"আগামী ছত্রিশ ঘণ্টার মাঝে। একটা চৌম্বকীয় ঝড় আসছে, সেটা আসার আগে শুরু না
করলে অনেক দেরি হয়ে যাবে।"
"ও।" আমি ঘুম থেকে জেগে ওঠার চেষ্টা করতে করতে বললাম, কিন্তু আমার নিজেরও
তো একটু প্রস্তুতি নিতে হবে।"
"না। তোমার নিজের প্রস্তুতি নেবার কোনো প্রয়োজন নেই। তোমার সবকিছুর প্রস্তুতি নেয়া
হয়েছে।"
"আমার ব্যক্তিগত কিছু কাজ -"
লি-হান অধৈর্য্য গলায় বলল, "তোমার কোনো কিছু আর ব্যক্তিগত নেই। যখন থেকে
সিগ্ধান্ত নেয়া হয়েছে তোমাকে পঞ্চম মাত্রার মহাকাশযানের অধিনায়ক করা হবে সেদিন থেকে
তোমাকে চবি্বশ-ঘণ্টা চোখে চোখে রাখা হয়েছে। তোমার ব্যক্তিগত সবকিছু আমরা জানি -
ঠিক সেভাবে ফোবিয়ানে সবকিছু রাখা হয়েছে। তোমার পছন্দসই বইপত্র মেটা ফাইল থেকে
শুরু করে প্রিয় খাবার, প্রিয় পোষাক, প্রিয় সঙ্গীত সবকিছু পাবে। তোমার কোনো ব্যক্তিগত কাজ
বাকী নেই ইবান।"
"কিন্তু -"
"কোনো কিন্তু নেই। তা ছাড়া ফোবিয়ানের চরম গতিবেগ তোলার আগে পর্যন্ত তুমি
নেটেওয়ার্কে সবার সাথে যোগাযোগ রাখতে পারবে।"
আমি ইতস্তত করে বললাম, "আমি সাথে আরো একটি জিনিস নিতে চেয়েছিলাম।"
"কী ?"
"রিতুন ক্লিসের মস্তিষ্ক ম্যাপিং।"
লি-হান এবারে থেমে গিয়ে একটা শিস দেয়ার মতো একটা শব্দ করল।
আমি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "পাওয়া যাবে না ?"
"একটু কঠিন হবে - কিন্তু আমি চেষ্টা করব।"
"চেষ্টা করলে হবে না। আমাকে পেতেই হবে। তুমি জানো আমি প্রায় একযুগ এই
মহাকাশযানে একা-একা বসে থাকব। আমার কথা বলার জন্যে একজন মানুষ দরকার।"
লি-হান হাসার শব্দ করে বলল, "আমাদের সময়ে তুমি প্রায় একযুগ থাকবে, কিন্তু তোমার
নিজের ফ্রেমে তো এতো দীর্ঘ সময় নয়। খুব বেশি হলে তিন বছরের মতো।
তিন বছর আর এক যুগে কোনো পার্থক্য নেই। একই ব্যাপার। একটা কিছু গোলমাল
হলেই তিন বছর সত্যি-সত্যি একযুগ নয় এক শতাব্দী হয়ে যেতে পারে।"
"বুঝেছি।"
আমি গলার স্বরে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বললাম, "আমাকে রিতুন ক্লিসের মস্তিষ্ক ম্যাপিং না
দেয়া হলে আমি কিন্তু এই অভিযানে যাব না।"
লি-হান একটু অধৈর্য্য হয়ে বলল, "আহ ! তুমি দেখি মহাকাশ-দসু্যদের মতো বব্জ্থ্যাক
মেইলিং শুরু করলে।"
"এটা বব্জ্থ্যাক মেইলিং নয় - এটা সত্যি।"
"ঠিক আছে আমি যোগাড় করে দেব।"
"আমার আরো একটা জিনিস দরকার।"
"কী ?"
"আমার মায়ের জন্যে একটা উপহার।"
"কী উপহার নিতে চাও ?"
"ঠিক বুঝতে পারছি না।"
"বায়োডামের বাইরে ঝড়ো বাতাসের গর্জনের সাথে মিল রেখে একটা সঙ্গীত-ধ্বনি তৈরি
হয়েছে। শুনলেই বুকের মাঝে কেমন জানি করতে থাকে। সেই সঙ্গীত-ধ্বনি নিতে পার।"
"ঠিক আছে।"
"কিংবা এই গ্রহের প্রাচীন সভ্যতার কোনো চিহ্ন। কোনো রেলিক। গ্রানাইটের ছোট
মূর্তি?"
