চাঁদের আলোতে সমুদ্রের পানি কেমন জানি ঝিকমিক করছে। তার মাঝে চাপা শব্দ করে
ট্রলারটি এগিয়ে যাচ্ছে। নিয়াজ অনভ্যস্ত হাতে ট্রলারের হালটি ধরে রেখেছে, সে কল্পনাও করতে
পারে না দুদিন আগে ট্রলারের উপর বসে থাকা নিয়ে তার ভেতরে একধরনের আতঙ্ক ছিল অথচ
এখন সে এটি সমুদ্রের ওপর দিয়ে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
ট্রলারের ভেতরে জব্বার মিয়া লম্বা হয়ে শুয়ে আছে। তার দুর্বল দেহে চেতনা আসছে এবং
চলে যাচ্ছে। ট্রলারটি সোজা দক্ষিণে গেলে লোকালয় পাওয়া যাবে, সেখান থেকে তাকে
হাসপাতালে নিয়ে যাবে। জব্বার মিয়া ভয় পায় না - সমুদ্রের বুকে সে এর থেকে অনেক বড়
দুর্ঘটনাও পার হয়ে এসেছে। মৃতু্য বারবার আসে না - একবারই আসে এবং সত্যি সত্যি যখন
আসবে সে একটুও ভয় না-পেয়ে তার মুখোমুখি হবে।
চাঁদটি এখন ঠিক মাথার ওপরে। পিছনে হকুনদিয়া দ্বীপ। জোছনার নরম আলোতে এত
দূর থেকে হকুনদিয়া দ্বীপটি দেখা পাওয়ার কথা নয়, কিন্তু সেটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, কারণ পুরো
দ্বীপটি দাউদাউ করে জ্বলছে। আগুনের কমলা রঙের শিখা জীবন্ত প্রাণীর মতো লকলক করে
নাচছে। সমস্ত আকাশ সেই আগুনের আলোতে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
ট্রলারের ছাদে হাত রেখে শ্রাবণী দাঁড়িয়ে ছিল। সে জয়ন্তের হাত স্পর্শ করে বলল, "মন
খারাপ করিস না জয়ন্ত।"
জয়ন্ত কাঁপা গলায় বলল, "আমি দায়ী। আমি যদি ম্যাচটা না দিয়ে আসতাম -"।
শ্রাবণী নিচু গলায় জোর দিয়ে বলল, "না, তুই দায়ী না। এই বেজিগুলো প্রকৃতির
স্বাভাবিক সৃষ্টি না। এটা মানুষের তৈরি একটি কৃত্রিম সৃষ্টি। যেটা স্বাভাবিক না সেটা প্রকৃতিতে
থাকে না, থাকতে পারে না।"
"কিন্তু আমি যদি ম্যাচটি না দিয়ে আসতাম তাহলে এতবড় আগুন লাগত না।"
"তোর ধারণা কাজটি ভুল হয়েছিল ?"
"অবশ্যই ভুল হয়েছিল।"
"একটা ভুলের জন্যে যে প্রাণী সারা পৃথিবী থেকে শেষ হয়ে যায় সেই প্রাণীর পৃথিবীতে
বেঁচে থাকার কথা না।"
"কিন্তু -"
"না জয়ন্ত। এই বেজিগুলো ছিল একটা ভয়ঙ্কর ভুল। তোর আরেকটা ভুল দিয়ে সেই
ভুলটি সংশোধন করা হল।"
জয়ন্ত কোনো কথা না বলে দূরে হকুনদিয়া দ্বীপের দিকে তাকিয়ে রইল। আগুনের লাল
আভায় টুরো আকাশটি আলোকিত হয়ে আছে। ভয়ঙ্কর আগুনের মাঝে বেজিগুলো না-জানি কী
ভায়ায় চিৎকার করে আর্তনাদ করছে।
সমাপ্ত
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




