"তোমাকে দেখার আমার একটু কৌতুহল ছিল -" বলে হাজীব কুন্তেরা, রাহান জাবিলের দিকে
তাকিয়ে একটু হাসল। হাজীব কুন্তেরার চেহারায় বিচিত্র একধরনের নিষ্ঠুরতা রয়েছে। এই
হাসিটি হঠাৎ করে সেই নিষ্ঠুরতাটিকে কেন জানি খোলামেলাভাবে প্রকাশ করে দিল।
রাহান জাবিল হঠাৎ করে একধরনের আতঙ্ক অনুভব করে, এই মানুষটির আমন্ত্রণ রক্ষা
করে এখানে আসা হয়তো খুব বুদ্ধিমানের কাজ হয়নি। সে বেশ চেষ্টা করে মুখে একধরনের
বেপরোয়া এবং শান্তভাব ধরে রেখে জিজ্ঞেস করল, "কেন ? আমাকে দেখার তোমার কৌতুহল
কেন ?"
"আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী মানুষ। ইচ্ছে করলে আমি মাঝারি একটা দেশের
রাষ্ট্রপতি পাল্টে দিতে পারি। আমাকে নিয়ে খবরের কাগজে রিপোর্ট লিখে সেই মানুষটি কেমন
দেখার কৌতুহল।"
"আমি একজন সাংবাদিক। সত্যকে প্রকাশ -" রাহানের বক্তৃতাটি মাঝপথে থামিয়ে হাজীব
কুন্তেরা বলল, "থাক।"
রাহান খানিকটা অপমানিত বোধ করে কিন্তু হঠাৎ করে যে-কোন মূল্যে সত্যকে প্রকাশ
করার সাংবাদিকদের বিশেষ দায়িত্ব সম্পর্কে বক্তৃতা দেয়ার উৎসাহ হারিয়ে ফেলে।
হাজীব কুন্তেরা টেবিলে তার আঙ্গুল দিয়ে শব্দ করতে করতে বলল, "আমি যা ভেবেছিলাম
তুমি ঠিক তাই।"
রাহান ভুরু কুচঁ কে জিজ্ঞেস করল, "সেটি কী ?"
"কমবয়সী, অপরিপক্ক, নির্বোধ এবং আহাম্মক।"
রাহান হতভম্ব হয়ে মানুষটির দিকে তাকিয়ে রইল। একজন মানুষ যত বিত্তশালীই হোক,
যত ক্ষমতাবানই হোক, সে কি অন্য একজনের সাথে এই ভাষায় কথা বলতে পারে !
রাহান কিছু-একটা বলতে যাচ্ছিল, হাজীব আবার হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল, বলল,
"রাগ করো না। তোমার বয়সে আমিও নির্বোধ এবং আহাম্মক ছিলাম।"
রাহান প্প ঙ্কদ্ধ গলায় বলল, "আমি নির্বোধ এবং আহাম্মক নই।"
হাজীব রাহানের কথার উত্তর না দিয়ে অত্যন্ত বিচিত্র ভঙ্গিতে হাসল এবং হঠাৎ করে রাহান
বুঝতে পারল সে আসলেই নির্বোধ এবং আহাম্মক। সে খানিকক্ষণ একধরনের অক্ষম আপ্পে ঙ্কশ
নিয়ে হাজীবের সবুজ চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, "তুমি
কেন আমাকে ডেকে পাঠিয়েছ ?"
"কথা বলার জন্যে।"
রাহান ভুরু কুচঁ কে বলল, "কথা বলার জন্যে ?"
"হঁ্যা। আমার আসলে কথা বলার লোক নেই।"
"কথা বলার লোক নেই ?"
"না। যারা আমার কর্মচারী তারা কখনো আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস
পায় না। যারা পরিচিত তারা তোষামুদি করে।"
"তোমার আপনজন ?"
