somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফোবিয়ানের যাত্রী - মুহম্মদ জাফর ইকবাল (তিন)

১৩ ই মে, ২০০৬ রাত ১১:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ভিডি টিউবের সুইচটা স্পর্শ করতেই ঘরের মাঝামাঝি আমার মায়ের ত্রিমাত্রিক একটা প্রতিচ্ছবি
স্পষ্ট হয়ে উঠল। ছবিটা এত জীবন্ত যে আমার মনে হলো আমি বুঝি তাকে স্পর্শ করতে
পারব।
আমার মায়ের প্রতিচ্ছিবিটি ঘুরে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "বাবা ইবান, আমি জানি না
আমাকে তুই দেখছিস কি না ! সেই কোন নক্ষত্রের কোন গ্রগপুঞ্জে তুই আছিস আমি জানিও
না। তবু আমার ভাবতে ইচ্ছে করে তুই আমার সামনে আছিস, চুপ করে বসে আমার কথা
শুনছিস।"
মা কথা বন্ধ করে আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন, মনে হলো সত্যিই যেন আমাকে
দেখতে পাচ্ছেন। মায়ের চেহারা সতেরো-আঠারো বৎসরের একটা বালিকার মতো - কথার
ভঙ্গিও সেরকম, চেহারায় বিন্দুমাত্র বয়সের ছাপ পড়ে নি।
মা একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে হঠাৎকরে একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন। হাত দিয়ে লালচে
চুলগুলো পিছনে সরিয়ে বললেন, "বুঝলি ইবান, কয়দিন থেকে নিজের ভেতরে কেমন জানি
অস্থিরতা অনুভব করছি। শূধু মনে হচ্ছে এই জগতে কেন এসেছি, কী উদ্দেশ্য তার রহস্যটা
বুঝতে পারছি না। আমি কী শুধু কয়েকদিন বেঁচে থাকার জন্যে এসেছি নাকি তার অন্য উদ্দেশ্য
আছে ? যদি অন্য উদ্দেশ্য থাকে তাহলে সেটা কী ? প্রাণীজগতের যেরকম বংশবৃদ্ধি করার
উদ্দেশ্য থাকে মানুষের জন্যে তো আর সেটা সত্যি নয় ! মানুষকে তো আর জন্ম নিতে হয় না।
জিনম ফ্যাক্টরিতে অর্ডারমাফিক শিশুর জন্ম দেয়া যায়। তাহলে আমাদের বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যটা
কী ?"
মা কয়েকমুহূর্তের জন্যে থামলেন তারপর ছেলেমানুষের মতো খিলখিল করে হেসে
উঠলেন, কষ্ট করে হাসি থামিয়ে বললেন, "আমার মনে সারাক্ষণ এরকম প্রশড়ব দেখে আমার
চারপাশে যারা আছে তারা খুব চিন্তিত হয়ে পড়ল, তারা ভাবল আমার চিকিৎসা দরকার !
একদিন আমাকে জোর করে ধরে নিয়ে গেল চিকিৎসক রবোটের কাছে, সেটি আমাকে টিপেটুপে
দেখে বলল আমার মাথায় মস্তিষ্কের ভিতরে একটা দ্বৈত কপোট্রন বসাতে হবে, যেটি আমার ভাবনা চিন্তাকে নিয়ন্ত্রন করবে। সোজা কথায় আমাকে মানুষ থেকে পাল্টে একটা রবোট তৈরি
করে ফেলবে।"
মা কথা থামিয়ে আবার ছেলেমানুষের মতো হাসতে শুরু করলেন, হাসি ব্যাপারটি নিশ্চয়ই
সং্#956;ামক, আমিও মায়ের সাথে সাথে হাসতে শুরু করলাম। মা হাসি থামিয়ে চোখ মুছে
বললেন, আমি চিকিৎসক রবোটের কথা শুনিনি। আমার মাথায় দ্বৈত কপোট্রন বসানো হয় নি।
মাথার ভিতরে এখনো আমার একশ ভাগ খাঁটি মস্তিষ্ক রয়েছে তাই এখনো আমি বসে বসে
এইসব ভাবি !" মা হঠাৎ সুর পাল্টে বললেন, "বাবা ইবান, আমার কথা শুনে তুই আবার অধৈর্য
হয়ে যাচ্ছিস না তো ?"
আমি মাথা নাড়লাম, ফিসফিস করে বললাম, "না মা আমি অধৈর্য হয়ে যাচ্ছি না।"
"অধৈর্য হলে হবি। আমার কিছু করার নেই। কেন জানি তোর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে
করছে। আমার মনে হয় তুই যদি আমার কাছে থাকতি তাহলে আমার প্রশড়বগুলোর গুরুত্বটা
বুঝতে পারতি। এখানে আর কাউকে বোঝাতে পারি না।
"প্রথম প্রথম মনে হতো আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য হয়ত জ্ঞানের অনুসন্ধান করা। কিন্তু
গত একশ বৎসরের ইতিহাসে দেখেছিস বড় আবিষ্কারগুলো কে করেছে ? রবোট। কম্পিউটার।
কপোট্রন। যেগুলো মানুষ করেছে তার পিছনেও রয়েছে যন্ত্রপাতি, নিউরাল নেটওয়ার্ক। তাহলে
মানুষের জন্যে থাকল কী ? মানুষ বেঁচে থাকবে কেন ? তাদের জীবনের উদ্দেশ্যটা কী ?"
মা কিছুক্ষণের জন্যে থামলেন তারপর আবার হেসে ফেললেন - মা যখন হাসেন তখন
তাকে কী সুন্দর না দেখায় ! হাসি থামিয়ে মাথা নেড়ে বললেন, "আমি জানি না কেন আমি
তোকে এসব বলছি। আসলে আমি তোকে বলছি কি না সেটাও আমি জানি না - তাহলে কেন
বলছি এসব ? মাঝে মাঝে আসলে তোর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে - মনে হয় তুই হয়তো
আমাকে বুঝতে পারবি। সেজন্যে বলছি - আমি কল্পনা করে নিচ্ছি তুই আমার সামনে বসে
আছিস, এই এখানে আমার কাছাকাছি।
"কিছুদিন থেকে আমার মনে হচ্ছে আমি যেন একটু একটু বুঝতে পারছি জীবনের উদ্দেশ্য
কী। ঠিক পুরোটুকু ধরতে পারছি না কিন্তু একটু যেন আন্দাজ করতে পারছি। আগে যেরকম
মনে হতো আমার জীবনের কোনো মূল্য নেই, কোনো অর্থ নেই - এখন সেরকম মনে হয় না।
একসময় ভাবতাম তোর ভিতরে জিনেটিক কোনো প্রাধান্য না দিয়ে খুব ভুল করেছি, তোকে অতিমানব জাতীয় কিছু একটা তৈরি করা উচিত ছিল। কিন্তু এখন আর তা মনে হয় না। এখন
মনে হয় আমি ঠিকই করেছি, তোকে সাধারণ একজন মানুষ হিসেবে তৈরি করেছি কিন্তু ভিতরে
দিয়েছি একটা চমৎকার হৃদয়। যেখানে রয়েছে ভালোবাসা। সবাইকে বড়ো হতে হবে কে
বলেছে ? মনে হয় যত ছোটই হোক জীবনের একটা অর্থ থাকে, একটা উদ্দেশ্য থাকে। কেউ
এই জগতে অপ্রয়োজনীয় না। ছোট বড় সবাই মিলে সৃষ্টিজগৎ।"
মা একটু থামলেন, থেমে হাসি-হাসি মুখ করে বললেন, "বেশি বড় জ্ঞানের কথা বলে
ফেললাম ? অন্য সবাইকে তো বলছি না - তোকে বলছি। তুই আমার ছেলে, তোকে আমি
পেটে ধরেছি। যখন পেটের মাঝে ছিলি তখন প
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সীমিত মগজ, লিলিপুটিয়ান, ডোডো পাখি (সৌজন্যে - চাঁদগাজী)...

