
বাংগালীরা পশ্চিমে যাচ্ছেন; তবে, অনেকে সেখানকার সংস্কৃতি না শিখে, নিজেদের খারাপ অভ্যাসগুলো এখনো পুষে যাচ্ছেন, এটা সেই ধরণের একটি ঘটনা:
নিউইয়র্কের লং-আইল্যান্ডে কাজ করছিলাম; বাহিরে হাঁটার সময়, দোকান থেকে ১ কাপ কফি কেনার ইচ্ছে হলো; গেলাম পাশের ডাংকিন ডোনাটে; দুপুর বেলায় লম্বা লাইন; বেশীর ভাগই বয়স্ক লোকজন, সিনিয়র সিটিজেন এলাকা; সার্ভিসে সবাই বাংলাদেশী, ৪ জন তরুণী, ১ জন একটু বয়স্ক মহিলা, ১ জন মধ্য বয়সী পুরুষ, এবং ইনি ম্যানেজার। ক্যাশে ১ জন অর্ডার নিচ্ছেন, লাইন নড়ছে না; সার্ভিসের এক তরুণী ডোনাট ইত্যাদি সাজাচ্ছে, সাথে সাথে কোন এক মহিলার আধা-পর্ণ জাতীয় পরকিয়ার গল্প পুরো গ্রাফিকসহ বলছে, সবাই সেটাতে মত্ত ; দোকানে হা হা, হি হি চলছে!
অনেকক্ষণ পর, ক্যাশের কাছে আসলাম; সামনের মহিলা, প্রায় ৮০ বছর বয়স হবে, ২টি ডোনাট ও মিডিয়াম কফির অর্ডার দিলেন; দাম দেয়ার সময় কুফন দিলেন ক্যাসিয়ারকে; ৪ ডলার থেকে সামান্য বেশী বিল আসলো, মহিলা ৫ ডলারের বিল দিয়ে বিল দিয়ে খাবার নিয়ে টেবিলে গিয়ে বসলেন। ক্যাসিয়ার বাংলায় আমাকে বললেন,
-কিভাবে সাহায্য করবো আপনাকে?
অকারণ দেরী ও হৈ চৈ'তে মেজাজ ভালো ছিল না; ইংরেজীতে অর্ডার দিলাম,
-দুধসহ ছোট ডি-কাফ, ফ্যাট-ফ্রি মিলক, চিনি লাগবে না।
পয়সা দিতে যাচ্ছি, এন সময় আগের ঐ বয়স্ক মহিলা ফেরত এলেন ক্যাশে, বললেন,
-আমি কুফন দিয়েছিলাম, আমার থেকে বেশী পয়সা নেয়া হয়েছে!
ক্যাশের তরুণী অগ্নিমুর্তি ধারণ করে বললেন, "এই কুপন আমরা নিচ্ছি না"।
মহিলা হতাশ হয়ে ফিরে গেলেন; আমি ক্যাশিয়ারকে বললাম,
-কুপনটা আমাকে দেখাবেন?
-তুমি আবার কে? ক্যাশিয়ার আমাকে ধমক দিলো; ভেতরের গল্প বলা হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেলো, সবাই আমাকে দেখছে; আমি বললাম,
-আমি কেহ নই; তবে, বড় যায়গায় নালিশ করবো; কুপন নিয়ে মিথ্যা বললে বড় সমস্যা হবে।
-যাও, করগে, উঁচু গলায় বললো ক্যাশিয়ার; এরপর মাহিলাকে ডেকে তার পুরো ৫ ডালারের নোট ফেরত দিলো; আমি কফি নিলাম, দোকানে ভয়ংকর নীরবতা।
দুইদিন পর, বাড়ী ফেরার পথে সেই দোকানে গেলাম, লাইন ছিল না; ক্যাশে ছিল ঠিক আগের দিনের মেয়েটি; ভেতরে হইচই করে গল্প চলছিল; আমি অর্ডার টেবিলের দিকে এগিয়ে যেতে মেয়েটা ঘোষনা করলো:
-গন্ডগোলটা এসেছে, গন্ডগোলটা এসেছে।
সে ক্যাশ থেকে সরে দাঁড়ালো, সবাই চুপ; বয়স্ক মহিলাটি ক্যাশে এলেন; আমি অর্ডার দিলাম, বাটারসহ টোস্টেড খোয়াসঁ ও এক বোতল সোডা। পয়সা দেয়ার সময় মহিলা বললেন:
-কফি?
