"আমরা যখন হেঁটে আসছিলাম - এই কয়েক হাজার বেজি ইচ্ছে করলে আমাদের ছিঁড়ে টুকরো
টুকরো করে ফেলতে পারত।" শ্রাবণী বলল, "কেন করেনি কে জানে।"
জয়ন্ত কিংবা নিয়াজ কোনো কথা বলল না।
"একটি দুটি খ্যাপা জন্তু-জানোয়ার থেকে রক্ষা পাওয়া যায় - কিন্তু এরকম কয়েক হাজার
থেকে রক্ষা পাবে কেমন করে ?"
নিয়াজ একটু নড়েচড়ে বলল, "জব্বার মিয়া। আমাদের একমাত্র ভরসা জব্বার মিয়া।"
শ্রাবণী বলল, "কীভাবে ?"
জব্বার মিয়া এসে যখন দেখবে আমরা নেই - তখন আমাদের খোঁজ নেয়ার একটা ব্যবস্থা
করবে না ?"
"সেটা কখন করবে ? ততক্ষণ আমরা কী করব ?"
"ততক্ষণ যেভাবেই হোক আমাদের বেঁচে থাকতে হবে।"
জয়ন্ত এতক্ষণ চুপচাপ ওদের কথা শুনছিল। এবারে সোজা হয়ে বসে বলল, "দ্যাখ -
আমরা মনে হয় ব্যাপারটাকে একটু বেশি মেলোড্রামাটিক করে ফেলছি। বাইরে যে-প্রাণীটা দুই
পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই প্রাণীটা কী ? প্রাণীটা হচ্ছে বেজি। একটা বেজির
ভয়ে আমরা আকুপাকু করব সেটা ঠিক হচ্ছে না -"
শ্রাবণী বাধা দিয়ে বলল, "একটা নয় - কয়েক হাজার -"
জয়ন্ত প্রায় নাটকের ভঙ্গিতে পা দিয়ে শব্দ করে বলল, "কয়েক হাজার হোক আর কয়েক
লক্ষ হোক তাতে কিছু আসে যায় না। বেজি হচ্ছে বেজি। আমি এই লাঠি দিয়ে পিটিয়ে এদের
বারোটা বাজিয়ে দেব।"
অনেকক্ষণ পর শ্রাবণীর মুখে হাসি ফুটে উঠল, বলল, "শুনে খুশি হলাম। এই পিটানোর
কাজটা কখন শুরু করবি ? এখনই বের হবি লাঠি হাতে ?"
জয়ন্ত একটু প্প ঙ্কদ্ধ চোখে শ্রাবণীর দিকে তাকিয়ে বলল, "তুই ঠাট্টা করছিস ? এটা ঠাট্টার
সময় ?"
শ্রাবণী বলল, "আই অ্যাম সরি। তুই ঠিকই বলেছিস - এটা ঠাট্টার সময় নয় - কিন্তু তুই
একটা লাঠি নিয়ে ইয়া-আলী বলে লাফঝাঁপ দিয়ে বেজি মারছিস, দৃশ্যটা কল্পনা করে কেমন
জানি হাসি পেয়ে গেল।"
জয়ন্ত কোনো কথা না বলে একটা বড় নিশ্বাস ফেলে বলল, "আমি বিশ্বাস করতে পারি না
একজন মানুষ এরকম সময়ে ঠাট্টা করতে পারে।"
নিয়াজ বলল, "এটা দোষের ব্যাপার না, এরকম একটা সময়ে যে ঠাট্টা করতে পারে বুঝতে
হবে তার মাথা ঠাণ্ডা - বিপদের সময় সে সঠিক সিগ্ধান্ত নিতে পারে।"
জয়ন্ত কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, "তা ঠিক।"
"কাজেই এখন ঠাণ্ডা মাথায় পুরো ব্যাপারটা ভেবে দেখা যাক।" নিয়াজ শা্রবণীর দিকে
তাকিয়ে বলল, "তুই শুরু কর।"
"আমি ? আমি কেন ?"
