somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চিড়িয়াখানা - মুহম্মদ জাফর ইকবাল (2য় খন্ড)

১৩ ই মে, ২০০৬ ভোর ৫:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

"হঁ্যা। বড়লোকদের অনেক রকম খেয়াল থাকে। কেউ মূল্যবান রতড়ব সংগ্রহ করে, কেউ
দুষ্প্রাপ্য ছবি সংগ্রহ করে - আমি সেরকম দুষ্প্রাপ্য প্রাণী সংগ্রহ করি।"
"দুষ্প্রাপ্য প্রাণী ?"
"হঁ্যা।"
"কীরকম দুষ্প্রাপ্য ?"
"আমার কাছে যেগুলো আছে, মনে করো সেগুলো পৃথিবীর কারো কাছে নেই !"
সেটি কিভাবে সম্ভব রাহান বুঝতে পারল না। তাহলে কী সে জিনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং
ব্যাবহার করে নূতন ধরনের প্রাণী তৈরি করেছে ? প্রশড়বটি জিজ্ঞেস করতে গিয়ে সে থেমে গেল -
এক্ষুনি হয়তো ব্যাপারটি সে নিজের চোখেই দেখতে পাবে।
হাজীব-এর পিছনে পিছনে রাহাব বের হয়ে এল, পিছনে পিছনে কয়েকজন প্রহরী বের হয়ে
আসবে বলে রাহান অনুমান করেছিল কিন্তু সেরকম কিছু হল না। মানুষটি নিরাপত্তা নিয়ে খুব
বেশি মাথা ঘামায় না, সম্ভবত নান ধরনের গোপন ক্যামেরা দিয়ে তাদেরকে চোখে চোখে রাখা
হয়েছে।
প্রাসাদের মতো দালানটির মার্বেল সিঁড়ি-দিয়ে তারা নেমে এল। সিঁড়ির সামনে ছোট একটি
গাড়ি রাখা আছে, পাশাপাশি দুজন বসতে পারে। হাজীব রাহানকে ইঙ্গিত করে নিজে অন্যপাশে
বসে একটা সুইচ স্পর্শ করতেই গাড়িটি একেবারে নিঃশব্দে চলতে শুরু করল, রাহান কান
পেতে অনেক চেষ্টা করেও গাড়ির ইঞ্জিন বা মোটরের শব্দ শুনতে পেলো না। গাড়িটি খুব ধীরে
ধীরে চলছে, কোন দিক দিয়ে যেতে হবে নিশ্চয়ই প্রোগ্রাম করে রাখা আছে। গাড়িগটির ছাদ
নেই বলে খুব খোলামেলা, চারিদিকে দেখা যায়। হাজীব সিটে হেলান দিয়ে বলল, "সারা
পৃথিবীতে আমার একচলিব্জ্থশটা দ্বীপ আছে, তবে এটা আমার সবচেয়ে প্রিয়।"
"এটা কত বড় ?"
"খুব বেশি বড় নয়। একশ বর্গ কিলোমিটার থেকে একটু ছোট।"
"এখানে তোমার নিজস্ব এয়ার স্ট্রিপ আছে ?"
হাজীব হাত নেড়ে বলল, "সেজন্য এটি আমার প্রিয় নয়। আমার প্রিয় কারণ এই পুরো
দ্বীপটি আসলে একটা সুপ্ত আগেড়বয়গিরি।" হাজীব হাত দিয়ে দূরে দেখিয়ে বলল, "ওখানে
গ্রানাইটের পাহাড়, ভারি চমৎকার।"
বৃক্ষহীন গ্রানাইটের পাহাড় কেমন করে ভারি চমৎকার হতে পারে রাহান বুঝতে পারল না,
কিন্তু সে কোনো প্রশড়বও করল না। তবে জায়গাটি আশ্চর্য রকম নির্জন, কোথাও কোনো
মানুষজন নেই। চিড়িয়াখানাটি কোথায় কে জানে, রাহান বিচিত্র একধরনের কৌতুহল নিয়ে ধৈর্য
ধরে অপেক্ষা করে থাকে।
গ্রানাইটের পাহাড়ের খুব কাছাকাছি এলে হঠাৎ এক ধরনের সুরঙ্গ দেখতে পেল, ছোট
গাড়িটি সেই সুরঙ্গ দিয়ে ভিতরে একটা খোলা জায়গায় এসে হাজির হয়। হাজীব তখন সুইচ
টিপে গাড়িটি থামিয়ে দিয়ে বলল, "এটা আমার চিড়িয়াখানা।"
রাহান চারিদিকে তাকিয়ে চিড়িয়াখানার কোন চিহ্ন দেখতে পেল না। সপ্রশড়ব দৃষ্টিতে
হাজীবের দিকে তাকাতে হাজীব বলল, "এদিকে এসো।"
রাহান হাজীবের পিছু পিছু একদিকে এগিয়ে যায়, উঁচু পাহাড়ের খাড়া দেয়াল উঠে গেছে,
সেখানে হাত দিয়ে একটা পাথর সরাতেই উঁকি দেয়ার মতো একটা জায়গা বের হয়ে গেল।
হাজীব সেখানে উঁকি দিয়ে কিছু একটা দেখে সরে গিয়ে বলল, "দেখো।"
রাহান কৌতুহলী হয়ে তাকিয়ে চমকে উঠে। বেশ খানিকটা দূরে নিচে খানিকটা সমতল
জায়গায় বিচিত্র কয়েকটা প্রাণী একটি মৃত ছাগলের দেহ টানাটানি করে খাচ্ছে। কামড়াকামড়ি
