২০১৩-১৯৯৫ = ১৮ বছর আগের জানুয়ারি মাসের শীতের এক মধ্যাহ্ন। ঢাকা শহরে তখনো ‘প্রকৃতির প্রবেশ নিষেধ’ হয় নাই। নীলক্ষেত লেপ তোশকের দোকানের সামনে রিকশা থেকে নামল সদ্য বিশে পা দেয়া এক যুবক। যুবক পাঁচ টাকা রিকশা ভাড়া দিল। সে নীলক্ষেতে এসেছে বেডশিট এবং বালিশের ওয়াড় কিনবে বলে।টিনের ট্রাংক, তোশক, কম্বল এবং বালিশ কিনার দরকার নাই। ওগুলো বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছে। তুমুল উত্তেজনায় যুবকের হৃৎপিণ্ড ধুকপুক ধুকপুক করছে। আজকে সে নিজের হলে নিজের সীটে উঠবে। হলের নাম নজরুল ইসলাম হল। রুম নাম্বার ১২৯।
এস এম হল থেকে নজরুল ইসলাম হল। পলাশী মোড়ের ওপাড় থেকে এপাড়। যুবক তার টিনের ট্রাংক, লেপ, কম্বল, বালিশ সব রিকশায় চাপাল। তারপর নিজেও রিকশায় চেপে বসল। রিকশা যখন চলতে শুরু করল তখন যুবকের মনে হল সে যেন এক যুদ্ধ জয়ী সম্রাট । এতদিনকার অতিথিশালা থেকে বিদায় নিয়ে ঘাঁটি স্থাপন করতে যাচ্ছে সদ্য জয় করা নিজস্ব দুর্গে।
যুবক ভারি কল্পনা প্রবন। যুবকের কল্পনায় রিকশা ইতোমধ্যে হয়ে গেছে দশ ঘোড়ায় টানা রথ।রিকশাওয়ালা রথের সারথি! হলের গেট গুলো দুর্গের ফটক! সম্রাট(!) ভুল করে দশ ঘোড়ায় টানা রথের সারথি(!)কে নির্দিষ্ট ফটকের আগের ফটক দিয়ে দুর্গে অনুপ্রবেশ করতে বললেন!!
যুবকের রিকশা নজরুল ইসলাম হলের প্রবেশ মুখের পরিবর্তে আলমের দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল!
আলমের দোকানের সামনের বেঞ্চিতে ছিপছিপে লম্বা একটা ছেলে কুঁজো হয়ে বসে চা খাচ্ছে। ছেলেটার বয়স তার সমান ই হবে। যুবক অনুমান করল।
তাকেই জিজ্ঞেস করল যুবক- ভাই নজরুল ইসলাম হলে কিভাবে যাব?
জানা গেল সেও আজকে নজরুল ইসলাম হলে উঠবে। যুবকের মত তারও ডিপার্টমেন্ট মেকানিক্যাল এবং রুম নাম্বার ১২৯! একসাথে এক কাপ করে চা খাওয়া, শেয়ার করে একটা বাংলা ফাইভ সিগারেট খাওয়া এবং আরও মিনিট পাঁচেক কথা বলার পর তারা পরস্পর কে ‘তুই’ করে বলা আরম্ভ করল।
দেখা গেল ছয় জনের গনরুমে সেদিন রাতে বাকী চারজন সবাই অনুপস্থিত। সুইচে কি সমস্যা থাকায় রুমে বাতি জ্বালানো যাচ্ছিল না। মোম এবং কয়েল জ্বালিয়ে তোশক চাদর বিছিয়ে রুমটাকে কোনোমতে থাকার উপযোগী করা হল। তারপর সদ্য রুমমেট ওরা দুজন আড্ডায় মেতে উঠল। দেখা গেল দুজনই কবিতা ভালবাসে। দুজনেরই অনেক গুলো কবিতা মুখস্ত। ওরা পরস্পরকে মুখস্ত কবিতা আবৃত্তি করে শুনাল!
ছিপছিপে লম্বা ছেলে যুবক কে জিজ্ঞেস করল
- তুই ইন্টারে কত মার্কস পেয়েছিস রে?