-না, ধন্যবাদ
-ফ্রি।
আমি না করলাম। আমি টোস্টেড খোয়াসঁ'র জন্য অপেক্ষা করছি, ম্যানেজার বললো, "এই লোক বাংগালী"। ক্যাশের মহিলা বললো,
-না, বাংগালী নয়; আমি ফ্রি কফি দিতে চেয়েছিলাম, নেয়নি।
ট্রেনে উঠে প্যাকেট খুলে দেখি, টোস্টেড খোয়াসঁ'র যায়গায় ব্যাগল; আমি ব্যাগল পছন্দ করিনা, একবার খেলে সহজে ক্ষুধা লগে না; তবুও খেলাম।
পরেরদিন, কাজে যেতে থামলাম দোকানে, তরুণী ক্যাশিয়ার আমাকে দেখেই জোরেই ঘোযনা করলো,
-মাসী, গন্ডগোলটা এসে গেছে।
-গতকাল আমাকে টোস্টেড খোয়াসঁ'র যায়গায় ব্যাগল দেয়া হয়েছিল, বয়স্ক মহিলাকে বললাম।
-তাই নাকি? ঠিক আছে, ভবিষ্যতে যাতে ভুল না হয় সেদিকে খেয়াল রাখবো; আজ কি দেবো?
-আমি আমার টোস্টেড খোয়াসঁ চাই।
মহিলা গ্রিলের ছেলেটাকে অর্ডার দিয়ে আমার কাছে পয়সা চেলো। আমি বললাম:
-পয়সা তো গতকাল দিলাম।
-আপনাকে তো ব্যাগল দেয়া হয়েছিলো।
-ওটা আমার অর্ডার ছিলো না।
দোকানের সবাই চুপ, ম্যানেজার সামনে এলো, বললো:
-ব্যাগল তো আপনি ফেরত আনেননি।
-আপনি চান, আমি ট্রেন থেকে এসে ব্যাগল দিয়ে যাবো? এসব গন্ডগোল ছেড়ে দেন।
মহিলা আমাকে খোয়াসঁ'র প্যাকেট দিলো; আমি বেরিয়ে যাচ্ছি, শুনলাম, ম্যানেজার মহিলাকে বলছে,
-বিনা পয়সায় দেয়া ঠিক হয়নি তোমার; লোকটা মাথায় উঠবে।
শুক্রবারে কাজের থেকে আগে বাড়ী ফিরছি, কফির জন্য থামলাম, লোকজন তেমন নেই; ক্যাসিয়ার মেয়েটি ঘোষনা করলো,
-গন্ডগোল, গন্ডগোল, গন্ডগোল এসেছে।
সবাই কাজ কর্ম বন্ধ করে আমাকে দেখছিল; গ্রিলের ছেলেটা বললো, "তুমি যে গন্ডগোল, গন্ডোগল বলছ, লোটা এক সময় বুঝতে পারবে"
"আজ এই লোকের অর্ডার আমি নিচ্ছি", বলে ম্যানেজার ক্যাশে এসে দাঁড়ালো।
আমি অর্ডার দিলাম, "মিডিয়াম ডি-কাফ, ফ্যাট-ফ্রি মিলক, চিনি লাগবে না"
লোকটা নিজেই কফি বানাতে গেলো, ডি-কাফের পটে সামান্য তলানী পড়ে ছিল, সেটুকু ঢাললো, বাকীটুকু দিলো রেগুলার থেকে; আমি জানালা দিয়ে বাহিরের দিকে তাকানোর ভান করে দেখছিলাম; পুরো ক্রু ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে আছে; আমি কফি নিয়ে পয়সা দিয়ে, এক চুমুক খেয়ে বললাম:
-আমি ডি-কাফের অর্ডার দিয়েছিলাম?
ম্যানেজার বললো, "এটা ডি-কাফ"।
বয়স্ক মহিলা এগিয়ে এলেন, "একটু অপেক্ষা করুন, নতুন ডি-কাফ তৈরি করে দিচ্ছি"; উনি নিজেই কফি বসালেন, মিনিট চারেকের মাঝ কফি হয়ে গেছে; মহিলাটি আরেকটি অর্ডার নিচ্ছে; ম্যানেজার আমার জন্য কফি বানালো; দেখা যাচ্ছে সে রাগান্বিত; সে ফ্যট-ফ্রি দুধের যায়গায় রেগুলার দুধ দিলো দেখলাম। আমি কফিটা হাতে নিয়ে এক চুমুক খেয়ে মহিলাকে বললাম:
-আমি ফ্যাট ফ্রি দুধ চেয়েছিলাম।
মহিলা ম্যানেজারের দিকে তাকালো; দোকানের এক পাশে ম্যানেজারের টেবিল, সে সেখানে গিয়ে বসে পড়লো। মহিলা নতুন করে কফি বানিয়ে দিলো; বললেন,
-ফ্রি খোয়াসঁ দেবো আপনাকে।
-না, ধন্যবাদ।
আমি দোকান থেকে বের হচ্ছি, আগেরদিনের তরুণীটি ঘোষণা করলো,
-গন্ডগোলটা গেলো, আর যেন না আসে।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে মে, ২০২১ রাত ৮:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



