পিতৃপ্রদত্ব নাম ছিল ম্যানুয়েল ফ্রান্সিসকো দস সান্তোস। কিন্তু ছোটখাটো গড়নের জন্য বোন রোসা আদর করে ছোট্ট পাখি গারিঞ্চার নামে ডাকতেন দস সান্তোসকে। কিন্তু সেই আদরের ছোট্ট পাখি গারিঞ্চাই পরবর্তীতৈ অনেক বড় আসন দখল করে নেয় বিশ্ব ফুটবলে। গারিঞ্চাকে বলা হয়ে থাকে ফুটবল ইতিহাসের সেরা ড্রিবলার। উইঙ্গার পজিশনটিকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা গারিঞ্চা ফিফার শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড়ের তালিকায় হন সপ্তম, নির্বাচিত হন বিংশ শতাব্দীর ’ওয়ার্ল্ড টিম’ এর সদস্য।
বাকানো পায়ের পাতা আর এক পায়ের চেয়ে প্রায় ছয় সেন্টিমিটার ছোট আরেকটি পা নিয়ে জন্মেছিলেন গারিঞ্চা। কিন্তু কিংবদন্তীর ফুটবলার হবার জন্য যার জন্ম এইসব সমস্যা তাকে থামাতে পারেনি, মাঠে যেমন তাকে থামাতে পারত না প্রতিপক্ষের রক্ষণ। তার সময়ে পেলের চেয়েও অনেক বেশী জনপ্রিয় গারিঞ্চা বরং এই বাকানো পায়ের যাদুর জন্য পেয়েছিলেন ’এ্যাঞ্জেল উইথ দ্য বেন্ট লেগস’ উপাধি। বিখ্যাত ’ব্যানানা শট’ দিয়ে কর্নার থেকেও সরাসরি গোল করেছেন গারিঞ্চা।
১৯৫৪ বিশ্বকাপ আসতে আসতে ততদিনে পেশাদার ফুটবলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন গারিঞ্চা। ক্লাব বেটাফেগোর হয়ে খেলছিলেনও চমৎকার। কিন্তু একই পজিশনে খেলা জুলিনহো বা প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য ফুটবলের কারনে ১৯৫৪ বিশ্বকাপে শেষ পর্যন্ত ডাক পাননি গারিঞ্চা। এই ক্ষতি পুষিয়ে দিতেই যেন ১৯৫৮ এবং ১৯৬২--পর পর দু’টি বিশ্বকাপ জয় করেন গারিঞ্চা। ১৯৩৪-৩৮ এর ইতালির পর দ্বিতীয় দল হিসেবে গারিঞ্চার ব্রাজিল জয় করে টানা দুটি বিশ্বকাপ।
১৯৫৮র বিশ্বকাপে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে নিজেদের তৃতীয় ম্যাচে ব্রাজিলের হয়ে দু’জন খেলোয়াড়ের বিশ্বকাপ অভিষেক হয়। যার একজনের নাম পেলে এবং অপর জন পেলের চেয়ে বছর সাতেকের বড় গারিঞ্চা। ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ দুই সন্তান। বরং বলা হয়ে থাকে তার অসাধারণ ড্রিবলিং, দুরন্ত গতি, দু পায়ের সমান দক্ষতা, জোরালো শট সব মিলিয়ে পেলের চেয়ে অনেক বেশী ক্যারিশম্যাটিক ছিলেন গারিঞ্চা। গরিঞ্চা এবং পেলে একইসাথে খেলেছে এমন ম্যাচে কেউ কখনো হারাতে পারেনি ব্রাজিলকে।
অভিষেক ম্যাচের এক মিনিটের কম সময়ের মধ্যেই গারিঞ্চা বিপক্ষ দলের তিন জন খেলোয়াড়কে কাটিয়ে যে শটটি নেন তা পোস্টে লেগে ফিরে আসে। এক মুহুর্ত পরেই গারিঞ্চার বাড়িয়ে দেয়া বল থেকে পেলের দুর্দান্ত শটটিও ফিরে আসে ক্রসবারে লেগে। গারিঞ্চা এর পরও একের পর এক ব্যাতিব্যস্ত করে তোলেন বিপক্ষের রক্ষণ কে। গারিঞ্চার অভিষেক ম্যাচের প্রথম ৩ মিনিট কে বলা হয়ে থাকে ”দি গ্রেটেস্ট থ্রি মিনিটস ইন ফুটবল হিস্ট্রি”।