"বেশ। তুমি যদি মনে করো সেরকম কিছু খুঁজে পাবে -"
"সবচেয়ে ভালো হয় যদি কোয়ার্টজের গোলকের ভেতরে করে একটা সৌভাগ্য-বৃক্ষ নিয়ে
যাও।"
"সৌভাগ্য-বৃক্ষ ?"
"হঁ্যা। এই গ্রহের একটি বিশেষ ধরনের গাছ রয়েছে, ছোট গাছ তার মাঝে রয়েছে ছোট
ছোট নীল পাতা। এখানকার মানুষ বলে জীবনে যখন বড় ধরনের সৌভাগ্য আসে তখন সেখানে
ফুল ফোটে। উজ্জ্বল কমলা রংয়ের ফুল। ভারি চমৎকার দেখতে !"
"বেশ। তাহলে এই গাছটাই নেয়া যাক। কিন্তু আন্তঃনক্ষত্র পরিবহনে গাছপালা বা জীবন্ত
প্রাণী আনা-নেয়ার উপর নানারকম বিধিনিষেধ রয়েছে না ?"
লি-হান হা হা করে হেসে বলল, "তুমি তোমার মহাকাশযানে করে ম্যাঙ্গেল ক্বাসকে নিয়ে
যাচ্ছ। যাকে ম্যাঙ্গেল ক্বাসের মতো একটি বস্তুকে নেয়ার অনুমতি দেয়া হয় তাকে যে-কোনো
জীবন্ত প্রাণী নেয়ার অনুমতি দেয়া হবে। সেটা নিয়ে তুমি চিন্তা কোরো না !"
"ঠিক আছে আমি চিন্তা করব না।"
"তাহলে তুমি চার নম্বর এস্ট্রোডামে চলে আসো। প্রস্তুতি শুরু হয়ে যাক। তোমাকে তিন
ঘণ্টা সময় দেয়া হলো।"
"তিন ঘণ্টা ? মাত্র তিন ঘণ্টার মাঝে আমি সারা জীবনের জন্যে একটা গ্রহ ছেড়ে চলে
যাব?"
লি-হান একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, "কেউ যদি আমাকে এই গ্রহ চেড়ে চলে যাবার
সুযোগ করে দিত, আমি তিন মিনিটে চলে যেতাম !"
আমি কোনো কথা না বলে বাইরে তাকালাম। কুৎসিত বেগুনি আলোতে গ্রহটাকে কী
ভয়ঙ্কর-ই না দেখাচ্ছে। লি-হান মনে হয় সত্যি কথাই বলছে।
ফোবিয়নের কার্গো ভল্টে স্টেনলেস স্টিলের কালো একটি সিলিণ্ডারকে দেওয়ালের সাথে আটকে
দিয়ে সামরিকবাহিনীর উচ্চপদস্থ মানুষটি বলল, "এটি হচ্ছে ম্যাঙ্গেল ক্বাস। ফোবিয়ানের মূল
নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে একে বুঝিয়ে দেওয়া হলো।"
মহাকাশযানের ভরশূন্য পরিবেশে ভেসে ভেসে আমি সিলিণ্ডারটির কাছে গিয়ে সেটি স্পর্শ
করে বললাম, "এই মানুষটি সম্পর্কে আমি এত বিচিত্র ধরনের গল্প শুনেছি যে আমি নিশ্চিত
হতে চাই যে মানুষটি মাঝপথে জেগে উঠবে না।"
সামরিক অফিসারটি হেসে বলল, "সে-ব্যাপারে তুমি নিশ্চিত থাকতে পার, তাকে তরল
হিলিয়াম তাপমাত্রায়22 জমিয়ে রাখা আছে। জেগে ওঠার কোনো সম্ভাবনা নেই।"
"তোমার-আমার বেলায় সেটি সত্যি হতে পারে, ম্যাঙ্গেল ক্বাসের বেলায় আমি এত নিশ্চিত
নই !"
"এ ব্যাপারে তুমি নিশ্চিত থাকতে পার, পর্দার্থ বিজ্ঞানের সূত্র তোমার-আমার জন্যে যেটুকু
সত্যি ম্যাঙ্গেল ক্বাসের জন্যেও ততটুকু সত্যি। তরল হিলিয়াম তাপমাত্রায় মানুষের শরীরে
কোনো জৈবিক অনুভূতি থাকে না। সে আক্ষরিক অর্থে একটি জড়বস্তু।"
"বাইরে থেকে কেউ কোনো সঙ্কেত দিয়ে তাকে জাগিয়ে তুলতে পারবে না ?"