- সাতশ সতের। তুই কত পেয়েছিস?
- আমার মার্কস একটু বেশি রে!
-সেই বেশি টা কত?
- নয়শ ষোল!
- কি? তুই, তুই কি স্ট্যান্ড করেছিস?
- হ্যাঁ, আমি রাজশাহী বোর্ডে থার্ড স্ট্যান্ড এবং বুয়েটে আমার ভর্তি পরীক্ষার সিরিয়াল ছিল পনের!
যুবক ছিপছিপে ছেলেটার ঠিক সামনে এসে অবাক বিস্ময়ে তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। ছিপছিপে লম্বা ছেলের প্রশ্নের জবাবে যুবক বলল-
- আমি এতদিন স্ট্যান্ড করা ছেলেদের শুধু পেপারে এবং ম্যাগাজিনে দেখেছি!
আজকে বোর্ডে থার্ড স্ট্যান্ড করা ছেলে আমার রুম-মেট, ও মাই গড!!
দেখতে দেখতে টার্ম ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে গেল। ৪ এর কাছাকাছি জিপিএ যারা পেল তারা সুপার স্টার। ৩ দশমিক পাঁচের উপরে যারা তারা সন্মানিত। ৩ এর নিচে যারা তারা কাওকে জিপিএ বলেনা! যুবকের লজ্জায় মাথা কাটা যাবার অবস্থা। তার জিপিএ আড়াই এর ঘরে! কিন্তু সে বিস্মিত হয়েছে লম্বা ছিপছিপে ছেলেটার রেজাল্টে। যুবক ধরেই নিয়েছিল লম্বা ছিপছিপে ছেলে ৪ এর কাছা্কাছি পাবে। কিন্তু সে পেয়েছে ৩ দশমিক ২৭! এবং তাকে এটা নিয়ে বিচলিত বলেও মনে হচ্ছে না! সে অনেক সময় অন্যদেরকে নিজ থেকেই বলছে- আমি থ্রি পয়েন্ট টু সেভেন পেয়েছি!
যুবক এক নির্জন দুপুরে ছিপছিপে লম্বা ছেলে কে বলেই ফেলল
- মনে করছিলাম তুই ফার্স্ট হবি। আর সেই তুই কিনা!
যুবক বিস্মিত হয়ে খেয়াল করল ছিপছিপে লম্বা ছেলের চোয়াল ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে যাচ্ছে! চোখ দুটা যেন দূরের কোন বিন্দুতে স্থির। ছিপছিপে লম্বা ছেলের চেহারা থেকে এক মুহূর্তে সমস্ত চপলতা উধাও! ছিপছিপে লম্বা ছেলে স্থির অকম্পিত স্বরে বলল-
- বুয়েটের শেষ পরীক্ষাটায় আমি ফার্স্ট হব।
ছিপছিপে লম্বা ছেলে তার কথা রেখেছিল। সে শেষ পরীক্ষা ছাড়াও আরও অনেকগুলো টার্ম ফাইনালে ফার্স্ট হয় এবং বুয়েটের টিচার হিসেবে জয়েন করে। যুবকের সাথে অতটা যোগাযোগ না থাকলেও যুবক জানে সে এখন সাফল্যের চুড়ায়!
খেয়ালি স্বভাবের কারনেই সম্ভবত যুবক তার নিজের জীবনে সে অর্থে সাফল্য পায়নি। কিন্তু কেবল বেঁচে থাকার জন্য ও ত প্রায় প্রতিদিন দরকার হয় ছোট ছোট সাফল্যের! সেই ছোট ছোট সাফল্য গুলোর জন্যও লাগে প্রেরনা। যুবকের যখনই প্রেরনা দরকার হয় সে চোখ বন্ধ করে ফেলে। কল্পনায় ভেসে উঠে ছিপছিপে লম্বা একটা ছেলের মুখ! যার চোখ দুটো স্থির অকম্পিত। যুবক স্পষ্টতই কানে শুনতে পায়-
- বুয়েটের শেষ পরীক্ষাটায় আমি ফার্স্ট হব!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



