
মুক্তিযু্দ্ধের সময়ের ঘটনা, আমাদের পাশের গ্রামের কলেজের এক ছাত্র, রাজাকার কমান্ডার হয়েছিলো, সে আমাদের গ্রামের এক গরীব কৃষক পরিবারের সুন্দরী মেয়েকে জোর করে বিয়ে করতে চেয়েছিলো; বিয়ের আগের রাতে মেয়ের পরিবার পালিয়ে যায়; এটি সেই ঘটনা।
মে'মাসের(১৯৭১ সাল) শেষদিকে থানা হেডকোয়ার্টারের স্কুলটাকে রাজাকারের ঘাঁটিতে পরিণত করেছে পাকিস্তানী সৈন্যরা; এলাকার জন্য ভীতিকর খবর, রাতে নাকি এরা সীতাকুন্ড একালার মেয়েদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে, এদেরকে নাকি পাকিস্তানী সৈন্যদের হাতে তুলে দিতেছে; পুরো গ্রাম অস্হির। আমাদের গ্রামটা ঢাকা-চিটাগং হাইওয়ের ১'মাইলের মঝে, গ্রামের উভয় পাশ দিয়ে ২টি বড় রাস্তা চলে গেছে, উভয় রাস্তা দিয়ে সেনাবাহিনীর গাড়ী আসতে যেতে পারে।
জুন মাসের শুরুতে এক শুক্রবার জুমার নামাজের সময় ৩ জন পাকিস্তানী সৈন্য, ১০ জন রাজাকার ও শান্তি বাহিনীর কয়েকজন লোক আমাদের গ্রামের মসজিদে এসে হাজির; গ্রাম থেকে ৮ জন মুক্তিবাহিনীতে গেছে, তাদের পরিবারের লোকদের আলাদা করে দাঁড়া করালো, ৭ দিন সময় দেয়া হলো: ৭ দিনের ভেতর মুক্তিযোদ্ধাদের থানায় এনে আত্মসমর্পণ করাতে হবে; না'হয় কারো ঘরবাড়ী কিছুই থাকবে না। ১০ জন রাজাকারের মাঝে আমাদের গ্রামের ৩ ছেলে, আর পাশের গ্রামের ১ ছেলে; পাশের গ্রামের ছেলেটি স্হানীয় কলেজের ছাত্র, সে নাকি কমান্ডার।
সন্ধ্যার আগে গ্রামের লোকজন চা দোকানে একত্রিত হয়েছে, সবাই আসন্ন বিপদ নিয়ে উৎকন্ঠিত; এমন সময় আনুমিয়ার ছেলে দৌঁড়ায়ে এসে খবর দিলো, তাদের বাড়ীতে রাজাকার এসেছে, আনুমিয়াকে ডাকতে পাঠায়েছে। অনেকই আনুমিয়ার সাথে যেতে চাইলো, আনুমিয়া না করে দিলো, ছেলেকে নিয়ে বাড়ীর দিকে রওয়ানা হলো; ঘরে তার মেয়ে ফাতেমা একা। বাড়ীর সামনে এসে দেখে ৪ জন রাজাকার দাঁড়িয়ে আছে।
গ্রামের ছেলে ভোলামিয়া আগে বেবী ট্যাক্সী চালাতো, এখন রাজাকার হয়েছে; সে আনুমিয়াকে সালম দিয়ে বললো,
-কাকা, একটু দরকারী কথা আছে, আপনার ঘরে চলেন।
-এখানে বলা যায় না? আনুমিয়া বললো।
-কাকা, ভয়ের কিছু নাই; আমরা দেশের মিলিটারীতে ভালো চাকুরী পেয়েছি; আমরা আপনাদের কোন ক্ষতি করবো না।
আনুমিয়া এদেরকে বারান্দায় বসতে দিয়ে বললেন,
-কি কথা বলেন!
ভোলামিয়া তাদের কামন্ডারকে দেখায়ে বললো,
-কাকা, ভালো প্রস্তাব আছে, আমাদের কমান্ডার, আলমগীর ভুঁইয়া সাহেব মিলিটারীতে অনেক বড় চাকুরী পেয়েছেন; তিনি আপনার মেয়ে ফাতেমাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিতেছেন।
-আমার স্ত্রী জীবিত নেই; মেয়েকে বড় করেছে মেয়ের নানী; আমাকে উনার সাথে কথা বলতে হবে; আমি জানাবো।
-আজকে আপনি কথা বলতে পারবেন, আমরা আপনার সাথে যাবো।
-না, বিয়ে শাদী এভাবে হয় না, সময় লাগবে।
-কালকের ভেতর জানাবেন, এটা ভালো সুযোগ।
রাজাকারেরা চলে যাবার পর, আনুমিয়া দেখে ফাতেমা ঘরে নেই; আনুমিয়া জানে, মেয়ে পালিয়ে গেছে; বেশ রাতে ফাতেমা ঘরে ঢুকলো; সে বাবাকে বললো,
-আমরা কোথায় পালাবো, বাবা?
