আমি ইঞ্জিন দুটো এক সাথে হঠাৎ করে বন্ধ করে দেবার প্রস্তুতি নিলাম। ফোবি আমার
পরিকল্পনা আন্দাজ করে আমাকে সাবধান করে দেবার চেষ্টা করল, বলল, "মহামান্য ইবান,
মহাকাশযানের ইঞ্জিন হঠাৎ করে বন্ধ করে দেয়া চতুর্থ মাত্রার অনিয়ম।"
"তার মানে জানো ?"
"জানি মহামান্য ইবান।"
"তার মানে এটি মহাকাশযানের কোনো বড় ধরনের ক্ষতি করবে না।"
"কিন্তু আপনার বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।"
"মনে হয় না। সেই ছেলেবেলা উঁচু দেয়াল থেকে লাফিয়ে পড়লাম - হঠাৎ করে ভরশূন্য
পরিবেশের অনুভূতি খুব চমৎকার অনুভূতি। আমার মনে হয় আমার ছেলেবেলার স্মৃতি মনে পড়ে
যাবে।"
"আপনি ছাদে গিয়ে আঘাত করবেন, আপনার সাথে সাথে সকল খোলা যন্ত্রপাতি ছাদে
আঘাত করবে, সমস্ত মহাকাশযান প্রচণ্ড একটা ঝাঁকুনিতে কেঁপে উঠবে, নিরাপত্তা যন্ত্রপাতি -"
"আহ্ ফোবি, তুমি থামবে ? আমি একটা বাচ্চা খোকা নই আর তুমি আমার মা নও !
তুমি যদি ভুলে গিয়ে থাক তাহলে তোমাকে মনে করিয়ে দিই, আমি এই মহাকাশযানের
অধিনায়ক।"
ফোবি নরম গলায় বলল, "আমি আপনার প্রতি বিন্দুমাত্র অসম্মান প্রদর্শন করছি না
মহামান্য ইবান, আমি আমার দায়িত্ব পালন করছি মাত্র।"
"চমৎকার ! তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করো, আমি আমার দায়িত্ব পালন করি !"
আমি শরীরকে আসনড়ব ঘটনার জন্যে প্রস্তুত করে সুইচকে স্পর্শ করে এক সাথে দুটো ইঞ্জিন
বন্ধ করে দিলাম। মনে হলো সাথে সাথে মহাকাশযানে প্রলয় কাণ্ড ঘটে গেল, প্রচণ্ড শব্দ করে
মহাকাশযানটি কেঁপে উঠল, এবং আমি আক্ষরিক অর্থে উড়ে গিয়ে ছাদে আঘাত করলাম,
মহাকাশযানের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকার কারণে আমি শারিরীক কোনো আঘাত পেলাম না,
তবে উড়ে আসা নানা ধরনের যন্ত্রপাতি, আমার অভুক্ত খাবার, জমে থাকা জঞ্জাল এবং
অব্যবহৃত পোশাক থেকে নিজেকে রক্ষা করতে বেশ বেগ পেতে হলো।
নিয়ন্ত্রণ কক্ষে ভাসমান যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য জঞ্জাল সরিয়ে আমি ঘরটিকে আবার
ব্যবহার উপযোগী করতে বেশ কিছু সময় লাগল। ভেসে ভেসে আবার নিয়ন্ত্রণ প্যানেলের সামনে
এসে ফোবিকে বললাম, "দেখলে, এটি কোনো ব্যাপার নয়।"
"দেখলাম। তবে আপনি সতর্ক না থাকলে উড়ে আসা যন্ত্রপাতি থেকে আঘাত পেতে
পারতেন।"
"কিন্তু আমি সতর্ক থাকব না কেন ?"
