somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শিশুতোষ গল্প 'ইঁদুর ও কুনোব্যাঙ '

১০ ই মে, ২০১৫ সন্ধ্যা ৭:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




এক.

সে অনেকদিন আগের কথা। আলিমপুর গ্রামে বাস করতো এক ইঁদুর ও এক কুনোব্যাঙ। তাদের মধ্যে ছিল বেশ ভাব। একে অপরের বিপদে সর্বস্ব নিয়ে হাজির হতো। কুনুব্যাঙের মূল নাম ছিল ইটন। সে এক মজার ইতিহাস। ইটনের যখন জন্ম হলো তখন তার নানা, নানি, চাচা-চাচি, দাদা-দাদি, খালু-খালা সবাই এসে উপস্থিত। সবাই খুইব করে ধরল ইটনের দাদুকে। ইটনের দাদু ছিল সাত তল্লাটের মধ্যে সবচেয়ে চতুর এবং রসিক মানুষ। সবাই তার দিকেই তাকিয়ে রইল।

বিটন একটু ভাব নিয়ে বলল- ওর নাম হল- ঐ পর্যন্ত বলেই থেমে গেলেন। নাম আর বলেন না। সবাই বলতে থাকে- বলেন না! সবার পীড়পীড়িতে বলেই ফেলল। ওর নাম হল - দোলা। দোলা!!! বিটনের বউ চেচিয়ে বলল- এটা কোন নাম হলো? বিটন তখন ভ্রু কুচকে নামের ব্যাখ্যা করা শুরু করল। এটা মানব নাম, তবে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ এবং মজার। সবাই বলল- কীভাবে?

বিটন তখন বলতে থাকে- ও যখন বড় হবে। স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে তখন তার ছোট যারা আছে তারা তো আর তাকে নাম ধরে ডাকার সাহস পাবে না, তারা তখন তাকে ডাকবে- দুলা ভাই!!! কথাটি শেষ হতেই বিটন পরিবারে হাসির রুল পড়ে গেল। বিটনের ছেলে কিন্তু নাছোর বান্দা। কেউ তার ছেলের নাম নিয়ে পরবর্তীতে টিজ করুক এটা সে কোনভাবেই চায় না। এইকারণে সে বলল- ওটা না হয় তার ডাকনাম হল- আমাদের সম্প্রদায় মেনে তো একটা মূল নাম থাকা চাই নাকি? তখন উপস্থিত সবাই বলল- হ্যাঁ, তাই তো! তখন বিটনই তার নতুন নাম রাখলো-ইটন। সেই থেকে সার্টিফিকেটে তার নাম ইটন।

ইটনের সাথে যে ইঁদুরের ভাব তার নাম পংচি। সব ইঁদুরগুলোর নামের সাথেই সাধারণত চি থাকে। বাংলাদেশের মুসলিমদের মধ্যে নামের আগে যেমন মোহাম্মদ থাকে, হিন্দুদের নামের আগে যেমন শ্রী থাকে তেমনি আরকি! অর্থাৎ ইঁদুরে মূল নাম হল পং। আর সম্প্রদায়গত নাম হল চি। এই দুই মিলেই নাম হয়েছে পংচি।

এই পংচির সাথে ছিল ইটনের খুব ভাব। তারা দুজনে একই এলাকাতে থাকত। ইটন প্রায়ই পংচিকে মোবাইলে দাওয়াত করে আনত। ব্যাঙরা সাধারণত কলাপাতা দিয়ে মোবাইল বানায়। সে মোবাইল গুলো দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি অদ্ভুত। মজার বিষয় হলো এই মোবাইলগুলো চালাতে কোন ধরনের ব্যাটারি লাগে না। ব্যাঙরাজ্যের বিজ্ঞানী জিমিজিমি ব্যাটারিবিহীন মোবাইল আবিষ্কার করে তো এখন প্রায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে আছেন। বিশ্ব ব্যাঙসংঘ থেকেও তাকে বেশ দামি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। খ্যাতির বিরম্বনায় এখন সে অনেকটাই অতিষ্ঠ!

যাইহোক, ইঁদুরেরা সাধারণত এই প্রজাতির মোবাইল ব্যবহার করে না। কিন্তু কেউ দিলে তারা আবার না করতে পারে না। পংচির জন্মদিনে ইটন কলাপাতার একটি এন্ড্রয়েড মোবাইল উপহার দিয়েছিল। সেই থেকে তাদের বন্ধুত্বটা আরো বেড়ে গিয়েছে।
পংচির বড় ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষে ইটনকে একবার দাওয়াত করে আনলো। তারা যে বাসায় থাকত সে বাসার মালিক ছিল খুবই খারাপ। ইঁদুরদের একটু শব্দ পেলেই লাঠি নিয়ে তেড়ে আসত। ধরতে পারলে তার আর রক্ষে থাকতো না। পংচির বাসায় যেতে ইটনের সাতমাস সাতদিন লেগে গেল।

