বাল্টিমোরের কনভেনশন সেন্টারে এইমাত্র আলবার্তো গার্সিয়া তার পেপারটি উপস্থাপন শেষ
করেছেন। ওভারহেড প্রোজেক্টরের সুইসটি অফ করে তিনি হলভর্তি দর্শকদের দিকে তাকালেন।
বিজ্ঞানীদের কনফারেন্সে বক্তব্য শেষ হবার পর সাধারণত ছোট একটি সৌজন্যমূলক করতালি
দেয়া হয় কিন্তু এবারে একটি বিস্ময়কর নীরবতা বিরাজ করল। এই সেশনটির সভাপতি সেন্ট
জন বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃদ্ধ অধ্যাপক বব রিকার্ডো প্রথমে করতালি দিতে শুরু করলেন এবং
গ্যালারীর প্রায় দুই হাজার শ্রোতা হঠাৎ করে চেতনা ফিরে পেয়ে করতালিতে যোগ দিল। দেখতে
দেখতে করতালির প্রচণ্ড শব্দে হলঘরটি ফেটে যাবার উপপ্প ঙ্ক হল কিন্তু তবুও সেটি থেমে যাবার
কোনো লক্ষণ দেখা গেল না, বরং একজন-দু'জন করে সবাই দাঁড়িয়ে গিয়ে উরুগুয়ের একটি
অখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের অখ্যাত বিজ্ঞানীকে সম্মান দেখাতে শুরু করলেন। বিজ্ঞানীদের
কনফারেন্সে সাধারণত সাংবাদিকরা থাকেন না কিন্তু জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারদের এই বার্ষিক
কনফারেন্সে আলবার্তো গার্সিয়া যে পেপারটি উপস্থাপন করবেন তার কথা কিভাবে জানি বাইরে
প্রকাশিত হয়ে গিয়েছিল, কাজেই আজ এখানে হলভর্তি সাংবাদিক। ফটো তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
হওয়া সত্ত্বেও সাংবাদিকদের ক্যামেরা ফ্ল্যাশ জ্বলতে শুরু করল, এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি ধরে
রাখার জন্যে শ্রোতাদের অনেকে তাদের ক্যামেরা বের করে ছবি তুলতে শুরু করলেন।
বৃদ্ধ অধ্যাপক বব রিকার্ডো শেষ পর্যন্ত উঠে দাঁড়ালেন, তাকে নির্দিষ্ট সময়ের মাঝে সেশনটি
শেষ করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। যদি এখনই তিনি নিয়ন্ত্রণটুকু হাতে না নিয়ে নেন সেটি সম্ভব
হবার কথা নয়। বব রিকার্ডোকে উঠে দাঁড়াতে দেখে শ্রোতারা তাদের করতালি থামিয়ে একজন
একজন করে নিজের চেয়ারে বসে পড়লেন, সাংবাদিকদের দলটি ঠেলাঠেলি করে আরো সামনে
এসে ভিড় করে দাঁড়াল। বব রিকার্ডো কি বলেন শোনার জন্যে সবাই নীরব হয়ে অপেক্ষা করতে
থাকে।
বব রিকার্ডো উপস্থিত শ্রোতাদের দিকে তাকিয়ে একটি নিশ্বাস ফেলে কোমল গলায়
বললেন, "আলবার্তো গার্সিয়ার নাম আমাদের মতো কয়েকজন ছাড়া কেউ জানত না। কিন্তু
আজ থেকে পৃথিবীর সব মানুষ আলবার্তোর কথা জানবে। আজকের কনফারেন্সে সে যে
পেপারটি উপস্থাপন করেছে আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে সেটি অত্যন্ত সাদামাটা একটি টেকনিক্যাল পেপার, কোষ-বিভাজনের সময় মানব-প্প ঙ্কমাজমের টেলোমিয়ারকে অক্ষত রাখার প্রপ্পি ঙ্কা। কিন্তু
একটু খুঁটিয়ে দেখলেই দেখা যাবে সে শুধু টেলোমিয়ারকে অক্ষত রাখেনি, টেলোমারেজ প্রপ্পি ঙ্কাটি
বিশেব্জ্থষণ করেছে এবং সফলভাবে মানবকোষে ব্যবহার করেছে। আমরা তার তথ্য থেকে জানতে
পেরেছি আলবার্তোর সাদাসিধে একটি ল্যাবরেটরিতে একটি পেটরি-ডিশে মানবদেহের ত্বকের