"আমার কোনো আপনজন নেই।"
রাহান ভুরু কুঁচকে বলল, "আমি তোমার উপর রিপোর্ট করেছি, আমি জানি তোমার
দুইজন স্ত্রী আছে, তিনজন ছেলেমেয়ে আছে।"
হাজীব এবারে শব্দ করে হাসল, এই হাসিটি হল শেব্জ্থষে পরিপূর্ণ এবং সে-কারণে মানুষটিকে
অত্যন্ত কুশ্রী দেখাল। রাহান মানুষটির মুখের দিকে তাকিয়ে একধরনের ঘৃণা অনুভব করে।
হাজিব হাসি থামিয়ে বলল, "আমার স্ত্রী এবং ছেলেমেয়ে প্রতিমুহূর্তে আমার মৃতু্য কামনা করে।"
"কেন ?"
"তুমি সাংবাদিক, এটা তোমার জানার কথা।"
রাহান কোন কথা বলল না, সে আসলেই জানে। ছোটখাটো সম্পদ মানুষের জীবনে সুখ
আনতে পারে, ভয়ংকর ঐশ্বর্যের বেলায় সেটি সত্যি নয়, পারিবারিক জীবনটিকে সেটি কুৎসিত
ষড়যন্ত্রে পাল্টে দেয়।
হাজীব বলল, "আমি আমার স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েকে নিয়ে তোমার সাথে কথা বলতে চাই
না।"
"তাহলে কী নিয়ে কথা বলতে চাও ?"
"তোমাকে নিয়ে।"
রাহান অবাক হয়ে বলল, "আমাকে নিয়ে ?"
"হঁ্যা।"
"আমাকে নিয়ে তুমি কী কথা বলতে চাও ?"
হাজীব তার ডেস্ক থেকে একটা খবরের কাগজ বের করে টেবিলে রেখে বলল, "এখানে
তুমি আমার সম্পর্কে একটা বিশাল আলোচনা ফেঁদেছ।"
না-তাকিয়েও রাহান বুঝতে পারে হাজীব কোন লেখাটার কথা বলছে, একটি অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত
দৈনিক পত্রিকায় তার এই নিবন্ধটি ছাপা হয়েছিল। হাজীবের টাকার উৎস, তার নানা ধরনের
অপরাধ, তার অমানবিক নৃশংসতা কিছুই সে বাদ দেয়নি। হাজীব চেষ্টা করে মুখে একটু হাসি
ফুটিয়ে বলল, "তুমি এখানে আমার চরিত্রটি বিশেব্জ্থষণ করার চেষ্টা করেছ।"
রাহান মাথা নাড়ল। হাজীব বলল, "তুমি আমার সম্পর্কে কতটুকু জানো ?"
"পৃথিবীতে তোমার সম্পর্কে যত তথ্য আছে আমি তার সব জোগাড় করে বিশেব্জ্থষণ
করেছি।"
"আমি মানুষটা কেমন বলে তোমার ধারণা ?"
রাহান একটু ইতস্তত করে বলল, "খারাপ।"
"কত খারাপ ?"
"বেশ খারাপ।"
"সেটা কতটুকু সে সম্পর্কে তোমার ধারণা আছে ?"
রাহান কোন কথা না বলে হাজীবের দিকে তাকিয়ে রইল। হাজীব একটা নিশ্বাস ফেলে
বলল, "আমার ধারণা সে সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণা নেই।"
হাজীব ঠিক কি বলতে চাইছে রাহান সেটা অনুমান করার চেষ্টা করল কিন্তু খুব একটা
লাভ হল না। সে কিছু-একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই হাজীব উঠে দাঁড়াল, বলল,
"চলো।"
"কোথায় ?"
"এখানে একটা চিড়িয়াখানা আছে, তোমাকে সেটা দেখাব।"
"চিড়িয়াখানা !" রাহান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "তোমার নিজস্ব চিড়িয়াখানা আছে ?"
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




