
এইটি আমাদের পাশের গ্রামের ছোট একটি মেয়ের জীবনের ছোট একটি কাহিনী। বর্ষাকালে স্কুলে ও খামারে আসতে যেতে আমাকে ওদের বাড়ীর সামনে দিয়ে আসতে যেতে হতো; মেয়েটাকে ওর ছোটকাল থেকেই দেখে আসছি, সে পরিবারের একটা ছাগল চরায়, গাভীটাকেও দেখে; আমি যখই ওকে দেখছি, প্রতিবারই গরুঘরের মাঝে, না'হয় গরুঘরের সামনে, কিংবা মাঠে ছাগল চরাচ্ছে। সে ছোটকাল থেকে নাকি কারো সাথে তেমন কথা বলে না, মাথার চুলগুলো বাঁধে না; তার আসল নাম আমি জানতাম না, সবাই পাগলী নামে ডাকে।
আসতে যেতে, আমার সামনে পড়লে, আমি হাত নেড়ে দিই, জিজ্ঞাসা করি, "কেমন আছ"; সে একটু ম্লান-হাসি হাসে সব সময়, কোনদিনও উত্তর দেয়নি। সেবার কালবৈশাখীর ঝড়বৃষ্টিতে দুই দিনের মাঝে মাঠে আধা হাঁটু পানি জমে গিয়েছিল। আমি বেলা ডুবার সামান্য আগে খামারে এসেছি; দেখি, পশ্চিম ভিটার ভেঁড়ির (এক ধরণের ডাল) জমিতে অন্যদের একটি ছাগল ভেঁড়ির লতা খাচ্ছে। পাকা ভেঁড়ির ডাল তোলা হয়ে গেছে, গাছগুলো গাভীকে ও ছাগলগুলোকে খাওয়ানো হচ্ছে। এই ছাগলটা আমার চেনা, পাগলীর ছাগল; তবে এতদুর এলো কিভাবে, মাঠে পানি! আমি একটা ছোট ঢেলা ছুঁড়ে মারলাম ছাগলটার দিকে, চলে যাক; ছাগল নড়লোও না। দেখি, আমাদের পুকুর পাড়ের কলাগাছের আড়াল থেকে পাগলী বেরিয়ে এলো, বললো,
-এই, তুমি ছাগলের দিকে ঢেলা মারছো কেন? ছাগলের গায়ে পড়বে, সে বাচ্চা দিবে দুই একদিনের মাঝে।
আমি এই প্রথম মেয়েটিকে কথা বলতে শুনলাম। সে ছাগল নিয়ে চলে যাবার কথা; কিন্তু সে গেলো না, হেঁটে আমার কাছে এসে, খামারের ছোট ঘরটা দেখায়ে আমাকে বললো,
-তুমি নাকি এখানে একা থাক?
-আমি মাঝে মাঝে থাকি!
-একা একা ভয় লাগে না? আমিও আমাদের পাকঘরে একা থাকি; আমার খুব ভয় লাগে একা একা!
-পাক ঘরে কেন, বড় ঘরে যায়গা নেই?
-না, আমার জন্য যায়গা নেই; আমাদের পেছনে ধানের জমিতে রাতে শিয়াল ডাকে; ওখানে পানি জমলে ভুতেরা বাতি জ্বালায়!
-ওগুলো ভুত নয়, পানিতে ধানের নারা (ঘাস) পঁচে গ্যাস বের হয়, উহা জ্বলে।
-হ্যেঁ, তোমাকে বলছে।
সে আমার পাশ দিয়ে হেঁটে গিয়ে, ঘরের দরজার উপরের শেকল খুলে ঘরে প্রবেশ করলো; আমি ওর পেছনে পেছনে আসলাম; এই ঘরটি খুবই মজবুত করে তৈরি করা হয়েছিলো; ছোট ২টি রুম: একটা আমার, অন্যটা বুড়ামিয়ার; এখানে অন্য কেহ ভয়ে থাকে না। আমার রুমে একটা ছোট টিনে খই ছিলো, সে এক মুঠো নিয়ে খেতে লাগলো, সে বললো,
-এই ঘরটা খুবই সুন্দর, রাতে তোমার কেমন লাগে?
-তোমার নাম কি?
-পাগলী।
-ভালো নাম আছে?
-আনু।
সে আমার দুই একটা বই উল্টায়ে দেখলো, এই রুম থেকে ঐ রুমে যাচ্ছে, উপরে নীচে দেখছে। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসছিলো, আমি বললাম,
-আনু, বেলা ডুবে গেছে, তুমি ছাগল নিয়ে বাড়ী চলে যাও।
-আমি আরেকটু থাকি?
-ঠিক আছে, থাক।
-আমি যদি রাতে এখানে তোমার পাশের কামরায় থাকতাম, আমার ভয় লাগতো না; আমি জানালা দিয়ে রাতে মাঠ দেখতাম।
ওর চোখে মুখে কেমন একটা আনন্দ! আমি বললাম,
- অন্ধকার হয়ে আসছে, তুমি বাড়ী চলে যাও।
তার মুখের আনন্দটা কোথায় যেন মিশে গেলো, সে ধীর পায়ে বেরিয়ে ছাগলটা নিয়ে চলে গেলো।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই এপ্রিল, ২০২০ সকাল ৮:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