"না, এই সিলিন্ডারটিকে বাইরে থেকে কেউ সঙ্কেত পাঠাতে পারবে না। এটি বলতে পারো
তথ্য বা সঙ্কেতের দিক থেকে একেবারে নিচ্ছিদ্র।"
সামরিক অফিসারটি ফোবিয়ানের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের সাথে আনুষ্ঠানিক বোঝাপড়া শেষ করে
আমাকে ছোট একটি প্পি ঙ্কাল ধরিয়ে দিয়ে বলল, "ইবান, তুমি এখন তোমার যাত্রা শুরু করতে
পার।"
আমি ভল্টের দেয়ালে আটকে রাখা সারি সারি সিলিন্ডারগুলোর দিকে তাকালাম, ম্যাঙ্গেল
ক্বাস ছাড়াও এখানে অন্য মানুষ রয়েছে। কেউ-কেউ প্রতিরক্ষা বাহিনীর, কেউ-কেউ একেবারে
সাধারণ যাত্রী। নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে তাদের পরিচয় দেওয়া আছে, আমার আলাদা করে জানার
প্রয়োজন নেই। মানুষ ছাড়াও এই মহাকাশযানে অন্য জিনিসপত্র রয়েছে, যার কিছু কিছু
আমার জানার কথা নয়। মহাকাশযানের অধিনায়ক হিসেবে আমাকে সেগুলি মানুষের এক
কলোনি থেকে অন্য কলোনি পেঁৗছে দেবার কথা। ম্যাঙ্গেল ক্বাসের কথা আলাদা, সে যে কোন
মহাকাশযানে থাকলে সেটি মহাকাশযানের অধিনায়কের জানা প্রয়োজন।
সামরিক অফিসার এবং তার সাথে আসা টেকনিশিয়ানরা নিজেদের যন্ত্রপাতি গুছিয়ে নিতে
শুরু করে। ভরশূন্য পরিবেশে ভেসে যাওয়া যন্ত্রপাতি গুছিয়ে নেয়া খুব সহজ কাজ নয় কিন্তু এই
টেকনিশিয়ানরা দক্ষ, তাদের হাতের কাজ দেখতে ভালো লাগে। কিছুক্ষণের মাঝেই সবাই
বিদায় নেয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। একজন একজন করে সবাই এসে আমার সামনে মাথা
নিচু করে অভিবাদন করে তাদের স্কাউটশিপে উঠে গেল। সামরিক অফিসার আমার হাত ধরে
সেখানে মৃদু চাপ দিয়ে বলল, "তোমার যাত্রা শুভ হোক, ইবান।"
আমি হেসে বললাম, "আমার পক্ষ থেকে চেষ্টার কোনো ত্রুটি হবে না !"
সামরিক অফিসার আমার হাত ছেড়ে দিয়ে বাতাসে ভেসে ভেসে তার স্কাউটশিপে ঢুকে
গেল, আমি ফোবিয়ানের গোল বায়ু-নিরোধক দরজাটা বন্ধ করে দিতেই স্কাউটশিপের ইঞ্জিনের
চাপা শব্দ শুনতে পেলাম, আমি এখন এখানে একা।
আমি নিজের ভিতরে একধরনের নিঃসঙ্গতা অনুভব করলাম, এই বিশাল মহাকাশযানটিতে
আমি একা একা এক বিশাল দূরত্ব অতিপ্প ঙ্ক করব - এক নক্ষত্র থেকে অন্য নক্ষত্রে। এই দীর্ঘ
সময়ে আমার সাথে কথা বলার জন্যেও কোনো সত্যিকারের মানুষ থাকবে না। মহাকাশের
নিকশ কালো অন্ধকারে, হিম শীতল পরিবেশে এই বিশাল মহাকাশযান তার শক্তিশালী ইঞ্জিনের
গুঞ্জন তুলে উড়ে যাবে। নতুন এই মহাকাশযানে হয়ত অজানা কোনো বিপদ অপেক্ষা করে
আছে, মাহালা নক্ষত্রপুঞ্জের কাছাকাছি দুটি বিশাল বব্জ্থ্যাক হোল, তার পাশ দিয়ে বিপজ্জনক
একটি কক্ষপথ দিয়ে আমাকে যেতে হবে। সেখানে মহাকাশ-দসু্যরা ওৎ পেতে আছে, কে
জানে, হয়ত বিচিত্র মহাজাগতিক প্রাণীর মুখোমুখি হতে হবে ! জানি না এই দীর্ঘ যাত্রা কখনো
শেষ হবে কি না, রিশি নক্ষত্রের সেই মানবকলোনিতে পেঁৗছাতে পারব কি না। যদিওবা পেঁৗছাই
সেই এক যুগ পর আমার মায়ের সাথে দেখা হবে কি না সে কথাটিই-বা কে বলতে পারে !
