somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্ক্রিন সেভার - মুহম্মদ জাফর ইকবাল (4র্থ খন্ড)

১৩ ই মে, ২০০৬ ভোর ৫:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হাসান জামিল আবার আমতা আমতা করে কিছু-একটা বলতে চাইছিল কিন্তু শিরীনের
আর কিছু শোনার ধৈর্য থাকল না। সে রেগেমেগে টেলিফোনটা রেখে গুম হয়ে টেবিলে বসে
রইল।
একটা চাপা দুশ্চিন্তা নিয়ে শিরীন বাসায় ফিরে এসে দেখে তপু বসে বসে হোমওয়ার্ক
করছে। শিরীনকে দেখে হাত তুলে বলল, "আম্মু, তুমি এসেছ !"
"হঁ্যা বাবা। তোর কী খবর ?"
"বাংলা খবর -" বলে তপু হি হি করে হাসল। এটা একটা অত্যন্ত পুরাতন এবং
বহুলব্যবহৃত রসিকতা, তবুও শুনে শিরীনও হাসল এবং হঠাৎ করে তার মন ভালো হয়ে গেল।
শিরীন তপুর মাথার চুল এলোমেলো করে দিয়ে খানিকক্ষণ এটা-সেটা নিয়ে কথা বলে আসল
প্রসঙ্গে চলে এল। বলল, "তপু।"
"কী আম্মু।"
"আমি ঠিক করেছি তুই এখন কয়েকদিন কম্পিউটার ব্যাবহার করতে পারবি না।"
শিরীন ভেবেছিল তপু নিশ্চয়ই চিৎকার করে আপত্তি করবে, নানারকম ওজর-আপত্তি
তুলবে, নানা যুক্তি দেখাবে। কিন্তু সে কিছুই করল না, অত্যন্ত বাধ্য ছেলের মতো মাথা নেড়ে
বলল, "ঠিক আছে আম্মু।"
গভীর রাতে হঠাৎ শিরীনের ঘুম ভেঙে গেল। ঠিক কেন ঘুম ভেঙেছে সে বুঝতে পারল না,
তার শুধু মনে হল খুব অস্বাভাবিক কিছু-একটা ঘটছে কিন্তু সেটা কি সে বুঝতে পারছে না। সে
চোখ খুলে তাকাল, তার মনে হলো সারা বাসায় হালকা নীল একটা আলো। শুধু তাই নয়, মনে
হল খুব চাপাস্বরে কেউ একজন কাঁদছে, ইনিয়ে বিনিয়ে কানড়বা। শিরীন ধড়মড় করে উঠে বসল।
আলোটা মনের ভুল নয়, সত্যিই হালকা নীল রঙের একটা আলো। কিসের আলো এটা ?
শিরীন বিছানা থেকে নেমে নিজের ঘর থেকে বের হতেই দেখল তপুর ঘরের দরজা
আধখোলা, আলোটা তার ঘর থেকে আসছে। শিরীন প্রায় ছুটে সেই ঘরে ঢুকে আলোর উৎসটা আবিষ্কার করল, কম্পিউটারের মনিটরের আলো। মনিটরে বিচিত্র একটা ছবি, সেটি ধীরে ধীরে
নড়ছে এবং স্পিকার থেকে চাপা কানড়বার মতো একটা শব্দ হচ্ছে - মনে হচ্ছে ঝড়ো বাতাসের
শব্দ, তার মাঝে কেউ একজন ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদছে। মনিটরের অপার্থিব নীল আলোতে তপুর
ঘরটিকে একটি অপার্থিব জগতের দৃশ্য বলে মনে হচ্ছে। শিরীন অবাক হয়ে তপুর বিছানার
দিকে তাকাল, বিছানার এককোণায় তপু গুটিশুটি মেরে বসে মনিটরটির দিকে তাকিয়ে থরথর
করে কাঁপছে। শিরীন কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, "কী হয়েছে তোর, তপু ? কী হয়েছে ?"
তপু কাঁদতে কাঁদতে বলল, "ভয় করছে আম্মু। আমার খুব ভয় করছে।"
"ভয় কী বাবা ? তোর ভয় কিসের ?"
শিরীন ঘরের লাইট জ্বালিয়ে তপুর কাছে এগিয়ে যায়। মশারি তুলে তপুর কাছে গিয়ে
বসল। হাঁটুর ওপরে মুখ রেখে বসেছে, চোখ থেকে পানি বের হয়ে গাল ভিজে আছে। চোখের
দৃষ্টি অপ্রকৃতিস্থের মতো, একধরনের আতঙ্ক নিয়ে মনিটরটির দিকে তাকিয়ে আছে। হাতদুটি
পিছনে, অত্যন্ত বিচিত্র একটি বসে থাকার ভঙ্গি। শিরীন তপুর পিঠে হাত রেখে বলল, "তোকে
না কম্পিউটার চালাতে নিষেধ করেছিলাম ?"
"আমি চালাইনি আম্মু। বিশা্বাস করো আমি চালাইনি।"
"তাহলে কে চালিয়েছে ?"
তপু ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, "আমি জানি না।"
"ঠিক আছে বাবা, কম্পিউটার বন্ধ করে দিচ্ছি।"
তপু হঠাৎ চিৎকার করে বলল, "না।"
"না !" শিরীন অবাক হয়ে বলল, "কেন না ?"
"আমার ভয় করে আম্মু - আমি বলতে পারব না -"
শিরীন অবাক হয়ে তপুর পিঠে হাত বুলিয়ে হাতটা নিচে আনতেই হঠাৎ সেখানে একটা
ধাতব শীতল স্পর্শ অনুভব করল। পিছনে তাকাতেই সে অবাক হয়ে দেখল তপু দুই হাতে
একটা চাকু ধরে রেখেছে। রানড়বাঘরে এই চাকু দিয়ে সে শাকসব্জি কাটে। শিরীনের মেরুদণ্ড দিয়ে
