শিরীন ডাইনিং টেবিলে বসে কাজ করছিল। মাথা তুলে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অসহিষ্ণু গলায়
তপুকে উদ্দেশ্য করে গলা উঁচিয়ে বলল, "তপু। কয়টা বেজেছে দেখেছিস ?"
তপু তার ঘর থেকে চিৎকার করে বলল, "আর এক মিনিট আম্মু।"
"এক মিনিট এক মিনিট করে কয় মিনিট হয়েছে খেয়াল আছে ?"
"এই তো আম্মু -"
"প্রত্যেক দিনই একই ব্যাপার। ঘুমুতে দেরি করিস আর সকালে বিছানা থেকে টেনে তোলা
যায় না।"
"এই তো আম্মু হয়ে গেছে।"
শিরীন হাতের কাগজগুলো ডাইনিং টেবিলের উপর রেখে তপুর ঘরে দেখতে গেল সে কী
নিয়ে এত ব্যস্ত। যা অনুমান করেছিল ঠিক তাই। কম্পিউটারের কি-বোর্ডে দ্রুত কিছু-একটা
টাইপ করছে, মনিটরে উজ্জ্বল রঙের কিছু-একটা ছবি যার কোন মাথামুণ্ডু নেই। শিরীন জোরে
একটা ধমক লাগাতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই তপু উজ্জ্বল চোখে বলল, "দেখেছ আম্মু ?
একটা নূতন সঙিঊন সেভার। তুমি এটাকে গেম হিসেবে ব্যবহার করতে পারো। যখন তুমি টাইপ
করবে তখন লেভেল পাল্টাবে। যদি ঠিক ঠিক ম্যাচ করে তখন নূতন একটা রং বের হয়।"
তপু ঠিক কি বলছে শিরীন ধরতে পারল না কিন্তু সে এত উৎসাহ নিয়ে বলল যে তাকে
আর বকতে মন সরল না। বারো বছরের ছেলের নিজস্ব একটা জগৎ আছে সেটা সে দেখতে
পায় কিন্তু ভিতরে প্রবেশ করতে পারে না। কাজেই সম্পূর্ণ অর্থহীন এই ব্যাপারটিতে খানিকটা
উৎসাহ দেখানোর জন্যে জিজ্ঞেস করল, "কোথায় পেয়েছিস এই সঙিঊন সেভার ?"
"আমার ই-মেইলে এসেছে।"
"কে পাঠিয়েছে ?"
"আমি জানি না।"
নাম নেই ঠিকানা নেই মানুষেরা কিভাবে অন্যদের সময় নষ্ট করার জন্যে এসব পাঠায়
ব্যাপারটা সে ভালো করে বুঝতে পারল না, কিন্তু সে বোঝার চেষ্টাও করল না। বলল, "ঠিক
আছে। অনেক হয়েছে, এখন শুতে যা।"
তপু কম্পিউটারটা বন্ধ করতে করতে বলল, "তুমি বিশ্বাস করবে না আম্মু, এই সঙিঊন
সেভারটা কী মজার। একই সাথে গেম আর সঙিঊন সেভার। অন্য গেমের মতো না। এটা
খেলতে মনোযোগ দিতে হয়। কত তারাতারি তুমি উত্তর দাও তার উপর সব কিছু নির্ভর করে।
রংটা এমনভাবে পাল্টায় যে মনে হয় তোমার সাথে কথা বলছে। মনে হয় -"
"ব্যস, অনেক হয়েছে।" শিরীন মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে বলল, "এখন দুধ খেয়ে দাঁত ব্রাশ
করে ঘুমা।"
দুধ খাবার কথা শুনে তপু 'আহারে' জাতীয় একটা কাতর শব্দ করল কিন্তু তাতে শিরীনের
হৃদয় দ্রবীভূত হল না।
একটু পরেই শিরীন তপুর বিছানার কাছে দাঁড়িয়ে দেখল যে মানুষটিকে রীতিমত ধাক্কাধাক্কি
করে বিছানায় পাঠানো হয়েছে, বালিশে মাথা রাখা মাত্রই সে ঘুমিয়ে একেবারে কাদা হয়ে
গেছে। তার নিজের ঘুম নিয়ে সমস্যা হয় মাঝে মাঝে, চোখে ঘুম আসতে চায় না, তখন ঘুমের
টেবলেট খেয়ে ঝিম মেরে পড়ে থাকা একটি অন্যধরনের ঘুমের মাঝে ডুবে থাকতে হয়। শিরীন
তপুর দিকে তাকাল। ছেলেটি দেখতে তার বাবার মত হয়েছে, উঁচু কপাল, খাঁড়া নাক, ঘন
কালো চুল, টকটকে ফরসা রং। শিরীনের সাজ্জাদের কথা মনে পড়ল, যার এরকম একটা
ফুটফুটে বাচ্চা আছে সে কেমন করে স্ত্রী-পুত্রকে ছেড়ে চলে যেতে পারে ? কেমন আছে এখন
সাজ্জাদ ? যাদের জীবনের ছোট ছোট জিনিসে তৃপ্তি নেই তারা কি কখনো কোথাও শান্তি খুঁে জ
পায় ?
