সাগরে ভাসতে থাকা অসহায় মানুষদের কথা চিন্তা করে কদিন ধরেই মনের মধ্যে অসম্ভব তোলপাড় চলছিল। কঠিন একটা প্রশ্ন মনের মধ্যে জেগে উঠেছিল। যেকোন মূল্যে জেতার সর্বনাশা রেস ই ত একটা সমাজের চুড়ান্ত দূর্নীতিগ্রস্ত কাঠামো তৈরি করতে পারে। সেই সমাজ কাঠামোতে কারো অতিরিক্ত টাকা থাকলে দিন কে রাত বলে ‘সত্যায়িত’ করতে পারে। জীবিত একজন মানুষ টাকার বিনিময়ে সংগ্রহ করতে পারে তার ডেথ সার্টিফিকেট। ধরা যাক সেরকম সমাজে একজন মানুষের সন্ধান মিলল যে জীবিত এবং যার নামে একটা ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করা আছে। তাহলে ব্যাপার টা কি দাঁড়াল? একজন মানুষ বাস্তবে জীবিত কিন্তু কাগজপত্রে মৃত। প্রকৃত বাস্তবতা বলছে মানুষ টা জীবিত। দূর্নীতিগ্রস্ত সমাজের কাগুজে বাস্তবতা বলছে মানুষ টা মৃত। এখন আপনি কোনটাকে গ্রহণ করবেন? মানুষ ত আর শ্রোডিঞ্জারের বিড়াল নয় যে অর্ধেক জীবিত আর অর্ধেক মৃত হবে! তাহলে যেকোন একটা সত্য কে আমাদের গ্রহণ করতে হবে। হয় বাস্তব সত্য গ্রহণ করে তার ডেথ সার্টিফিকেট টা পুড়িয়ে ফেলতে হবে অথবা কাগজের সত্য গ্রহণ করে মানুষ টাকে হত্যা করতে হবে। সমাজের কাছে যদি মানবতা মূখ্য হয় তাহলে কাগজ পোড়ানো হবে, মানুষ টাকে বাঁচিয়ে রাখা হবে। আর সমাজের কাছে যদি দূর্নীতির কারখানায় উৎপন্ন কাগজের টুকরা টি মুখ্য হয় তাহলে কাগজ সোনা দিয়ে বাঁধানো হবে, মানুষ টাকে পুড়িয়ে মারা হবে।
ঠিক এরকম একটা কঠিন প্রশ্নের মুখেই যোগাযোগ সর্বস্ব এই পৃথিবীকে ফেলে দিয়েছিল অমানবিক নৌকায় সাগরে ভাসতে থাকা অসহায় মানুষ। পৃথিবীর নিয়ম কানুন এসব মানুষ কে সকল প্রকার স্থল ভূমিতে অনাহুত করেছে। তোমাদের কোন স্থলভুমিতে থাকার কাগুজে বৈধতা নাই, কাজেই তোমরা সাগরে ভাসতে থাক অথবা কোন অলৌকিক উপায়ে মাছে পরিনত হয়ে জলে ঝাঁপ দাও! কারণ কাগজ এবং স্বার্থবাদী মগজ অনুযায়ী তোমরা মনূষ্য গোত্রের অন্তর্ভুক্ত নও। আমি একবুক হতাশা নিয়ে বিশ্বমানবতার চেতনা দ্রবনের তলায় পড়ে যাওয়া মানবিকতার অধঃক্ষেপ টুকুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আজকে পত্রিকায় যখন পড়লাম মালেশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া এই হতভাগ্য দের সাময়িক ভাবে আশ্রয় দিতে রাজী হয়েছে তখন বুক টা খানিকটা হলেও ঠান্ডা হল। ‘পৃথিবীটা ধ্বংশ হয়ে গেছে’ এই দূঃসহ অনুভুতি থেকে আমি কিছুটা হলেও মুক্তি পেলাম।
তবে এতে চুড়ান্ত খুশি হবার কিছু নেই। অসহ গরমে সমুদ্রের লোনা জলের ঝাপ্টায় স্বল্পায়তন নৌকায় বিভিন্ন বয়সী নারীপুরুষ কে যে জান্তব নারকীয় জীবন যাপন এতদিন করতে হয়েছে( নাকি এখনো করতে হচ্ছে? ওদের ইতোমধ্যে আশ্রয় দেয়া হয়েছে কিনা জানিনা) সেটা তাদের প্রাপ্য নাকি প্রাপ্য নয় সেটা ঠিক করতে জ্ঞানপাপীদের ঘাম জমাট বেঁধে ঘি হয়ে গেছে। সেই নৌকায় থাকা শিশুদের কেউ নিশ্চয় সমুদ্রের বুকে আচমকা ভেসে উঠা কোন মাছের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভেবেছে- ইস যদি মাছ হয়ে জন্মগ্রহণ করতাম!!
ভয়ঙ্কর মানবতাবিরোধী যে ‘টাকাবাদ’ পৃথিবীর মানবতা ধ্বংশ করে দিচ্ছে সেই টাকাবাদ কিভবে ধ্বংশ করা যায় সেটা নিয়ে ভাবার এটাই শ্রেষ্ঠ সময়। বিজ্ঞান পৃথিবী তে একধরনের যোগাযোগসাম্য প্রায় প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে। সামান্য সুখশান্তিময় জীবন যাপনের জন্য অঢেল টাকা পয়সা, জমিদারির এখন আর প্রয়োজন নাই। মানুষ এখন চাইলেই ‘সব মানুষের পৃথিবী নির্মাণ’ প্রজেক্ট বাস্তবায়নের চিন্তা করতে পারে। সুখী হবার জন্য এক শ্রেনীর মানুষের ভয়াবহ টাকা দানবে পরিনত হয়ে আরেক শ্রেনীর মানুষ কে ইতরজীবন যাপনকারী দাস এবং আরেক শ্রেনীর মানুষ কে মাছ বা অন্য প্রানী হয়ে জন্মগ্রহণ না করার জন্য আফসোস করানোর কোন প্রয়োজন নাই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



