somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শিক্ষাগুরুর মর্যাদা

২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ রাত ১২:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রাস্তা পার হতে হতে রিকশায় ভেসে যাওয়া সুন্দরী দেখতে যেয়ে একাধিকবার রিকশাওয়ালার কাছ থেকে হলুদ কার্ড পেয়েছি।

তবে আজ বোধ হয় কেবল হলুদ কার্ডেই পার পাওয়া গেল না। কারণ, সামনে একটু এগিয়ে গিয়ে রিকশা একেবারে থেমেই গেল। ঘটনা কী বুঝে ওঠার আগেই দেখি রিকশা থেকে সেই সুন্দরী হাতের ইশারায় কাছে ডাকছে।

কোন এক জ্ঞানী লোকের কাছে শুনেছিলাম সেই অমর বাণী--কোন রূপসীকে আপনার দিকে তাকিয়ে হাসতে দেখলেই বিগলিত হয়ে যাবেন না। আগে খোঁজ নিয়ে দেখুন আপনার জিপার ঠিকমতো লাগানো আছে কিনা। প্যান্টের জিপার ঠিকমতোই আছে নিশ্চিত হয়ে এদিক ওদিক খোঁজ নিলাম--অন্য কাউকে ডাকছে কিনা। ডানে-বায়ে, সামনে-পেছনে ভালমত তাকিয়েও যখন নিশ্চত হলাম নাহ্, আমাকেই ডাকছে, বিভ্রান্তি আরও বেড়ে গেল। সুন্দরীরা দূরে ঠেলে দিলে তা কষ্টের কারণ হয়, কিন্তু নিশ্চিত ভাবেই বলছি, এভাবে কাছে ডেকে নিলেও তা সুখের কারণ হয় না।

কাছে এগিয়ে যেতেই আমাকে কোন সুযোগ না দিয়েই একগাদা প্রশ্ন--
-স্যার আপনি কেমন আছেন?
-অফিস কেমন চলছে?
-আপনি তো আর আসলেন না বাসায়...

'স্যার' বলে সম্বোধন করায় সম্বিত এবং স্বস্তি দুটোই ফিরে পেলাম। সুন্দরী মেয়েদের 'স্যার' হতে পারার একটা আলাদা শ্লাঘা থাকে। সে তো ছিলই, তাছাড়াও, আমার এক যুগের শিক্ষকতা যে সিকি যুগের চাকরীর কাছে এখনও বিলীন হয়ে যায়নি সেটা জেনেও ভালো লাগলো।

এই শতাব্দীর প্রায় শুরু থেকেই শুরু আমার শিক্ষকতা জীবনের। বড় লোক বন্ধুদের মধ্যে দেখা যেত এক অদ্ভুদ আত্মসম্মান বোধ--হাত খরচের জন্য পিতার কাছে হাত পাততে তাদের অহং-এ লাগতো, তাই তারাও টিউশনি করতো। আমাদের যাদের জন্মই হয়েছে ’পিতার কাছে টাকা চাহিয়া পত্র লিখিবার জন্য’ তাদের এই টিউশনির পিছনে অন্যান্য হাজারো ’কারনাবলী’ সক্রিয় ছিল, কিন্তু তা কখনই অহং ছিল না। বরং টিউশনির প্রথম দু’এক বছরের উত্তেজনা কেটে যাবার পরের বছরগুলোতে মাধবী সকাল, ক্লান্ত বিকেল কিংবা আয়েশী সন্ধ্যায় এই বাসা থেকে সেই বাসায় ছুটে বেড়াতে বেড়াতে এক রকম হীনমন্যতা ভর করত।

সেই হীনমন্যতা পুষিয়ে দিতেই যেন আজকাল সেখানে একটা গর্ব এসে ভর করে। গর্বিত হই যখন স্ত্রী সন্তান নিয়ে রাস্তায় বের হবার পর কোন ছাত্রের মুখোমুখি হয়ে যাই এবং সে বিনীত ভঙ্গিতে সালাম দিয়ে জানতে চায় স্যার কেমন আছে। ছাত্র সিগারেট টানে অথবা রূপসী ছাত্রী আরেক তরুণের বাহুলগ্না হয়ে বসে থাকে তাতে দুঃখ না পেয়ে বরং ভালো লাগে যদি দেখি দূর থেকে দেখতে পেয়েই ছাত্র তার হাতের সদ্য কেনা সিগারেট ফেলে দেয় কিংবা ছাত্রীরা অপরের বাহুমুক্ত হয়ে বসার চেষ্টা করে।

ছাত্রীর সাথে ভাব-ভালোবাসা টিচিং এথিকস-এর বাইরে--এ বিষয়ে বরাবরই সজাগ ছিলাম। কিন্তু একথাও সত্য--শিক্ষকও তো মানুষ! তার উপর বয়স আবার যুদ্ধে যাবার শ্রেষ্ঠ সময়ের। টেবিলের ওপারে একটা সুন্দরী ছাত্রী বসে থাকলে শত অনটনের মধ্যেও তরুণ শিক্ষকের মনে এক বৈশি^ক উদারতা কাজ করে-- জ্ঞান বিতরণ তুচ্ছ টাকার চেয়ে অনেক মহৎ জিনিস; দু’এক মাস বেতন না পেলে কীই বা এসে যায়? কেবল তরুণ টিউটরের কেন, যে কোন সুস্থ পুরুষেরই ভালো লাগার কথা। কারণ মুগ্ধ করতে সৌন্দর্যতো কোন সম্পর্ক মানে না। অবশ্য যারা মুগ্ধ হতে হতে শেষ পর্যন্ত ”ভালোমতো পড়াশোনা করানোর নামে” স্টুডেন্টকেই জীবনসঙ্গী করে নিয়েছে ”টিচিং এথিক্স” বিষয়ে তাদেরও অকাট্য যুক্তি আছে--মুগ্ধতা যেমন সম্পর্ক মানে না, প্রেমও তেমনি এথিক্স মানে না।