"এক্ষুনি না প্রমাণ করে দিলাম যে তোর মাথা সবচেয়ে ঠাণ্ডা।"
"আমার মাথা ঠাণ্ডা না। কখনো ছিল না। তোর প্রমাণে গোলমাল আছে।"
"ঠিক আছে, জয়ন্ত তাহলে তুই বল।"
জয়ন্ত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,"প্রথমে উপরতলাটা সিকিউর করতে হবে যেন ঐ
বদমাইশ বেজিগুলো উপরে আসতে না পারে।"
"সেটা কীভাবে করবি ?"
"নিচের দরজা উপরের দরজা সবকিছু বন্ধ রেখে।"
"তারপর ?"
"তারপর এই পুরো বাসাটি খুঁজে দেখতে হবে কী কী জিনিসপত্র আছে। সেই জিনিসপত্র
দিয়ে একটা নতুন পব্জ্থ্যান করতে হবে।"
"ভেরি গুড।"
"বন্দুকটা খুঁে জ পেলে খারাপ হয় না।"
"যদি না পাই ?"
"তাহলে আপাতত আমাদের হাতে একমাত্র অস্ত্র হচ্ছে এই ম্যাচটা।" জয়ন্ত পকেট থেকে
ম্যাচটা বের করে বলল, "যদি সিগারেট না খেতাম তাহলে এই ম্যাচটাও থাকত না।"
"তাহলে আপাতত পরিকল্পনা হচ্ছে এই বাসাটিকে দুর্গের মতো ব্যবহার করে থাকা ?"
জয়ন্ত শ্রাবণীর দিকে মাথা নেড়ে বলল, "হঁ্যা।"
"খাওয়াদাওয়া ?"
"তুই যদি কিছু না এনে থাকিস তাহলে বন্ধ।"
"আমি কোত্থেকে আনব ?" ব্যাগ হাতড়ে কয়েক টুকরো চকলেট বের করে বলল, "এই
হচ্ছে একমাত্র ফুড সাপব্জ্থাই।"
নিয়াজ বলল, "আমরা নিশ্চয়ই এখানে মাসখানেক থাকার পরিকল্পনা করছি না - বড়
জোর আজকের দিনটা।"
"তা ঠিক।" জয়ন্ত দুর্বলভাবে হেসে বলল, "কিন্তু খাওয়ার কথা বলতেই কেমন জানি খিদে
পেয়ে গেল !"
নিয়াজ হাসার চেষ্টা করে বলল, "শুধু-শুধু খাওয়ার কথা চিন্তা না করে কাজে লেগে যাওয়া
যাক।"
"হঁ্যা।" জয়ন্ত বলল, "একজনকে সবসময় থাকতে হবে বারান্দার কাছাকাছি। বেজির গুষ্টি
কোনো বদমাইশি করার চেষ্টা করলেই অন্যদের জানিয়ে দেবে।"
শ্রাবণী বলল, "আমি বসে বসে এই বেজির বাচ্চাগুলো দেখতে পারব না। তোরা কেউ
দ্যাখ।"
জয়ন্ত বলল, "ঠিক আছে, আমি দেখছি। তোরা ল্যাবরেটরি, স্টোর রুম, রেস্ট এরিয়া
খুঁজে দেখ কী কী পাওয়া যায়।"
"কোনো বিশেষ কিছু খুজঁ ব নাকি ?"
"একটা মেশিনগান হলে মন্দ হয় না !"
