
জীবনের চেয়ে মৃত্যুর আদর এবং কদর অনেক বেশি আমাদের এই দেশে! জীবদ্দশায় যাঁদের খোঁজখবর নেবার প্রয়োজন বোধ করি না আমরা, মৃত্যুর পর কী অদ্ভুতভাবেই ভীষণ আপন হয়ে ওঠে তাঁরা, হয়ে ওঠে ভীষণ কাছের মানুষ! ভাগ্য সব! ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে অন্তত কারো কারো ক্ষেত্রে মৃত্যুর পর সহানুভূতি, সম্মান, সমাদরের লেখচিত্র স্পর্শ করে অপ্রত্যাশিত উচ্চতা!
সোহাগী জাহান তনুর কথা ধরা যাক। মৃত্যু পরবর্তী ভাগ্য দৃশ্যত সুপ্রসন্ন তাঁর। এবং সুপ্রসন্ন হওয়াটাই ন্যায়সঙ্গত। এবং সুপ্রসন্ন হওয়াটাই উচিত সবদিক বিবেচনায়। এমন বর্বরোচিত ঘটনায় নড়ে ওঠা উচিত প্রতিটি মানুষের বিবেকের দরজার কড়া। সজোরে। কেঁপে ওঠা উচিত সভ্য সমাজের ভিত। প্রচণ্ড আঘাতে। এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে সামান্য সময় চোখ রাখলেই দেখা যাচ্ছে, ঠিক যেমনটি হওয়া উচিত সংক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায়, তেমনটিই হচ্ছে স্বতঃস্ফুর্তভাবে।
কিন্তু সমাজ যদি সত্যি সভ্য হতো! যদি সদা সক্রিয় থাকতো মানুষের বিবেক! জাগ্রত যদি থাকতো সংবেদনশীল অনুভূতি অকৃত্রিম সারল্যে! সর্বস্তরে যদি থাকতো মনুষ্যত্বের অনুশীলন, যদি থাকতো নৈতিকতার নির্মল চর্চা, তাহলে কি ঘটতে পারা সম্ভব ছিলো সোহাগী জাহান তনুর মতো মানুষের সম্ভ্রমলুণ্ঠিত নির্মম অপমৃত্যু?
জীবদ্দশায় যে মানুষ পায় না মানুষের মতো বাঁচার মর্যাদাটুকু, মৃত্যুর পর তার প্রতি অতলান্ত সহানুভূতি, হৃদয়মন্থিত আবেগের স্ফুরণ, সহস্র স্তুতি আমাকে কেন যেন হতাশায় ক্রমনিমজ্জন থেকে উদ্ধার করে না! হয়তো আমি একজন আজন্ম নৈরাশ্যে আবরিত মানুষ! হয়তো নেতিবাচকতার বিষাদী বলয় আমাকে সবসময় ঘিরে থাকে!
ঘিরে থাকে, ঘিরে থাকে এবং ঘিরে থাকে যখন জানি, বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থায় সোহাগী জাহান তনুর ঘটনা কোন বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত নব্যসৃষ্ট ঘটনা নয়! যখন একটি সমীক্ষার ফলাফলে জানি, গত বছর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ১৩ জন খুন হয়েছেন এবং ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৬ জন (সূত্র: প্রথম আলো, ২৪ মার্চ, ২০১৬), যখন জানি, বৃহত্তর নৃগোষ্ঠীকে যদি আনা হয় এ ধরনের সমীক্ষার আওতায়, তবে খুন ধর্ষণের সংখ্যা জন্ম দিতো অভাবিত আতঙ্কের! বেদনাদায়ক উচ্চারণে ভাগ্যের কথাই বলতে হচ্ছে আবার। ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলতে হচ্ছে, সোহাগী জাহান তনুর মতো দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি বরণ করেছেন অনেকেই, তফাৎ এই শুধু ভাগ্য তাদের সুযোগ দেয়নি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসার!
সোহাগী জাহান তনু যে অকল্পনীয় অন্যায়, যে অপরিমেয় নৃশংসতা, যে অপরিসীম বর্বরতার শিকার হয়েছেন, তার শৈথিল্যহীন বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রত্যাশা করি, প্রত্যাশা করি অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তস্থাপনকারী সর্বোচ্চ শাস্তি। এবং আশা করি সেটা হবে অবশ্যই। তবে সোহাগী জাহান তনুর অপমৃত্যুর ঘটনার সন্তোষজনক পরিসমাপ্তির মাধ্যমেও সম্ভবত এ ধরনের অমানবিক, বিবেকহীন, পৈশাচিক ঘটনার যবনিকাপাত হবে না বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থায়।
মৃত্যু পরবর্তী প্রতিবাদী কার্যাবলীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অবশ্যই আছে সমাজে, তবে উত্তম হতো মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষার পরিবর্তে জীবনেই যদি শোধ করা যেতো তনুদের জীবনের ঋণ, যদি তনুরা বাঁচতো তনুময় হয়ে!!
কামনা করি, জীবন থাকতে সম্মান, সহানুভূতি, যথাযোগ্য মর্যাদা লাভ করুক সোহাগী জাহান তনুরা। বেঁচে থাকতেই তাঁরা হয়ে উঠুক আমাদের অতি আপন, ভীষণ কাছের মানুষ।
কামনা করি, লাঞ্ছনা, সম্ভ্রমহানি, অপমান, গ্লানি, অকালপ্রয়ান, অপমৃত্যু তাঁদের স্পর্শ না করুক।
চিরকাল বাঁচুক তাঁরা মানুষের মতো মাথা উঁচু করে।
ছবি: সংগৃহীত

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