শিরীন আবার তার টেবিলে ফিরে এসে কাগজপত্রগুলো নিজের কাছে টেনে নিল। অফিসের
কাজ খুব বেড়ে গেছে, প্রতিদিনই সে অফিসের কিছু ফাইল বাসায় নিয়ে আসে। সেগুলো দেখে
নোট লিখে রেডি করতে করতে ঘুমুতে দেরি হয়ে যায়। শিরীনের অবশ্যি সেটা নিয়ে কারো
বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। এতদিনে সে শিখে গেছে পৃথিবী খুব কঠিন জায়গা, মেয়েদের
জন্যে আরো অনেক বেশি কঠিন। সময়মতো এই চাকরিটা পেয়ে গেছে বলে সে ভাগ্যের কাছে
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, তা না হলে সাজ্জাদ চলে যাবার পর ছেলেটিকে নিয়ে সে কোথায় যেত
কে জানে।
সকালে তপুকে নাস্তা করতে তারা দিতে দিতে শিরীন খবরের কাগজটিতে চোখ বুলিয়ে
নেয়, পুরো কাগজে পড়ার মত কোন খবর নেই। সারা পৃথিবীতেই কোনো মানুষের মনে যেন
কোনো শান্তি নেই। কলারাডোতে একজন মানুষ বাচ্চাদের স্কুলে এসে সাতটা বাচ্চাকে গুলি
করে মেরে ফেলেছে। দ্বিতীয় বিয়ে করার অনুমতি দেয়নি বলে মাগুরাতে একজন মানুষ তার
স্ত্রীকে এসিড ছুড়ে মেরেছে। ঢাকায় বারো বছরের একটা বাচ্চা তার ছোট বোনকে কুপিয়ে খুন
করে ফেলেছে। শিরীন বিশ্বাস করতে পারে না তপুর বয়সী একটা ছেলে কেমন করে কুপিয়ে
নিজের বোনকে মেরে ফেলতে পারে। শিরীন অবাক হয়ে ভাবল, পৃথিবীটা কি হয়ে যাচ্ছে !
অফিসে নিজের টেবিলে যাওয়ার সময় শিরীন দেখল একাউন্টেন্ট কামাল সাহেবের টেবিলের
সামনে ছোটখাটো একটা ভিড়। তিনি হাত-পা নেড়ে কিছু একটা বর্ণনা করছেন, অন্যেরা
আগ্রহ নিয়ে শুনছে। শিরীন শুনল কামাল সাহেব বলছেন, "দেখে বোঝার উপায় নেই। শান্তশিষ্ট
ভদ্র ছেলে, পড়াশোনায় ভালো, কোনো সমস্যা নেই। হঠাৎ করে খেপে উঠল। রাত দুইটার
সময় রানড়বাঘর থেকে এই বড় একটা চাকু নিয়ে এইভাবে কুপিয়ে -"
কামাল সাহেব তখন কুপিয়ে খুন করার দৃশ্যটি অভিনয় করে দেখালেন, দেখে শিরীনের
কেমন জানি গা গুলিয়ে উঠল। সে জিজ্ঞেস করেছে, "কার কথা বলছেন ?"