জয়ন্তের কথা শুনে দুজনেই শব্দ করে হাসল এবং হঠাৎ করে বুঝতে পারল দীর্ঘ সময় পর
এই প্রথমবার তারা হাসছে। আনন্দহীন হাসি - কিন্তু তবুও হাসি।
ল্যাবরেটরিতে বেশ কিছু জিনিসপত্র পাওয়া গেল - যেমন বেশ কিছু সলভেন্ট, এগুলো
দিয়ে এই মুহূর্তে কোনোকিছু পরিষ্কার করার প্রয়োজন নেই - কিন্তু বিশাল একটা আগুন
জ্বালানোর জন্যে ব্যবহার করা যেতে পারে। বড় বড় কয়েকটা কাচের বোতলে কিছু এসিড এবং
ক্ষার পাওয়া গেল। ড্রয়ারে প্রচুর সিরিঞ্জ রয়েছে। সিরিঞ্জের ভেতরে এই এসিড কিংবা ক্ষার ভরে কিছু ভয়ানক অস্ত্র তৈরি করা যেতে পারে।এছাড়াও ধারালো বেব্জ্থড এবং চাকু রয়েছে। রবারের
গব্জ্থাভস রয়েছে প্রচুর। যদিও দীর্ঘদিন পড়ে থাকার কারণে খানিকটা আঠা আঠা হয়ে আছে। ওরা
সবচে খুশি হলো চোখের ওপর পরার জন্যে পব্জ্থাষ্টিকের গগলস পেয়ে - পাজি বেজিগুলো যদি
চোখের ওপর হামলা চালাতেই বেশি পছন্দ করে তাহলে এগুলো কাজে লাগবে।
ল্যাবরেটরির ড্রয়ারে তারা একটা বাইনোকুলার পেয়েই সেটা সাথে সাথে জয়ন্তকে দিয়ে এল
- বেজিগুলোর কাজকর্ম এখন খুব ভালোভাবে দেখা যাবে।
স্টোররুমে অনেক ধরনের ব্যাবহারি জিনিস পাওয়া গেল। মোমবাতি দুটি শেষ হয়ে
আসছিল, সৌভাগ্যপ্প ঙ্কম সেখানে কয়েক বাক্স মোমবাতি পাওয়া গেল। নাইলনের দড়ি, সঙঊু
ড্রাইভার, করাত-হাতুড়ি এ-ধরনের বেশকিছু প্রয়োজনীয় জিনিসও ছিল। বেশকিছু ব্যাটারি ছিল
কিন্তু সেগুলো কোনো কাজে আসবে না - নষ্ট হয়ে ভেতর থেকে আঠালো ক্যামিকেল বের হয়ে
আসছে।
তবে সবচেয়ে দরকারি জিনিসটা তারা পেয়ে গেল বিশ্রাম নেবার ঘরে। সোফার কুশনের
নিচে লুকিয়ে রাখা একটা দোনলা বন্দুক এবং ড্রয়ারের ভেতরে বন্দুকের গুলি। বন্দুকটা হাতে
নিয়ে নিয়াজের মুখে হাসি ফুটে ওঠে, যুদ্ধবাজ জেনারেলের মতো বন্দুকটা উপরে তুলে বলল,
"এবারে দেখে নেব বেজির বাচ্চা বেজিদের।"
শ্রবণী বলল, "এভাবে কথা বলিস না - তোকে সন্ত্রাসীর মতো দেখাচ্ছে।"
নিয়াজ মাথা নেড়ে বলল, "বন্দুক জিনিসটা নিশ্চয়ই খারাপ। হাতে নিলেই নিজের ভিতরে
কেমন জানি মান্তান-মাস্তান ভাব এসে যায়।"
"তাই নাকি ?"
"হঁ্যা, হাতে নিয়ে দ্যাখ।"
শ্রাবণী হাতে নিয়ে বলল, "কোথায় ? আমার তো হাতে নিয়ে নিজেকে কীরকম জানি
বেকুব-বেকুব লাগছে !"
নিয়াজ বলল, "সেটাই ভালো। আসলে বেকুব-বেকুবই লাগার কথা।"
"আয় জয়ন্তকে সুসংবাদটা দিই - এখন আমাদের হাতে অস্ত্র আছে। মেশিনগান না হলেও
বন্দুক তো বটেই !"