করে খেতে-খেতে হঠাৎ একটা অন্যটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং তুলনামূলকভাবে দূর্বল প্রাণীটি
চারপায়ে ছুটে দূরে চলে গিয়ে অক্ষম আপ্পে ঙ্কশে গর্জন করতে লাগল। প্রাণীটির সিংহের মতো
লম্বা কেশর এবং পিছনের দুই পা তুলনামূলকভাবে লম্বা। দেখে মনে হয় কোনো একধরনের
অপুষ্টির কারণে দেহের লোম ঝরে গেছে। মুখমণ্ডল গোলাকার এবং বানর বা মানুষের সাথে
মুখমণ্ডলের মিল রয়েছে। রাহান একটু অবাক হয়ে হাজীবের দিকে তাকাল, জিজ্ঞেস করল,
"এটি কোন প্রাণী ?"
হাজীব মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, "মানুষ।"
রাহান বিদু্যৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠে এবং আবার মাথা ঘুরিয়ে ছোট ফুটো দিয়ে উঁকি দিল
এবং আতঙ্কে শিউরে উঠে আবিষ্কার করল সত্যিই এই প্রাণীগুলো মানুষ। সে ফ্যাকাশে মুখে
হাজিবের দিকে তাকিয়ে বলল, "এই মানুষগুলো এরকম কেন ?"
"আমি আইডিয়াটি পেয়েছিলাম একটি বিশেষ ঘটনা থেকে। প্রাচীন ভারতবর্ষে একটি
নেকড়ে বাঘের গর্তে দুটি মেয়ে পাওয়া গিয়েছিল। একটির বয়স ছিল সাত-আট, অন্যটি আরো একটু বড়, বারো-তেরো। নেকড়ে বাঘ তাদেরকে গ্রাস থেকে ধরে এনে বড় করেছিল। মানুষেরা
তাদের উদ্ধার করে রক্ষা করতে চেষ্টা করেছিল কিন্তু কোন লাভ হয়নি। শৈশব নেকড়ে বাঘের
সঙ্গে কাটানোর জন্যে তারা বন্যপশুর মতোই থেকে গিয়েছিল। মানুষের কোনো বৈশিষ্ট ছিল না।
চারপায়ে প্রচণ্ড বেগে ছুটত, কাচা মাংস খেত গায়ে কাপড় রাখত না, তীক্ষ্ন ছিল ঘ্রাণশক্তি - এক
কথায় পুরোপুরি বন্যপশু !"
হাজীব একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, "মানুষের বাচ্চাদুটিকে উদ্ধার করে তাদের নাম দেয়া
হয়েছিল অমলা আর কমলা। কিন্তু ঐটুকুই ছিল তাদের একমাত্র মানুষের পরিচয়।"
রাহান একধরনের আতঙ্ক নিয়ে হাজীবের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। হাজীব মুখে তার
সেই ভয়ঙ্কর অস্পষ্ট হাসিটা ফুটিয়ে বলল, "ঘটনাটি শুনে আমার মনে হয়েছিল ইতিহাসে যদি
এরকম একটি ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে কি আমরা আরো তৈরি করতে পারি না ?"
রাহান হতচকিত হয়ে হাজীবের দিকে তাকিয়ে বলল, "তুমি - তুমি এদের তৈরি করেছ ?"
"হঁ্যা।" হাজিব মাথা নাড়ল, বলল, "কাজটি খুব সহজ হয়নি। অনেক শিশু নষ্ট হয়েছে।
সব নেকড়ে-মাতাই যে মানবশিশুকে নিজের শিশুর হিসেবে বড় করতে চায় সেটা সত্যি নয়।
কিন্তু শেষপর্যন্ত আমরা পেরেছি - এখানে পাঁচটি নেকড়ে-মানব আছে। দুটি ছেলে, তিনটি
মেয়ে। আমি খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি এদের সন্তানেরা কীরকম হয় দেখার জন্যে।"
রাহান ভয়ংকর একটি আতঙ্ক নিয়ে হাজীবের দিকে তাকিয়ে রইল। তার সামনে দাঁড়িয়ে
থাকা মানুষটি কী সত্যিই মানুষ নাকি একটি দানব - হঠাৎ করে এই ব্যাপারটি নিয়ে তার সন্দেহ
হতে থাকে।
হাজীব দুই পা হেঁটে বলল, "আমার মনে হল, মানবশিশু যদি নেকড়েকে দিয়ে পালন
করানো যায়, তাহলে অন্য পশু কেন নয়। তখন আমি পরীক্ষা শুরু করেছি। বাঘ, কুকুর,
শিম্পাঞ্জি এমনকি ডলফিন।"
"ডলফিন ?"
"হঁ্যা। ঐপাশে পানির একটা ছোট হ্রদ আছে, সেখানে তিনজন ডলফিন শিশু থাকে।
পানির নিচে সাঁতার কাটে, কাঁচা মাছ খায়। দেখে কেউ বলতেও পারবে না যে তারা আসলে
ডাঙার প্রাণী ! আমি পুরো বিবর্তনকে উল্টোদিকে প্রবাহিত করতে শুরু করেছি !"
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সীমিত মগজ, লিলিপুটিয়ান, ডোডো পাখি (সৌজন্যে - চাঁদগাজী)...

