"তপু সম্মোহিতের মতো বলল, "কিছু হয়নি।"
"কার সাথে কথা বলছিস তুই ?"
"সেভারের সাথে।"
"সেভার ? সেভার কে ?"
"সঙিঊন সেভার। লাউভ সেভার। নেট সেভার। সোল সেভার।"
শিরীন চিৎকার করে বলল, "কী বলছিস তুই পাগলের মতো ? তপু কী হয়েছে তোর ?"
তপু হঠাৎ করে যেন জেগে উঠল, অবাক হয়ে তাকাল শিরীনের দিকে, বলল, "কী হয়েছে
আম্মু ?"
"তোর কী হয়েছে ?"
"আমার ? আমার কিছু হয়নি ?"
"তাহলে এখানে এভাবে বসে ছিলি কেন ? কার সাথে তুই কথা বলছিলি ?"
তপুকে হঠাৎ যেন কেমন বিভ্রান্ত দেখায়, কী যেন চিন্তা করে ভুরু কুঁচকে তারপর মাথা
নেড়ে বলল, "মনে নেই আম্মু। কী যেন একটা খুব ইম্পরট্যান্ট একটা ব্যাপার। খুব জরুরি -"
শিরীন হঠাৎ করে কেমন জানি খেপে গেল, চিৎকার করে বলল, "বন্ধ কর কম্পিউটার।
এক্ষুনি বন্ধ কর। বন্ধ কর বলছি।"
তপু কেমন জানি ভয় পেয়ে কম্পিউটার বন্ধ করে শিরীনের দিকে তাকাল। শিরীন হিংস্র
গলায় বলল, "আর কোনদিন তুই কম্পিউটারের সামনে বসতে পারবি না। নেভার। বুঝেছিস ?"
তপু অবাক হয়ে শিরীনের দিকে তাকিয়ে রইল, সে যেন ঠিক বুঝতে পারছে না তার আম্মু
কী বলছে।
রাতে ডাইনিং টেবিলে বসে শিরীন শুনতে পেল তপু ঘুমের মাঝে বিছানায় ছটফট করছে।
মনে হয় বুঝি কোনো একটা দুঃস্বপড়ব দেখছে। শিরীন তপুর মাথার কাছে বসে রইল, শেষপর্যন্ত
যখন শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল তখন সে নিজের বিছানায় এল শোয়ার জন্যে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে
সে অনেক রাত পর্যন্ত জেগে রইল - তার চোখে কিছুতেই ঘুম আসছে না।
পরদিন দুপুরের পর শিরীন তাদের অফিসের সিস্টেম এডেমিনিস্ট্রেটর শাহেদ আহমেদকে
খুঁজে বের করল। যে-কোন সিস্টেম এডমিনের মতোই শাহেদ কমবয়সী, উৎসাহী এবং
হাসিখুশি মানুষ। শিরীনকে দেখে বলল, "কী হয়েছে আপা ? সিস্টেম ডাউন ?"
"না, না, সিস্টেম ঠিক আছে।"
"তাহলে ?"
"আপনি তো কম্পিউটার এক্সপার্ট, আপনাকে একটা জিনিস জিজ্ঞেস করি।"
"কী জিনিস ?"
শিরীন ইতস্তত করে বলল, "কম্পিউটার কী ছোট বাচ্চাদের উপর কোন প্রভাব ফেলতে
পারে ?"
"অবশ্যই পারে।" শাহেদ উজ্জ্বল চোখে বলল, "কম্পিউটার হচ্ছে একটা টুল। এই টুলটা
ব্যবহার করে কতকিছু করা যায়, কতকিছু শেখা যায় -"
"না, না -" শিরীন মাথা নেড়ে বলল, "আমি ভালো প্রভাবের কথা বলছি না, খারাপ
প্রভাবের কথা বলছি।"
শাহেদ এবার সরু চোখে শিরীনের দিকে তাকাল, বলল, "কীরকম খারাপ প্রভাব ?"
"ধরুন, পাগল হয়ে যাওয়া ?"
শাহেদ হেসে বলল, "না, সেরকম কিছু আমি কখনো শুনিনি।"
"কোনো কম্পিউটার গেম কী আছে যেটা খেললে বাচ্চাদের ক্ষতি হয় ?"
"সেটা তো থাকতেই পরে। আজকাল কী ভয়ানক ভয়ানক ভায়োলেন্ট গেম তৈরি করছে।
এত গ্রাফিক যে সেগুলো খেলে খেলে বাচ্চারা ইনসেনসেটিভ হয়ে যেতে পারে। ভায়োলেন্সে
অভ্যস্ত হয়ে যেতে পারে। গত বছর দুটি ছেলে আমেরিকার স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের গুলি করে মারল
- তারা নাকি কী একটা কম্পিউটার গেম থেকে খুন করার আইডিয়াটা পেয়েছে।"
শিরীন ইতস্বত করে বলল, "কিন্তু কম্পিউটার গেম নয় - সঙিঊন সেভার থেকে কি কোনো
ক্ষতি হতে পারে ?"
শাহেদ হেসে বলল, "সঙিঊন সেভারটা তৈরি হয়েছে সঙিঊনের ফসফরকে বাঁচানোর জন্যে।
কোনো একটা ডিজাইন, নকশা, এটা দেখে আর কী ক্ষতি হবে। তবে -"
"তবে ?"