জয়ন্ত বাইনোকুলার চোখে লাগিয়ে বারান্দায় গুড়ি মেরে বসেছিল, পায়ের শব্দ শুনে চোখ
তুলে তাকিয়ে নিয়াজ আর শ্রাবণীকে বন্দুক হাতে আসতে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "বন্দুক !
কোথায় পেলি ?"
"সোফার কুশনের নিচে লুকানো ছিল।" শ্রাবণী বলল, "বন্দুকটা হাতে নেয়ার পর থেকে
নিয়াজ মাস্তান-মাস্তান ব্যবহার করছে !"
জয়ন্ত বাইনোকুলারটা শ্রাবণীর কাছে দিয়ে বন্দুকটা হাতে নিয়ে চাপ দিয়ে সেটা খুলে
ব্যারেলের ভেতর দিয়ে তাকিয়ে বলল, "ময়লা হয়ে আছে - পরিষ্কার করতে হবে।"
শ্রাবণী অবাক হয়ে বলল, "তুই বন্দুক চালাতে পারিস ?"
"আমার এক মামা পাখি শিকার করতেন, তাঁর সাথে মাঝে মাঝে যেতাম।"
"পাখি শিকার !" শ্রাবণী চোখ কপালে তুলে বলল, "ইশ ! কী নিষ্ঠুর।"
"তুই কি চিকেন খাস না ?"
"খাই। কেন ?"
"চিকেন এক ধরনের পাখি। সেটা জ্যান্ত খাওয়া হয় না। মেরে কেটেকুটে খাওয়া হয় -
সেটা নিষ্ঠুর না ?"
নিয়াজ বাইনোকুলারটা নিয়ে বেজিগুলোকে দেখার চেষ্টা করছিল। জয়ন্ত বলল,
"দেখেছিস? মোস্ট ফেসিনেটিং।"
শ্রাবণী জিজ্ঞেস করল, "কী জিনিজ মোস্ট ফেসিনেটিং ?"
"এই বেজিগুলো। মনে হচ্ছে এদের মাঝে একটা সমাজব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।"
"এতে অবাক হবার কী আছে ? প্রায় জন্তুদেরই তো সমাজব্যবস্থা থাকে। জংলী কুকুর,
হায়েনা, হাতি -"
"না, না, সেরকম না। এখানে মনে হচ্ছে এদের দায়িত্ব ভাগ করা আছে। কেউ কেউ
শ্রমিক - কেউ কেউ -"
"অাঁতেল ?"
জয়ন্ত শব্দ করে হেসে বলল, "হঁ্যা অনেকটা সেরকম। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক আর
ডিসকভারি চ্যানেলে সবসময়ে দেখেছি জন্তু-জানোয়ারে সবচেয়ে যেটা বেশি শক্তিশালী সেটাই
হচ্ছে নেতা। কিন্তু এখানে মনে হচ্ছে অন্য ব্যাপার।"
"কী ব্যাপার ?"
"কড়ই গাছের নিচে শুকনো হাড়-জিরজিরে একটা বেজি বসে আছে আর অনেকগুলো
ধুমসো মোটা মোটা বেজি সেটাকে পাহারা দিচ্ছে। মাঝে মাঝে কোনো বেজি দেখা করতে আসে
- সেটাকে এসকর্ট করে নিয়ে যায়, হাড়-জিরজিরে বুড়ো বেজিটার সামনে গিয়ে মাথা নিচু করে
থাকে। আর সবচেয়ে পিকুলিয়ার -"
"কী ?"
"মনে হয় এই বেজিগুলোর একটা ভাষা আছে, নিজেদের মাঝে এরা কথা বলে। মনে হয়
হাড়-জিরজিরে বুড়ো বেজিটা হাত নাড়িয়ে কথা বলে, কিছু একটা অর্ডার দেয়। সে-ই নেতা।"
"সত্যি ?"