"সেটি অবশ্যি সত্যই বলেছেন।"
আমি পদার্থ-প্রতিপদার্থের অব্যবহৃত জ্বালানি চৌম্বকীয় ক্ষেত্রে আবদ্ধ করে নিরাপত্তা
ব্যাপারটি নিশ্চিত করলাম। যাত্রাপথটি ছক করে নিউট্রন স্টারে পেঁৗছাতে কত সময় লাগবে
সেটি বের করে নিলাম, পুরো মহাকাশযানের খুঁটিনাটিতে একবার চোখ বুলিয়ে মহাকাশযানের
অধিনায়কের দৈনন্দিন কাজ করতে শুরু করলাম। মহাকাশযানে পুরোপুরি একা থাকার একটি
সুবিধে রয়েছে যেটা আমি মাত্র টের পেতে শুরু করেছি, এখানে আমার এখন কোনো নিয়ম
মানতে হয় না।
সমস্ত কাজ শেষ করতে করতে বেশ অনেকক্ষণ সময় লেগে গেল, দীর্ঘদিন মহাকর্ষ বলের
মাঝে থেকে হঠাৎ করে ভরশূন্য পরিবেশে এসে যাওয়ায় অভ্যন্ত হতে একটু সময় নিচ্ছে।
অধিনায়কের দৈনন্দিন তথ্য প্রবেশ করে আমি ঘুমানোর আয়োজন করলাম, এতদিন তবু একটু
সব্জি্থপিয় ব্যাগের ভেতরে ঘুমিয়েছি, এখন আর তারও প্রয়োজন নেই, আমি শূন্যে শুয়ে পড়তে
পারি, ভেসে ভেসে দূরে কোথাও না চলে যাই সে-জন্যে একটা ফিতা দিয়ে একটা পা কন্ট্রোল
প্যানেলের সাথে বেঁধে নিলাম। আমি শূন্যে ভাসতে ভাসতে ঘুমানোর জন্যে চোখ বন্ধ করেছি
তখন আবার ফোবির কথা শুনতে পেলাম, "মহামান্য ইবান, আপনি কিছু না খেয়েই ঘুমিয়ে
পড়ছেন। এটি আপনার স্বাস্থের জন্য -"
"ফোবি। আমি তোমাকে আগেই বলেছি, তুমি আমার মা নও, তুমি আমার স্ত্রী নও, তুমি
আমার কোনো অভিভাবক নও। আমকে বিরক্ত কোরো না, ঘুমুতে দাও।"
ফোবি আমাকে আর বিরক্ত করল না এবং আমি কিছুক্ষণের মাঝেই গভীর ঘুমে অচেতন
হয়ে পড়লাম। আমি হঠাৎ ঘুম ভেঙে জেগে উঠলাম, কেন আমার হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে গেল
আমি জানি না। আমি চোখ খুলে তাকিয়ে আবার পাশ ফিরে ঘুমিয়ে যেতে গিয়ে মনে পড়ল আমি আসলে বিছানায় শুয়ে নেই, শূন্যে ঝুলে আছি। আমি তখন চোখ খুলে তাকালাম এবং
হঠাৎ করে আতঙ্কে আমার সারা শরীর শীতল হয়ে গেল।
নিয়ন্ত্রণ কক্ষের মূল আলো নিভিয়ে রাখা হয়েছে বলে এখানে আবছা এক ধরনের অন্ধকার,
ইঞ্জিনগুলো বন্ধ করে দেয়ার ফলে কোথাও এতটুকু শব্দ নেই। এই ভয়ঙ্কর নৈঃশব্দ এবং
আলো-অঁধারিতে আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম নিয়ন্ত্রণ কক্ষের মাঝামাঝি থেকে একজন তরুণী
স্থির হয়ে একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
আমি চিৎকার করে উঠতে গিয়ে নিজেকে সামলে নিলাম, নিশ্চয়ই আমি স্বপড়ব দেখছি। কিন্তু
আমি ততক্ষণ পুরোপুরি জেগে উঠেছি, আমি জানি আমি স্বপড়ব দেখছি না। আমার সামনে একটি
তরুণী ভাসছে। একটুকরা নিওপলিমার দিয়ে শরীরকে ঢেকে রেখেছে, নিয়ন্ত্রণ কক্ষের
পরিশোধিত বাতাসের প্রবাহে সেই কাপড়টা উড়ছে। আমি স্থির দৃষ্টিতে তরুণীটির দিকে তাকিয়ে
রইলাম, এটি ত্রিমাত্রিক হলোগ্রাফিক কোনো প্রতিচ্ছবি নয় - তাহলে আমি দেখতে পেতাম
দেয়ালের ভিডি টিউব থেকে আলো বের হয়ে আসছে। এটি সত্যি-সত্যি রক্তমাংসের একজন
তরুণী।
আমি অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলাম, "তুমি কে ?"
আমার কথায় মেয়েটি ভয়ানক চমকে উঠল এবং আমি দেখতে পেলাম তার মুখে অবর্ণনীয়
আতঙ্কের ছায়া পড়েছে। মেয়েটি আমার প্রশেড়বর উত্তর না দিয়ে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল
তারপর আমাকে পাল্টা প্রশড়ব করল, "তুমি কে ?"
আমি বললাম, "আমার নাম ইবান। আমি এই মহাকাশযানের অধিনায়ক।"
"অধিনায়ক ?" মেয়েটা খুব অবাক হয়ে বলল, "অধিনায়ক তুমি ?"
