আপনারা অনেকেই হয়ত ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’ গানটি শুনিয়াছেন।

বাংলা ছবিতে বেদেদেরকে যতই রোম্যান্টিক ভাবে দেখান হোক, বাস্তবে তাহাদের হাতে যাহারা ধরা খাইয়াছে, তাহারাই জানেন যে, প্রয়োজনে ইহারা কতটা হৃদয়হীন হইতে পারে।

নচেৎ আমার মত নান্না-মুন্না পেয়ারা বাচ্চার হাতে পাঁচ টাকা ধরাইয়া দিয়া, প্রকাশ্য দিবালোকে তাহারা আমার ইজ্জৎ লইয়া ছিনিমিনি খেলিবে কেন???

যাইহোক ঘটনাখানা এখন খুলিয়াই বলি। ইহা বেশ কিছুকাল আগের ঘটনা। একদা আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাইবার নিমিত্তে, চুল আঁচড়াইয়া, মাঞ্জা মারিয়া, ঘর হইতে বাহির হইয়া, বাস স্ট্যান্ড আসিয়া নায়ক নায়ক লুক নিয়া ভ্যাবলার ন্যায় দাঁড়াইয়া ছিলাম,

এবং দেশ ও জাতির উন্নয়ন নিয়া গভীর চিন্তা ভাবনা করিতেছিলাম।

মোটামুটি আধাঘণ্টা দাঁড়াইয়া থাকিবার পরও যখন কোন বাস পাইলাম না, তখন দেশের উন্নয়নের চিন্তা বাদ দিয়া, যোগাযোগ ব্যাবস্থার গোষ্ঠী উদ্ধার করিয়া টাইম পাস করা শুরু করিলাম, এবং আমার ক্লাস ধরিবার মহৎ চিন্তা ত্যাগ করিলাম।

ঠিক এমন সময়ে ঘটনা ঘটিয়া গেল। বাস স্ট্যান্ড এ হাজার হাজার জাগ্রত জনতা থাকিতেও একদল বাইদ্যানি আসিয়া আমাকে ঘিরিয়া ধরিল। তাহাদের যুদ্ধংদেহী মনোভাব দেখিয়া,আমি উলটা দিকে খরগোশের ন্যায় দৌড় দিবার একটা পাকা প্ল্যান প্রায় বানাইয়া ফেলিয়াছিলাম,কিন্তু হঠাৎ মনে হইল, আমি চুরিও করিনাই, ডাকাতিও করিনাই, এমনকি কাহারও ইজ্জত লুটিয়াছি এমন অভিযোগও কেউ করিতে পারিবেনা,

কাজেই পালাইব কেন?? অতঃপর বুকে বল নিয়া তাহাদের দিকে তাকাইলাম। এরি মধ্যে তাহাদের একজন আমার হাত পাকড়াইয়া ধরিয়া, চাঁদা চাইবার ভঙ্গিতে কহিল পঞ্চাশ ট্যাকা দে।

আমি মনে মনে কহিলাম কস্কি মমিন,

পঞ্চাশ টাকা ফ্লেক্সি করিলে আমার একমাস চলিয়া যায়, আর তাহারা কিনা পঞ্চাশ টাকা চায়, মামা বাড়ীর আবদার নাকি।

আমি আবারও সিনা টান টান করিয়া একটু ভাব ধরিবার চেষ্টা করিয়া, মিন মিন করিয়া বলিলামঃ টাকা নাই। তাহাদের একজন বলিল মাঞ্জা মারিয়া ঘুরিতে পারো অথচ টাকা নাই এইটা কেমন কথা??

ভাইসব,আপনারা হয়ত জানেন না যে, আমার মত নান্না-মুন্না পেয়ারা বাচ্চার লুক নিয়া কেউ কথা বলিলে আমার মেজাজ এম্নিতেই খারাপ হইয়া যায়, আর এইটাতো টাকা পয়সার ব্যাপার, কাজেই আমার গুপ্ত মেজাজ একেবারে সুপ্ত আগ্নেয়গিরির ন্যায় গরম হইয়া উদ্গিরন করিল,

এবং আমি প্রচণ্ড রাগের সহিত মাছি তাড়াইবার ভঙ্গিতে হুশ হুশ করিতে করিতে বলিলামঃ কইসিনা টাকা নাই,এত বিরক্ত কর কেন?? আর আমি মাঞ্জা মারিলে তোমার সমস্যা কি??

তাহারা আমার গরম মেজাজ দেখিয়া একটু নরম স্বরে কহিল, আচ্ছা যা ঠিক আসে বিশ ট্যাকা দে ,

আমি আবারও কহিলামঃ কইসিনা টাকা নাই, বিদায় হও এখন। ভাই সকল কি আর বলিব এই রাগই আমার বিপদ ডাকিয়া আনিল, তাহাদের একজন আমার এহেন ব্যাবহারে ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিয়া কহিলঃ এইরকম কিপ্টা দেখিয়াই তো সারাজীবন মাঞ্জা মারিয়াও একলা দাঁড়াইয়া থাকস, একসাথে দাঁড়াইবার জন্য কাউরে পাস না, এই ল পাঁচ ট্যাকা, কপালে ঘসিয়া মসজিদে দিস, তাইলে হয়ত পাশে দাঁড়ানোর জন্য কাউকে পাইবি, এই বলিয়া পাঁচ টাকা আমার কপালে ঘষাঘষি করিয়া, হাতে ধরাইয়া দিয়া চলিয়া গেল।

তাহাদের এই কাণ্ড দেখিয়া উপস্থিত জনতা হাসিতে হাসিতে দিশা হারাইয়া ফেলিল। আর আমি ঘটনার আকস্মিকতায় খাম্বার ন্যায় জায়গাতেই হ্যাং হইয়া গেলাম, এবং বোকা বোকা হাসি দিয়া পাঁচ টাকা সমেত নিজের কপাল ঘষিতে থাকিলাম, আর মনে মনে সুযোগ থাকিতেও উল্টা দিকে দৌড় না দেয়ার জন্য নিজেকে অভিসম্পাত করিতে করিতে কহিলাম, হে ধরণি দ্বিধা হও, আমি লুকাইয়া পড়ি।
প্রথম পর্বের লিঙ্কঃ
ইজ্জতের বেঈজ্জতি
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ডিসেম্বর, ২০১২ সন্ধ্যা ৬:৩৮