somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

উত্তরাধুনিকতা ও কবি জফির সেতুর কবিতা (সমালোচনা) পর্ব - ২

১৬ ই জুলাই, ২০১৪ রাত ৯:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


কোন ব্যক্তির একক প্রচেষ্টার কারণে দশকও পরিচিত হয়ে ওঠতে পারে। আবার কোন দশকের মধ্যে না থেকেও কোন কোন ব্যক্তির সৃষ্টকর্ম দশকের উর্ধ্বের আলোচনায় আসতে পারে। যেমন নজরুলের কবিতাকে প্রকৃতপক্ষে কোন দশক দিয়েই নির্ণয় করা যায় না। যারা তা করার চেষ্টা করেন তারা যেন সর্ষের মধ্যেই ভূত খুঁজেন। তবে কবি নজরুলেরও অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল যে রকম সীমাবদ্ধতা আমরা দেখতে পাই পল্লি কবি জসীমউদদীনের মধ্যে। জসীমউদদীনের কবিতায় শব্দের প্রাঞ্জলতা রয়েছে। বাংলা কবিতায় নতুনত্ব আনয়নে, গ্রামীণ আঞ্চলিক শব্দের সুনিপুন ব্যবহারে তার ভূমিকা অপরিসীম। তবুও তাঁর চিন্তার সংকীর্ণতা ছিল। কেবল গ্রামীণ প্রকৃতি ও জনজীবনকেই তিনি তার কাব্যে প্রধান উপজীব্য করে ফুটিয়ে তুলার চেষ্টা করেছেন। এর বাহিরে যেন আর কোন কিছু নেই; তিনি দেখেও দেখতেন না, শুনেও যেন বুঝতেন না। বিশ্বমানের সাহিত্যিক হওয়ার জন্য যা প্রধান অন্তরায় হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। তাঁর চিন্তা ধারা ছিল অনেকটা কুয়োর ব্যাঙের মত। কুয়োর ব্যাঙ যেমন পৃথিবীকে আড়াই হাত মনে করে তেমনি জসীমউদদীনও তাঁর সাহিত্যজগৎকে সংকীর্ণ করে ফেলেছিলেন কেবল একটি অঞ্চল বেছে নিয়ে। বিশ্বমানের সাহিত্যিক হতে গেলে ক্ষুদ্র অঞ্চল প্রীতি এবং সে অঞ্চলের উপকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা মোটেও সমীচীন নয়।
বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর রচনার শিল্পগুণ প্রবন্ধে বলেছিলেন,“তুমি যাহা লিখিবে লোকে পড়িবামাত্র যেন তাহা বুঝিতে পারে। যাহা লিখিলে, লোকে যদি তাহা না বুঝিতে পারিল, তবে লেখা বৃথা”। কিন্তু আফসোস! তাঁর এই বাক্যদ্বয়ের মর্মার্থ উনি নিজে বুঝে যদি ওনার সাহিত্যে তার প্রতিফলন ঘটাতে পারতেন তবে তা হয়ত সত্যিকার অর্থেই সার্থক হয়ে ওঠত। যাই হোক, ভাষার কাজ হচ্ছে সরলীকরণ। আর সে সরলীকরণের সুবাতাস একবার বইতে শুরু করলে সাহিত্যের সকল শাখাকেই তা ছুঁয়ে যায়। উত্তরাধুনিক যুগের অনেক কবিই নিজের কবিতাকে স্বতন্ত্রধারায় নিয়ে আসলেও শব্দের কাঠিন্য থেকে মুক্তি দিতে পারেন নি। যিনি কবিতাকে জড় ধর্ম থেকে মুক্তি দিয়ে সজীব করে তুললেন ভাষার সরলীকরণ দিয়ে, উত্তরাধুনিকতার খোলসকে যিনি স্বীয় সৃষ্টিশীলতার নৈপুণ্য উন্মোচিত করে তুললেনে, শব্দের দুর্বোধ্যতাকে যিনি ঝেটিয়ে বিদায় করেছেন কাব্য থেকে, বিরাম চিহ্ন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও যিনি পরিমিতি বোধ দেখিয়েছেন তিনি হলেন উত্তরাধুনিক যুগের কবিতার প্রাণভ্রমরা ড. জফির সেতু। পাঠককুল তাঁর কাব্যগ্রন্থ পাঠমাত্রই আমার কথার সত্যতা উপলব্ধি করতে পারবেন।
বাংলা চলচিত্রাঙ্গে আনোয়ার হোসেনকে প্রায় সব ছবিতেই স্টোক করে মারা যেতে দেখা যায়। এটি এতবারই হয়েছে যে সাধারণ মানুষ ধরেই নিত আনোয়ার হোসেন মানেই স্ট্রোক! ছবিতে কখন সে মারা যাবে তাও সাধারণ দর্শক আঁচ করতে পারত। যা গিনেজ বুক অব ওয়াল্ডে রেকর্ডেরও দাবি রাখে! বিষয়টা ওখানেই-গতানুগতিক ধারা কখনোই কাম্য নয় তাও আবার সেরাদের কাছ থেকে। একই জিনিসের পুনরাবৃত্তির কারণে যেমন একঘেয়েমি চলে আসে তেমনি শিল্প সফলতাও নষ্ট হয়। তথাকথিত অনেক উত্তরাধুনিক কবির প্রধান বিষয়বস্তুই ঈশ্বর এবং ধর্ম। শব্দের চাকু দিয়ে যা পুনঃপুনঃ ক্ষতবিক্ষত করে তুলেছে। এই একই কারণে সে সব কবিতা শিল্প সফলতা থেকে ছিটকে পড়েছে।