শুধু প্রথম ম্যাচেই নয়। বিশ্বকাপের বাকি ম্যাচ গুলোতেও একই ভাবে প্রতিপক্ষের ঘুম হারাম করে ছাড়েন গারিঞ্চা। ফাইনালে সুইডেনের সাথে ১-০ তে পিছিয়ে থেকেও ব্রাজিল যে ২-১ এ জয় পায় গারিঞ্চার বাড়িয়ে দেয়া বল থেকেই গোল দু’টি করেন ভাভা। প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে এসেই বিশ্বকাপ জয় করেন গারিঞ্চা। ব্রাজিলও জেতে তাদের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা, শুরু হয় বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সাফল্যগাথার। গারিঞ্চা আসরের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন এবং স্থান করে নেন আসরের সেরা একাদশে।
তবে গারিঞ্চা তার সেরাটা জমিয়ে রেখেছিলেন ১৯৬২র চিলি বিশ্বকাপের জন্য। দ্বিতীয় ম্যাচেই ইনজুরির কারনে পেলে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পরায় গারিঞ্চার কাধে নতুন দায়িত্ব বর্তায়। কেবল গোল করালেই চলবে না, গোল করতেও হবে। বলাবাহুল্য দক্ষতার সাথে সে দায়িত্ব পালন করেন গারিঞ্চা। বিশেষত ইংল্যান্ড এবং স্বাগতিক চিলির বিপক্ষে ম্যাচ দু’টিতে অসাধারণ খেলেন তিনি। ৪ গোল করেন সেই দুই ম্যাচে। পুরো আসরে ভাভা, আমারিলদোদের দিয়ে করান একের পর এক গোল। চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে ফাইনাল ম্যাচে প্রচন্ড জ্বর নিয়েও খেলা চালিয়ে যান গারিঞ্চা। ব্রাজিলকে টানা দ্বিতীয় বারের মতন বিশ্বকাপ জিতিয়েই মাঠ ছাড়েন তিনি। বিশ্বকাপ শিরোপার পাশাপাশি জিতে নেন আসরের সেরা খেলোয়াড়ের গোল্ডেন বল এবং সর্বোচ্চ গোলদাতার গোল্ডেন বুটও।
১৯৬৬তে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপেও খেলতে গিয়েছিলেন গারিঞ্চা। গোড়ালির ইনজুরিতে ভুগতে থাকা গারিঞ্চা তবুও প্রথম দুটি ম্যাচে অংশ গ্রহণ করেন। বুলগেরিয়ার সাথে ২-০ তে জয়ে গোলও করেন একটি। কিন্তু পরের ম্যাচেই হাঙ্গেরির সাথে ম্যাচে ব্রাজিল পরাজিত হয় ৩-১ গোলে। ব্রাজিলের তৃতীয় ম্যাচটিতে গারিঞ্চা মাঠে না নামায় হাঙ্গেরির সাথে ম্যাচটিই হয়ে যায় গারিঞ্চার শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করে প্রথমবারেই শিরোপা জয়ী গারিঞ্চা ব্রাজিলের জার্সি গায়ে ৫০ ম্যাচ খেলে মাত্র একটিতেই পরাজিত হন, সেটি ওই শেষ ম্যাচেই।
’শেষ ভালো যার সব ভালো তার’ এই বাংলা প্রবাদটি গারিঞ্চাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
প্রথম আলো অনলাইনে মাঝে মাঝে আমার কিছু লেখা প্রকাশিত হয়। সেই ভালোলাগা অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে কখনও কখনও ব্লগেও তা শেয়ার করি। কিন্তু এখানেই ঘটে বিপত্তী। অনেকেই সঙ্গত কারণেই বিভ্রান্ত হন, 'পুরোটাই কপি করার দায়ে' তেড়ে আসেন। বিভ্রান্ত হবেন না, এটি তেমনই একটি প্রয়াস।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে মে, ২০১৪ রাত ২:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


