তুমি ও কবিতা
তোমার সাথে প্রতিটি কথাই কবিতা, প্রতিটি
মুহুর্তেই উৎসব-
তুমি যখন চলে যাও সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর
সব আলো নিবে যায়,
বইমেলা জনশূন্য হয়ে পড়ে,
কবিতা লেখা ভুলে যাই।
তোমার সান্নিধ্যের প্রতিটি মুহূর্ত রবীন্দ্রসঙ্গীতের মতো
মনোরম
একেটি তুচ্ছ বাক্যালাপ অন্তহীন নদীর কল্লোল,
তোমার একটুখানি হাসি অর্থ এককোটি বছর
জ্যোৎস্নারাত
তুমি যখন চলে যাও পৃথিবীতে আবার হিমযুগ
নেমে আসে;
তোমার সাথে প্রতিটি কতাই কবিতা, প্রতিটি গোপন কটাক্ষই
অনিঃশেষ বসন্তকাল
তোমার প্রতিটি সম্বোধন ঝর্নার একেকটি কলধ্বনি,
তোমার প্রতিটি আহ্বান একেকটি
অনন্ত ভোরবেলা।
তাই তুমি যখন চলে যাও মুহূর্তে সব নদীপথ
বন্ধ হয়ে যায়
পদ্মার রুপালি ইলিশ তার সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলে,
পুষ্পোদ্যান খাঁখাঁ মরুভূমি হয়ে ওঠে;
যতোক্ষণ তুমি থাকো আমার নিকটে থাকে
সপ্তর্ষিমণ্ডল
মাথার ওপরে থাকে তারাভরা রাতের আকাশ,
তুমি যতোক্ষণ থাকো আমার এই হাতে
দেখি ইন্দ্রজাল
আঙুলে বেড়ায় নেচে চঞ্চল হরিণ;
তুমি এলে খুব কাছে আসে সুদূর নীলিমা
তোমার সান্নিধ্যের প্রতিটি মুহূর্ত সঙ্গীতের
অপূর্ব মূর্ছনা
যেন কারো অবিরল গাঢ় অশ্রুপাত;
তোমার সাথে প্রতিটি বাক্য একেকটি কবিতা
প্রতিটি শব্দ শুভ্র শিশির
কোথায় যাই, কার কাছে যাই
আজ বন্ধের দিন; কোথাও কিছু খোলা নেই
সবখানে শুধু বন্ধ, শুধু বন্ধ;
একেকটি দরোজার সামনে বড়ো বড়ো শাটার নামানো
যেন বন্ধ-করা একটি কাঠের বাক্সের মতো সমস্ত শহর,
তালাবন্ধ যেন এই সুনীল আকাশ; আজ
বন্ধের দিন, নিউ মার্কেটের সবগুলো গেটে তালা
সাকুরায় যেন বহুদিনের কারফিউ;
পোষ্টাপিসের হলূদ বারান্দা জনশূন্য,
কাঠের সিঁড়ি শব্দহীন
ব্যাঙ্ক, বীমা, নীলক্ষেত টেলিফোন অফিস
কোথাও কোনো স্বাভাবিক কাজকর্ম নেই,
এই বন্ধের দিনে বেইলী রোডের দোকানগুলোতে
কিছুই পাওয়া যাবে না-
সারা এলিফ্যান্ট রোড যেন কোন এক অচিন ঘুমের দেশ।
আজ বন্ধের দিন, কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই,
নিউ মার্কেটের বইয়ের দোকান বন্ধু,
সাকুরা আজ খুলবে না
স্টেডিয়ামের সবগুলো দোকানে ঝাঁপফেলা,
খবরের কাগরের অফিসে কেউ নেই, টেলিফোন বন্ধ
আমি আজ কোথায় যাই; শহরের একটি রোস্তরাঁ কিংবা
পানশারঅও খোলা নেই,
শিশুপার্ক, কার্জন হল, কলা ভবন
বন্ধ, বন্ধ, সব বন্ধ,
এই বন্ধের দেনে এই জনশূন্য গোধূলিতে
তাহলে আমি কোথায় যাই, কার কাছে যাই!
