somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমিনের বাবার চিঠিটা

২৭ শে জানুয়ারি, ২০২১ রাত ৯:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ইহা আমাদের গ্রামের একজন স্বামী-সংগহীন মহিলার কষ্টকর জীবনের ছোট কাহিনী।

আমাদের গ্রামের আমিনের মা'কে আশপাশের দুই তিন গ্রামের মানুষ চিনতেন, এবং মোটামুটি সবাই হয়তো ঘৃণা করতেন, আমিনের মা সুদে টাকা ধার দিতেন। আমি স্কুলে যাওয়া শুরু করার আগের থেকেই আমিনের মাকে আমি চিনতাম, তিনি সপ্তাহে ২/১ বার আমাদের বাড়ী আসতেন, আমার মায়ের সাথে বসে পান খেয়ে কিছুক্ষণ কথা বলে চলে যেতেন; উনার স্বামী রেংগুন গিয়েছেন বহু বছর আগে, আর ফিরে আসেননি; বিয়ের ১ বছরের মাথায় উনাদের একটা ছেলে হয়েছিলো; ছেলে হওয়ার পরপরই উনার স্বামী চাকুরীর আশায় রেংগুন চলে যান; স্বামী রেংগুন যাবার বছর দু'য়েক পরে ছেলেটির মৃত্যু হয়; ছেলেটির নামানুসারে মহিলাকে মানুষজন আমিনের মা ডাকতেন।

মনে হয়, আমার জন্মের সামান্য আগে, কিংবা পরে, আমিনের বাবা রেংগুন চলে গিয়েছিলেন; প্রথম ২/৩ বছর লোক মারফত উনি স্ত্রীর জন্য সামান্য টাকা পয়সা পাঠাতেন; তারপর থেকে আর টাকা পয়সা পাঠাননি; মানুষের মুখে শোনা যেতো যে, তিনি ওখনে বিয়ে করে সংসার করছেন; কিন্তু আমিনের মা উনার পথ চেয়ে এখানে একা বাস করে চলেছেন।

আমি যখন ২য় শ্রেণীতে, গ্রামের প্রবাসী মানুষদের স্ত্রীদের পত্রলেখক হিসেবে আমার স্হান এক নম্বরে ছিলো; তখন আমাদের গ্রামের অনেকেই কলকাতায় চাকুরী করতেন, ৩/৪ জন রেংগুনে ছিলেন। একদিন স্কুল থেকে এসে ভাত খাবার সময়, মা বললেন যে, আমিনের মা আসবেন সন্ধ্যায়, আমি যেন ১টা চিঠি লিখে দেই; সন্ধ্যায় আমিনের মা আসলেন, আমি চিঠি লিখলাম; তিনি ২ আনা পয়সা দিলেন চিঠি পাঠাতে; আমি ঠিকানা চাইলাম; কিন্তু তিনি আমিনের বাবার ঠিকানা জানেন না; আমি মনে অনেক কষ্ট পেলাম। যাক, আমার মা বললেন, এটা সমস্যা নয়, যারা রেংগুনে চাকুরী করে তাদের থেকে যোগাড় করা যাবে। প্রায় বছর খানেক চেষ্টা করে, মা ৩/৪টা ঠিকানা যোগাড় করলেন, আমি সবগুলোতে পাঠালাম; কোন উত্তর নেই। এরপর ৩/৪ মাস পরপর সব ঠিকানায় চিঠি পাঠাতে লাগলাম; কোনদিন উত্তর আসেনি। আমি যখন ৪র্থ শ্রেণীতে, তখন একখানা উত্তর এলো; উত্তরের সেই চিঠিখানা আমি কত শতবার পড়েছি ১০ম শ্রেণী অবধি, সেটা এক দু:খের কাহিনী।

আমার বাবা গ্রামের বিচার ইত্যাদি করতেন; মসজিদের ইমাম ছিলেন আমাদের দুর-সম্পর্কের আত্মীয়; মনে হয়, আমি চতুর্থ শ্রেনীতে পড়ার সময়, ইমাম সাহেব আরো কয়েকজন মুসল্লীসহ বাবার কাছে নালিস করলেন, আমিনের মার সুদে টাকা দেয়া বন্ধ করার জন্য ব্যবস্হা নেয়ার দরকার; বাবা কোন ব্যবস্হা নেননি। বাবার মৃত্যুর পর, ইমাম সাহেব আবার ব্যবস্হা নেন, এবার লোকজন মহিলাকে ডেকে গ্রাম থেকে বের করে দেয়ার হুমকি দেয়; মহিলার ১টা গাভী ও ১টা ছাগল ব্যতিত আর কিছু ছিলো না।

গ্রামের মহিলারাও এই মহিলাকে কোনভাবে সাহায্য করতো না; তারা এই তথাকথিত পাপিষ্ঠার ভয়ে থাকতেন, কথা বললে গুনাহ হতে পারে; আসলে, আমাদের বাড়ী ব্যতিত উনার জন্য সব দুয়ার প্রায় বন্ধ হলো। আমার বাবার মৃত্যুর পর, প্রতি শুক্রবার মা ইমাম সাহেবকে কবর জেয়ারতের জন্য কিছু পয়সা দিতেন; মা ক্রমে সেটা বন্ধ করে আমিনের মাকে দেয়ার শুরু করলেন। যাদের স্বামীরা কলকাতায় থাকতেন, তাদের মাঝে ৩/৪ জন চুপেচুপে আমিনের মাকে সাহায্য করতে লাগলেন। আরো ২টি কৃষক পরিবার ও মহিলার ভাইদের সামান্য সাহায্য নিয়ে মহিলা কোনভাবে টিকেছিলেন। আমাদের বাড়ীতে আসার সময় স্বামীর দেয়া চিঠিটা নিয়ে আসতেন; এক সময় লেখাগুলো অনেকটা লেপটে গিয়েছিলো; কিন্তু বাক্যগুলো আমার মনে থাকায়, আমি ঠিক মতোই পড়ে দিতাম।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জানুয়ারি, ২০২১ রাত ১১:৩৯
২৯টি মন্তব্য ২৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×