
এক.
-জামাই আমার যেমন তেমন, দেবর হইল মনের মতোন!
অনিককে কথাটি বলেই ফিক করে হেসে উঠলো কণিকা। সেকি হাসি! ঝর্ণার স্বচ্ছ জলরাশির মতোই প্রবহমান। শুরু হলে যেন আর থামতেই চায় না! অদ্ভুত সুন্দর চোখ। ভাবের বধ্যভূমিতে যখন অনুভূতির নিশান টাঙিয়ে টানাটানা চাহনিতে উন্মুখ থাকে তখন মনে হবে যেন- পৃথিবীর সব সাজানো মুগ্ধতা তার চাহনির ভাঁজে ভাঁজে উপচে পড়ছে। ছিপছিপে গড়ন। চিবুকের ডানদিকে ছোট একটিও তিল রয়েছে। ঘরের কোথাও ফুলের টব রাখলে তা যেমন ঘরের সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে তোলে তেমনি কণিকার তিলটিও তার সৌন্দর্যকে অনেকাংশেই বাড়িয়ে দিয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে কণিকা দেখার মতো ভারী মিষ্টি মেয়ে। গেল মাসে সে আঠারতে পা দিয়েছে। গ্রামদেশে এই একটি প্রবণতা অনেকটা মহামারির মতোই ব্যপ্ত। মেয়েরা শারীরীকভাবে একটু বেড়ে উঠতে না উঠতেই তাদের বিয়ের জন্য পরিবারের সদস্যরা উঠে পড়ে লেগে যায়। ফলে শাররীকভাবে কিছুটা বেড়ে উঠলেও মানসিকভাবে তারা থাকে অনেক পিছিয়ে।
অনিকের চাচাত ভাই সৈকতের সাথে বছর চারেক আগে তার বিয়ে হয়েছে। তখন ভালো করে শাড়ি-কাপড় পরা তো দূরে থাক সেলোয়ার কামিজ পরাও তার জন্য কষ্টকর ছিল। বিয়ের প্রথম কয়েক মাস তো সৈকত তার কাছে ঘেঁষতেই পারে নি। খালি হাতে বিদ্যুৎ স্পর্শ করলে যেমন শক করে সৈকত কণিকাকে স্পর্শ করা মাত্রও যেন তেমনি সে শক করতো!
প্রায় মাস দুয়েক ধরে অনিকের সাথে কণিকার সুসম্পর্ক । গাইতে গাইতে যেমন গায়ক হয়, বাজাতে বাজাতে যেমন পরিপক্ক বাদক হয়, তেমনি কাছে আসতে আসতেও সুসম্পর্কের সৃষ্টি হয়। জীবিকার তাগিদে নতুন বউ রেখে প্রায় মাস ছ’য়েক আগে সৈকত বিদেশে পাড়ি জমায়। ফলে বাড়িতে অনেকটাই একা হয়ে পড়ে কণিকা। নিজের বয়সী একমাত্র অনিকই রয়েছে। গেল মাসে তাদের বিয়ের আজ চার বছর পূর্তি হয়েছে; কিন্তু প্রকৃতিগত কারণেই তাদের কোন সন্তানাদি হয় নি।
কণিকা নিজে ফুটেফুটে হলে কী হবে- পড়াশোনায় ছিল সে একেবারেই দুর্বল। পড়াশোনার দৌরাত্ম ক্লাস থ্রি পর্যন্ত! ভালোভাবে সে বাক্যগঠনও করতে পারে না। অবশ্য এ নিয়ে তার দুঃখেরও কমতি ছিল না। নিজের ভাগ্যকে তো দোষ দেয়-ই, সাথে সাথে পিতামাতাকেও দোষারূপ করতে দ্বিধাবোধ করে না। হায়রে! একটি চিঠি লেখার জন্যও গ্রামের অনেকের কাছে দিনের পর দিন ধরনা দিতে হয়! বেশির ভাগ শিক্ষিত মানুষই ব্যস্ততা দেখায়। কেবল ব্যস্ততা দেখায় না অনিক। মুচকি হেসে বলে- ভাবি, আপনার যে কোন প্রয়োজনে যে কোন সময় আমাকে বইলেন- জীবন দিয়ে হলেও...!
