somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রাজাকারের বিয়ে

১৮ ই মে, ২০২১ বিকাল ৫:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




মুক্তিযু্দ্ধের সময়ের ঘটনা, আমাদের পাশের গ্রামের কলেজের এক ছাত্র, রাজাকার কমান্ডার হয়েছিলো, সে আমাদের গ্রামের এক গরীব কৃষক পরিবারের সুন্দরী মেয়েকে জোর করে বিয়ে করতে চেয়েছিলো; বিয়ের আগের রাতে মেয়ের পরিবার পালিয়ে যায়; এটি সেই ঘটনা।

মে'মাসের(১৯৭১ সাল) শেষদিকে থানা হেডকোয়ার্টারের স্কুলটাকে রাজাকারের ঘাঁটিতে পরিণত করেছে পাকিস্তানী সৈন্যরা; এলাকার জন্য ভীতিকর খবর, রাতে নাকি এরা সীতাকুন্ড একালার মেয়েদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে, এদেরকে নাকি পাকিস্তানী সৈন্যদের হাতে তুলে দিতেছে; পুরো গ্রাম অস্হির। আমাদের গ্রামটা ঢাকা-চিটাগং হাইওয়ের ১'মাইলের মঝে, গ্রামের উভয় পাশ দিয়ে ২টি বড় রাস্তা চলে গেছে, উভয় রাস্তা দিয়ে সেনাবাহিনীর গাড়ী আসতে যেতে পারে।

জুন মাসের শুরুতে এক শুক্রবার জুমার নামাজের সময় ৩ জন পাকিস্তানী সৈন্য, ১০ জন রাজাকার ও শান্তি বাহিনীর কয়েকজন লোক আমাদের গ্রামের মসজিদে এসে হাজির; গ্রাম থেকে ৮ জন মুক্তিবাহিনীতে গেছে, তাদের পরিবারের লোকদের আলাদা করে দাঁড়া করালো, ৭ দিন সময় দেয়া হলো: ৭ দিনের ভেতর মুক্তিযোদ্ধাদের থানায় এনে আত্মসমর্পণ করাতে হবে; না'হয় কারো ঘরবাড়ী কিছুই থাকবে না। ১০ জন রাজাকারের মাঝে আমাদের গ্রামের ৩ ছেলে, আর পাশের গ্রামের ১ ছেলে; পাশের গ্রামের ছেলেটি স্হানীয় কলেজের ছাত্র, সে নাকি কমান্ডার।

সন্ধ্যার আগে গ্রামের লোকজন চা দোকানে একত্রিত হয়েছে, সবাই আসন্ন বিপদ নিয়ে উৎকন্ঠিত; এমন সময় আনুমিয়ার ছেলে দৌঁড়ায়ে এসে খবর দিলো, তাদের বাড়ীতে রাজাকার এসেছে, আনুমিয়াকে ডাকতে পাঠায়েছে। অনেকই আনুমিয়ার সাথে যেতে চাইলো, আনুমিয়া না করে দিলো, ছেলেকে নিয়ে বাড়ীর দিকে রওয়ানা হলো; ঘরে তার মেয়ে ফাতেমা একা। বাড়ীর সামনে এসে দেখে ৪ জন রাজাকার দাঁড়িয়ে আছে।

গ্রামের ছেলে ভোলামিয়া আগে বেবী ট্যাক্সী চালাতো, এখন রাজাকার হয়েছে; সে আনুমিয়াকে সালম দিয়ে বললো,
-কাকা, একটু দরকারী কথা আছে, আপনার ঘরে চলেন।
-এখানে বলা যায় না? আনুমিয়া বললো।
-কাকা, ভয়ের কিছু নাই; আমরা দেশের মিলিটারীতে ভালো চাকুরী পেয়েছি; আমরা আপনাদের কোন ক্ষতি করবো না।