"হঁ্যা, দ্যাখ বাইনোকুলারটা দিয়ে।"
শ্রাবণী বাইনোকুলারটা চোখে দিয়ে দূরে তাকায়। কড়ই গাছের নিচে গাছের গুঁড়িতে হেলান
দিয়ে একটা শুকনো দুর্বল বেজি বসে আছে। গাছটিকে ঘিরে আরো অনেকগুলো বেজি।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেই বোঝা যায়, এই শুকনো হার-জিরজিরে দুর্বল বেজিটি আসলে দুর্বল
নয় - অন্য-বেজিগুলো প্প ঙ্কাগত তার কাছে আসছে এবং যাচ্ছে, আদেশ নিচ্ছে এবং ছুটে চলে
যাচ্ছে। যদি ব্যাপারটি এরকম পরিবেশে না হত শ্রাবণী নিশ্চিতভাবে এর মাঝে খানিকটা কৌতুক
খুঁজে পেত - কিন্তু এখন সে কোনো কৌতুক খুঁজে পেল না।
ঠিক দুপুরবেলা বেজিগুলো প্রথমবার তাদের আপ্প ঙ্কন করল। নিয়াজ বাইনোকুলার চোখে
দিয়ে বসেছিল। হঠাৎ করে সে চিৎকার করে বলল, "বেজিগুলো কিছু একটা করছে।"
জয়ন্ত ল্যাবরেটরি-ঘরে কিছু কাঠের টুকরায় কাপড় বেঁধে মশাল তৈরি করছিল। সেগুলো
টেবিলে রেখে চিৎকার করে জানতে চাইল, "কী করছে ?"
"ছুটোছুটি করছে।"
"কেন ?"
"বুঝতে পারছি না।"
কিন্তু কিছুক্ষণের মাঝেই কারণটা বোঝা গেল। বেজিদের বিশাল বাহিনী থেকে একটা
বিরাট অংশ হঠাৎ করে বাসাটির দিকে ছুটে আসতে শুরু করল। এর মাঝে তারা বাসার দরজা
জানালা যতটুকু সম্ভব বন্ধ করে দিয়েছিল কিন্তু তবু বেজিগুলোকে নিরুৎসাহিত করা গেল না।
পুরানো বাসার ফাঁকফোকর দিয়ে সেগুলো পিলপিল করে ভেতরে ঢুকতে শুরু করে। জয়ন্ত
হাতের বন্দুক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। শ্রাবণী আর নিয়াজ বড় বড় লাঠিগুলো নিয়ে অপেক্ষা করে।
"এই ঘরের ভেতরে যদি ঢুকে যায় তাহলে গুলি করব। ঠিক আছে ?"
অন্য দুজন মাথা নাড়ল।
"মশালগুলো রেডি আছে। সলভেন্টে চুবিয়ে শুধু আগুন লাগাতে হবে।"
"ঠিক আছে।"
"সিরিঞ্জগুলোতে এসিড ভরে রেখেছি - খুব কাছে এলে সেটা পুশ করে দেয়া যেতে পারে -
কিন্তু সেটা হচ্ছে একেবারে নিরুপায় হলে। লাস্ট রিসোর্ট।"
শ্রাবণী বলল, "আমার মনে হয় সবাই চোখে পব্জ্থাস্টিকের গগলসা পরে নিই।"
"হঁ্যা, যদি কোনোভাবে ঘরে ঢুকে যায় - তাহলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।"
বেজিগুলো বুদ্ধিমান, কাজেই তারা খুব বুদ্ধিমানের মতো কিছু করবে এরকম একটা আশঙ্কা
ছিল। কিন্তু দেখা গেল সেরকম বুদ্ধিমানের মতো কিছু করল না। দল বেঁধে বেজিগুলো তাদের
