
*রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা চুরি করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন! বাস্তবতা হলো, রবীন্দ্রনাথ যখন নোবেল পান, নজরুল তখন লেখালেখেই শুরুই করেননি। তাঁর বয়স সবে ১৪ ছিল।
প্রাপ্ত বয়সে নজরুল তাঁর ‘সঞ্চিতা’ নামক কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথকে উতসর্গ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথও কাঁর গীতিনাট্য ‘বসন্ত’ নজরুলকে উৎসর্গ করেন। ১৯৩৫ সালে নজরুলকে একটি স্নেহপূর্ণ চিঠি লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই চিঠির জবাবে অভিভূত হয়ে নজরুল ‘তীর্থপথিক’ নামে একটি কবিতা রচনা করেন এবং রবীন্দ্রনাথকে উত্তর দেন।
কবিতার বিখ্যাত কয়েকটি পঙ্ক্তি: “আমি জানি তুমি অজর অমর, তুমি অনন্ত প্রাণ;
মহাকাল ও নাহি জানে, কবি, তব আয়ুর সে পরিমাণ।”
তাঁদের মধ্যে সবসময় সুসম্পর্ক ছিল। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর নজরুল শোকে মুহ্যমান হয়ে একাধিক কবিতাও লিখেছিলেন (‘রবিহারা’ ও ‘সালাম অস্ত রবি’) এবং ‘ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে’ সংগীত রচনা করেন।
**রবীন্দ্রনাথ নাকি ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাত্র ৫ বছর ১৯২৬ সালে তিনি ঢাবিতে এসেছিলেন। কার্জন হলে কবি বক্তৃতাও দিয়েছিলেন। বিষয় ছিল - The Meaning of Art। কয়েকদিন পর একই হলে তিনি দ্বিতীয় বক্তৃতা দেন। বিষয় - The Rule of the Giant।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে তিনবার সংবর্ধনা দিয়েছিল। দু’বার ডাকসুর উদ্যোগে কার্জন হলে, আর একবার সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের মুসলিম ছাত্রদের উদ্যোগে। নবাব খাজা হাবিবুল্লাহ নিজে তাঁকে অতিথি করে এনেছিলেন।
১৯১২ সালে কলকাতার গড়ের মাঠে রবীন্দ্রনাথ নাকি সভাপতিত্ব করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা করেছিলেন! বিরোধিতা করতে বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে এত সম্মান দিয়ে ডাকত না। সেদিন রবীন্দ্রনাথ কলকাতাতেই ছিলেন না। তিনি ছিলেন কুষ্টিয়ার শিলাইদহে। ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ তিনি শিলাইদহে ছিলেন, কলকাতায় ফেরেন ১২ এপ্রিল। সে সময়ের কোনো পত্র-পত্রিকায় এই বিরোধিতার কোনো খবর নেই। উল্টো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার পর তিনি নিজে কলকাতা থেকে কয়েকজনকে চিঠি লিখে ঢাকায় শিক্ষকতা করতে যেতে বলেছিলেন। আসলে রবীন্দ্রনাথ বিরোধিতা করেছিলেন কাশীতে ‘হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার সাম্প্রদায়িক মনোভাবের আয়োজনের বিরুদ্ধে।
১৯৩৬ সালের ২৯ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিশেষ সমাবর্তনে রবীন্দ্রনাথকে সম্মানসূচক ডি. লিট ডিগ্রি দেওয়া হয়। অসুস্থতার কারণে তিনি আসতে পারেননি, কিন্তু নথিতে আজও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সম্মানিত নোবেলজয়ী।
***রবীন্দ্রনাথের নামে অভিযোগ তিনি নাকি পতিতালয় চালাতেন। ১৮০৬ সালের এস এন মুখার্জির এক লেখায় কলকাতা বৌ বাজার এলাকায় যে পতিতালয়ের উল্লেখ, সেখানেই লেখা আছে যে পতিতালয়টির মালিকানা দ্বারকানাথ ঠাকুর বংশের কোনো এক সদস্যের। নাম উল্লেখ নেই। দ্বারকানাথ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের দাদা।
দ্বারকানাথের বংশ অনেক বড় ছিল। সেই বংশের কার না কার ১৮০৬ সালে পতিতালয়ের মালিকানা ছিল, সেই সূত্রকে ভিত্তি ধরে গুজব ছড়ানো হলো রবীন্দ্রনাথের পতিতালয়ের ব্যবসা ছিল! অথচ রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় কলকাতার বৌ বাজারে ঐ পতিতালয়ের অস্তিত্বই ছিল না। আর ১৮০৬ সালে দ্বারকানাথের বয়স ছিল মাত্র ১১! ১১ বছরের বালক ৪৩ কক্ষবিশিষ্ট পতিতালয়ের মালিক ছিল- এই গল্প একমাত্র মাথায় গুবরওয়ালাদের পক্ষেই বিশ্বাস করা সম্ভব!
১৯৪৭ এবং ৭১-এর বিরোধিতা করেছে জামায়াত। গণহত্যার অংশীদারও তারা। এগুলো ইতিহাস দ্বারা স্বীকৃত। তারপরও এসব নিয়ে কথা বলা যায় না। বর্তমানে জামায়াত দেশের সবচেয়ে বড় দেশপ্রেমিক দল! তাদের ছানাপোনারাই গুজব ছড়ায়। অনেকে না বুঝে সেই ফাঁদে পা দেয়। যাচাই করে দেখে না সত্যতা কী?
সমস্যা আসলে আর কিছুতে না, বরং রবীন্দ্রনাথে। তিনি মুসলিম ছিলেন না, এটাই তার দোষ! কেন বলছি এই কথা? রবীন্দ্রনাথ জমিদার ছিলেন, এটা তার দোষ? ভারতবর্ষে মুসলমানদের দীর্ঘকাল শাসন কিংবা নবাবদের নিয়ে গর্ব করা লোকের অভাব নেই। তারা কি ফেরেশতা ছিলেন?
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর ঢাকা হয়েছিল পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের রাজধানী। তখন রাজধানীর জন্য ব্রিটিশ সরকার ৬০০ একর জমি অধিগ্রহণ করে। অধিগ্রহণ মানে দান নয়, সরকার ন্যায্য মূল্যের চেয়ে তিনগুণ বেশি দামে জমির মালিকানা নিজের নিয়ন্ত্রণে নেয়। সেই ৬০০ একরের একটি অংশ ছিল নবাব বাহাদুর স্যার খাজা সলিমুল্লাহর এস্টেটের জমি।
নবাবরা কোথায় কোথায় দান করেছেন, তার পুরো লিস্ট আজও আহসান মঞ্জিলে গেলে দেখতে পাবেন। অথচ নবাবদের ঠিকই মহান করে তোলার চেষ্টা করা হয়। নিজেদের নিপীড়িত বর্ণনা করা হয়। পক্ষান্তরে হিন্দু বা অন্য ধর্মের শাসকদের খলনায়ক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




