ফেসবুকে সম্প্রতি একটা জরিপ দেখলাম। ‘কার রান্না বেশি মজা? বউ না মা?’ বলা বাহুল্য পোষ্টে অসংখ্য লাইক এবং নিচে অজস্র কমেন্ট- মায়ের রান্না বেশি মজা। জরিপটার মূল উদ্যেশ্য অবশ্যই ‘কার রান্না বেশি মজা’ এটা যাচাই করা নয়। মূল উদ্যেশ্য পৃথিবীর তাবৎ পুরুষ কূল কে মনে করিয়ে দেয়া- মা বৌ এর চেয়ে বেশি আপন! আধুনিক বাংলার বেশিরভাগ ঘরেই বৌ শাশুড়ির মধ্যে ‘বাইরে থেকে মেকি লোক দেখানো ভাল, ভেতরে ভেতরে হিংসা’র সম্পর্ক বিদ্যমান। আবহমান কাল ধরে চলে আসা বৌ এবং শাশুড়ির এই দ্বন্ধের কারণ অনুসন্ধান করা যাক।
পঞ্চাশ বছর আগেই অর্থনৈতিকভাবে নারীরা পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল পুরুষের উপর। মানুষের বাসায় কামলা খেটে অথবা দিন মজুরি করে পুরুষের অর্ধেক রেটে নারী টাকা উপার্জন করলেও সেই টাকার কর্তৃত্ব তার নিজের উপর না থেকে তার প্রভু( কখনো স্বামী, কখনো বাবা, কখনো ভাই এমন কি কখনো সন্তান!)র উপর থাকত। কাজেই নারীর মনে এই ধারনা বদ্ধমূল ছিল যে সারাটা জীবন তাকে কোন না কোন পুরুষের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে হবে। কোন পুরুষের উপর প্রতিষ্ঠিত অধিকার হারানো মানেই তার অস্ত্বিত্ব বিলীন হওয়া। জন্মের পর নারী প্রথম নির্ভরশীল থাকে বাবার উপর। তারপর স্বামীর উপর। তারপর অবধারিত ভাবে ছেলের উপর। বাবার উপর যখন নির্ভরশীল থাকে তখন সে থাকে রাজকন্যা এবং খেলার মাঠে তার কোন প্রতিদ্বন্দ্বী আবির্ভূত হয়না। স্বামীর উপর যখন নির্ভরশীল হয় তখন খেলার মাঠে শক্ত প্রতিদ্বন্ধী রূপে আবির্ভূত হয় শাশুড়ি। শাশুড়ির অভিজ্ঞতা বেশি থাকায় প্রথম দিকে অসম প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও বৌ খুব দ্রুত ই শাশুড়ি কে কিভাবে সাইজ করতে হয় সেটা রপ্ত করে ফেলে এবং সংসারে সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি শুরু হয়। এই সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি’র ফুটবল মাঠে বৌ শাশুড়ি দূজন ই ছেলে নামক ‘ফুটবল’ কে নিজের দখলে নিয়ে প্রতিপক্ষের পোষ্টে গোল দিতে চায় এবং শান্তি রক্ষার জন্য ছেলে কে একই সাথে নিরীহ ফুটবল এবং রেফারি’র ভুমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়! মা গোল করলে বৌ এর পক্ষে বাঁশি বাজাতে হয়। বৌ গোল করলে মায়ের পক্ষে বাঁশি বাজাতে হয়! এভাবে চুড়ান্ত একটা ভঙ্গুর অবস্থাকে অতি সাবধানে গ্লাস ভর্তি পানির মত কাঁপা কাঁপা হাতে ধরে রেখে চলে বাঙ্গালীর সংসার যাত্রা।
বৌ শাশুড়ির এই দ্বান্দ্বিকতাপূর্ণ অবস্থানের জন্য আমরা নারীর স্বভাব কে দায়ী করি এবং জ্ঞানীর মত বলি- কই? জামাতা এবং শ্বশুরের মধ্যে এমন রেষারেষি ত কখনো দেখা যায়না!