-চরে, আমার মামার বাড়ীতে চলে যাবো; সময় লাগবে, আমাদের ধানচাল, গরু-ছাগলগুলো রাতের বেলা সরায়ে ফেলতে হবে; কাউকে জানতে দেয়া যাবে না; কে কোন পক্ষের লোক বুঝা মুশকিল।
পরদিন রাজাকার বর ও ভোলামিয়া রাইফেল কাঁধে এসে উপস্হিত; আনুমিয়া চা-পানির ব্যবস্হা করলো; আনুমিয়া বললো,
-আমি তো এত তাড়াতাড়ি মেয়ে বিয়ে দেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না; আমাদর হাতে টাকা পয়সা নেই; বিয়েতে সমাজের লোকদের খাওয়াতে হবে; আমার সময়ের দরকার, গরু ২টি আগামী বাজারে তুলবো।
-বাবা, আপনার গরু বিক্রয়ের দরকার নেই এখন; আমি আপনাকে মেজবানের ও মেয়ে সাজানোর জন্য টাকা এখন দেবো; আপনি সময় মতো আমাকে ফেরত দিলে হবে।
বিয়ের দিন ধায্য হলো, ১ সপ্তাহের মাঝেই বিয়ে; কিন্তু দিনের বেলা বিয়ে। গ্রামের সবাই রাগান্বিত, রাজাকারের হাতে নিজের এই সুন্দরী মেয়ে তুলে দিচ্ছে আনু? রাজাকার বর টাকা দিয়ে গেছে, আনুমিয়া পরেরদিন গরু কিনে নিয়ে এসেছে মেজবানের জন্য; মেয়ের জন্য বিয়ের কাপড় চোপড়ও এনেছে। সে নিজে গিয়ে সব বাড়ীতে দাওয়াত দিলো; গ্রামবাসী রাগান্বিত, কিন্তু ভয়ে কেহ কিছু বলছে না, কেহ আসছে না। আনুমিয়া গ্রামের চা দোকানে চা খেতে গেলো, তার টেবিলে কেহ বসলোনা। পরের ২/৩ রাতের ভেতর মেয়ে ও বাবা মিলে এক গরু-গাড়ীওয়ালার সাহায্য নিয়ে নিজেদের ধান-চাল, গরু ছাগল সব ৬ মাইল পশ্চিমে আনুমিয়ার মামার বাড়ী নিয়ে গেলো চুপিসারে।
বিয়ের আগেরদিন আনুমিয়ার মামা, মামাতো ভাইয়েরা ও আরো কিছু আত্মীয়-স্বজন এলো; রাজাকার বর, তার মামা, তাদের গ্রামের ৩/৪ জন গণ্যমান্য লোকজন, ৭/৮ জন রাজাকার ও বরের চাচা এলো; বরের বাবা নেই। গ্রামের লোকজন না থাকাতে বরের চাচা একটু বিব্রাত হলো; আনুমিয়া বুঝায়ে বললেন, সময় ভালো না, মানুষ বিয়ের দিন আসবে।
বিয়ের দিন খুব ভোরে আনুমিয়া ও তার মামাতো ভাইয়েরা গরু জবেহ করে রান্নার ব্যবস্হা করলো; এই গ্রামের কেহ আসেনি; কিছু ছেলেপেলে এসে তামাসা দেখছে। আনুমিয়া দুর গ্রাম থেকে বেতন দিয়ে ২০/২৫ জন লোক নিয়ে এসেছে রান্মাবান্না করতে। সকালের দিকে ৬/৭ জন রাজাকর এসে সবকিছু দেখে গেছে, সবকিছু ভালো। আসলে, ভোরের আগে ফাতেমাকে নিয়ে আনুমিয়ার মামা ও আনুমিয়ার ছেলে পালিয়ে গেছে। দিনের ১১টার দিকে রান্না হয়ে গেছে। আনুমিয়া সবাইকে নিয়ে খেলো। তারপর, তার আত্মীয়দের নিয়ে বাড়ীর পেছন দিয়ে বের হয়ে গেলো।
দুপুরের পরপরই বর আসার কথা; তার কিছুক্ষণ আগেই কাজের লোকেরা আস্তাআস্তে চলে গেলেো; গ্রামের লোকেরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে কি হয় দেখার জন্য; অনেকে ভয়ে গ্রাম থেকে পালিয়ে গেছে। আশপাশের লোকেরা বাড়ী সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, ভেতরে যাচ্ছে না। দুপুরের একটু পরে, প্রায় ৩০/৩৫ জন রাজাকার নিয়ে বর এসে উপস্হিত; উঠানে চুলার উপর পাতিলে কিছু খাবার আছে, সামিয়ানা টাংগানো আছে, গ্রামের কয়েকটা বাচ্ছা ভয়ে ভয়ে ঘরের পেচনে পালিয়ে বর দেখছে। ১০/১৫ মিনিট পরে আনুমিয়ার ঘর, পাকঘর ও গরুঘরে আগুন দিয়ে রাজাকারেরা চলে গেলো।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই মে, ২০২১ রাত ১০:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