প্রথা ভাঙ্গার চর্চা নিয়ে কবিতায় এসেছিলেন ড. হুমায়ুন আজাদ ও তসলিমা নাসরিন প্রমুখরা। যা কাসেম বিন আবুবাকার ও ধর্মীয় রাজনৈতিক চেতনা সমৃদ্ধ আলমাহমুদের সৃষ্টিশীলতার বিপরীত। অর্থাৎ একই মুদ্রার যেন এপিঠ ওপিঠ। অথাৎ একদল প্রথা ভাঙতে চাইতো আর আরেক দল চাইতেন প্রথা শক্ত করতে।
এই ভাঙ্গা এবং শক্ত করতে গিয়ে সাহিত্যের শিল্প সৌন্দর্য থেকে তারা অনেকটাই ছিটকে পড়েছিলেন। যা সাধারণ পাঠ মাত্র আঁচ করা সম্ভব নয়। কেবল একটু সূক্ষ ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলেই আমার কথার সত্যতা স্পষ্ট হয়ে ওঠবে। সাহিত্যে একক উদ্দেশ্য নিয়ে অর্থাৎ ধর্মের চর্চা ক্রমাগতই করলে তা শিল্পগুণ থেকে বিচ্যুত হবে এটাই স্বাভাবিক; আর প্রগতিশীলতার নামে কবিতার চরণে চরণে নাস্তিক্যবাদ প্রচার করলেও যে তা শিল্প সফল হবে তেমনটি ভাবা মোটেও ঠিক নয়। বরং প্রকৃত চিত্র হল অনায়াসে তা শিল্প ধর্ম থেকে বিচ্যুত হবে। এদিক থেকে পুরুটাই ভিন্নধর্মী ভাব, ভাষা, অলংকরণ ও শব্দের সুনিপুন সন্নিবেশ ও বিচিত্র উপস্থাপনের কৃতিত্ব দেখিয়েছেন কবি জফির সেতু।

শতাব্দির শুরু হয়ে গেলে পিছন ফিরে তাকানোর নয়, তবুও তাকাতে হয়। এরপর বিচার করে দেখা যেতে পারে নিজেদের হালহকিকত, সৃষ্ট কর্মের অবনতি ও উন্নতি। আধুনিক যুগের প্রারম্ভে এসে আর কিছু না হোক, অন্তত পশ্চিমের একটা শিক্ষা বেশ ভালোভাবেই রপ্ত করেছিলাম আমরা। যদিও পরিস্থিতির দৈবপাকে পড়ে আমাদের সে শিক্ষা রপ্ত করতে হয়েছে। পশ্চিমা ফসল হল বিভাজন-নীতি। শিল্প ও সাহিত্যকে খণ্ড, ক্ষুদ্র ও বিচ্ছিন্ন করে দেখা। কালের ঘূর্ণাবর্তে সে বিচ্ছিন্নতা এতদূর প্রসারিত যে, কখনো বা মূলের সঙ্গে শাখা সম্পর্কহীন হয়ে পড়ে। সূক্ষ দৃষ্টিতে খেয়াল করলে তখন মনে হবে- মূল ও শাখা উভয়েই যেন দাবি করে বসছে বৃত্তের উপর কর্তৃত্বের। আমাদের সাহিত্যের ইতিহাস ছিল অখন্ড, সাহিত্যের পরিসর ছিল অসীম। দুঃখজনক হলেও সত্য, পশ্চিমা প্রভাবের কারণেই আজ সেথা বিভক্তি তথা বিভাজনের স্পষ্ট রূপ দেখা যাচ্ছে। দশকের হিসাব আসা মাত্রই সে অখণ্ডের খণ্ড রূপ স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয়।