দুই

বাড়িতে বিয়ের উৎসব চলছে। কত জাতের রান্না! মাটনচি, পোলাওচি, কোর্মাচি, লাচ্চিচি, পিঠাচি, ফুলুদাচি, সন্দেশচি, হালিমচি, পুলিপিঠাচি আরও কত জাতের যে খাবার তার ইয়ত্ত্বা নেই! ইটন তো মহাখুশি। এইরকম খাবার সে আগে কখনো খায়নি। কিন্তু সমস্যা হলো বেশি খেলেই তার আবার বদ হজম হয়ে যায়। মানে পাতলা পায়খানাটাই তার একটু বেশি হয়! বন্ধুর বাড়িতে এসে তাই সে খুউব করে ভাবছে। ভাবলেই আর কী! এতো ভালো খাবার না খেলেই যে নয়! লোভ সামলাতে না পেরে সে খেতই লাগলো। ফলে যা হবার তাই হলো।

ইঁদুরেরা সাধারণ মরাপাতা দিয়ে টয়লেট বানায়। বিশাল আকারের চোঙায় পানিভর্তি করে শৌচের কাজ চালায়। ইটনের তো টয়লেটে লেফট রাইট করতে করতে শরীরের অবস্থা একেবারে প্রায় কাহিল হয়ে পড়েলো। ২০০ বারের মতো টয়লেটের কাজ সেরে বাহিরে আসতেই দেখলো বাসার মালিক দলবলসহ কী যেন পরামর্শ করছে। কাছে যেতেই শুনলো- পংচিদের সমুলে মারার পাঁয়তারা করছে।
ইটন বন্ধু পংচিকে সব খুলে বললো। পংচি প্রথমে বিশ্বাস করলো না। তারপর ঠিকই যখন দেখলো ছোট বাটিতে লাললাল কী যেন মাখা আছে তখনই সে একটু অনুমান করল। একটু পর যখন দেখল অনেকগুলো মাছি বাটির চারপাশে মরে পরে আছে তখনই তার সম্পূর্ণ বিশ্বাস হল। অবস্থা খারাপ দেখে পংচির পরিবারের সবাই মিলে জরুরি বৈঠক বসলো। বৈঠকের সিদ্ধান্ত মোতাবেক আজ রাতেই তারা এ বাসা ছেড়ে দেবে। আপাদত পংচির নানা বাড়িতে গিয়ে উঠবে। পংচির নানা বাড়ি হল ইটনের এলাকায়। যে কথা সেই কাজ।

সবার জীবন রক্ষা করার জন্য ইটনকে পংচিদের পরিবারের সবাই খুব ধন্যবাদ দিল। বিশেষ করে পংচির মা তো তাকে খুউব করে আদরও করলো। সেই সাথে স্নেহভরাট কণ্ঠে বলল- তুমি আমার আরেক ছেলে। ছেলে কথাটি শুনতেই আনন্দে ইটনের চোখে পানি এসে গেল। তার কারণও আছে। গেল বছর মালবাহি গাড়ির সাথে আকস্মিক দুর্ঘটনায় তার মায়ের অকাল মৃত্যু হয়েছে। সেই থেকে কেউ তাকে ছেলে বললেই সে আহ্লাদে গলে পড়ে।

তারা টিটিংটিটিং নামের দ্রুতযানে চড়ে সাতমাস সাত দিনের মাথায় ইটনের এলাকায় গিয়ে পৌঁছলো। পংচির নানাবাড়িতে যেতে হলে কাঠের সাঁকো পাড়ি দিয়ে যেতে হয়। একে একে সবাই সাঁকো পাড়ি দিলেও পংচি শ্লিপ কেটে পানিতে পড়ে গেল। পংচির চিৎকার আর দেখে কে! সে কী চিৎকার! তার পরিবারে সবাই দেখছে কিন্তু কেউ কিছুই করার সাহস পাচ্ছে না। খুব ক্ষুরধারা স্রোত। একবার পড়লে আর বেঁচে উঠার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। সবাই শুধু কিনারে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসছে না। বিষয়টি দেখে ইটনের খুবই খারাপ লাগতে লাগলো।

সবচাইতে আশ্চর্য বিষয় হলো পংচির পরিবারের কেউই সাঁতার জানে না। আর এই কারণেই কেউ সাহস করে পানিতে নামছে না। পংচি স্রোতে প্রায় তলিয়েই যাচ্ছে। এমন সময় ইটন পানিতে লাফ দিয়ে পড়ে গেল। অনেক কষ্ট করে পংচির কাছে গেল। পংচিকে বলল- আমার পিঠে ওঠ। পংচি শিশুর মতো তাই করলো। কয়েক ঘণ্টা অক্লান্ত পরিশ্রমের পর ইটন নদীর কিনারে পৌঁছল। কিন্তু ততক্ষণে স্রোত তাদের আরেক এলাকায় নিয়ে এসেছে। কিনারে উঠেই পংচি ইটনকে বুকে জড়িয়ে ধরলো। আনন্দাশ্রু ছেড়ে বলল- আমরা একে অপরের জন্ম জন্মের বন্ধু। সেই থেকে ইঁদুর ও কুনোব্যাঙদের মধ্যে এখনো বন্ধুত্ব রয়েছে।
----------------------------
১০.০৫.২০১৫
মুনশি আলিম
টিলাগড়, সিলেট


সর্বশেষ এডিট : ২০ শে মে, ২০১৫ বিকাল ৩:৪৫
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ডায়েরী- ২০১

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৩১



এবছর দেশে আমড়ার ফলন ভালো হয়েছে।
আমড়ায় আছে প্রচুর ফাইবার যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। এক কেজি আমড়া মাত্র ৫০ টাকা। এক কেজি আপেল ৩৫০ টাকা। মালটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×