"হঁ্যা।"
"তাহলে তোমকে বেঁধে রেখেছে কেন ?"
আমি অবাক হয়ে নিজের দিকে তাকালাম এবং হঠাৎ করে বুঝতে পারলাম, ঘুমানোর আগে
আমি যেন ভেসে কোথাও না চলে যাই সে-জন্যে ফিতা দিয়ে একটা পা বেধে রাখার ব্যাপারটি
মেয়েটিকে বিস্মিত করেছে। আমি পা থেকে ফিতাটি খুলে বললাম, "কোথাও যেন ভেসে চলে
না যাই সেজন্যে বেঁধে রেখেছিলাম।"
"কেন তুমি ভেসে চলে যাবে ? আমি শুনেছি মহাকাশযানে অধিনায়কদের খুব সুন্দর ঘর
থাকে।"
"তুমি ঠিকই শুনেছ -"
"তাহলে তুমি সেখানে না ঘুমিয়ে এখানে নিজেকে বেঁধে রেখে শূন্যে ঝুলে ঝুলে ঘুমাচ্ছ
কেন ?"
আমি ঠিক নিজেকে বিশ্বাস করতে পারলাম না যে এরকম বিচিত্র একটা পরিবেশে আমি
এধরনের আলাপে জড়িয়ে পড়ছি। আমি গলার স্বর যতটুকু সম্ভব শান্ত রাখার চেষ্টা করে
বললাম, "দেখ, এসব ব্যাপার নিয়ে আমরা পরেও কথা বলতে পারব। আগে আমার প্রশেড়বর উত্তর
দাও। আমার জানা প্রয়োজন তুমি হঠাৎ করে কোথা থেকে হাজির হয়েছ।"
মেয়েটি আমার প্রশড়ব শুনে কেন জানি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে বলল, "তুমি যদি মহাকাশযানের
অধিনায়ক হয়ে থাক তাহলে তোমার জানা উচিত আমি কোথা থেকে হাজির হয়েছি।"
আমি বিপনড়ব গলায় বললাম, "দেখতেই পাচ্ছ আমি জানি না। সেজন্যেই ব্যাপারটি জরুরি" ে
কন ব্যাপারটি জরুরি ?"
"দাঁড়াও বলছি। তার আগে আমি আলো জ্বেলে নিই।"
আমি আলো জ্বালানোর জন্যে একটু এগিয়ে যেতেই মেয়েটি চিৎকার করে বলল, "খবরদার
তুমি আমার কাছে আসবে না।"
আমি একটু অপমানিত বোধ করলাম, কিন্তু এই মুহূর্তে মান-অপমান নিয়ে চিন্তা করার
সময় নেই। আমি গলার স্বর শান্ত রেখে বললাম, "তোমার ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই,
আমি তোমার কাছে আসব না।"
নিয়ন্ত্রণ প্যানেলের সুইচ স্পর্শ করামাত্র নিয়ন্ত্রণ কক্ষটি উজ্জ্বল আলোতে ভেসে গেল এবং
মেয়েটি হাত দিয়ে নিজের চোখ আড়াল করে দাঁড়াল। আমি দেখতে পেলাম মেয়েটি কমবয়সী
এবং অপূর্ব সুন্দরী। মসৃণ ত্বক, কালো চুল এবং সুগঠিত দেহ। মেয়েটির চেহারায় একধরনের
নির্দোষ সারল্য রয়েছে যেটি আমি বহুদিন দেখি নি। মেয়েটি ভরশূন্য পরিবেশে অভ্যস্ত নয়, প্রতি
মুহূর্তে সে ভাবছে সে পড়ে যাবে, কিন্তু ভরশূন্য পরিবেশে কেউ কোথাও পরে যেতে পারে না
এবং এই বিচিত্র অনুভূতির সাথে সে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে।
আমি কন্ট্রোল প্যানেলের কাছে দাঁড়িয়ে পুরো প্যানেলটিতে একবার চোখ বুলিয়ে অস্বাভাবিক কিছু ঘটেছে কি না দেখার চেষ্টা করলাম - কিন্ত সেরকম কিছু চোখে পড়ল না। আমি মেয়েটির
দিকে তাকিয়ে আবার জিজ্ঞেস করলাম, "তুৃমি কে ? কোথা থেকে এসেছ ?"
