somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

সত্যপথিক শাইয়্যান
অন্যদের সেভাবেই দেখি, নিজেকে যেভাবে দেখতে চাই। যারা জীবনকে উপভোগ করতে চান, আমি তাঁদের একজন। সহজ-সরল চিন্তা-ভাবনা করার চেষ্টা করি। আর, খুব ভালো আইডিয়া দিতে পারি।

পি ভি নরসিমা রাও - ভারতের অর্থনৈতিক সংস্কারের জনক

০৯ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



পি ভি নরসিমা রাও ১৯৯১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তৎকালীন ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় যে ঐতিহাসিক সংস্কারনীতি গ্রহণ করেন, তা "এলপিজি সংস্কার" (LPG Reforms - Liberalisation, Privatisation, Globalisation) বা অর্থনৈতিক উদারীকরণ নামে পরিচিত। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং-কে সাথে নিয়ে নেওয়া তাঁর এই যুগান্তকারী পদক্ষেপগুলো ভারতকে একটি নিয়ন্ত্রিত ও বন্ধ অর্থনীতি থেকে মুক্ত-বাজারের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে রূপান্তর করে। ১৯৯১ সালের এই অর্থনৈতিক উদারীকরণের পটভূমি, মূল স্তম্ভ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবগুলো যা আজও অনেক দেশের জন্যে উদাহরণ:

১৯৯১ সালের সংকটের পটভূমি

স্বাধীনতার পর থেকে ভারত সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি অনুসরণ করতো, যা "লাইসেন্স রাজ" নামে পরিচিত ছিল। ১৯৯১ সালের জুনে ভারত এক চরম দেউলিয়াত্বের মুখে পড়ে:

বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকট: ভারতের রাজকোষে মাত্র তিন সপ্তাহের আমদানি করার মতো বৈদেশিক মুদ্রা (Foreign Exchange Reserves) অবশিষ্ট ছিল।

সোনার বন্ধক: খেলাপি বা দেউলিয়া রাষ্ট্র হওয়া এড়াতে ভারতকে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (IMF) শর্ত মেনে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের কাছে প্রায় ৬৭ টন সোনা বন্ধক রেখে ঋণ নিতে হয়েছিল। এই চরম সংকটময় মুহূর্তে নরসিমা রাও সরকার দেশের অর্থনীতিকে আমূল বদলে ফেলার সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়।

উদারীকরণের মূল তিনটি স্তম্ভ - LPG Framework

১৯৯১ সালের ২৪ জুলাই ভারতের নতুন শিল্পনীতি ও ঐতিহাসিক বাজেট পেশের মাধ্যমে অর্থনীতিকে তিনটি মূল দর্শনে সাজানো হয়:

ক. উদারীকরণ (Liberalisation): লাইসেন্স রাজের অবসান
নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ: পূর্বে যেকোনো নতুন ব্যবসা বা কারখানা খুলতে সরকারের কাছ থেকে কয়েক বছর ধরে লাইসেন্স নেওয়ার কঠোর নিয়ম ছিল। নরসিমা রাও প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন মাত্র ১৮টি খাত বাদে বাকি সব খাতের জন্য লাইসেন্স রাজ সম্পূর্ণ বাতিল করেন।
ব্যবসা সহজীকরণ: একচেটিয়া ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ আইন (MRTP Act) শিথিল করা হয়, যার ফলে দেশীয় উদ্যোক্তারা স্বাধীনভাবে নিজেদের ব্যবসার সম্প্রসারণের সুযোগ পান।

খ. বেসরকারীকরণ (Privatisation): বেসরকারি খাতের উন্মোচন
রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ব্যবস্থার অবসান: টেলিকম, বিদ্যুৎ, বিমান পরিবহন এবং ব্যাংকিংয়ের মতো বড় বড় খাতগুলো - যা আগে কেবল সরকারি মালিকানাধীন ছিল—তা বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
বিলগ্নিকরণ (Disinvestment): লোকসানে থাকা অদক্ষ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার বেসরকারি খাতে বিক্রি করে রাষ্ট্রীয় অপচয় কমানো হয়।

গ. বিশ্বায়ন (Globalisation): বৈশ্বিক বাজারের সাথে একীভূতকরণ
ট্যারিফ বা আমদানি শুল্ক হ্রাস: বৈশ্বিক বাণিজ্যের দরজা খুলতে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর থাকা চড়া কাস্টমস ডিউটি ও শুল্ক ধাপে ধাপে কমানো হয়।
এফডিআই (FDI) উন্মোচন: প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা ৪০% থেকে বাড়িয়ে ৫১% (পরবর্তীতে অনেক খাতে ১০০%) করা হয়, যার ফলে বৈশ্বিক বহুজাতিক কোম্পানিগুলো ভারতে সরাসরি মূলধন ও আধুনিক প্রযুক্তি আনার সুযোগ পায়।
মুদ্রার আংশিক রূপান্তরযোগ্যতা: ভারতীয় রুপিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সুবিধার্থে আংশিক রূপান্তরযোগ্য করা হয় এবং রুপির মান অবমূল্যায়ন করে রপ্তানিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করা হয়।

দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তর ও প্রবৃদ্ধি
নরসিমা রাওয়ের এই "নিঃশব্দ বিপ্লব"-এর ফলেই ভারত আজকের ট্রিলিয়ন ডলারের আধুনিক অর্থনীতিতে পৌঁছাতে পেরেছে:

+------------------------------------+---------------------------------+------------------------------+

| সূচক | ১৯৯১ (শুরুতে) | বর্তমান যুগ |
+------------------------------------+---------------------+------------------------------------------+

| বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ | ~$১.২ বিলিয়ন | ~$৬০০+ বিলিয়ন |
| গড় বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি | ~১.১% - ৩% | ~৬.৫% - ৮% |
| আইটি ও সেবা খাতের অবদান | নামমাত্র | জিডিপির ৫০% এর বেশি |
| দারিদ্র্য সূচক (Poverty Rate) | ~৪৫% | ~১১% এর নিচে |
+------------------------------------+---------------------+-------------------------------------------+

সংস্কারের সুদূরপ্রসারী সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব

টেলিকম ও আইটি বিপ্লব: বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের ফলে ভারতে ইনফোসিস, টিসিএস-এর মতো বিশ্বমানের আইটি জায়ান্ট এবং জিও, এয়ারটেলের মতো সস্তা টেলিকম সেবা গড়ে ওঠে, যা আজ ভারতকে বিশ্বের ডিজিটাল আউটসোর্সিংয়ের রাজধানীতে পরিণত করেছে।

পুঁজিবাজারের আধুনিকায়ন: ১৯৯২ সালে সেবি (SEBI Act 1992) আইন পাসের মাধ্যমে শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আইনি ক্ষমতা দেওয়া হয়, যা বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের (FPI) আস্থা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উত্থান: নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ফলে ভারতে একটি বিশাল ও উচ্চ ক্রয়ক্ষমতাসম্পন্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্ম হয়, যা বিশ্বের বৃহত্তম কনজিউমার মার্কেটের একটি।

তৎকালীন সময়ে ভারতের এই বাজারমুখী সংস্কারকে চরম বামপন্থী ও বিরোধী দলগুলো 'দেশ বিক্রির চক্রান্ত' বলে সমালোচনা করলেও, পি ভি নরসিমা রাও তাঁর অসাধারণ রাজনৈতিক দূরদর্শিতার মাধ্যমে এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করেন। এই কারণেই ২০২৪ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা "ভারতরত্ন"-এ ভূষিত করে এবং তাঁকে "ভারতের অর্থনৈতিক সংস্কারের জনক" হিসেবে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৪৮
৩টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জুলাই বিপ্লব নাকি জুলাই CDI?

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০৮ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১:২৯



আমি মনে করি জুলাই বিপ্লবের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ সাধারণ জনগণ। যাদের মধ্যে দেশপ্রেম, মায়-মমতা আছে, যারা অন্যায়-অবিচার দেখলে প্রতিবাদ করেন, তারাই এই আন্দোলনের মূল শক্তি... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুসলমানের সন্তানের নাম জিকো কীভাবে হতে পারে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১:৫৫


ছোটো মামার মুখে একটা নাম প্রায়ই শুনতাম, জিকো। তখন বুঝতাম না এটা কে, শুধু জানতাম এই মানুষটা নাকি ফুটবল মাঠে জাদু দেখাতেন। পরে জেনেছি তার আসল নাম আর্থার... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাতৃভূমিকে ছোট করে প্রতিবেশী দেশকে মহান দেখানোর উদ্দেশ্য কি?

লিখেছেন ভুয়া মফিজ, ০৮ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:২১



বহুদিন ব্লগে ঘোরাঘুরি করা হয় না। গত সপ্তাহে কি মনে হলো, ভাবলাম একটু ঘোরাঘুরি করি। তো ঘুরতে ঘুরতে কিছু পোষ্ট পড়লাম; কিছু মন্তব্যও নজরে আসলো, বিশেষভাবে দুইটা মন্তব্য।... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ নিত্য তোমার অন্বেষণে

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ০৮ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:২২

জানি,
তুমি ছড়িয়ে আছো চতুর্দিকেই,
তবুও,
মন খারাপে তাকাই আমি আকাশপানেই
দিনে তাকাই, রাতেও তাকাই,
আলোয় তাকাই , কালোয় তাকাই,
তাকাই মানে তোমায় খুঁজি,
খুঁজতে খুঁজতে চোখ বুঁজি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

এদেরকে না রুখলে চড়া মূল্য দিতে হবে

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৮ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৬



মাহবুব আজিজ, আনিস আলমগীর, সোমা ইসলাম, শাওন, মঞ্জুরুল পান্না, শম্পা রেজা, কালচারাল ফ্যাসিস্ট ফরিদুর রেজা শাইখ সিরাজ এদেরকে এখনই বন্ধ করতে হবে না হলে বাংলাদেশকে চড়া মূল্য দিতে হবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×