননা; এবং স্বপ্নভঙ্গেও বয়ান এবং প্রবল বন্যায় ভেসে যাওয়া দেশে একটি প্রতীকি জাহাজ যার আরোহী মতাবানরা প্রভৃতি তিনি উপস্থাপন করেছেন শিল্প কুশলতায়।
'জলকঙ্কাল' গল্পে তিনি শোষনমুক্ত সমভাগের সমবন্টনের সমাজপতিষ্ঠান ব্যর্থতার চিত্র এঁকেছেন এবং হাজির করেছেন একটি মরাগাঙকে যেন সমার্থক। (অংশবিশেষ)
লিখেছেন: ইকতিজা আহসান
অরুন্ধতী পত্রিকায়
সময়ের চোখ: ফকরুল চৌধুরী
প্রকাশকাল: বইমেলা 2004। প্রচ্ছদ: ফকরুল চৌধুরী। মূল্য 90 টাকা
প্রকাশক: শাহ আল মামুন, মনন প্রকাশ, বাংলা বাজার, ঢাকা 1000।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