মেয়েটি আমার প্রশেড়বর উত্তর না দিয়ে নিও পলিমারের চাদরটি টেনে নিজের শরীরকে ভালো
করে ঢাকার চেষ্টা করে বলল, "আমার শীত করছে।"
"এই পাতলা নিওপলিমারের টুকরো দিয়ে শরীর ঢাকার চেষ্টা করলে শীত করতেই পারে।
আমি তোমার গরম কাপড়ের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।"
মেয়েটি কোন কথা না বলে আমার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইল। আমি আবার
জিজ্ঞেস করলাম, "তুমি কে ?
"আমার নাম মিত্তিকা।"
"মিত্তিকা, তুমি কোথা থেকে এসেছ ?"
"আমি জানি না। হঠাৎ করে আমার ঘুম ভেঙে গেল, আমি ঘুম থেকে উঠে ভাসতে
ভাসতে এদিকে এসেছি -"
"তার মাসে তুমি কার্গো বে'তে রাখা শীতল ক্যাপসুল থেকে উঠে এসেছ ?"
"আমি সেটা জানি না। আমি রিশি নক্ষত্রপুঞ্জে যাবার জন্যে রেজিস্ট্রি করিয়েছিলাম, কথা
ছিল সেখানে পেঁৗছার পর আমাকে জাগানো হবে। কিন্তু -"
মেয়েটি অভিযোগের সুরে আরো কিছু কথা বলতে থাকে কিন্তু আমি ভালো করে সেটা
শুনতে পেলাম না, হঠাৎ করে একধরনের অশুভ আশঙ্কায় আমার ভুরু কুঞ্চিত হয়ে উঠল।
আমি চাপা গলায় ডাকলাম, "ফোবি।"
ফোবি একেবারে কানের কাছ থেকে ফিসফিস করে বলল, "বলুন মহামান্য ইবান।"
"এটা কী করে হলো ? এই মেয়েটি ঘুম থেকে জেগে উঠল কেমন করে ?"
"বলতে পারছি না মহামান্য ইবান। আমার দুটি সম্ভাবনার কথা মনে হচ্ছে।"
"কী সম্ভাবনা ?"
ফোবি উত্তর দেবার আগেই মিত্তিকা ভয়-পাওয়া-গলায় চিৎকার করে উঠল, "তুমি কার
সাথে কথা বলছ ?"
আমি মিত্তিকাকে ভরসা দেবার ভঙ্গিতে বললাম, "ফোবির সঙ্গে। ফোবি হচ্ছে এই
মহাকাশযানের মানুষের সাথে যোগাযোগ করার ইন্টারফেস।"
"সে কোথায় ?"
"তুমি তাকে দেখতে পাবে না।"
মিত্তিকা আমার কথা বিশ্বাস করল বলে মনে হলো না, কেমন জানি ভয়ার্ত চোখে আমার
দিকে তাকিয়ে রইল। আমি ফোবিকে জিজ্ঞেস করলাম, "তুমি কী সম্ভাবনার কথা বলছ ?"
"আপনি যখন ফোবিয়ানের দুটি ইঞ্জিন একসাথে বন্ধ করে দিয়েছিলেন তখন প্রচণ্ড
ঝাকুনিতে কোনো একটি শীতল ক্যাপসুল খুলে গিয়েছে, নিরাপত্তা সার্কিট তখন ভেতরের
মানুষটিকে বাঁচিয়ে তুলেছে।"
আমি মাথা নাড়লাম, বললাম, "না। সেটা খুব সম্ভবযোগ্য মনে হচ্ছে না। দ্বিতীয়
সম্ভাবনাটা কী ?"
"রিতুন ক্লিসকে যখন আমরা নিজেকে নিজে অপসারণক্ষমতা দিয়েছি তখন নিউরাল
নেটওয়ার্কের স্মৃতির একটা বড় অংশ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তার ফল হিসেবে শীতল ক্যাপসুলের
মানুষেরা জেগে উঠছে।"
"সর্বনাশ !"
মিত্তিকা একটু এগিয়ে আসার চেষ্টা করে গলার স্বর উঁচু করে বলল, "সর্বনাশ কেন ?"
"তোমাকে নিয়ে আমি সর্বনাশ বলছি না।"
"তাহলে কাকে নিয়ে সর্বনাশ বলছ ?"