কাছাকাছি আসার চেষ্টা করতে লাগল। নিচে দরজা জানালা বন্ধ থাকলেও জানালার ভাঙা কাচ
এবং ঘরে ফাঁকফোকর দিয়ে সেগুলো ঢুকতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মাঝেই সিঁড়িতে ধুপধাপ
শব্দ শোনা গেল এবং তারপরই ল্যাবরেটরির দরজায় সেগুলো ধাক্কা দিতে শুরু করল।
ল্যাবরেটরির দরজাটা ছিটকিনি দিয়ে বন্ধ করে রাখা আছে। কয়েকটা বেজি সেগুলো ধাক্কা দিয়ে
খুলতে পারবে না। তবু তারা তিনজন আতঙ্কে শিটিয়ে রইল। শুধু-যে দরজা ধাক্কা দিচ্ছে তা নয়,
তারা দেখতে পেল দরজার নব ঘুরিয়ে বেজিগুলো দরজা খোলার চেষ্টা করছে। ব্যাপারটি
অবিশ্বাস্য যে বেজির মতো একটা প্রাণী জানে দরজা খোলার জন্যে নব ঘোরাতে হয়।
কী করবে বুঝতে না পেরে জয়ন্ত দরজার ভেতর থেকে কয়েকটা লাথি মেরে চিৎকার করে
বলল, "বদমাইশ বেজির বাচ্চা বেজি। ভাগ এখান থেকে, না হলে খুন করে ফেলব গুলি
করে।"
জয়ন্তের কথা শুনে এক মুহূর্তের জন্যে হঠাৎ করে দরজায় ধাক্কা থেমে গেল। মনে হল
জয়ন্তের কথা বুঝি বুঝতে পেরেছে। কিন্তু পরমুহূর্তে আবার দরজায় ধাক্কাধাক্কি করতে থাকে।
কান পেতে ওরা শুনতে পেল, বেজিগুলো মুখ দিয়ে বিচিত্র নানা ধরনের শব্দ করছে।
নিয়াজ আর শ্রাবণী কি করবে বুঝতে পারছিল না। যদি কোনোভাবে দরজা ভেঙে
বেজিগুলো ঢুকে যেতে পারে তাহলে কী হবে তারা চিন্তাও করতে পারে না। এক মুহূর্তে হয়তো
তাদের ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলবে।
হঠাৎ ঝনঝন করে কোথায় জানি কাচ ভাঙার শব্দ হল। জয়ন্ত বন্দুক হাতে ল্যাবরেটরির
পিছনে ছুটে গিয়ে হতবাক হয়ে যায়। বেজিগুলো আসলেই বুদ্ধিমান - সামনে তাদেরকে ব্যস্ত
রেখে সেগুলো পিছন দিয়ে ঢুকে পড়ছে। ল্যাবরেটরির পিছনে পর্দার পিছনে কাচের জানালা
ভেঙে বেজিগুলো ঢুকতে শুরু করেছে। জয়ন্ত হতবাক হয়ে দেখল, বেজিগুলো মুখে পাথরের
টুকরো ধরে সেগুলি দিয়ে কাচের ওপর আঘাত করে কাচ ভেঙে ফেলছে। কাচের ধারালো ভাঙা
টুকরোয় বেজিগুলোর পা কেটে যাচ্ছে। কিন্তু সেগুলো ভ্রুক্ষেপ করল না, লাফিয়ে লাফিয়ে
ভিতরে ঢুকে গেল। কিছু বোঝা আগেই জয়ন্ত টের পেল গোটাদশেক বেজি তাকে ঘিরে
ফেলেছে। জয়ন্ত পিছনে ঘুরে লাথি দিয়ে কয়েকটা বেজিকে দূরে ছুড়ে দিয়ে দেয়ালে পিঠ দিয়ে
দাঁড়াল, সে পিছন থেকে কোনোটাকে আপ্প ঙ্কন করতে দিতে চায় না। কিছু বোঝার আগেই
