হাজীব শব্দ করে হাসল এবং রাহান হঠাৎ করে আবার আতঙ্কে শিউরে উঠল। হাজীব
একটা বড় পাথরে বসে বলল, "যাও রাহান, তুমি ঘুরে ঘুরে দ্যাখো। আমি এখানে অপেক্ষা
করি। আমার মনে হয় শিম্পাঞ্জি-শিশুটিকে তুমি পছন্দই করবে - দেখে মনে হয় বিবর্তনের ফলে
মাটিতে নেমে আমরা বুদ্ধিমানের কাজ করিনি। গাছটাই বুঝি ভালো ছিল !"
রাহান শুষ্কমুখে বলল, "আমার দেখার ইচ্ছে করছে না।"
"না করলে কেমন করে হবে ? তুমি একজন অকুতোভয় ন্যায়নিষ্ঠ সাংবাদিক। তুমি এটি
দেখবে না ? যাও, দেখে আসো। কারণ তুমি এই সবগুলো দেখে এলে আমি আমার সর্বশেষ
আবিষ্কারটি দেখাব।"
"কী আবিষ্কার ?"
হাজীব মাথা নাড়ল, বলল, "সেটা আমি আগেই বলব না। রাহান তুমি বুঝতে পারছ না
তুমি কত বড় সৌভাগ্যবান মানুষ। আমার এই চিড়িয়াখানায় এর আগে কোনো মানুষ আসেনি।
এটি আমার খুব ব্যক্তিগত জায়গা। যখন কোনকিছু নিয়ে আমার খুব মেজাজ খারাপ হয় তখন
আমি এখানে আসি। এই পশু-শিশুগুলো দেখলে আমার স্নায়ুগুলো নিজে থেকে শীতল হয়ে
আসে। আমি মাঝে মাঝে এসে একসপ্তাহ-দুসপ্তাহও থাকি। ঐপাশে আমার একটা ছোট ঘর
আছে। এটা হচ্ছে আমার ব্যক্তিগত আনন্দভূমি। এখানে আজ আমি তোমাকে এনেছি - তুমি
উপভোগ না করলে কেমন করে হবে ?"
রাহান মাথা নাড়ল, "না হাজীব - আমার পক্ষে এটা উপভোগ করা সম্ভব নয়।"
"কিন্তু তুমি সাংবাদিক - আমার সম্পর্কে তুমি যদি পূর্ণাঙ্গ একটা রিপোর্ট লিখতে চাও
তাহলে কি পুরোটা দেখা উচিত নয় ?"
হাজীবের কথার শেব্জ্থষটুকু ধরতে রাহানের কোনো অসুবিধে হল না এবং হঠাৎ করে সে এক
অমানুষিক ধরনের আতঙ্কে শিউরে উঠে। হাজীব রাহানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "ঠিক
আছে। তুমি যদি দেখতে না চাও তোমাকে আমি জোর করে দেখাতে পারব না। তবে আমার
শেষ আবিষ্কারটি তোমাকে দেখতে হবে।"
"তোমার আবিষ্কারটি কী ?"
"বলতে পারো এ-ব্যাপারে আমার গুরু হচ্ছে ড. ম্যাঙ্গোলা। নাৎসি জার্মানির একজন
ডাক্তার। মানুষকে নিয়ে সবচেয়ে সুন্দর পরীক্ষাগুলো করেছিলেন তিনি।"
"সুন্দর ?"
"হঁ্যা। সাধারণ মানুষ ভিতু। জৈব পরীক্ষাগুলো করে পশুপাখিদের উপর। কিন্তু সরাসরি
মানুষের উপর পরীক্ষা করার মতো আনন্দ আর কোথায় পাবে ? ড. ম্যাঙ্গোলা সেই পরীক্ষা
করতেন। তাদের বিকলাঙ্গ করতেন, অত্যাচার করতেন। তার কোন সংকোচ ছিল না।"
রাহান নিশ্বাস আটকে বলল, "তুমিও করেছ ?"
"হঁ্যা। আমি শুরু করেছি। প্রথম পরীক্ষাটি খুব সহজ। মানবশিশুদের যদি জন্মের পর থেকে
অন্ধকারে রেখে দেয়া হয় তাহলে কী হবে ?"
"তুমি সেই পরীক্ষাটি করেছ ?"
"হঁ্যা। একডজন শিশুকে আমি পুরোপুরি অন্ধকারে বড় করেছি। আলো কি তারা জানে না
- তারা কখনো সেটা দেখেনি।"
"তুমি তাদের কেমন করে দ্যাখো ?"