ভয়ের একটা শীতল স্রোত বয়ে যায় এবং কিছু বোঝার আগে হঠাৎ করে তপু দুই হাতে চাকুটা
উপরে তুলে শিরীনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করল।
শিরীন প্রস্তুত ছিল বলে ঝটকা মেরে একপাশে সরে গেল এবং তপুর চাকুটা বিছানার
ভেতরে ঢুকে গেল। শিরীন চিৎকার করে তপুর হাতটা খপ করে ধরে ফেলল কিন্তু অবাক হয়ে
আবিষ্কার করল এইটুকু মানুষের শরীরে ভয়ঙ্কর জোর। তপু হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে তাকে ফেলে
দিয়ে আবার চাকুটা উপরে তুলে ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেলে বলল, "আম্মু আমি মারতে চাই
না আম্মু - কিন্তু আমি কী করব। আমাকে বলেছে মারতেই হবে -" তপু কথা শেষ করার
আগেই আবার চাকুটি নিয়ে শিরীনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। শিরীন ঝটকা মেরে আবার সরে
গিয়ে চেবিলের নীচে ঢুকে গেল। ভয়ংকর আতঙ্ক নিয়ে দেখল তপু চাকুটা হাতে নিয়ে এগিয়ে
আসছে। সে ভেউ ভেউ কাঁদছে - কাঁদতে কাঁদতে এগিয়ে আসছে, তার কিছু করার নেই,
তাকে কেউ একজন আদেশ দিচ্ছে সেই আদেশ সে অমান্য করতে পারবে না।
শিরীন দেখল তপু আরো একটু এগিয়ে এসেছে, ঠিক তখন সে কম্পিউটারের পাওয়ার
কর্ডটা টান দিয়ে খুলে ফেলল। একটা চাপা শব্দ করে মনিটরটি অন্ধকার হয়ে গেল এবং সাথে
সাথে তপু মাটিতে টলে পরে গেল। শিরীন কাছে গিয়ে দেখে সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। তপুকে
বুকে চেপে ধরে সে বের হয়ে আসে, হামাগুড়ি দিয়ে সে টেলিফোনের কাছে ছুটতে থাকে -
তাকে হাসপাতালে নিতে হবে। তাকে বাঁচাতে হবে।
মাসখানেক পরের কথা। শাহেদের রুমে শিরীন তার সাথে কথা বলছে। শাহেদ হাসিমুখে
বলল, "আপনার অনুমান সত্যি। আপনার কথা বিশ্বাস করলে আরো অনেক মানুষকে বাঁচানো
যেত।"
শিরীন কোন কথা বলল না। শাহেদ বলল, "কিন্তু ব্যাপারটি বিশ্বাস করবে কীভাবে ? এটা
তো বিশ্বাস করার কথা নয়। একটা কম্পিউটার প্রোগ্রাম বাচ্চাদের সম্মোহিত করে ভয়ংকর
ব্যাপার ঘটাচ্ছে, এটা কি বিশ্বাস করা যায় ?"
শিরীন মাথা নাড়ল। বলল, "তা যায় না।"
"আপনার ছেলে এখন কেমন আছে ?"
"ভালো। প্রতিদিন বিকেলে এখন আমি ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিই খেলার
জন্যে। দৌড়াদৌড়ি করার জন্যে।"
"ভেরি গুড। ঐ রাতের ঘটনা কিছু মনে করতে পারে ?"
"না, পারে না। আমি চাইও না তার মনে পড়ুক।"
শাহেদ হাসার চেষ্টা করে বলল, "ঠিকই বলেছেন।"
শিরীন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, "ঐ সঙিঊন সেভারটা কে তৈরি করেছে সেটা কি বের
করতে পেরেছে ?"
শাহেদ মাথা নাড়ল, বলল, "না। অনেক চেষ্টা করা হচ্ছে কিন্তু এখনও বের করতে পারে
নি। সঙিঊন সেভারটা এত অদ্ভূত এত অস্বাভাবিক যে সবাই একটা অন্য জিনিস সন্দেহ করছে।"
"কি সন্দেহ করছে ?"
"এটা কোনো মানুষ লিখেনি।"
"তাহলে কে লিখেছে ?"
"ইন্টারনেট।"
"ইন্টারনেট ?"
"হঁ্যা - ইন্টারনেট হচ্ছে অসংখ্য কম্পিউটারের একটা নেটওয়ার্ক - ঠিক মানুষের মস্তিষ্কের
মতো। অনেকে মনে করছে পৃথিবীর ইন্টারনেটের বুদ্ধিমত্তা এখন মানুষের বুদ্ধিমত্তা থেকে
বেশি।"
"মানে ?"
"তার মানে মানুষ নেটওয়ার্ককে নিয়ন্ত্রন করছে না। নেটওয়ার্কই মানুষকে নিয়ন্ত্রন
করছে।"
শিরীন চমকে উঠে বলল, "কী বলছেন আপনি !"
"হঁ্যা। সবাই ধারনা করছে এই সঙিঊন সেভারটি ছিল তাদের প্রথম চেষ্টা - পরের বার
আ্#956;মনটা হবে আরো পরিকল্পিত। আরো ভয়াবহ।"
শিরীন কোনো কথা না বলে চোখ বড় বড় করে শাহেদের দিকে তাকিয়ে রইল।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সীমিত মগজ, লিলিপুটিয়ান, ডোডো পাখি (সৌজন্যে - চাঁদগাজী)...