আমি জোর করে আমার ভেতর থেকে সব চিন্তা দূর করে সরিয়ে দিয়ে ভেসে ভেসে
মহাকাশযানের ওপরের দিকে যেতে থাকি। নিয়ন্ত্রণ কক্ষে গিয়ে আমাকে এখনই প্রস্তুত হতে
হবে। ফোবিয়ানের শক্তিশালী ইঞ্জিন প্রচণ্ড গর্জন করে এই গ্রহের মহাকর্ষ বলকে উপেক্ষা করে
মহাকাশে পাড়ি দেবে তখন আমাকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে হবে।
কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে আরামদায়ক চেয়ারটিতে বসার সাথে সাথে আমি ফোবিয়ানের
নিয়ন্ত্রণকারী মূল নিউরাল নেটওয়ার্কর কণ্টস্বর শুনতে পেলাম, "পঞ্চম মাত্রার আন্তঃনক্ষত্র
মহাকাশযান ফোবিয়ানের পক্ষ থেকে আপনাকে এই মহাকাশযানের নেতৃত্ব দেয়ার জন্যে
আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানাচ্ছি মহামান্য ইবান।"
মানুষের কণ্ঠস্বরে এ ধরনের যান্ত্রিক কথা শুনলে সব সময়েই আমি একটু অস্বস্তি বোধ করি
- আমি ব্যক্তিগতভাবে সবসময়েই মনে করি যন্ত্র এবং মানুষের কথার মাঝে একটা স্পষ্ট পার্থক্য
থাকা দরকার। মানুষের কথা শোনার সময় তাকে সবসময়েই আমরা দেখতে পাই, মুখের
ভাবভঙ্গি থেকে কথার অনেক কিছু স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যন্ত্রের বেলায় সেটা সম্ভব নয় - সত্যি কথা
বলতে কী কথাটা কোথা থেকে আসছে অনেক সময় সেটাও বুঝতে পারি না।
আমি চেয়ারে নিজেকে নিরাপত্তা বেল্ট দিয়ে বেঁধে নিতে নিতে বললাম, "আমি যদি বলি
তোমার আমন্ত্রণ আমি গ্রহণ করলাম না !"
নিউরাল নেটওয়ার্কের কণ্ঠস্বর তরল গলায় বলল, "মহামান্য ইবান, আপনি ইচ্ছে করলে
অবশ্যি সেটা বলতে পারেন। তাতে কিছু আসে যায় না।"
"তুমি কে ?"
"আমি ফোবি। ফোবিয়ানের নিউরাল নেটওয়ার্ক এবং মানুষের সংযোগকারী মডিউল
ফোবি।"
আমি কন্ট্রোল প্যানেলের কয়েকটা সুইচ স্পর্শ করতে করতে বললাম, "আচ্ছা ফোবি,
আমি যদি এখন তোমাকে জঘন্য ভাষায় গালাগাল করি তাহলে কী হবে ?"
"কিছুই হবে না মহামান্য ইবান। আমি মানুষ নই, আমার ভেতরে কোনো মান-অপমান
বোধ নেই - আমি আপনাকে সাহায্য করতে এসেছি, যেভাবে সবচেয়ে ভালোভাবে সাহায্য করা
যায় সেভাবে সাহায্য করব।"
আমি কন্ট্রোল প্যানেলে ফোবিয়ানের ইঞ্জিনগুলোর খুঁটিনাটি পরীক্ষা করতে করতে বললাম,
"ফোবি, আমি যতদূর জানি তোমার নিউরাল নেটওয়ার্ক মানুষের মস্তিষ্ক থেকে অনেক গুণ
ভালো বলা হয়, মানুষ থেকে বারো গুণ বেশি তোমার বুদ্ধিমত্তা - যার অর্থ তুমি আসলে আমার
থেকে অনেক বেশি বুদ্ধিমান। কাজেই প্রকৃত অর্থে আমার তোমাকে বলা উচিৎ মহামান্য ফোবি-
ফোবি এবার প্রায় হাসার মতো করে শব্দ করল, বলল, "আপনি ভুল করছেন মহামান্য
ইবান, আমি নিউরাল নেটওয়ার্ক নই - আমি শুধুমাত্র নিউরাল নেটওয়ার্কের মানুষের সাথে
যোগাযোগকারী মডিউল। নিউরাল নেটওয়ার্ক যদি একটা মানুষ হয় তাহলে আমি তার কণ্ঠস্বর।
