
মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের থানার সার্কেল অফিসার পাকিস্তানের পক্ষে কথা বলতো ও কোমরে পিস্তল ঝুলায়ে হাঁটতো; পাকিস্তানী সৈন্যরা উইথড্র করার সময় সে পালিয়ে যায়, গেরিলা মুক্তিযোদ্ধোরা তাকে খুঁজছিলো, তার স্ত্রী এটা নিয়ে আমার সামনে বড় বড় কথা বলছিলো; এটা সেই ঘটনা।
যুদ্ধ শেষ হলো, থানা তখনো স্হানীয় গেরিলাদের হাতে, ক্যাপ্টেন এনাম সাহেব ২ জন লোক দিয়েছেন, এরা ও গেরিলারা মিলে থানা চালাচ্ছে: অনেক রাজাকার, শান্তি কমিটির লোকজন গ্রেফতার হয়েছে। ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও কয়েকজন মেম্বার শান্তি কমিটতে ছিলো, তারা পালিয়ে গেছে; আমাদের এক সিনিয়র, জাফর ভাই, কলেজের ছাত্র, ইউনিয়ন বোর্ড চালানোর ভার পেয়েছেন, কয়েকজন মেম্বারকে নিয়ে উনি তা চালাচ্ছেন। আমি বাড়ীতে ম্যালেরিয়ার চিকিৎসা করাচ্ছি, সবকিছু থেকে বিচ্চিন্ন, পোড়া বাড়ী মেরামত করার কাজ করছি। বাজারে গিয়েছি আজাদী পত্রিকা কিনতে, জাফর ভাই'এর সাথে দেখা, জোর করে ইউনিয়ন বোর্ডের অফিসে নিয়ে এলেন।
অফিসে আগের থেকে এক ভালো শাড়িপরা, সুন্দরী মহিলা জাফর ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছিলেন; জাফর ভাইকে পেয়ে রেগে মেগে আগুন। ইনি থানা সার্কেল অফিসারের স্ত্রী, উনার বাসায় গেরিলারা সার্চ করেছে ৪/৫ বার, উনার স্বামীকে খুঁজছে; উনার স্বামী যুদ্ধের সময় শান্তি কমিটির দেখাশোনা করেছে, ওদের মিটিং'এ গিয়েছে, কোমরে পিস্তল নিয়ে বাজারে যেতো, মুক্তিযোদ্ধাদের বিপক্ষে কথা বলেছে; এখন পলাতক। উনার স্ত্রীর অভিযোগ, উনার স্বামীর কারণে উনার পরিবারকে হেনস্তা করা হচ্ছে, উনার স্বামী কোন অপরাধ করেনি, পরিবার চালানোর জন্য চাকুরী করেছে মাত্র ও পাকীদের ভয়ে যা দরকার ততটুকু করেছে, মানুষের ক্ষতি করেনি।
জাফর ভাই আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন, চা আনালন, উনাকে শান্ত করলেন। জাফর ভাই উনাকে আশ্বস্ত করলেন যে, থানা কমান্ডারকে বলবেন, উনাকে এই ব্যাপারে আর যেন প্রশ্ন না করা হয়। একটু পরে সার্কেল অফিসারের ছেলে আসলো, উহা চট্টগ্রাম শহরে ১০ম শ্রেণীতে পড়ে, উহাও জাফর ভাইকে বড় বড় কথা বলছে, তার বাবা পেটের দায়ে সরকারী কাজ করেছে, কোন অপরাধ করেনি। সার্কেল অফিসারের পরিবার চট্টগ্রাম শহরের লোক, সার্কেল অফিসার পালিয়ে যাবার পর, ভয়ে পরিবার শহরে যাচ্ছে না, সেখানে ওদের পরিবার সম্পর্কে এলাকার মানুষ অসন্তুষ্ট।
আমি মহিলাকে বললাম,
-আপনার স্বামী যদি জাফর ভাইয়ের কাছে আত্মসমর্পন করে, জাফর ভাই উনাকে নিজ দায়িত্বে থানায় রাখলে ভালো হবে; গেরিলাদের হাতে ধরা পড়লে কি হবে বলা কঠিন।