বন্ধুরা ছুটিতে কেউ গেছে দেশের বাড়িতে, কেউ দেশের বাইরে
যারা ঢাকায় তারাও যে যার গর্তে ঢুকে আছে,
সবখানে এই দরোজা-লাগানো শহরে, এই গেটবন্ধ
নগরীতে আমি কোথায় যাই।
ব্যাঙ্ক, বীমা, পত্রিকার অফিস আজ
সব বন্ধু, কোথাও কেউ নেই,
তাহলে এই একলা রিকশায়, উদাসীন সাইকেলে চেপে
আমি কোথায় যাবো, কার কাছে যাবো!
এই বিষণ্ন সন্দ্যায় একাকী ঘুরতে ঘুরতে
যদি তোমাদের বাড়ির কাছে চলে যাই-
তোমাদের সেই বন্ধু গেটটিও কি কিছুতেই খুলবে না,
সারারাত ডাকাডাকিতেও কি গুম ভাঙবে না তোমাদের কারো,
এই শহরে একটিবারের জন্যেও কি কেউ এই বন্ধ দরোজা
আর খুলবে না, আর খুলবে না?
তাহলে এই বন্ধের দিনে, এই সর্বত্র তালা-লাগানো শহরে
এই নিঃসঙ্গ সাইকেলে চেপে অবিরাম বেল বাজাতে বাজাতে
বলো আমি কোথায় যাই, কার কাছে যাই,
কোন নরকে যাই!
তুমি চলে যাবে বলতেই
তুমি চলে যাবে বলতেই বুকের মধ্যে
পাড় ভাঙার শব্দ শুনি-
উঠে দাঁড়াতেই দুপুরের খুব গরম হাওয়া বয়,
মার্সির কাঁচ ভাঙতে শুরু করে;
দরোজা থেকে যখন এক পা বাড়াও আমি
দুই চোখে কিছুই দেখি না-
এর নাম তোমার বিদায়, আচ্ছা আসি, শুভরাত্রি,
খোদাহাফেজ।
তোমাকে আরেকটু বসতে বললেই তুমি যখন
মাথা নেড়ে না, না বলো
সঙ্গে সঙ্গে সব মাধবীলতার ঝোপ ভেঙে পড়ে;
তুমি চলে যাওয়ার জন্যে যখন সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকো
তৎক্ষণাৎ পৃথিবীর আরো কিছু বনাঞ্চল উজাড়
হয়ে যায়,
তুমি উঠোন পেরুলে আমি কেবল শূন্যতা শূন্যতা
ছাড়া আর কিছুই দেখি না
আমার প্রিয় গ্রন্থগুলির সব পৃষ্ঠা কালো কালিতে ঢেকে যায়।
অথচ চোখের আড়াল অর্থ কতোটুকু যাওয়া,
কতোদূর যাওয়া-
হয়তো নীলক্ষেত থেক বনানী, ঢাকা থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট
তবু তুমি চলে যাবে বলতেই বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে
সেই থেকে অবিরাম কেবল পাড় ভাঙার শব্দ শুনি
পাতা ঝরার শব্দ শুনি-
আর কিছুই শুনি না।
জীবনের পাঠ
শুধাই বৃক্ষের কাছে, ‘বলো বৃক্ষ, কীভাবে
চলতে হয় কঠিন সংসারে? তুমি তো দেখেছো
এই পৃথিবীতে অনেক জীবন;
বৃক্ষ বলে, শোনো, এই সহিষ্ণুতাই জীবন’।
বলি আমি উদ্দাম নদীকে, বলো, পুণ্যতোয়া নদী,
কেমন দেখেছো তুমি মানুষের জীবনযাপন?
তুমি তো দেখেছো বহু সমাজ সভ্যতা’;
মৃদু হেসে নদী বলে,
দুঃখের অপর নাম জীবনযাপন’।
যাই আমি কোনো দূর পাহাড়ের কাছে
বলি, শোনো, হে মৌন পাহাড়,
তুমি তো কালের সাক্ষী, বলো না
বাঁচতে হলে কীভাবে ফেলতে হয় এখানে চরণ’?
কেবল দেখায় তার নিজের জীবন।
অবশেষে একটি শিশুকে আমি বুকে নিয়ে বলি,
‘তুমি এই জীবনের কতেটুকু জানো,
কোথায় নিয়েছো তুমি জীবনের পাঠ’?
কেবল শিশুটি বলে, ‘এসো খেলা করি আমরা দুজনে’।
৪র্থ পর্ব

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