অনিকের কথা শুনে কণিকা হাসে। হাসতেই থাকে। সে হাসির সুবাস ছড়িয়ে পড়ে অনিকের হৃদয়ের গহীন থেকে গহীনে। স্রষ্টা সে হাসি যাকে দিয়েছে তার আর অন্য কিছু করার দরকার নেই! কণিকা মনে মনে দূঢ় সিদ্ধান্ত নেয় অনিককে দিয়েই চিঠি লিখাবে।
প্রায়ই চিঠি লিখতে লিখতে গভীর রাত হয়ে যেত অনিকের। কণিকা সামনে বসে থাকলেই কেবল গভীর ভাব আসে তার। আর সে ভাবের বুনন চলে চিঠির পৃষ্ঠা জুড়ে। একবার তারা দুজনে খুব কাছাকাছি বসা। কণিকার খোলা চুল। হঠাৎ দমকা হাওয়ায় তার চুলের কিছু অংশ ওড়ে অনিকের মুখ ঢেকে যায়। অনিক অজানা আনন্দে চোখ বন্ধ করে। এভাবেই সূত্রপাত! এরপর প্রায়ই অনিক লেখার ছলে দীর্ঘ দৃষ্টি নিয়ে কণিকার দিকে তাকিয়ে থাকে। কণিকার প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চ জ্ঞান না থাকলেও সে চাহনির অর্থ বুঝে। কেবল আগ-বাড়িয়েই কিছু করতে চায় না। ঐ যে নারীর বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না- সেরকমই অবস্থা আরকি!
এভাবে কাছে আসার মাধ্যমেই তাদের মধ্যে অন্যরকম এক সম্পর্কের সূত্রপাত। সময়ের সাথে সাথে সে সম্পর্কটা ক্রমশই ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হতে থাকে। কণিকার শাশুড়ী নীলিমা বেগম। তিনিও নিরক্ষর। তবুও পুত্রবধূর পরকীয়া সম্পর্ক আঁচ করতে তার বিন্দুমাত্রও বেগ পেতে হয় নি। কেবল যথেষ্ট প্রমাণ ও সময়-সুযোগের অভাবের কারণেই কাউকে কিছু বলতে পারছে না।
প্রতিবেশী অনেকেই কানাঘুষা করে দেখে তিনি অনেকটাই বিচলিত হয়ে পড়লেন। শেষটায় পুত্র বধুর সতীত্ব টিকেয়ে রাখার জন্য অনিকের মার দ্বারস্থ হয়। আলাপ-আলোচনা বা খোশ গল্পের শেষ পর্যায়ে নীলিমা বেগম বলেন-
-ভাবী অনিকরে একটু কইয়া দিবেন তো যাতে বউডার লগে একটু কম কম মিশে-
- ক্যান? কী হইছে?
- না, তেমুন কিছু না! ত্বয় মাইনশে কানাঘুষা করে। আপনি বুজেনই তো, নতুন বউ! ... সোময় থাকতে শাসন করাই ভালো।
তারপর কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে কী যেন বললো। অনিকের মা আছিয়া খাতুন মাথা নাড়ে। নীলিমা বেগমের সাথে আছিয়া খাতুনের দহরম মহরম সম্পর্ক। তারপর চা পান চলতে থাকে।
দুই.
বিকেল বেলা। সূর্য তখন অনেকটাই পশ্চিমাকাশে হেলে পড়েছে। অনিক কলেজ থেকে বাড়ি ফিরলে তার মা তাড়াতাড়ি করে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করে। খাবার পরিবেশন শেষ হয়ে গেলে অনিকের মা পান খেয়ে হাসতে হাসতে বলে
- বাজান, তুমি তো অহন বড় অইছো, বেবাকই বুজ, কাজেই একটু কইলেই বাকীটা বুইজা নিও।
- কী হইছে মা?
- কণিকার লগে তুমি একটু কম মিশবা,
-কেন মা? হঠাৎ এ কথা কইলা ক্যান?
- নানান জনে নানান কথা কয়।
- কেড়া কয় খালি তার নামডা একবার কও। সে অনেকটাই উত্তেজিত হয়ে পড়ে। নিজের সততার মাপকাঠি বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্যই সে অনেকটা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। অনেকটা চোরের মা’র বড় গলার মতোই ভয়াভহ ব্যাপার!
- রাগের দরকার নাই বাবা। অহন থেইক্কা একটু কম মিশলেই ভাল অয়। আর আমি জানি তুমি মায়ের কথা ফেলবা না। ঠিক না বাবা?