"ইনফ্রা-রেড ক্যামেরা দিয়ে। এই দ্যাখো -"
হাজীব একটু এগিয়ে গিয়ে একটা সুইচ স্পর্শ করতেই বড় একটা সঙিঊনে কিছু ছবি ভেসে
উঠল। বড় বড় চুল, বড় বড় নখ, বুনো পশুর মতো নানা বয়সী কিছু মানুষ ইতস্তত হাঁটছে, মাটি
থেকে খুঁটে খুঁটে খাবার খাচ্ছে, তাদের দৃষ্টিশক্তি নেই কিন্তু তারা সেটি জানে না।
"এই মানুষগুলোর স্পর্শশক্তি ভয়ঙ্কর প্রবল। ঘ্রাণশক্তিও অনেক বেশি। দৃষ্টিশক্তি ব্যবহার
না করে থাকার মাঝে কোনো অসুবিধা আছে বলেই মনে হয় না।"
রাহান হঠাৎ করে ঘুরে হাজীবের দিকে তাকাল, বলল, "তুমি কেন আমাকে এসব
দেখাচ্ছ?"
"কারণ আমি তোমাকে এখানে রেখে যাব।"
রাহান বিদু্যৎপৃষ্টের মতো চমকে উঠল, "কী বললে !"
"হঁ্যা।
এই অন্ধকারের মানুষের কাছে আমি তোমাকে রেখে যাব। আমার খুব কৌতুহল একজন
নূতন অতিথি পেলে তারা কী করে সেটা দেখার।"
"তুমি কী বলছ এসব !"
"ঠিকই বলছি। নির্বোধ আহাম্মক একটা সাংবাদিক একটা কাজে ব্যবহার করা যাক। কী
বলো ?"
রাহান বিস্ফারিত চোখে দেখল হাজীবের হাতে ছোট একটা রিভলবার। হাজীব মুখে তার
সেই ভয়ংকর হাসিটি ফুটিয়ে বলল, "তোমাকে এখনই ঠিক করতে হবে তুমি কী করবে ? একটু
বাধা দিলেই আমি তোমাকে গুলি করব। এটি আমার জগৎ - এখানে আমি ছাড়া কেউ আসে
না। কেউ জানবে না কী হয়েছে।"
হাজীব কথা শেষ করার আগেই রাহান তার উপর ঝাপিয়ে পড়ল এবং হাজীব এতটুকু দ্বিধা
না করে রিভলবারের পুরো ম্যাগাজিনটি তার উপরে শেষ করল। গুলির শব্দ গ্রানাইটের দেয়ালে
প্রতিধ্বনিত হয় এবং পশু হিসেবে বেড়ে-ওঠা মানবশিশুগুলি আতঙ্কিত হয়ে ছুটোছুটি শুরু করে
দেয়। রাহানের দেহ একটা বড় পাথরের ওপর ছিটকে পড়ে।
হাজীব একটা নিশ্বাস ফেলে রিভলবারটি তার পকেটে রেখে গাড়ির কাছে ফিরে যায়।
সেখানে এক বোতল উত্তেজক পানীয় রাখা আছে; তার স্নায়ুকে শীতল করার জন্যে এখন সেটি
দরকার। সে বহুদিন পর কাউকে নিজের হাতে খুন করল, একধরনের বিস্ময় নিয়ে আবিষ্কার
করল হত্যাকাণ্ডের প্রপ্পি ঙ্কাটিতে সে একধরনের প্রশান্তি অনুভব করেছে।
উত্তেজক পানীয়টির দ্বিতীয় ঢোক খাওয়ার পর হঠাৎ করে তার মনে একটি খটকা লাগল।
রাহানের শরীরে ছয়টি গুলি লাগার পরও শরীরে সে-পরিমাণ রক্ত বের হল না কেন। সন্দেহ
নিরসনের জন্যে সে পিছন ফিরে তাকাল - কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। রাহান নিঃশব্দে
উঠে এসে তাকে পিছন থেকে আঘাত করেছে - এক টুকরো পাথর অত্যন্ত আদিম অস্ত্র, কিন্তু
এখনো সেটি চমৎকার কাজ করে।
রাহান হাজীবের অচেতন দেহের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "আমাকে তুমি যত
আহাম্মক ভেবেছিলে আমি তত আহাম্মক নই। আমার গায়ে ক্যাভলারের একটা বুলেটপ্রুফ
ভেস্ট লাগানো আছে - তোমার সাথে এমনি দেখা করতে আমার সাহস হয়নি।"
রাহান হাজীবের অচেতন শরীরটি টেনে অন্ধকার-জগতের দিকে নিয়ে যেতে থাকে।
অন্ধকার-জগতের মানুষেরা নূতন অতিথি পেলে কী করে সেটি জানার হাজীবের খুব কৌতুহল
ছিল। কিছুক্ষণেই তার জ্ঞান ফিরে আসবে - এই কৌতুহলটি সে মিটিয়ে নেবে তখন।
হাজীবের এই চিড়িয়াখানার কথা কেউ জানে না। তাকে উদ্ধার করতে কেউ আসবে না।
নিজের সৃষ্টির সাথে সে তার জীবনের বাকি অংশটুকু কাটিয়ে দেবে।
কে জানে ড. ম্যাঙ্গেলাকে নিয়ে তার ধারনার পরিবর্তন হবে কি না !
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