"আরে ! আপনি আজকের পত্রিকা পড়েন নাই ? এটা তো এখন টক অব দা টাউন।
সোনালী ব্যাংকের ডি.জি.এমের ছেলে। বারো বৎসর বয়স। আমাদের ফ্ল্যাটে তার ভায়রা থাকে।
ছেলেটা ছোটবোনকে খুন করেছে - পড়েন নাই পত্রিকা ?"
"পড়েছি।" শিরীন দুর্বল গলায় বলল, "ভেরি স্যাড।"
কামাল সাহেব মাথা নেড়ে প্রবেল হতাশার ভঙ্গি করে বললেন, "এই দেশে কোনো আইন
নেই, কোনো সিস্টেম নেই। আমেরিকা হলে ব্যাপারটা স্টাডি করে বের করে ফেলত। আমার
ছোট শালা নিউজার্সি থাকে। একবার তার অফিসে -"
শিরীন নিজের টেবিলে যেতে যেতে শুনল কামাল সাহেব একটি অত্যন্ত বীভৎস খুনের বর্ণনা
দিচ্ছেন, খুঁটিনাটিগুলো এমনভাবে বলছেন যে শুনে মনে হয় খুনটি তার চোখের সামনে হয়েছে।
শুনে শিরীনের গা গুলিয়ে উঠতে লাগল।
ডাইনিং টেবিলে তপু চোখ বড় বড় করে বলল, "আম্মু, জানো কী হয়েছে ?"
"কী হয়েছে।"
"আমাদের স্কুলে ক্লাস নাইনে একটা মেয়ে পড়ে, তার নাম রাফিয়া। তার একজন কাজিন
আছে, মডেল স্কুলে পড়ে। সে তার ছোটবোনকে মেরে ফেলেছে। এত বড় চাকু দিয়ে -"
শিরীন চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে একটা বিষম খেল, আজকের দিনে এই ঘটনাটা
তিনবার শুনতে হল। একটা ভালো ঘটনা মানুষের মুখে মুখে ছড়ায় না, কিন্তু ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর আর
বিভৎস ঘটনা সবার মুখে মুখে থাকে।
"খুন করার আগে রাফিয়াকে একটা ই-মেইল পাঠিয়েছে। লিখেছে আই হ্যাভ টু ডু ইট।
আমাকে এটা করতে হবে।" তপু চোখ বড় বড় করে বলল, "কীভাবে খুন করেছে জানো ?"
শিরীন মাথা নেড়ে বলল, "না, জানি না। কিন্তু জানার কোন ইচ্ছেও নেই। এইসব খুন-
জখমের ব্যাপারে তোদের এত ইন্টারেস্ট কেন ?"
রগরগে খুনের বর্ণনাটা দিতে না-পেরে তপু একটু নিরুৎসাহিত হয়ে অন্য প্রসঙ্গে গেল,
"এখন ছেলেটার কী হবে আম্মু ? ফাঁসি হবে ?"
"এত ছোট ছেলের ফাঁসি হয় না।"
"তাহলে কী হবে ?"
"আমি ঠিক জানি না। বাচ্চা একটা ছেলে তো আর এমনি-এমনি খুন করে ফেলে না,
নিশ্চয়ই পিছনে অন্য কোনো ব্যাপার আছে। সেটা খুঁজে বের করে তার চিকিৎসা করতে হবে।"
"কী চিকিৎসা ?"
"সাইকোলজিস্টরা বলতে পারবে। আমি তো আর সাইকোলজিস্ট না - আমি এত কিছু
জানি না।" আলোচনাটা অন্যদিকে ঘোরানোর জন্যে বলল, "হোম ওয়ার্ক সব শেষ করেছিস ?"
তপু দাঁত বের করে হেঁসে বলল, "করে ফেলেছি। আজকের অঙ্ক মিস আসে নাই, তাই
কোন হোমওয়ার্কও নাই !"
শিরীন হেসে বলল, "খুব মজা, না ?"
তপু মাথা নাড়ল, বলল, "হঁ্যা !"
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




