দু চার লাইন লিখতে লিখতে বেশ কিছু লেখা হয়ে গেল। এখন অন্য কিছু নিয়ে লিখতে গেলেও মনে হয় সিরিজ যখন শুরু হয়েছে এইটাই শেষ করি, যদিও রাসদ মোটামোটি ফুরিয়ে এসেছে।
কদিন আগে আমি বলেছিলাম যে আমাদের প্রতিবেশী ভাষা কিছু শিখে রাখলে মন্দ হয় না। তাই কয়েকটা ভাষার কথা বলছি যেগুলো আমার মনে হয় কার্যকরী হতে পারে। আমি এখনো কিছুটা দন্দ্বে আছি কোনটাকে প্রায়োরিটি দেব তবে মোটামোটিভাবে লিখে যাচ্ছি।
হিন্দী/উর্দূ
আমাদের সৌভাগ্য যে, অত্যান্ত কাছাকাছি এই সুবিশাল জনগোষ্ঠীর সাথে আমরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যদিও ইতিহাসের বিবর্তনের কারণে আমরা পৃথক জাতিসত্বা হিসাবে নিজেদেরকে পেয়েছি কিন্তু এখনো আমাদের ওপর এই দুটি ভাষার প্রভাব অত্যান্ত প্রবল। কেন শেখা? একে তো আমাদের বিশাল সীমানা ভারতের সাথে আর ভারতকে ভারতীয়ের চোখ দিয়ে দেখতে গেলে হিন্দী বোঝা, জানা জরুরী। তেমনি পাকিস্তান ভারতের পরে হলেও এখনো আমরা প্রতিবেশীর মতই, তবে এক্ষেত্রে দুটি বিষয় আছে, ১) ভারতে উর্দূভাষী এক বিশাল জনগোষ্টী আছে যা সাধারণত পরিসংখ্যানের চোখ থেকে লুকিয়ে রাখা হয়। ২) আমাদের উর্দূ শিক্ষিত জনগোষ্টী ইতিমধ্যে আছে, মাদ্রাসাগুলোর কল্যাণে। অতয়েব কাজ চলে যাবে।
তবে যারা বিদেশ আছেন বা যাচ্ছেন, তাদের জন্য জানাটা মনে হয় খারাপ না। এই কারণে, যে আপনি যেই দেশেই যান না কেন, খুবই ভাল সম্ভাবনা যে, ইতিমধ্যে বাঙ্গালীর চেয়ে ইন্দোপাক জনসমষ্টীর সংখ্যা বেশী। তাই ভারত আর পাকিস্তানের নেতারা আর গোয়েন্দাগোষ্টী আমাদের সাথে কি করেছে তার রাগ না রেখে (আমাদের মহান নেতাদের ফুলের মতন চরিত্র তো প্রতিদিনই খবরে আসছে) মানুষ হিসাবে একসাথে কাজ বা পড়াশোনা চালিয়ে যাবার জন্য ভাষাটা জানা ভাল। সময় সুযোগ মত তেনাদেরও বাংলার ট্যাবলেট গিলিয়ে দেয়া যায়।
আরবীঃ
আমাদের জনশক্তি যা রপ্তানী হয় তার বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যে। আর বেশিরভাগ সময়েই সেখানে যায় অদক্ষ বা অর্ধদক্ষ শ্রমিকেরা। একে তো দক্ষতার দিক থেকে পেছানো থাকে আর গিয়ে পড়ে সম্পুর্ণ নতুন ভাষার দেশে। যদিও মধ্যপ্রাচ্যে মানুষ পাঠানোর বিষয়ে ভয়াবহ দূর্নীতি আর অমানবিকতা হয়ে থাকে, তারপরও, যারা প্রথম বারের মতন যায়, তারা আরবী শিখে নিলে মন্দ হত না। দ্বিতীয়ঃ কোরআনকে কোরআনের মত আর হাদীসকে হাদীসের মত করে তার সূধাপান করতে গেলে অনুবাদ কখনোই যথেষ্ট না। আমরা যারা সুশিক্ষিত, এক সময়ে কাজ চালানোর মত শিখে নিলে ক্ষতি কি।
চীনাঃ
কদিন আগেই খবরে দেখলাম যে, আমাদের আমদানী তালিকায় ভারতকে ছাপিয়ে প্রথমে চলে এসেছে চায়না। বৃহত্তম জনসংখ্যার এই দেশটির সর্বমূখী রফতানীমুখিতা সারা বিশ্বের জন্য মাথাব্যাথা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ইউরোপ আর আমেরিকার যেকোন শপিং সেন্টারে গেলেও এখন যেই ব্রান্ডই ধরবেন, লেখা আছে কোন কোনায় মেড় ইন চায়না। চায়নার এই বিশাল রফতানী নীতির সাথে সাথে, উপার্যিত অর্থ তারা বিপুল পরিমাণে আমদানীতেও খরচ করছে। যারা সম্প্রতি চায়নার বড় শহরগুলোতে গিয়েছে, তারা অবশ্যই ঐশ্বর্যের সম্ভারের দেখা পেয়েছে। সবাই চায়না থেকে আমদানীর সাথে সাথে রপ্তানীর চেষ্টায় আছে। আমরা কেন শুধু গ্রহীতা হয়ে থাকব? যদিও আমরা সংকটে আছি, নিজেরাই নিজেদের যোগান দিতে পারি না, তবে মনে হয় ভাষা জানলে কমপক্ষে আমদানীর ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা করতে পারব। শতকরা এক ভাগ দাম কমাতে পারলেও দেশের এবং ব্যাবসায়ীদের কোটি কোটি টাকার সাশ্রয়।