আমার নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা নেই। আর সম্বোধনের আনুষ্ঠানিকতার কোনো অর্থ নেই মহামান্য
ইবান। দীর্ঘদিন গবেষণা করে দেখা গেছে একজন মানুষ এবং একজন যন্ত্রকে পাশাপাশি কাজ
করতে দেয়া হলে মানুষকে আনুষ্ঠানিকভাবে খানিকটা প্রাধান্য দিতে হয়, পুরো ব্যাপারটি অনেক
সহজ হয়, এর বেশি কিছু নয়।"
"ও।" আমি একটা নিশ্বাস নিয়ে বললাম, "এই মহাকাশযানে আমি দীর্ঘ সময়ের জন্যে
আছি, তোমার সাথে যন্ত্র এবং মানুষ নিয়ে কথা বলা যাবে। এখন ফোবিয়ানকে শুরু করা
যাক।"
"বেশ।"
আমি কন্ট্রোল প্যানেল পরীক্ষা করে মূল ইঞ্জিন দুটো চালু করলাম, সাথে সাথে ফোবিয়ানের
দুইপাশে বসানো শক্তিশালী ইঞ্জিন দুটি গর্জন করে উঠল। আমি ফোবিয়ানের জানালা দিয়ে
বিদু্যৎঝলকের মতো আয়োনিত গ্যাস বের হতে দেখলাম। আমি অসংখ্যবার মহাকাশযানের মূল
ইঞ্জিন চালু করে মহাকাশযানকে নিয়ে মহাশূন্যে ছুটে গিয়েছি কিন্তু প্রথম মুহূর্তটি প্রত্যেকবারই
আমাকে একইভাবে অভিভূত করেছে।
আমি ফোবিয়ানে তীব্র কম্পন অনুভব করি, মহাকাশযানটি শেষবারের মতো গ্রহটিকে
প্রদক্ষিণ করতে শুরু করেছে, শক্তিশালী ইঞ্জিনদুটি প্রদক্ষিণ শেষ করার আগেই এই গ্রহের
মহাকর্ষ বলকে ছিনড়ব করে উড়ে যাবে।
আমি কন্ট্রোল প্যানেলের দিকে তাকিয়ে বসে থাকি। মহাকাশযানের ভরশূন্য পরিবেশ দূর
হয়ে এখন এখানে ত্বরণ থেকে প্রচণ্ড আকর্ষণ শুরু হচ্ছে। আরামদায়ক চেয়ারটিতে অদৃশ্য
কোনো শক্তি আমাকে ধীরে ধীরে চেপে ধরতে শুরু করেছে। সাধারণ যে-কোনো মানুষ থেকে
আমি অনেক বেশি মহাকর্ষ শক্তি সহ্য করতে পারি। কন্ট্রোল প্যানেলে দেখতে পাচ্ছি আমার
ওজন বাড়তে শুরু করেছে, মনে হচ্ছে বুকের ওপর অদৃশ্য একটি দানব চেপে বসেছে। আমার
নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হতে থাকে, চোখের সামনে লাল পর্দা কাঁদতে শুরু করে।
আমার কানের কাছে ফোবি ফিসফিস করে বলল, "মহামান্য ইবান, আপনাকে অচেতন
করে দিই ?"
আমি দাঁতে দাঁত চেপে বললাম, "না।"
"কেন ? কেন আপনি এই কষ্ট সহ্য করছেন ?"
"জানি না।"
"আর কিছুক্ষণের মাঝে আপনার মাথার মাঝে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাবে, আপনি এমনিতেই
অচেতন হয়ে পড়বেন।"
"তবু আমি দেখতে চাই।" আমি বুঝতে পারি অদৃশ্য শক্তির টানে আমার মুখের চামড়া
পিছনে সরে আসছে, চোখ খোলা রাখতে পারছি না, মনে হচ্ছে বুকের উপর কেউ একটা বিশাল
পাথর চাপিয়ে রেখেছে, আমি একবারও বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছি না।
ফোবি আবার ফিসফিস করে বলল, "মহামান্য ইবান। আপনার নিরাপত্তার খাতিরেই এখন
আপনাকে অচেতন করে রাখা প্রয়োজন। এটি নিছক পাগলামি -"
"আমি জানি।"
"কিন্তু -"
"ফোবি - তোমরা কি কখনো পাগলামি করো ? যন্ত্র কি পাগলামি করতে পারে ?"
ফোবি উত্তরে কী বলল আমি শুনতে পেলাম না কারণ এর আগেই আমি অচেতন হয়ে
পড়লাম।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