"তোমাদের সাথে ম্যাঙ্গেল ক্বাস নামে একজন ভয়ঙ্কর ডাকাত রয়েছে, তাকে নিয়ে বলছি।
এই মানুষটি যদি জেগে উঠে থাকে তাহলে আমাদের খুব বড় বিপদ।"
ফোবি নিচু গলায় আমাকে ডাকল, "মহামান্য ইবান।"
"বল।"
"কিছু-একটা নিয়ে একটু সমস্যা আছে। কার্গো-বে'তে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সমস্যা হচ্ছে।"
আমি হঠাৎ করে একধরনের আতঙ্ক অনুভব করলাম, সত্যিই যদি মিত্তিকার মতো ম্যাঙ্গেল
ক্বাসও জেগে উঠে থাকে তাহলে কী হবে ? আমি চাপা গলায় ডাকলাম, "ফোবি।"
"বলুন মহামান্য ইবান।"
"আমার একটু কার্গো বে'তে যেতে হবে।"
ফোবি কোনো কথা বলল না।
"কী হয়েছে নিজের চোখে দেখে আসতে হবে।"
এবারেও ফোবি কোনো কথা বলল না।
"ফোবি।"
"বলুন মহামান্য ইবান।"
"আমার মনে হয় খালি হাতে যাওয়া ঠিক হবে না। অস্ত্রাগার থেকে একটা অস্ত্র নিয়ে যাই।
কী বল ?"
"ঠিক আছে।"
মিত্তিকা চোখ বড় বড় করে আমাদের কথা শুনছিল, এবারে ভয়ার্ত গলায় বলল, "তুমি
কোথায় যাচ্ছ ?"
"কার্গো বে'তে। তুমি এখানে একটু অপেক্ষা কর।"
"না, আমার ভয় করে।"
"এখানে ভয়ের কিছু নেই।"
"যদি ভয়ের কিছু না থাকে তাহলে হাতে অস্ত্র নিয়ে যাচ্ছ কেন ?"
প্রশড়বটির ভালো কোনো উত্তর ভেবে পেলাম না, মিত্তিকা নিজেই বলল, "আমি তোমার
সাথে যাব।"
"তুমি তো ভরশূন্য পরিবেশে অভ্যস্ত নও, ভেসে ভেসে যেতে পারবে না।"
"ভেসে ভেসে যদি যেতে না পারি তাহলে এখানে এসেছি কেমন করে ?"
আমি এই প্রশড়বটারও উত্তর দিতে পারলাম না, মাথা নেড়ে বললাম, "ঠিক আছে চল।"
আমি মিত্তিকাকে নিয়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে মূল করিডোর ধরে ভেসে ভেসে ফোবিয়ানের
মাঝামাঝি সুরক্ষিত ঘরটি থেকে একটা শক্তিশালি অস্ত্র তুলে নিলাম, লেজার রশ্মি দিয়ে
লক্ষ্যবস্তুকে লক্ষ্য করে শক্তিশালী বিস্ফোরক ছুড়ে দেবার একটি অতি প্রাচীন কিন্তু কার্যকর
অস্ত্র।
অস্ত্রটি উরুর সাথে বেঁধে নিয়ে আবার আমি ভাসতে ভাসতে এগিয়ে যেতে থাকি, ভরশূন্য
পরিবেশে ভেসে ভেসে যাওয়া নিয়ে মিত্তিকা যদিও খুব বড়গলায় কথা বলেছে কিন্তু আসলে অভ্যস্ত না থাকায় সহজে এগিয়ে যেতে পারছিল না, আমি তাকে একহাতে টেনে নিয়ে
যাচ্ছিলাম।
কার্গো বে-এর দরজা হাট করে খোলা, ভিতরে আবছা অন্ধকার। আমি আলো জ্বালালাম,
ঘরের মাঝামাঝি একটা ক্যাপসুল ওলটপালট খেয়ে ভাসছে। ক্যাপসুলটি হা করে খোলা। আমি
চাপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম, "মিত্তিকা, এটা কি তোমার ক্যাপসুল ?"
মিত্তিকা মাথা নেড়ে বলল, "না। আমারটা ওই পাশে।"
আমি উরু থেকে খুলে অস্ত্রটা হাতে নিয়ে একটা ঝটকা দিয়ে ক্যাপসুলের দিকে এগিয়ে
গেলাম। ক্যাপসুলের দরজা খোলা, ভেতরে কেউ নেই। ক্যাপসুলের পাশে ম্যাঙ্গেল ক্বাসের নাম
লেখা - এটাতে তাকে আটকে রাখা ছিল।
ভয়ের একটা শীতল স্রোত আমার মেরুদণ্ড দিয়ে বয়ে গেল, ম্যাঙ্গেল ক্বাস ক্যাপসুল থেকে
বের হয়ে এসেছে।
এই মহাকাশযানের কোথাও সে আমার জন্যে অপেক্ষা করছে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