- অনিক মাথা নাড়ে।
মায়ের কথায় অনিক লজ্জাবতী গাছের মতোই লজ্জায় যেন নুয়ে পড়ছে। সে মাথা নিচু করে খুব দ্রুত খাওয়া শেষ করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। এর পর থেকে অনিক কণিকার সাথে কম কথা বলে। কণিকা প্রয়োজনীয় কোন কথা বললেও অনিক এড়িয়ে যায়। কণিকা বুঝতে পারে- তাকে নিশ্চয়ই কিছু বলা হয়েছে। কিন্তু চাইলেই কি অনিক না মিশে থাকতে পারে? যার সাথে সম্পর্কটা শুধু মনে মনে নয়; দৈহিক পর্যন্তও গড়িয়েছে, তাকে কী করে এতো সহজে ভুলে যাবে? তারপরে ও নিজেকে অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে অনিক।
কয়েকদিন পর কণিকা নিজেই অনিকের কাছে আসে। তার স্বামী রহমানের কাছে চিঠি লিখতে হবে। অনিক চিঠি লিখছে। মুকুল তার খুব কাছা-কাছি। গাঢ় রাত্রি দোহন করে উন্মত্ত বাতাস নুইয়ে দিচ্ছে গাছ-পালা। আকাশে কালো মেঘেরা আজ এমন অবস্থাই করেছে যে- ‘কয়েক হাজার লণ্ঠন জালিয়ে ও মনে হয় সূর্যবাবুর দেখা তো দূরের কথা তার আলোর লেশ ও রোধ করি পাওয়া দুস্কর!
বিজলি চমকাচ্ছে। একটু পর পরই বজ্রপাতের বিকট শব্দ। কণিকা বজ্রপাতের শব্দকে সবচেয়ে, বেশি ভয় পায়। অনেক মেয়ে যেমন তেলাপোকা দেখে ভয় পায় টিক তেমনি আরকি! তাই বজ্রের শব্দ তার কানে যাওয়া মাত্রই সে অনিককে জড়িয়ে ধরে। দুটি জানালাই খোলা। কোথাও অন্য মানুষের অনাগোনা দেখা গেল না। কণিকা অনিককে জড়িয়ে ধরলে অনিক কি আর বসে থাকতে পারে? তার উপড় আজকের এই ঘোর অন্ধকারে দিন। অনিকও তাকে আরো কাছে টেনে নেয়। ঠোঁটে ঠোঁটে রাখে।
এমন সময় হঠাৎ করেই পাশের রুম থেকে কাগজের খচখচ শব্দ হল। সেই শব্দ মুকুলের কানে না গেলেও অনিকের কানে ঠিকই গেল। অনিক দ্রুত কণিকা থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বেড়ার পাশে চলে গেল। সহসাই কণিকা কিছু বুঝে উঠতে পারছিল না বটে কিন্তু অনিকের বুঝতে বাকী রইল না যে কেউ তাদের লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছে। সে বুদ্ধি করে ছোট আয়নাটা লাঠিতে বেঁধে তা পাশের রমের উপরের দিকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ধরে দেখতে থাকে।
দেখামাত্রই অনিকের হাত পা কাঁপতে শুরু করলো। সে যেন মুখ ফুটে এখন আর ভালোভাবে কথাই বলতে পারছে না। পক্ষাঘাতগ্রস্থ রোগীদের মতোই তার চোখে মুখে জড়তা নেমে এল। কিন্তু কণিকার চঞ্চলতা, আবেগের স্ফুরণ কোনকিছুই যেন বাঁধ মানছে না। এমন সুযোগ কী আর সব সময়ই আসে? এমন সুযোগ পেয়েও সে সুযোগ হাতছাড়া করছে দেখে কণিকার খুব রাগ হতে লাগলো। বোকা হাদারাম কোথাকার! মনে মনে হাজারও গালি দিলো। সমুদ্র জোয়ারের মতোই আজ আবেগ উপচে পড়ছে কণিকার হৃদয়ে। শরীর জুড়ে বিদ্যুতের উষ্ণতা সততই ঢেউ খেলে যাচ্ছে। অভিমানভরে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে কণিকা। রহস্যের ধুম্রজাল উন্মোচনের লক্ষ্যে সে বিনয়াবত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল-
- তোমার কি অইছে। অমন করতাছ কেন?
- অনিক নীরব।
-পাশের রুমে কি এমন দেখলা যে তোমার হাত পাও কাঁপতাছে?
-নীরব।
-কথা কও না কেন?
লজ্জা, ঘৃণা আর অজ্ঞাত ভয়ে অনিকের চোখ দিয়ে পানি চলে এল। আবছা অন্ধকারে কণিকা তা খেয়াল করলো কি না তা স্পষ্ট বুঝা গেল না। অনেকক্ষণ পর নীরবতা ভেঙ্গে অস্পষ্ট স্বরে বলল-
- মা ফুটো দিয়ে সব কিছুই দেখছে।’
-কও কী!
কণিকা তখন লজ্জায় আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে এই প্রচণ্ড ঝড়ের মাঝেও দ্রুত বেরিয়ে গেল। সেই যে গেল এরপর কখনোই সে আর অনিকের সাথে কথা বলার চেষ্টা করে নি।
-------------------
০৭.০৭.২০১৫
মুনশি আলিম
জাফলং, সিলেট

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