লিখেছেন বিচার মানি তালগাছ আমার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সকাল ১১:২৯



১. যেনা করব আমরা, ৫০১-এ যাব আমরা, পার্কে যাব আমরা। তুমি তো আলেম। তুমি কেন যাবে? তুমি তো ইসলামের সবক দাও সবাইকে। তুমি মাহফিলে কোরআন, হাদীস বয়ান কর। তুমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

মহাজন জিন্দা হ্যায়!!!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৭



মনে পড়ে, ঠিক এক বছর আগে গত বছর এই সময়ের দিকে ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া ভেসে যাচ্ছিল 'মহাজন স্যারকে আরও ৫ বছর বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে দেখতে চাই' টাইপের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম অটুট, মৌলভিরা নন: সমালোচনা মানেই অশ্রদ্ধা নয়

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৬



নবী ইউসুফ (আ.)-এর সময় মিসরীয়রা 'আমুন' দেবতার পূজা করত। মিসরের শাসক আপোফিসকে তার পিতা তৎকালীন পুরোহিতদের কুচক্রী স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। এই পুরোহিতরা ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজ্যসভা থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৈশব- কৈশোর বেলার গল্প

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৭



আমাদের শৈশব ছিলো অতিশয় প্রাণপ্রাচুর্যময় যদিও শৃঙ্খলাপূর্ণ।
একালের মতো বিলম্বিত শয্যা ত্যাগ রীতিমতো গর্হিত অপরাধ! শয্যা ত্যাগ করেই বিশেষত অবকাশের দিন গুলোতে নিয়মিত গন্তব্য ছিলো কারো কারো খেলার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ পাখির জগত

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:০০



টোনাপাখি লেজ নাচিয়ে গাইছে মধুর গান।
গান শুনে টুনিপাখি আহ্লাদে আটখান।

টোনা যখন উড়ে ঘুরে অন্য ডালে বসে।
টুনি এসে ঠিক তখনই বসে তারই পাশে।

বুলবুলিদের পাড়ায় আজ দারুণ শোরগোল।
নানা শব্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×