একটা বেজি লাফিয়ে তার শরীর বেয়ে উপরে উঠে তার চোখে কামড় দেয়ার চেষ্টা করল - কিন্তু
শক্ত পব্জ্থাস্টিকের গগলস থাকায় সেটা পব্জ্থাস্টিকের উপর তার ধারালো দাঁতের চিহ্ন রেখে নিচে
গড়িয়ে পড়ল। জয়ন্ত হাত দিয়ে বেজিটাকে সরিয়ে দিয়ে বন্দুক দিয়ে গুলি করার চেষ্টা করে কিন্তু
বেজিগুলো প্প ঙ্কাগত ছুটছে বলে কিছুতেই নিশানা ঠিক করতে পারে না।
জয়ন্তের চিৎকার শুনে নিয়াজ আর শ্রাবণী লাঠি হাতে ছুটে এসে বেজিগুলোকে আঘাত
করার চেষ্টা করে। প্রচণ্ড আঘাতে বেজিগুলো ছিটকে পড়ে বিচিত্র শব্দ করতে শুরু করে। জয়ন্ত
ঘরের ভেতরে গুলি করার সাহস পায় না বলে বন্দুকের বাঁট দিয়ে আঘাত করে কয়েকটার মাথা
থেঁতলে দিল। বেজিগুলো এক ধরনের জান্তব চিৎকার শব্দ করে তাদের শরীরে বেয়ে উঠার চেষ্টা
করে চোখে কামড় দেয়ার চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু পব্জ্থাস্টিকের গগলস থাকায় তারা প্রতিবারই
রক্ষা পেয়ে গেল। ঘরের ভেতরে ভয়ঙ্কর একটা নারকীয় পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে গেছে। একটার পর
একটা বেজি এসে ঢুকছে - কতক্ষণ এদের সাথে টিকে থাকতে পারবে তারা বুঝে উঠতে পারছিল না। অসম্ভব দ্রুত বেজিগুলো কিছু বোঝার আগে তাদের শরীর বেয়ে উপরে উঠে কামড়ে
ধরার চেষ্টা করতে থাকে। জয়ন্ত কোনমতে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করে চিৎকার করে বলল,
"মশালগুলো নিয়ে আয় -"
শ্রাবণীর শরীরে কয়েকটা বেজি কামড়ে ধরেছে, তার মাঝে সে কোনোভাবে নিজেকে মুক্ত
করার চেষ্টা করে ছুটে গিয়ে মশালটা নিয়ে সলভেন্টের ড্রামে ভিজিয়ে নিয়ে ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়ে
দিল। সাথে সাথে সেটা দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে। দ্বিতীয় মশালটা জ্বালিয়ে সে জয়ন্ত আর
নিয়াজের কাছে ছুটে এল, একটা মশাল নিয়াজের হাতে দিয়ে অন্য মশাল নিয়ে এলোপাথাড়ি
বেজিগুলোকে মারতে থাকে। সারা ঘরে বেজির লোম পোড়া একটা গন্ধে ভরে গেল। হঠাৎ করে
বাইরে থেকে বেজি ঢোকা বন্ধ হয়ে গেল। ভেতরের বেজিগুলোও ঘরের আনাচে-কানাচে লুকিয়ে
পড়ে - আগুন জিনিসটাকে মনে হয় সত্যিই ওরা ভয় পায়।
জয়ন্ত হিংস্র গলায় চিৎকার করে বলল, কোথায় পালিয়েছিস বদমাইশ বেজির দল ?