কয়েকটি কোষ বিভাজন করছে যাদের থেমে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।"
বব রিকার্ডো বার্ধক্যে শীর্ণ হয়ে যাওয়া তার হাতটি সামনে তুলে ধরে বললেন, "আমাকে
বার্ধক্য এবং জরা আপ্প ঙ্কন্ত করেছে, কারণ প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী আমার দেহের কোষগুলো
তাদের হিসেবমত একশ থেকে দুশবারের মতো বিভাজন করে থেমে পড়েছে। মঞ্চে দাঁড়ানো
আলবার্তো বলছে থেমে পড়ার প্রয়োজন নেই। আলবার্তো গার্সিয়া মানবজাতির পক্ষ থেকে
সৃষ্টিজগতের সবচেয়ে গুরুত্বগূর্ণ তথ্যটি খুঁজে বের করেছে। সে আজ আপনাদের সামনে ঘোষণা
করেছে মানুষকে বার্ধক্য স্পর্শ করবে না।" বব রিকার্ডো হঠাৎ থেমে গেলেন, কয়েক মুহূর্ত
ইতস্তত করে বললেন, "প্রকৃতপক্ষে আলবার্তো মানুষকে অমরত্ব দান করেছে।"
হলঘরটিতে হঠাৎ এক ধরনের চাঞ্চল্য দেখা গেল, একসাথে অনেকে কথা বলতে শুরু
করল, অনেকে প্রশড়ব করার জন্যে উঠে দাঁড়াল। বব রিকার্ডো হাত তুলে সবাইকে থামিয়ে দিয়ে
বললেন, "আমি জানি আপনাদের সবার ভিতরে অসংখ্য প্রশড়ব জমা হয়েছে, আমার নিজের
ভিতরেও আছে। কিন্তু আজকে আমাদের হাতে সময় নেই, আমি এখানে মাত্র অল্প দু-একটি
প্রশড়ব গ্রহণ করতে পারব। কে প্রশড়ব করতে চান ?"
উপস্থিত বিজ্ঞানীদের অনেকেই হাত তুলে প্রায় দাঁড়িয়ে গেলেন, বব রিকার্ডো তাদের
একজনকে সুযোগ দেয়ার জন্যে উঙ্গিত করছিলেন কিন্তু তার আগেই কমবয়সী একজন তরুণী
হাতে মাইপ্পে ঙ্কফোন নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল; অনুমতির অপেক্ষা না করেই বলল, "প্রফেসর রিকার্ডো
- আমরা সংবাদপত্র থেকে এসেছি, আপনাদের বৈজ্ঞানিক আলোচনা আমরা কিছুই বুঝব না।
সেটি কি পরে করা যায় না ? আপাতত আমাদের কৌতুহল মেটানোর জন্যে কি একটি-দুটি
প্রশেড়বর উত্তর দেওয়া যায় না ?"
বব রিকার্ডো একটু হাসার চেষ্টা করে বললেন, "কি প্রশড়ব ?"
তরুণীটি আরো একটু এগিয়ে এসে বলল, "আমি ডক্টর গার্সিয়ার কাছে জানতে চাই তিনি
কেন এই আবিষ্কারটি করেছেন ?"
আলবার্তো গার্সিয়াকে একটু বিভ্রান্ত দেখা গেল, তিনি সপ্রশড়ব দৃষ্টিতে তরুণী সাংবাদিকের
দিকে তাকিয়ে বললেন, "কেন ?"
"হঁ্যা, কেন ?"
আলবার্তো গার্সিয়া একটু বিপনড়ব মুখে বললেন, "টেলোমারেজ নিয়ে আমার অনেকদিনের
কৌতুহল। আমাদের ল্যাবরেটরিতে সেরকম সুযোগ-সুবিধে নেই, তাই যেটুকু পেরেছি সেটুকুই
করেছি। মানবকোষকে কিভাবে অনির্দিষ্ট সময় বিভাজন করতে দেয়া যায় সেটি বিজ্ঞানীমহলের
দীর্ঘদিনের কৌতুহল। আমি সেই কৌতুহল থেকে কাজ করেছি-"
"কিন্তু মানুষ যদি অমর হয়ে যায় - তাদের যদি মৃতু্য না হয় -"
আলবার্তো গার্সিয়া হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, "আমি একজন বিজ্ঞানী, আমি
শুধু বিজ্ঞানের কৌতুহল নিয়ে কাজ করেছি। এই তথ্যের কারণে মানবসমাজে কি প্রভাব পড়বে
সে-সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই।"
তরুণী সাংবাদিক উৎকণ্ঠিত মুখে বলল, "কিন্তু এখন আমরা সেটাই শুনতে চাই। মানুষ
যদি অমর হয়ে যায় এই পৃথিবীর কি হবে ? সমাজের কি হবে ?"