লিখেছেন বিচার মানি তালগাছ আমার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সকাল ১১:২৯



১. যেনা করব আমরা, ৫০১-এ যাব আমরা, পার্কে যাব আমরা। তুমি তো আলেম। তুমি কেন যাবে? তুমি তো ইসলামের সবক দাও সবাইকে। তুমি মাহফিলে কোরআন, হাদীস বয়ান কর। তুমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

মহাজন জিন্দা হ্যায়!!!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৭



মনে পড়ে, ঠিক এক বছর আগে গত বছর এই সময়ের দিকে ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া ভেসে যাচ্ছিল 'মহাজন স্যারকে আরও ৫ বছর বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে দেখতে চাই' টাইপের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম অটুট, মৌলভিরা নন: সমালোচনা মানেই অশ্রদ্ধা নয়

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৬



নবী ইউসুফ (আ.)-এর সময় মিসরীয়রা 'আমুন' দেবতার পূজা করত। মিসরের শাসক আপোফিসকে তার পিতা তৎকালীন পুরোহিতদের কুচক্রী স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। এই পুরোহিতরা ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজ্যসভা থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৈশব- কৈশোর বেলার গল্প

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৭



আমাদের শৈশব ছিলো অতিশয় প্রাণপ্রাচুর্যময় যদিও শৃঙ্খলাপূর্ণ।
একালের মতো বিলম্বিত শয্যা ত্যাগ রীতিমতো গর্হিত অপরাধ! শয্যা ত্যাগ করেই বিশেষত অবকাশের দিন গুলোতে নিয়মিত গন্তব্য ছিলো কারো কারো খেলার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ পাখির জগত

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:০০



টোনাপাখি লেজ নাচিয়ে গাইছে মধুর গান।
গান শুনে টুনিপাখি আহ্লাদে আটখান।

টোনা যখন উড়ে ঘুরে অন্য ডালে বসে।
টুনি এসে ঠিক তখনই বসে তারই পাশে।

বুলবুলিদের পাড়ায় আজ দারুণ শোরগোল।
নানা শব্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×