সবগুলোকে খুন করে ফেলব। জবাই করে ফেলব, পুড়িয়ে কয়লা করে দেব -"
নিয়াজ আর শ্রাবণীও বেজিগুলোকে খুঁজতে থাকে। কিন্তু বড় ল্যাবরেটরির আনাচে-কানাচে
কোথাও লুকিয়ে আছে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এক পলকের জন্যে একটা দেখতে
পেলেও সেটা চোখের পলকে অন্য কোথাও সরে যাচ্ছে।
হঠাৎ এক কোণা থেকে একটা বেজি ছুটে এসে অবিকল মানুষের গলায় বলল, "প্পি ঙ্ককি
প্পি ঙ্ককি -" এবং এরকম শব্দ করতে করতে সেটি জানালার ফুটো দিয়ে বের হয়ে গেল। সাথে
সাথে ঘরের আনাচে-কানাচে লুকিয়ে থাকা বেজিগুলো প্পি ঙ্ককি প্পি ঙ্ককি শব্দ করতে করতে ছুটে
পালিয়ে যেতে শুরু করে। নিয়াজ, শ্রাবণী আর জয়ন্ত প্রচণ্ড আপ্পে ঙ্কশে পালিয়ে যেতে থাকা
বেজিগুলোকে লাঠি দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা করে কয়েকটার মাথা থেঁতলে দিল।
শেষ বেজিটি পালিয়ে যাবার পর তারা ল্যাবরেটরি-ঘরটির চারিদিকে তাকাল। সমস্ত ঘরের
লণ্ডভণ্ড অবস্থা। গোটা-ছয়েক বেজি মরে পড়ে আছে। গোটা-দশেক অর্ধমৃত হয়ে এখানে-
সেখানে ছটফট করছে। নিজেদের দিকে তাকানো যায় না - চোখগুলো বেঁচে গিয়েছে কিন্তু
শরীরের প্রায় পুরোটুকু ক্ষতবিক্ষত। জামাকাপড় ছিঁড়ে গিয়ে রক্তাক্ত হয়ে আছে। শ্রাবণী নিয়াজ
এবং জয়ন্তের দিকে তাকিয়ে বলল, "আমাকে দেখতে যদি তোদের মতো দেখাচ্ছে তাহলে খবর
বেশি ভালো নয়।"
জয়ন্ত বন্দুকটা হেলান দিয়ে রেখে বলল, "তোকে আরো বেশি খারাপ দেখাচ্ছে।"
"কত খারাপ ?"
"ডাইনি বুড়ির মতো।"
"থ্যাংক ইউ জয়ন্ত। তোর মতো আন্তরিক সমবেদনাসম্পূর্ণ মানুষ পাওয়া খুব কঠিন।"
নিয়াজ নিজের হাতপায়ের দিকে লক্ষ্য করে বলল, "আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে
এটা ঘটেছে।"
"ঘটেছে না। বল ঘটছে।" শ্রাবণী বলল, "আমি বাজি রেখে বলতে পারি এই বদমাইশগুলি
আর দশ মিনিটের মাঝে ফেরত আসছে।"
নিয়াজ কাঁচভাঙা জানালাগুলোর দিকে তাকাল, বলল, "আবার যখন আসবে তখন কী
করব ?"
জয়ন্ত দাঁড়িয়ে বলল, "জানালাগুলো কাঠের তক্তা দিয়ে লোহা মেরে বন্ধ করে দিতে হবে।"
"তক্তা কোথায় পাবি ?"
জয়ন্ত লেবরেটরির চেয়ার টেবিল দেখিয়ে বলল, "এগুলো ভেঙে বের করতে হবে।"
নিয়াজ প্রথমে ভাবল জয়ন্ত ঠাট্টা করছে, কিন্তু তার মুখে কৌতুকের কোনো চিহ্ন নেই।
নিয়াজ একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, "চল তাহলে, দেরি করে লাভ নেই। "
শ্রাবণী ঘরের মৃত এবং অর্ধমৃত বেজিগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, "এগুলো কী করব ?"
"দরজা খুলে বাইরে ফেলে দ্বেদমাইশগুলো দেখলেই গা ঘিনঘিন করছে।"
কিছুক্ষণের মাঝে দেখা গেল সবাই মিলে ঘরটকে আবার সুরক্ষিত করার চেষ্টা করছে।
পরের আপ্প ঙ্কনটা কখন হবে কেমন করে হবে সেটা এখনো কেউ জানে না।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