জামাতা শ্বশুরের মধ্যে এমন রেষারেষি দেখতে চান? তাহলে সিস্টেম টাকে উল্টে দিন। দুটো পরিবার ‘ক’ আর ‘খ’ তৈরি করুন। দুই পরিবারেই মা টাকা উপার্জন করে। বাবা রান্না বান্না করে, ঘর ঝাঁট দেয়। দুটো পরিবারেই মেয়ে বড় হলে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হল। ছেলেকে ভাল করে রান্না বান্না এবং উঠান ঝাঁট দেয়া শেখানো হল যাতে তার ভাল বিয়ে হয়! এর পর ‘ক’ পরিবারের মেয়ের জামাই করে ‘খ’ পরিবারের ছেলেকে আনা হল। ছেলেপক্ষ থেকে মেয়েকে খাট, সোফা, ড্রেসিং টেবিল, টিভি, ফ্রিজ, দেয়া হল এবং মেয়েপক্ষ থেকে ছেলেকে দশ ভরি সোনা এবং দশলাখ এক টাকা কাবিন দেয়া হল। বাসর রাতে বেনারসী পাঞ্জাবি পরা লজ্জারাঙ্গা স্বামীকে স্ত্রী বলল- খবরদার! আর যাই কর আমার বাপের মুখের উপর কথা বলবা না। মা টাকা উপার্জন করেছে তাতে কি! বাপ আমাদের রান্না করে খাইয়েছে, উঠান ঝাঁট দিয়ে আমাদের পরিষ্কার উঠানে খেলতে দিয়েছে। আমাদের পায়খানা পরিষ্কার করেছে। কাজেই তোমার অন্যতম কাজ হল আমার বাপের মন যূগিয়ে চলা।
সকাল বেলা শ্বশুরের বানানো নাস্তাপানি খেয়ে( জামাতা হেল্পার) শ্বাশুড়ি এবং এবং বৌ গট গট করে চলে গেল অফিসে। শ্বশুর এবং জামাতা রইল ঘরে।
এই রকম পরিস্থিতি তৈরি করা গেলে দেখা যেত জামাতা এবং শ্বশুরের মধ্যে ঠিক একই রেষারেষি তৈরি হয়েছে যেটা বৌ এবং শাশুড়ির মধ্যে আবহমানকাল ধরে বিদ্যমান।
বর্তমানে সেইসব পরিবারই এই চিরকালীন সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতেছে যেসব পরিবারে নারী স্বাধীন উপার্জনশীল এবং নারীর মর্যাদা পুরুষের নিচে নয়। এখনো এরকম পরিবারের সংখ্যা যথেষ্ট কম যেখানে বৌ এবং শাশুড়ি দূজনের ই স্বাধীন উপার্জন আছে। সেটা যখন হবে তখন এই সমস্যা এমনিতেই দূর হয়ে যাবে।
কাজেই এই সমস্যা দূর করতে হবে সমাজে নারী এবং পুরুষ উভয়ের সম উপার্জন নিশ্চিত করার মাধ্যমে সম মর্যাদা নিশ্চিত করে। একজন ভাল হবার উপর যেন আরেকজনের বেঁচে থাকা নির্ভর না করে। একজনের মহৎ হবার উপর যেন আরেকজনের চিকিৎসা নির্ভর না করে। সবাই নিজেই যেন নিজের ভাল থাকার জন্য যথেষ্ট হয়- সেই লক্ষ্য নিয়ে সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ম কানুন গুলো তৈরি করতে হবে।
কোন সমাজে সক্ষম একজন মানুষের ভাল থাকা যখন তার নিজের যোগ্যতার উপর নির্ভর না করে আরেকজনের মহৎ হবার উপর নির্ভর করে তখন বুঝতে হবে সেই সমাজের নির্মান নকশায় বড়সড় ত্রুটি আছে এবং সেই সমাজে বৌ-শাশুড়ি দ্বন্ধ টাইপ নিম্নমানের দ্বন্ধগুলো সব সময় ই বিদ্যমান থাকবে। ছেলে, মা, বৌ কাউকে মহৎ হবার উপদেশ দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা যাবেনা। বরং এমন সমাজ গড়তে হবে যেখানে নারী পুরুষ দূজনেই নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী উপার্জন করতে পারে।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জানুয়ারি, ২০১৬ রাত ১১:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