আনুমিয়া এদেরকে বারান্দায় বসতে দিয়ে বললেন,
-কি কথা বলেন!
ভোলামিয়া তাদের কামন্ডারকে দেখায়ে বললো,
-কাকা, ভালো প্রস্তাব আছে, আমাদের কমান্ডার, আলমগীর ভুঁইয়া সাহেব মিলিটারীতে অনেক বড় চাকুরী পেয়েছেন; তিনি আপনার মেয়ে ফাতেমাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিতেছেন।
-আমার স্ত্রী জীবিত নেই; মেয়েকে বড় করেছে মেয়ের নানী; আমাকে উনার সাথে কথা বলতে হবে; আমি জানাবো।
-আজকে আপনি কথা বলতে পারবেন, আমরা আপনার সাথে যাবো।
-না, বিয়ে শাদী এভাবে হয় না, সময় লাগবে।
-কালকের ভেতর জানাবেন, এটা ভালো সুযোগ।

রাজাকারেরা চলে যাবার পর, আনুমিয়া দেখে ফাতেমা ঘরে নেই; আনুমিয়া জানে, মেয়ে পালিয়ে গেছে; বেশ রাতে ফাতেমা ঘরে ঢুকলো; সে বাবাকে বললো,
-আমরা কোথায় পালাবো, বাবা?
-চরে, আমার মামার বাড়ীতে চলে যাবো; সময় লাগবে, আমাদের ধানচাল, গরু-ছাগলগুলো রাতের বেলা সরায়ে ফেলতে হবে; কাউকে জানতে দেয়া যাবে না; কে কোন পক্ষের লোক বুঝা মুশকিল।

পরদিন রাজাকার বর ও ভোলামিয়া রাইফেল কাঁধে এসে উপস্হিত; আনুমিয়া চা-পানির ব্যবস্হা করলো; আনুমিয়া বললো,
-আমি তো এত তাড়াতাড়ি মেয়ে বিয়ে দেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না; আমাদর হাতে টাকা পয়সা নেই; বিয়েতে সমাজের লোকদের খাওয়াতে হবে; আমার সময়ের দরকার, গরু ২টি আগামী বাজারে তুলবো।
-বাবা, আপনার গরু বিক্রয়ের দরকার নেই এখন; আমি আপনাকে মেজবানের ও মেয়ে সাজানোর জন্য টাকা এখন দেবো; আপনি সময় মতো আমাকে ফেরত দিলে হবে।

বিয়ের দিন ধায্য হলো, ১ সপ্তাহের মাঝেই বিয়ে; কিন্তু দিনের বেলা বিয়ে। গ্রামের সবাই রাগান্বিত, রাজাকারের হাতে নিজের এই সুন্দরী মেয়ে তুলে দিচ্ছে আনু? রাজাকার বর টাকা দিয়ে গেছে, আনুমিয়া পরেরদিন গরু কিনে নিয়ে এসেছে মেজবানের জন্য; মেয়ের জন্য বিয়ের কাপড় চোপড়ও এনেছে। সে নিজে গিয়ে সব বাড়ীতে দাওয়াত দিলো; গ্রামবাসী রাগান্বিত, কিন্তু ভয়ে কেহ কিছু বলছে না, কেহ আসছে না। আনুমিয়া গ্রামের চা দোকানে চা খেতে গেলো, তার টেবিলে কেহ বসলোনা। পরের ২/৩ রাতের ভেতর মেয়ে ও বাবা মিলে এক গরু-গাড়ীওয়ালার সাহায্য নিয়ে নিজেদের ধান-চাল, গরু ছাগল সব ৬ মাইল পশ্চিমে আনুমিয়ার মামার বাড়ী নিয়ে গেলো চুপিসারে।

বিয়ের আগেরদিন আনুমিয়ার মামা, মামাতো ভাইয়েরা ও আরো কিছু আত্মীয়-স্বজন এলো; রাজাকার বর, তার মামা, তাদের গ্রামের ৩/৪ জন গণ্যমান্য লোকজন, ৭/৮ জন রাজাকার ও বরের চাচা এলো; বরের বাবা নেই। গ্রামের লোকজন না থাকাতে বরের চাচা একটু বিব্রাত হলো; আনুমিয়া বুঝায়ে বললেন, সময় ভালো না, মানুষ বিয়ের দিন আসবে।