হাতের এত কাছে হাত, পায়ের এত কাছে পা নিয়ে এই যে দিনের পর দিন মুখোমুখি বসে থাকা, আমি তো আমিই, জীবনানন্দও সাকুল্যে এত সময় বনলতার মুখোমুখি বসেছে কিনা সন্দেহ। হাতের কাছে পেলেই যে ছেলে সুযোগ নিতে চায় তার উপর সুন্দরীরা যারপরনাই বিরক্ত থাকে সত্য, কিন্তু যেই ছেলেটি দিনের পর দিন পাথরের মতো সামনে বসে থাক তার উপরও সুন্দরীরা যে খুব প্রীত থাকে তাও না। এই পাথরকে তারা সহজ ভাবে নেয় বলে মনে হয় না।

তারা যদি জানতো সেই পাথরের বুক চিরে বয়ে চলা ঝর্ণার কথা! তাদের সামনে উদাসী ভঙ্গিতে ঘন্টা দেড়েক বসে থাকতে তাদের তরুণ শিক্ষককে নিজের সাথে কতখানি সংগ্রাম করতে হতো! তারপরও শেষ পর্যন্ত সুযোগ নিতে চেষ্টা না করার যে আত্মত্যাগ, সেই ত্যাগও বৃথা যায় না, কালেভদ্রে ফল পাওয়া যায়। যেমন আজকে--

”-স্যার আপনি কেমন আছেন?
-অফিস কেমন চলছে?
-আপনি তো আর আসলেন না বাসায়...”

হাস্যোজ্জ্বল ছাত্রীটি পাশে শুকনোমুখে বসে থাকা তার স্বামীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। ভদ্রলোক শুকনো মুখটি আরও শুকনো করে আমার দিক হাত বাড়িয়ে দিলেন। সভ্যতার কিছু সমস্যা থাকে--কখনও কখনও বিষপান করেও আমাদের মুখে হাসি ফুটিয়ে সভ্যতা বাচিয়ে রাখার চেষ্টা করতে হয়। ছাত্রীটির স্বামী কিংবা আমি, আমরা কেউই সভ্যতাকে ধ্বংস হতে দিলাম না--কিছুক্ষণ হাত ঝাকাঝাকি করলাম।

রাত প্রায় এগারোটায় স্বয়ং স্বামীকে পাশে নিয়ে কোন তরুণী যখন চলন্ত রিকশা থামিয়ে সাবেক শিক্ষকের কুশলাদি জানতে চায়, মনের মাঝে তখন অবধারিত ভাবেই বাজতে থাকে--

"আজ হতে চির উন্নত হলো শিক্ষাগুরুর শির..."
৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রবীন্দ্রনাথের নামে কত শত অভিযোগ

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০৫


*রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা চুরি করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন! বাস্তবতা হলো, রবীন্দ্রনাথ যখন নোবেল পান, নজরুল তখন লেখালেখেই শুরুই করেননি। তাঁর বয়স সবে ১৪ ছিল।

প্রাপ্ত বয়সে নজরুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাটায় - পুটায় ঘষাঘষি, মাঝখানে মরিচদের জীবন শেষ?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩১

আওয়ামী তথা ভারতীয়দের নমস্য রবী বাবুর চিত্রে কালিমা লেপন।
দুই দিন পরে, আওয়ামী বিরোধীদের 'রবী' ইউনুস সাহেবকে গালাগালি!!!
এ যেন পাটাপুটায় ঘষাঘষি করে অভাগা মরিচদের জীবন শেষ করার চেষ্টা?
কিন্তু, রবী বাবু কিংবা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতা প্রেমিকদের কলমে সময়ের বিবেক : বিশ্ব কবি রবিন্দ্র নাথ ঠাকুরের গ্রাফিতেতে কালী লেপন প্রসঙ্গ

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৫:৩৪


যে কবির গানে ভোরের আকাশ জেগে ওঠে প্রতিদিন
যাঁর সুরে আজও অশ্রু ঝরে হাসে হৃদয় রঙিন
সেই রবীন্দ্রনাথের ছবির বুকে কালি মাখায় যারা
তারা কি জানে তাঁরই গানে বাঙালির প্রাণের... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাসূল (সা.), আহলে বাইত ও সাহাবায়ে কেরামের (রা.) অনুচিত কাজের সমালোচনা ও সমর্থন করা যাবে না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৫:৪১




সূরাঃ ৮ আনফাল, ৬৭ থেকে ৬৯ নং আয়াতের অনুবাদ-
৬৭।দেশে ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবির উচিত নয়। তোমরা পার্থিব সম্পদ কামনা কর। আল্লাহ চান... ...বাকিটুকু পড়ুন

রঠার মুসলিম বিদ্বেষ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:১৮



রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর সংক্ষেপে রঠা এর ছোট গল্প "রীতিমত নভেল" এ রঠা মুসলমান শব্দের সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করেছেন ‘যবন’। যবন অর্থ অসভ্য, ম্লেচ্ছ, অপবিত্র, বর্বর জাতি, যেকোনো বিদেশি ইত্যাদি ইত্যাদি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×