লিখেছেন বিচার মানি তালগাছ আমার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সকাল ১১:২৯



১. যেনা করব আমরা, ৫০১-এ যাব আমরা, পার্কে যাব আমরা। তুমি তো আলেম। তুমি কেন যাবে? তুমি তো ইসলামের সবক দাও সবাইকে। তুমি মাহফিলে কোরআন, হাদীস বয়ান কর। তুমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

মহাজন জিন্দা হ্যায়!!!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৭



মনে পড়ে, ঠিক এক বছর আগে গত বছর এই সময়ের দিকে ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া ভেসে যাচ্ছিল 'মহাজন স্যারকে আরও ৫ বছর বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে দেখতে চাই' টাইপের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম অটুট, মৌলভিরা নন: সমালোচনা মানেই অশ্রদ্ধা নয়

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৬



নবী ইউসুফ (আ.)-এর সময় মিসরীয়রা 'আমুন' দেবতার পূজা করত। মিসরের শাসক আপোফিসকে তার পিতা তৎকালীন পুরোহিতদের কুচক্রী স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। এই পুরোহিতরা ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজ্যসভা থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৈশব- কৈশোর বেলার গল্প

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৭



আমাদের শৈশব ছিলো অতিশয় প্রাণপ্রাচুর্যময় যদিও শৃঙ্খলাপূর্ণ।
একালের মতো বিলম্বিত শয্যা ত্যাগ রীতিমতো গর্হিত অপরাধ! শয্যা ত্যাগ করেই বিশেষত অবকাশের দিন গুলোতে নিয়মিত গন্তব্য ছিলো কারো কারো খেলার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ পাখির জগত

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:০০



টোনাপাখি লেজ নাচিয়ে গাইছে মধুর গান।
গান শুনে টুনিপাখি আহ্লাদে আটখান।

টোনা যখন উড়ে ঘুরে অন্য ডালে বসে।
টুনি এসে ঠিক তখনই বসে তারই পাশে।

বুলবুলিদের পাড়ায় আজ দারুণ শোরগোল।
নানা শব্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×