অসমিয়াঃ
বাংলার সাথে অসমিয়ার এতই বেশী মিল যে, এটাকে আলাদা ভাষা হিসাবে চিন্তা করাই মুশকিল। ওপরের যে ছবিটা, সেটি জাতিসংঘের বিশ্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা অসমিয়াতে। পড়া যায়? দিব্যি পড়ে নেয়া যায় কোন আলাদা ট্রেনিং ছাড়াই, আর বোঝার ক্ষেত্রে মনে হয় অন্ততঃ ভাবটুকু ধরে নেয়া যায়। অসমিয়াদের ক্ষেত্রেও বাংলা তাদের প্রতিবেশী ভাষা। আর সত্যি কথা হল যে, ভৌগলিক ভাবে তারা কোলকাতার চেয়ে ঢাকা বা বাংলার অনেক বেশী কাছাকাছি, আর কেন্দ্রীয় ভারতের একপেশে নীতির প্রতি এতই বিতশ্রাদ্ধ, যে উলফা এবং অন্যান্য দলগুলো সশস্ত্র বিপ্লবের জন্যও চেষ্টা করছে। আমরা কি করতে পারি? আমার মনে হয়, অনগ্রসর এমনকি বাংলাদেশের চেয়েও পিছিয়ে থাকা এই অঞ্চলগুলোতে বাংলাদেশী বাংলার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারি, আর তাদের ভাষার শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি পাঠাতে পারলে তো একেবারেই পোয়াবারো।
গুজরাটীঃ
ভারতের গুজরাত আমাদের ঠিক প্রতিবেশী না, আর একেবারেই পশ্চিমে অবস্থিত এই প্রদেশটির সাথে আমাদের সামান্যই মিল। কিন্তু এই জাতিগোষ্টী ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের মধ্যে একটি। কারণ কয়েকটিঃ গুজরাটিরা মূলত ব্যাবসায়ী। আর চিরন্তন সত্যি কথা হল সম্পদ উপার্জনের সবচেয়ে দ্রূত উপায় হল বানিজ্য। আর ঐতিহাসিক ভাবেই আমরা কাঁচামাল তৈরি করেছি আর অন্যেরা সেই কাঁচামাল ব্যাবহার করে সম্পদশালী হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ আমাদের বিশ্বায়নের এক দুই শতাব্দী আগে থেকেই অত্যান্ত সফলভাবে তারা নিজেদেরকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে। যাদের ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা আছে তারা জানেন যে, সমস্ত আফ্রিকায় ব্যাবসা বানিজ্য মূলত গুজরাটি ভারতীয়রা নিয়ন্ত্রণ করে। ক্যারিবিয়ান দেশগুলোতেও প্রচুর পরিমাণে তাদের উপস্থিতি। ইংল্যান্ড ও ইউরোপে যেমন বাঙ্গালী মানেই সিলেটী তেমনি ভারতীয় মানেই নিরংকুশ সঙ্খ্যাগরিষ্ঠতায় গুজরাটী। আমার ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা হল যে, গান্ধীর দেশের এই মানুষগুলো সত, পরিশ্রমী, সত্যবাদী এবং বেশীরভাগ সময়েই উপকারী। আমার ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতায় এদের মত ভাল ভারতীয় মুসলিম আমি দেখিনি। বাংলাদেশে বহু কোটিপতি গুজরাটি আছে, গুজরাটে কোটিপতি বাঙ্গালী?
বার্মীজ/আরাকানীঃ
সামরিক শাসনের কাঁটাতারের আড়ালে বন্দী এই দুর্ভাগা জনগোষ্টী আমাদের জন্য অত্যান্ত সম্ভাবনাময়। এরাও অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে পঙ্গু। চট্টগ্রাম বা রাঙ্গামাটি থেকে একটা আরাকানি চ্যানেল শুরু করে দিলে অটোমেটিক আমাদের পণ্যের বিশাল বাজার তৈরি হয়ে যাবে বলে আমি শিওর।
এই রে! লিখবনা লিখবনা করে মেলা লিখে ফেলেছি। জলদি এই সিরিজ খতম করতে হইবেক। নাহলে খবর আছেঃ)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



