
ইহা আমাদের গ্রামের একজন স্বামী-সংগহীন মহিলার কষ্টকর জীবনের ছোট কাহিনী।
আমাদের গ্রামের আমিনের মা'কে আশপাশের দুই তিন গ্রামের মানুষ চিনতেন, এবং মোটামুটি সবাই হয়তো ঘৃণা করতেন, আমিনের মা সুদে টাকা ধার দিতেন। আমি স্কুলে যাওয়া শুরু করার আগের থেকেই আমিনের মাকে আমি চিনতাম, তিনি সপ্তাহে ২/১ বার আমাদের বাড়ী আসতেন, আমার মায়ের সাথে বসে পান খেয়ে কিছুক্ষণ কথা বলে চলে যেতেন; উনার স্বামী রেংগুন গিয়েছেন বহু বছর আগে, আর ফিরে আসেননি; বিয়ের ১ বছরের মাথায় উনাদের একটা ছেলে হয়েছিলো; ছেলে হওয়ার পরপরই উনার স্বামী চাকুরীর আশায় রেংগুন চলে যান; স্বামী রেংগুন যাবার বছর দু'য়েক পরে ছেলেটির মৃত্যু হয়; ছেলেটির নামানুসারে মহিলাকে মানুষজন আমিনের মা ডাকতেন।
মনে হয়, আমার জন্মের সামান্য আগে, কিংবা পরে, আমিনের বাবা রেংগুন চলে গিয়েছিলেন; প্রথম ২/৩ বছর লোক মারফত উনি স্ত্রীর জন্য সামান্য টাকা পয়সা পাঠাতেন; তারপর থেকে আর টাকা পয়সা পাঠাননি; মানুষের মুখে শোনা যেতো যে, তিনি ওখনে বিয়ে করে সংসার করছেন; কিন্তু আমিনের মা উনার পথ চেয়ে এখানে একা বাস করে চলেছেন।
আমি যখন ২য় শ্রেণীতে, গ্রামের প্রবাসী মানুষদের স্ত্রীদের পত্রলেখক হিসেবে আমার স্হান এক নম্বরে ছিলো; তখন আমাদের গ্রামের অনেকেই কলকাতায় চাকুরী করতেন, ৩/৪ জন রেংগুনে ছিলেন। একদিন স্কুল থেকে এসে ভাত খাবার সময়, মা বললেন যে, আমিনের মা আসবেন সন্ধ্যায়, আমি যেন ১টা চিঠি লিখে দেই; সন্ধ্যায় আমিনের মা আসলেন, আমি চিঠি লিখলাম; তিনি ২ আনা পয়সা দিলেন চিঠি পাঠাতে; আমি ঠিকানা চাইলাম; কিন্তু তিনি আমিনের বাবার ঠিকানা জানেন না; আমি মনে অনেক কষ্ট পেলাম। যাক, আমার মা বললেন, এটা সমস্যা নয়, যারা রেংগুনে চাকুরী করে তাদের থেকে যোগাড় করা যাবে। প্রায় বছর খানেক চেষ্টা করে, মা ৩/৪টা ঠিকানা যোগাড় করলেন, আমি সবগুলোতে পাঠালাম; কোন উত্তর নেই। এরপর ৩/৪ মাস পরপর সব ঠিকানায় চিঠি পাঠাতে লাগলাম; কোনদিন উত্তর আসেনি। আমি যখন ৪র্থ শ্রেণীতে, তখন একখানা উত্তর এলো; উত্তরের সেই চিঠিখানা আমি কত শতবার পড়েছি ১০ম শ্রেণী অবধি, সেটা এক দু:খের কাহিনী।
আমার বাবা গ্রামের বিচার ইত্যাদি করতেন; মসজিদের ইমাম ছিলেন আমাদের দুর-সম্পর্কের আত্মীয়; মনে হয়, আমি চতুর্থ শ্রেনীতে পড়ার সময়, ইমাম সাহেব আরো কয়েকজন মুসল্লীসহ বাবার কাছে নালিস করলেন, আমিনের মার সুদে টাকা দেয়া বন্ধ করার জন্য ব্যবস্হা নেয়ার দরকার; বাবা কোন ব্যবস্হা নেননি। বাবার মৃত্যুর পর, ইমাম সাহেব আবার ব্যবস্হা নেন, এবার লোকজন মহিলাকে ডেকে গ্রাম থেকে বের করে দেয়ার হুমকি দেয়; মহিলার ১টা গাভী ও ১টা ছাগল ব্যতিত আর কিছু ছিলো না।
গ্রামের মহিলারাও এই মহিলাকে কোনভাবে সাহায্য করতো না; তারা এই তথাকথিত পাপিষ্ঠার ভয়ে থাকতেন, কথা বললে গুনাহ হতে পারে; আসলে, আমাদের বাড়ী ব্যতিত উনার জন্য সব দুয়ার প্রায় বন্ধ হলো। আমার বাবার মৃত্যুর পর, প্রতি শুক্রবার মা ইমাম সাহেবকে কবর জেয়ারতের জন্য কিছু পয়সা দিতেন; মা ক্রমে সেটা বন্ধ করে আমিনের মাকে দেয়ার শুরু করলেন। যাদের স্বামীরা কলকাতায় থাকতেন, তাদের মাঝে ৩/৪ জন চুপেচুপে আমিনের মাকে সাহায্য করতে লাগলেন। আরো ২টি কৃষক পরিবার ও মহিলার ভাইদের সামান্য সাহায্য নিয়ে মহিলা কোনভাবে টিকেছিলেন। আমাদের বাড়ীতে আসার সময় স্বামীর দেয়া চিঠিটা নিয়ে আসতেন; এক সময় লেখাগুলো অনেকটা লেপটে গিয়েছিলো; কিন্তু বাক্যগুলো আমার মনে থাকায়, আমি ঠিক মতোই পড়ে দিতাম।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জানুয়ারি, ২০২১ রাত ১১:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