-উনি কি জীবিত, নাকি মৃত, আমি তাও জানি না; আমি ছেলেমেয়ে নিয়ে মহাকষ্টে আছি; গেরিলারা আমাকে অন্যায়ভাবে দিনরাত জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
-গেরিলারা আপনাকে জিজ্ঞাসা করবে, উনাকে খুঁজবে, এটা স্বাভাবিক। আপবার স্বামী আপনার সাথে যোগাযোগ করলে, জাফর ভাইয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বলুন, এতে উনার প্রাণ রক্ষা হবে।
-উনি কোন অপরাধ করেননি। জাফর ও তুমি মিলে থানা কমন্ডারকে বলো, আমাকে ও আমার পরিবারকে যেন আর অকারণে হেনস্তা না করে।
-আপনার স্বামী নিরোপরাধ, সেটা যদি আপনি গেরিলাদের ও ক্যা: এনামের লোকদের বুঝাতে পারেন ভালো হবে; কিন্তু এখন পরস্হিতি সেই রকম নেই।
জাফর ভাই পাশের রুমে গেলেন মেম্বারদের সাথে কথা বলতে, আমি মহিলাকে বললাম,
-আপনি স্হানীয় কোন একজন লোককে বাসায় রাখেন, যিনি আপনাকে বাজার ইত্যাদি নিয়ে সাহায্য করবে, গেরিলারা এলে বুঝায়ে বলতে পারবে, আপনার বাচ্চাদের সাহায্য করতে পারবে।
-সেই রকম একজন লোক আমাদের আছেন, আজকে ২ বছর উনি আমাদের কাজ করছেন।
জাফর ভাই মহিলাকে বাসা অবধি এগিয়ে দিয়ে এলেন; আমাকে বললেন,
-মহিলাকে নিয়ে বিপদে আছি; বড় বড় কথা বলে, কিন্তু বুঝতে পারছে না, কি বিপদের মাঝে আছে, গেরিলারা উনার স্বামীকে পেলে মেরে ফেলবে; ইডিয়ট লোকটি শান্তি কমিটির মিটিং করতো, বাজারে গিয়ে দোকানীদের বলতো, যদি কেহ মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করে, পাকিস্তানী মিলিটারীর হাতে তুলে দেবে।
-ব্যক্তিগতভাবে কারো ক্ষতি করেছে?
-না, তবে, মানুষ তাকে রাজাকার হিসেবে নিয়েছে।
-আমার মনে হচ্ছে, মহিলা ও উনার ছেলে আসল বিপদ বুঝতেছে না; আপনি ঐ লোককে ধরে থানায় দিয়ে দেন, প্রাণে বাঁচুক, না'হয় এই বেকুব মহিলা শীঘ্রই বিধবা হবে।
-আমি সার্কেল অফিসারকে কোথায় পাবো, মহিলা কি আমাকে বলবে?
-মহিলাটি আমাকে বলেছে, কোন এক লোক বাসায় কাজ করে দেয় গত ২ বছর থেকে?
-ওটা হলো পাশের গ্রামের জামাল; সেই এখন পরিবারকে রক্ষা করছে।
-আপনি জামালকে আপনার বাড়ী নিয়ে যান, ওকে বুঝায়ে বলেন যে, সার্কেল অফিসার গ্রেফতার হলে ভালো হবে; পরে বিচারে যা হয়, সেটা পরে হবে; এখন গেরিলাদের হাতে ধরা পড়লে, মারা পড়বে।
-তুমি বলছ জামাল জানবে? লোকটা গরীব ও সোজা লোক।
-অবশ্যই জামাল ওই লোককে লুকায়ে রেখেছে। উইথড্রয়ের সময় পাকিস্তানী মিলিটারী কি কোন যানবাহন চলাচল করতে দিয়েছে যে, সার্কলে অফিসার শহরের দিকে যাবে? সার্কেল অফিসার চিটাগং যেতে পারেনি, জামালের বাড়ীতে কিংবা অন্য কোথায় থাকার ব্যবস্হা করেছে জামাল।
-তুমি সিওর?
-আমি তাই মনে করছি।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে মে, ২০২১ সন্ধ্যা ৬:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