"যাদের এপিলেন্সি আছে তাদেরকে কম্পিউটার গেম খেলতে নিষেধ করে। কোথায় নাকি
স্টাডি করে দেখেছে মনিটরের ফ্লিকার দেখে তাদের সিজু্যর ট্রিগার করতে পারে। আমি নিজে
দেখিনি, শুনেছি।"
শাহেদ কথা থামিয়ে একটু অবাক হয়ে বলল, "হঠাৎ আপনি এসব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন
কেন ?"
শিরীন পুরো ব্যাপারটি খুলে বলবে কি না চিন্তা করল, কিন্তু হঠাৎ তার কেমন জানি
সংকোচ হল। সে মাথা নেড়ে বলল, "না, এমনিই জানতে চাচ্ছিলাম।"
শাহেদের সাথে কথা বলে শিরীন নিজের টেবিলে এসে দীর্ঘসময় চুপচাপ বসে থাকে। তার
মাথায় কয়দিন থেকেই একটা সন্দেহ উঁকি দিচ্ছে। যতই সময় যাচ্ছে ততই সন্দেহটা আরো
প্রবলভাবে নিজের উপর চেপে বসছে। শেষ পর্যন্ত সে সন্দেহটা মিটিয়ে নেয়ার সিগ্ধান্ত নিল,
ডাইরি থেকে টেলিফোন নাম্বার বের করে দৈনিক প্রথম খবরে ফোন করে হাসান জামিলের সাথে
কথা বলতে চাইল। কিছুক্ষণের মাঝেই টেলিফোনে একজনের ভারী গলা শুনতে পেল,
"হ্যালো। হাসান জামিল।"
শিরীন এর আগে কখনো খবরের কাগজের অফিসে ফোন করেনি, খনিকটা দ্বিধা নিয়ে
বলল, "আপনি আমাকে চিনবেন না, আমি আপনাদের পত্রিকার একজন পাঠক।"
"জি্ব। কী ব্যাপার ?"
"বেশ কয়েকদিন আগে আপনি আপনাদের পত্রিকায় 'দুর্বোধ্য কৈশোর' নামে একটা
প্রতিবেদন লিখেছিলেন।"
"হঁ্যা লিখেছিলাম। অনেক টেলিফোন কল পেয়েছিলাম তখন।"
"আমিও সেটা নিয়ে কথা বলতে চাইছি।" শিরীন একটু ইতস্তত করে বলল, "সেই ব্যাপার
নিয়ে আমি একটা জিনিস জানতে চাইছি।"
"কী জিনিস ?"
"আপনি যেসব কিশোর-কিশোরীর কথা লিখেছেন, আই মিন যারা খুন করেছে বা
আত্দহত্যা করেছে বা অন্যভাবে ডিস্টার্বড তাদের কী কোনোভাবে কম্পিউটারের সাথে সম্পর্ক
আছে ? মানে তারা কী এর আগে কোনোভাবে কম্পিউটার দিয়ে প্রভাবিত হয়েছে ?"
হাসান জামিল টেলিপোনের অন্যপাশে দীর্ঘসময় চুপ করে থেকে আস্তে আস্তে বলল, "খুব
অবাক ব্যাপার যে আপনি এটা জিজ্ঞেস করলেন। ব্যাপারটা আমরাও লক্ষ্য করেছি - যারা যারা
ডিস্টার্বড সবাই কম্পিউটারে অনেক সময় দেয়, কিন্তু সেটাকে আমরা কোনো কো-রিলেশন
হিসেবে ধরিনি।"
"কেন ধরেননি ?"
"মনে করুন সবাই তো নিশ্চয়ই সকালে নাস্তা করে, দুপুরে ভাত খায়; তাহলে কি বলব
যারা সকালে নাস্তা করে বা দুপুরে ভাত খায় তারা সকলেই ডিস্টার্বড।"
শিরীন একটু প্প ঙ্কদ্ধ হয়ে বলল, "এটা খুব বাজে যুক্তি।"
"যুক্তি পছন্দ না হলেই আপনারা বলেন বাজে যুক্তি।"
"আপনি যেসব কিশোর-কিশোরীর কথা লিখেছেন তাদের সবাই কি ঘটনার আগে আগে
কম্পিউটারের কোনো একটা বিশেষ জিনিস নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে ছিল না ? সামথিং ভেরি
স্পেসিফিক ?"
হাসান জামিল আমতা আমতা করে বললেন, "ইয়ে সেরকম একটা কথা আমরা শুনেছি।
কনফার্ম করতে পারি নি -"
"সাংবাদিক হিসেবে আপনাদের কি দায়িত্ব ছিল না কনফার্ম করা ?"
"দেখুন আমরা সাংবাদিক, তার অর্থ এই নয় যে আমরা সমাজের বাইরে। সমাজের প্রতি
আমাদের একটা দায়িত্ব আছে। আমরা চেষ্টা করছি দেশকে তথ্যপ্রযুক্তিতে এগিয়ে নিতে। এখন
যদি কম্পিউটার নিয়ে একটা ভীতি ছড়িয়ে দিই - অকারণ ভীতি -"
"অকারণ ভীতি ? অকারণ ?"
"যেটা প্রমানিত হয়নি -"
"আপনারা প্রমান করার চেষ্টা করেননি -"
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




