মানির মান পাহাড়ের সমান, এমন একখান কথা কিভাবে প্রচলিত হইল তাহা আমি কোনভাবেই বুঝিয়া পাইনা। এই কথাটা যে একেবারেই মিথ্যা তাহা আজ আমি একেবারে প্রমান করিয়া ছাড়িব।

আজ আমি আপনাদের শুনাইব আমার মত মানির মান কিভাবে খান খান হইয়াছিল,

এখন আপনারা সিনা টান টান করিয়া গল্প শুনিতে আসেন। সে অনেককাল আগের কথা, আমি আর আমার জিগরি দোস্তরা তখন কলেজ পাশ করা যুবক। আমরা সেই সময়কালে এলাকায় মন্দের ভাল ছাত্র হওয়ায়, আমাদের নিজ নিজ পরিবার হইতে জানাইয়া দেয়া হইল যে কোন মূল্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সিট বাগাইতে হইবে।

কাজেই আমি আর আমার আরেক বন্ধু এই কথা জানিবা মাত্রই জিহাদি জোশে ঝাপাইয়া পড়িলাম, এবং বিখ্যাত নাকি কুখ্যাত ইউ ছি ছি কোচিং এ ভর্তি হইয়া গেলাম।

ভর্তি হইবার পর আমরা পড়ালেখা বাদে আর সকল কিছুই অত্যন্ত নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলার সাথে করিতে লাগিলাম। এই সময়কালেই আমি মোটামুটি কাটাকুটি খেলায় বিখ্যাত হইয়া গেলাম, কারণ দুই ঘন্টার ক্লাসে এই খেলাটি আমি এবং আমার দোস্ত নিয়মিত প্র্যাকটিস করিতাম।

এইভাবে করিয়া সুখে-শান্তিতে আমাদের দিন কাটিতে লাগিল। নানাদিকে আমাদের প্রতিভা বিকশিত হইতে লাগিল,এইরুপ একটি প্রতিভা ছিল এক টিকিটে দুই ছিঃনেমার ন্যায় এক টিকিটে দিনের পর দিন বাসে ভ্রমন।

ব্যাপারটা এমন দাঁড়াইয়াছিল যে, আমরা নিজেদের টিকিট কয়েকদিন ভ্রমন করিয়া নিজেরাই ছিঁড়িয়া, নতুন করিয়া টিকিট কাটিতাম।

এই কাজ করিতে করিতে আমাদের কনফিডেন্স এমন পর্যায়ে আসিল যে বাসে টিকিট চেকার আছে নাকি নাই তা না দেখিয়াই আমরা বাসে উঠিয়া পড়িতাম, আর মনের সুখে উ লা লা, উ লা লা গান ধরিতাম।

কিন্তু উপরওয়ালা আমাদের এই সুখ বেশী দিন সহ্য করিলেন না, জীবনের এইরূপ সুখের সময়ে আমরা দুইবন্ধু একদিন টিকিট চেকারের হাতে একেবারে নগদে কট খাইয়া গেলাম।

সে উল্টাইয়া পাল্টাইয়া, আমাদের টিকিট এর বয়স নির্ণয়ে ব্যাস্ত হইয়া পড়িল,এবং একসময় ঘোষণা করিল আমাদের টিকিট নাকি ছয়দিন আগের।

আমরা এইরূপ বিনা দৌড়ানিতে কট খাইয়া, একেবারে স্পিকটি নট হইয়া গেলাম।

চেকার আমাদের কহিল আপনাদের একটু আমার সাথে আসিতে হইবে, আমার দোস্ত তৎক্ষণাৎ জিজ্ঞেস করিয়া বসিল কোথায় থানায়???

এই কথা শুনিয়া চেকার আমাদের দিকে যেই দৃষ্টি দিল তাহাতে অগ্নি না ঝরিলেও বর্ষাকাল হইলে যে বৃষ্টি ঝরিত তাহা একেবারে কনফার্ম।

যাইহোক সে কহিল থানায় নয় আপনাদের একটু টিকিট কাউন্টারে আসিতে হইবে। কি আর করা আমরা ভাল মানুষের মত তাহার সহিৎ কাউন্টারে গেলাম। টিকিট কাউন্টারে যাইয়াই আমরা জানিতে পারিলাম আমরা নাকি একেবারে অমার্জনীয় অপরাধ করিয়াছি। আমরা আরও জানিতে পারিলাম কর ফাঁকি দেয়া আর টিকিট ফাঁকি দেয়া নাকি একি অপরাধ।

এমনকি কর ফাঁকির অপরাধ মাফ হইলেও নাকি টিকিট ফাঁকির অপরাধের মাফ নাই।

কাউন্টারের লোকজন এইসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানাইয়াই সরাসরি ডিলে আসিয়া পড়িতে চাহিল, এবং জানাইল, আমরা নেহায়েত ছাত্র মানুষ এবং জাতির মেরুদণ্ড হওয়ায় নাকি আমাদের ছাড়িয়া দিতেছে,

তবে এমনি এমনি তো আর ছাড়া যায়না তাই, জরিমানা স্বরূপ ৬ টাকার ভাড়া তাহারা ৬০ টাকা রাখিয়া দিল।

ভাইসকল এরপরের কাহিনী জিজ্ঞাসা করিয়া আমাকে আর লজ্জা দিবেন না। ঐদিন আমাদের পকেটে আর টাকা না থাকায়, আমরা পুরোটা পথ হাঁটিয়াই বাসায় ফিরিয়াছিলাম,এবং বন্ধু মহলে এই ঘটনা পুরাই চাপিয়া গিয়াছিলাম এবং প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলাম জীবনেও আর এক টিকিটে দুইদিন বাসে চড়িব না।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ডিসেম্বর, ২০১২ দুপুর ২:৪০