বিয়ের দিন খুব ভোরে আনুমিয়া ও তার মামাতো ভাইয়েরা গরু জবেহ করে রান্নার ব্যবস্হা করলো; এই গ্রামের কেহ আসেনি; কিছু ছেলেপেলে এসে তামাসা দেখছে। আনুমিয়া দুর গ্রাম থেকে বেতন দিয়ে ২০/২৫ জন লোক নিয়ে এসেছে রান্মাবান্না করতে। সকালের দিকে ৬/৭ জন রাজাকর এসে সবকিছু দেখে গেছে, সবকিছু ভালো। আসলে, ভোরের আগে ফাতেমাকে নিয়ে আনুমিয়ার মামা ও আনুমিয়ার ছেলে পালিয়ে গেছে। দিনের ১১টার দিকে রান্না হয়ে গেছে। আনুমিয়া সবাইকে নিয়ে খেলো। তারপর, তার আত্মীয়দের নিয়ে বাড়ীর পেছন দিয়ে বের হয়ে গেলো।

দুপুরের পরপরই বর আসার কথা; তার কিছুক্ষণ আগেই কাজের লোকেরা আস্তাআস্তে চলে গেলেো; গ্রামের লোকেরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে কি হয় দেখার জন্য; অনেকে ভয়ে গ্রাম থেকে পালিয়ে গেছে। আশপাশের লোকেরা বাড়ী সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, ভেতরে যাচ্ছে না। দুপুরের একটু পরে, প্রায় ৩০/৩৫ জন রাজাকার নিয়ে বর এসে উপস্হিত; উঠানে চুলার উপর পাতিলে কিছু খাবার আছে, সামিয়ানা টাংগানো আছে, গ্রামের কয়েকটা বাচ্ছা ভয়ে ভয়ে ঘরের পেচনে পালিয়ে বর দেখছে। ১০/১৫ মিনিট পরে আনুমিয়ার ঘর, পাকঘর ও গরুঘরে আগুন দিয়ে রাজাকারেরা চলে গেলো।





সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই মে, ২০২১ রাত ১০:২১
১৬টি মন্তব্য ১৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মিলাদুন্নবী: ভালোবাসার নবী, মানবতার শ্রেষ্ঠ আদর্শ

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৮


মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মদিন বা মিলাদুন্নবী শুধু একটি ঐতিহাসিক স্মরণদিন নয়; এটি মানবতার জন্য এক মহান আদর্শের কথা স্মরণ করার উপলক্ষ। তাঁর আগমন ছিল এমন এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ একটি পরিচ্ছন্ন শৌচাগার

লিখেছেন রাজসোহান, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৮



বাড়িটা দেখতে বাড়ির মতো না, যেনো একটা ঘোষণা। দ্যাখো, আমি কে।

গেটে দুইটা সিংহ, পাথরের, মুখ হাঁ করা; সিংহ দুইটা কী পাহারা দিচ্ছে তারা নিজেরাও জানে না। ভিতরে উঠান... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মক্তব চালু করলে শিশুরা ফিরে আসবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৪২


ববি হাজ্জাজ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। মুসা বিন শমসেরের ছেলে। মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে পুরো দেশ চষে বেড়াচ্ছেন। নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন, নতুন নতুন আইডিয়া দিচ্ছেন। মনে হয়,... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঁধনের কেন ফেমিকন লাগে !!!

লিখেছেন অপলক , ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৩৪



বাঁধন এখন বন্ধন মুক্ত। মিডিয়া পাড়ায় সরব উপস্থিতি। উপর মহলের ডাকে সারা দিতে হয়। কাজেই ফেমিকন লাগতেই পারে। মানে ফেমিকনের এ্যাড করা লাগতেই পারে। মিডিয়া আইকন হিসেবে জনসচেতনাতা বাড়াতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“উন্নয়নের দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশ”

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৮



বাং/লাদেশের মূর্খ জনগণ উন্নয়নের চেয়ে কথিত ফ্যাসিবাদকে বড় করে দেখেছে কিন্তু “উন্নয়নের দুর্ভিক্ষ” কি জিনিস তা দেখেনি।

দেখতে থাকুক….। আর ভাতের দুর্ভিক্ষ শুরু হলে বলে…..।

ফ্যাসিবাদ দূর করতে গিয়ে উন্নয়নই "নাই"... ...বাকিটুকু পড়ুন

×