মূলত উত্তরাধুনিকতাবাদ সমকালীন চিন্তাজগতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী একটি শব্দ। একটি বহু বিতর্কিত অভিধা। স্তুতি, নিন্দা, সমর্থন, অসমর্থন নির্বিশেষে উত্তরাধুনিকতাবাদ একটি বিপুল আলোচিত বা সমালোচিত একাডেমিক প্রপঞ্চ। অতি অল্প সময়ে বিষয়টি এত প্রচার ও প্রসার পেয়েছে যে তার সাথে একমত কিংবা দ্বিমত পোষণ করা সহজ, কিন্তু তাকে অগ্রাহ্য করা সহজ নয়।
অবশ্য তা হয় নি। তবে যা হয়েছে তা হল অতি স্তাবকতা অথবা অতি কুৎসা কিংবা যথেচ্ছ ব্যবহার; সাহিত্য শিল্পকলা, চলচিত্র, স্থাপত্য, সমালোচনাতত্ত্ব, ইতিহাস ও দর্শনের জগতে। এজন্যই হয়ত সাহিত্যবোদ্ধা উমাবার্তো ইকো আফসোস করে বলেছেন, “উত্তরাধুনিকতাবাদ একটি দুর্ভাগ্যজনক শব্দ”। তবে এ্যান্ডিয়াস হাইসেন একই সাথে আশা ও সতর্কতা উভয়ই প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “উত্তরাধুনিকতাবাদকে নিয়ে স্তব কিংবা বিদ্রুপ কোনটাই করা উচিত নয়। তাকে অবশ্যই তার সমর্থক এবং নিন্দুক উভয়ের হাত থেকেই বাঁচতে হবে। মূলত উত্তরাধুনিকতাবাদের প্রধান বিচরণ ক্ষেত্র হলো সাহিত্য শিল্পকলা ও দর্শন। তবে অপ্রিয় হলেও সত্য যে, কেবল সাহিত্যেই উত্তরাধুনিকতাবাদের অপ্রত্যাশিত প্লাবন হয়েছে।
যুগের বৈশিষ্ট্যকে অনেকেই লালন করেন তাদের সৃষ্ট সাহিত্যে। যেভাবে উত্তরাধুনিকতাবাদকে লালন করছেন একালের কবিরা। যদিও সে বৈশিষ্ট্যকে লালন করতে গিয়ে অনেকেই হারিয়ে যায় শূন্যতার অতলে। আমি মনে করি কোন সৃষ্টিই ক্ষুদ্র নয়। তা সে প্রাচ্যেই হোক আর পাশ্চাত্যেই হোক। সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ দরদ দিয়েই তা শৈল্পিক করে তুলতে হয়। আর সে দিক থেকে নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখেন একালের অন্যতম সেরা কবি ড. জফির সেতু। তিনি তার কবিতাকে যেন সন্তানসম স্নেহে গড়ে তুলেছেন। সন্তানের মাঝে যেমন ভবিষ্যতের সোনালি স্বপ্নের বীজ বপন করতে হয় ঠিক তেমনি তিনি তার কবিতায় তার প্রগতিশীল চেতনার সোনালি বীজ বপন করে চলেছেন আপন মনে।

(চলবে)
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পরিস্থিতি কি জটিল?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯

বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি, অথচ বাইরে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ার গ্যাসের শব্দে চারদিক প্রকম্পিত! মিরপুরে আমার বাসার কাছেই মেট্রো রেলের নিচে আগুন দেওয়া হয়েছে; কিছুক্ষণের জন্য মেট্রো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৯



খাওয়া দাওয়া করাটা আজকাল বিরক্তকর লাগে।
কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকতে হলে- খেতে হবে। না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। প্রিয় খাবার গুলোও খেতে ইচ্ছা করে না। ভালো লাগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৬


এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন এই গুজবটি ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইসরায়েল ট্রাম্পকে রাজি করিয়েছে, যাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই আমেরিকা ইরানে পারমাণবিক বোমা হামলা করে। বিগত বছরগুলোতে ইসরাইল সারা বিশ্বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Haze দমনে সিঙ্গাপুরের কুটনৈতিক দক্ষতা

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩১

সিঙ্গাপুর সাম্প্রতিককালে স্মরনকালের ভয়াবহ Haze (ধোঁয়াশা ও বায়ুদূষণ) এর কবলে পড়ে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সারা শহর ঘন ধোয়ার আবরনে ঢেকে যায়। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার বেঁচে থাকাই তাদের ভয়ের কারণ॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৫১





শেখ হাসিনার বেঁচে থাকা নিয়ে আক্ষেপ কেন? একটি রাজনৈতিক সমীকরণের বিশ্লেষণ

সম্প্রতি তারেক রহমানের উপদেষ্টা জাহেদুর রহমানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আলোচনা শুরু হয়েছে - "শেখ হাসিনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×