somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

‘একজন তীক্ষ্ণ যুবক এবং কয়েকটি পায়রা’

১৩ ই নভেম্বর, ২০১৪ বিকাল ৪:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১৯৮২ সালের ষোলই ডিসেম্বর। সাভার স্মৃতি সৌধের কাছে বাস থেকে নামল মাঝারি উচ্চতার একজন যুবক। যুবকের বয়স একত্রিশ। ঈষৎ লম্বা এলোচুল যুবকের। কাল প্যান্টের উপর ইস্তিরি না করা একটা শাদা শার্ট। কাল ফ্রেমের মাইনাস পাওয়ার চশমার আড়ালে ঢাকা পড়েছে যুবকের তীক্ষ্ণ মেধাবী চোখ। চশমা ঢাকা চোখেই একটা অদ্ভুদ দৃশ্য নজরে এল যুবকের।

রাস্তার পাশে একটা বিশাল বটগাছ। বটগাছের তলা বাঁধানো। বাঁধানো বটতলায় দেবশিশুর মত সুন্দর একটা শিশুকে কোলে নিয়ে বসে আছে অতি কদাকার চেহারার এক লোক। লোকটার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল যুবক। লোকটা কোন ভাবেই এ শিশুর বাবা নয়। লোকটার চারদিক ঘিরে আছে তার মতই কদাকার চেহারার আরো কিছু মানুষ। এদের চেহারা দেখে বুঝা যায় এদের অন্তরে কোন ধরনের কোন উন্নত অনুভূতি নাই। এদের জগত হচ্ছে নীচ স্বার্থপরতা এবং তোষামোদির জগত। শিশু উচ্চই স্বরে কান্না করছে। এই মানুষ গুলোর চেহারা দেখে মনেই হচ্ছে না এরা শিশুর কান্না শুনতে পাচ্ছে!

হঠাৎ কোত্থেকে আলুথালু বেশে ছুটে এল সতের আঠার বছরের একটা তরুণী মেয়ে। তাকে দূর থেকে দেখেই শিশু তখুনি কান্না থামিয়ে হাসতে গিয়ে বিষম খেল! তরুণী ভিড় ঠেলে শিশুর কাছে ছুটে যেতে চাইল। কিন্তু ভীড়ের মধ্যকার কিছু কর্কশ হাত তরুণীকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল।ধাক্কা খেয়ে অদূরে সরে গিয়ে তরুণী যেন পাথরের মূর্তি হয়ে গেল। অপলক চোখে সে তাকিয়ে আছে শিশুর দিকে। শিশুও অপলক চোখে তাকিয়ে আছে তরুণীর দিকে। শিশু হাসছেও না, কাঁদছেও না!

তরুণীর দিকে এক লহমায় তাকিয়েই যুবক বুঝে গেছে এই তরুণী ই শিশুর মা। মানুষের মূর্খতার শক্তি দেখে মনে মনে বিস্মিত হল যুবক! প্রকৃতির যত ভাষা আছে সব ভাষা চিৎকার করে বলছে ভীড় থেকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আলুথালু রমণী ই শিশুর মা। আর শিশুর চারপাশ ঘিরে থাকা ক’জন মূর্খ তাদের অভিব্যক্তি দিয়ে শিশুর সাথে তরুনী’র যে কোন সম্পর্ক নাই সেটা মূটামুটি প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে!

যুবকের মাথা একটু ঘুরে উঠল। সে যায়গার অদূরে একটা সস্তা তক্তার হোটেল দেখা যাচ্ছে। খানিকটা এগিয়ে সেটার ভেতর ঢুকল যুবক। তক্তার উপর বসে চা খেয়ে সিগারেট ধরিয়ে লম্বা টান দিল।চারপাশে চা বিড়ি খেতে খেতে গল্প করছে তক্তার উপর পা তুলে বসা লুঙ্গি পরা মানুষ। তাদের গল্পের বিষয় একটাই-

কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট এরশাদ আসবে। আজ জাতীয় স্মৃতি সৌধের উদ্বোধন। কথায় কথায় এক ফাজিল প্রেসিডেন্ট এরশাদ কে নিয়ে মজার একটা রসিকতা করল। বাকী সবাই হাসিতে ফেটে পড়ল।লাগামছাড়া হাসতে গিয়ে একজনের চা চল্কে লুঙ্গির বেকায়দা জায়গায় পড়তেই সে আঁক করে চিৎকার দিল। যে ফাজিল টা প্রেসিডেন্ট এরশাদ কে নিয়ে রসিকতা করছিল সে তাকে যন্ত্র(!) সামলে সুমলে রাখার পরামর্শ দিয়ে প্রেসিডেন্ট এরশাদ নিয়ে আরেকটা বদ রসিকতা আরম্ভ করল।হাতে চায়ের কাপ ধরা বাকী সবার হাসি হাসি মুখ ফাজিলের দিকে ঝুঁকে এল। যুবক খেয়াল করল রসিকতা গুলো শুনে সেও বেশ মজা পাচ্ছে। এগুলো যে মুখে মুখে ছড়ানো বানানো গল্প এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু শুনতে মজা!

তক্তা হোটেল থেকে বের হয়ে যুবক হাঁটতে হাঁটতে স্মৃতি সৌধের একেবারে কাছাকাছি চলে আসল। বেশি কাছে অবশ্য যেতে পারল না। পুলিশ তাচ্ছিল্য ভরে বাঁধা দিল। টানা টানা চাকমা উচ্চারণে বলল- ডেকছেন না! আযকে ঢ়াষ্ঠপটি আসবেন ষিটিশঢ উডভোডন কড়তে! উডিকে যান!
যুবকের একবার মনে হল চাকমা পুলিশের বোঁচা নামের উপর একটা ঘুসি মেরে নাকটা আরো বোঁচা করে দেয়। তারপর চুলের ঝুঁটি ধরে বলে- ব্যাটা তুই কি জানিস তোর সামনে যে যুবক দাঁড়িয়ে আছে সে হচ্ছে...!