আলবার্তো গার্সিয়া মাথা নাড়লেন, বললেন, "আমি জানি না।" একমুহূর্ত চুপ করে থেকে
তিনি বব রিকার্ডোর দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললেন, "হয়তো প্রফেসর রিকার্ডো এ ব্যাপারে
আপনাদের কিছু-একটা বলতে পারবেন।"
সাংবাদিকরা সাথে সাথে বব রিকার্ডোর দিকে ঘুরে গেল, "প্রফেসর রিকার্ডো, আপনি কি
কিছু বলবেন ?"
বব রিকার্ডো কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, "ভবিষ্যত অনুমান করা খুব কঠিন, কিন্তু
তোমরা যদি আমাকে চাপ দাও আমি চেষ্টা করতে পারি।"
"আমরা চাপ দিচ্ছি প্রফেসর রিকার্ডো।"
বব রিকার্ডো একটু হেসে কথা বলতে শুরু করলেন, কথা শুরু করার সাথে সাথে তার
মুখের হাসি মিলিয়ে সেখানে একটি থমথমে গাম্ভীর্য চলে এল। প্রায় নীচুগলায় বললেন,
"মানুষের অমরত্বের জন্যে মোহ দীর্ঘদিনের। এই অমরত্বের লোভে সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল
থেকে অনেক অন্যায় অনেক পাপ করা হয়েছে। দেবদেবী বা ঈশ্বর মানুষকে যে-অমরত্ব দিতে
পারেনি, আমাদের বিজ্ঞানীরা মানুষকে সেই অমরত্ব দেয়ার আয়োজন সম্পনড়ব করেছে। এখনও সেই কাজ পূর্ণ হয়নি কিন্তু আমার হিসেবে আগামী শতাব্দী থেকে মানুষ আর বার্ধক্যের কারণে
মৃতু্যবরণ করবে না।"
বব রিকার্ডোকে বাধা দিয়ে একজন সাংবাদিক জিজ্ঞেস করল, "তাহলে কিসে তাদের মৃতু্য
হবে ?"
"রোগ, শোক, একসিডেন্ট, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, হত্যাকাণ্ড। কিন্তু পৃথিবীর হিসেবে সেটি
অত্যন্ত ক্ষুদ্র। মানুষের যদি মৃতু্য না হয়, দেখতে দেখতে এই পৃথিবীতে জনসংখ্যার এক ভয়াবহ
বিষ্ফোরণ ঘটবে। এই পৃথিবীতে থাকবে শুধু মানুষ আর মানুষ। আজ থেকে হাজার বছর পর
এই পৃথিবীতে পদচারণা করবে সহস্র বছরের যুবা, তাদের চোখে কী থাকবে - স্বপড়ব না হতাশা
আমি জানি না, তাদের বুকে কী থাকবে, ভালোবাসা না ঘৃণা সেটাও আমি জানি না। আমার
বয়স সত্তুর, আমি এখনো আমার শৈশবকে স্মরণ করতে পারি, সহস্র বছরের মানুষ কি তার
শৈশবকে স্মরণ করতে পারবে ? আমার মনে হয় পারবে না। তাদের স্মৃতিতে কোনো আনন্দ
নেই, তাদের সামনে ভবিষ্যত নেই, কোনো স্বপড়ব নেই। বেঁচে থাকার কোনো তাড়না নেই।
তাদের সমাজে কোনো শিশু নেই, কোনো ভালোবাসা নেই - তাদের কথা চিন্তা করে আমি
শিউরে উঠছি।"
একজন পৌঢ় সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলেন, "তাহলে আপনি কি মনে করেন ড. আলবার্তো
গার্সিয়াকে পৃথিবীর ইতিহাস ভালোভাবে স্মরণ করবে না ?"
বব রিকার্ডো বিষণড়বমুখে মাথা নেড়ে আলবার্তো গার্সিয়ার দিকে তাকালেন, বললেন, "আমি
দুঃখিত আলবার্তো। কিন্তু আমার ধারণা মানব সভ্যতাকে ধ্বংস করার জন্যে পৃথিবীর ইতিহাস
এককভাবে তোমাকে দায়ী করবে। তুমি হবে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অভিশপ্ত
বিজ্ঞানী।"
আলবার্তো গার্সিয়া ফ্যাকাশে মুখে বব রিকার্ডোর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
দুই হাজার বছর পরের কথা।
নিশি রনের গলা জড়িযে বলল, "তুমি এরকম মুখ ভার করে আছ কেন ?"
রন অন্যমনস্কভাবে নিশির হাত সরিয়ে বলল, "কে বলেছে আমি মুখ ভার করে আছি ?"
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