কিন্তু যুবক কিছুই না বলে চুপচাপ সরে আসল। ‘পুলিশের লাঠির বাড়ির সীমানা’র বাইরে যেখানে অনেক উৎসুক জনতার ভীড় সেখানে এসে দাঁড়াল।আশ্চর্য! সবাই প্রেসিডেন্ট এরশাদ নিয়ে আলাপ করছে, রাজনীতি নিয়ে আলাপ করছে, সাভারে জমির দাম নিয়ে আলাপ করছে। কিন্তু স্মৃতিসৌধ নিয়ে কারো মুখে কোন কথা নাই! যুবক নিজে থেকেই তারই সমবয়সী আরেকজন যুবক কে ডেকে জিজ্ঞেস করল- আচ্ছা ভাই, এই স্মৃতিসৌধ টির নকশা কে করেছে আপনি কি জানেন? সমবয়সী যুবক তার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর বলল-ভাইজান এটা ত রাজমিস্ত্রিরা বানাইছে! আমি নিজের চোখে দেখছি।

যুবক দূর থেকে দেখছে। প্রেসিডেন্ট এরশাদ হাসি হাসি মুখে পায়রা উড়িয়ে দিলেন। তার চারপাশে কাল কোট পরা একদল লোক হাত তালি দিচ্ছে। মাইকে চিৎকার করে ঘোষণা চলছে- মহামান্য রাষ্ট্রপতি লেফটেনেন্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এই মাত্র পায়রা উড়িয়ে জাতীয় স্মৃতিসৌধের উদ্বোধন করলেন। উনার পাশে উপস্থিত রয়েছেন মাননীয়া ফার্স্ট লেডি বেগম রওশন এরশাদ এবং মাননীয় তেলমন্ত্রী জনাব( প্রবল হাততালিতে ঘোষকের কণ্ঠ চাপা পড়ে গেল)...।

যুবক বিস্ময়ের সাথে তাকিয়ে দেখল পায়রা গুলো উড়তে উড়তে বাঁক খেয়ে একেবারে স্মৃতিসৌধের মাথার উপর উঠে গেল। সেখানে ঘুরে ঘুরে অনেকক্ষণ উড়াউড়ি করল। তারপর সেখান থেকে উড়তে উড়তে ঠিক যুবকের মাথার উপর চলে আসল।অনেক উঁচুতে যুবকের মাথার উপর ঘুরে ঘুরে উড়তে লাগল।

যুবক জানে পায়রার মাধ্যমে প্রকৃতি আসলে এই মূর্খ মানব সমাজের সাথে কথা বলতে চাচ্ছে। কিন্তু অত উঁচুতে মাথা তুলে কেউ পায়রা দেখছে না!
সামনে চোখ বাড়ালেই যেখানে প্রেসিডেন্ট এরশাদের মত দূর্লভ জিনিষ চোখে পড়ে সেখানে কার এত ঠেকা পড়েছে যে ঘাড় বেঁকা করে আকাশের পায়রা দেখবে?


( শ্রদ্ধেয় মাইনুল হোসেন ভাই, মাপ করবেন। পাঠক, আপনারাও মাপ করবেন। কিছু কিছু কল্পনা কে মাঝে মাঝে নিজের কাছেই সত্য বলে মনে হয়!)


সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই নভেম্বর, ২০১৪ বিকাল ৪:৩৯
১৪টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের শাহেদ জামাল- ১০০

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৮



মাঝে মাঝে খুব অবিশ্বাস্য ব্যাপার সহজ ভাবে ঘটে যায়।
এই যে আমি শাহেদ। শাহেদ জামাল। রমিজ উদ্দীনের ছেলে। আমাকে একটা ঘরে বন্ধী করে রাখা হয়েছে। ছোট ঘর। ঘরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিশুর নিরাপত্তা কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনামের চেয়ে বড়

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:০২



শিশুর নিরাপত্তা কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনামের চেয়ে বড়

গতকাল এক বাবার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। অভিযোগ, তাঁর মেয়েকে একটি মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপাল যৌন নিপীড়ন করেছেন। বাবার প্রতিক্রিয়া সঠিক ছিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনেকটা পথ হেঁটে এসেছি

লিখেছেন চারাগাছ, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:০৫




১৯৯৭ সাল।

আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি।

স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে মামুন ভাইয়ের একটা অডিও ক্যাসেটের দোকান ছিল। পাশেই মির্জা ভাইয়ের কনফেকশনারি। টিফিনের সময় ওখানে প্যাটিস খেতাম।

সেই সময় অডিও ক্যাসেটের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশটাতো এখন রাজাকারদের....

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:২৮




একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে বাদী ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী (৮৭)। মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়ার প্রস্তুতি চলার সময় জামাতের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাদ্রাসা শিক্ষা একটা কর্মবিমুখ শিক্ষা

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:১৫

এদেশের মাদ্রাসা শিক্ষারে আপনি একটা স্ক্যাম হিসেবে ধরতে পারেন। মাদ্রাসার বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে যে মাদ্রাসাগুলো আছে সেগুলো বাদ দিয়ে অন্য সব মাদ্রাসাই এই স্ক্যামের ভেতরে। এটা একটা ভিক্ষার সাইকেল, দারিদ্র্য'র দুষ্টু... ...বাকিটুকু পড়ুন

×