somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অজান্তে

১১ ই জানুয়ারি, ২০১৬ রাত ১২:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

((হরর থ্রিলার))
আমি তখন রাশিয়াতে থাকি । পড়াশোনা আর পাশাপাশি আউটসোর্সিং ছিল আমার কাজ । খুব হাড়ভাঙা খাটুনি করতাম । শুক্র শনি দুইদিন ওগুলো বন্ধ রাখতাম । ওইসময় চলত লেখা লিখি । দেশের পত্রিকায় লেখা লিখি করি তখন থেকেই । দেখতে দেখতে পড়াশোনা শেষ হয়ে এল । একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর চাকরী জুটল । ইঞ্জিনিয়ার । কোম্পানীটি বিভিন্ন দেশে আইটি এক্সপার্ট সরবরাহ করে । এছাড়া নিজেদেরও বিশাল আইটি ফার্ম । আমি রাশিয়াতেই আটকে গেলাম । আলেক্সান্ড্রভ শহরে একটা ফার্মে পোস্টিং । সেখানে থাকতাম ।
কপাল ভাল বলতে হয় । যে বাড়িটাতে থাকতাম সেটা আমার পূর্ব পরিচিত এক লোকের । থাকতে চাইলাম, প্রথমে না করলেও পরে দিল । তবে ভাড়া নিবে না । মহাখুশি মনে বাড়িটাতে উঠলাম । বাড়িটার তিনদিকে লেক । দুই তলা বাড়ি । নতুনই বলতে গেলে । ভাড়া দেয়ার জন্যই তৈরি । তবুও আমাকে দিতে রাজি হননি মালিক । টুলেট সাইনবোর্ডটাও অবাক করল আমায় । বাড়িতে একাই থাকি বলতে গেলে । নির্ঝঞ্ঝাট লোক আমি । বাবা দেশে থাকেন । অবসরপ্রাপ্ত সরকারী আমলা । টাকা পাঠানো জরুরী না হলেও পাঠাই । দেশে ব্যাংকে জমা হয় । আয়ের তুলনায় ব্যায় অনেক কম । আমার কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই । ছিলো একজন । খুবই ভালবাসতাম । জোড় করে বিয়ে দিয়ে দিলো ওর বাবা । আমার বাড়ির লোক না ও করে নি আবার মেয়ের পরিবারের সাথে ঝামেলাও করে নি । আমিও নীল রক্তের অসম্মানের ভয়ে কিছু করতে পারি নি । ওর বিয়ের পর আমি রাশিয়া চলে আসি । মা আসতে দিতে চাননি । যদি রাশিয়ান বিয়ে করি । তবে নারীর নেশা থেকে দূরে থাকতে পারলেও মদ থেকে থাকতে পারি নি । মাসে বার চারেক ভদকা খেয়ে বুঁদ হয়ে থাকি । লেখা লিখির জন্য বাড়িটার জুড়ি নেই । পূর্ব পাশে বিশাল মাঠ । পশ্চিমে মেইনরোড । বাকি দুপাশে লেক । মেইন রোডের সাথে একটা সেতু বাড়িটার সাথে লোকালয়ের যোগাযোগ রেখেছে । দুই তলায় দুটো করে ফ্লাট । তিনটে রূম । একটা ডাইনিং । একটায় আমি থাকি । একটা গেস্ট রূম আরেকটা লাইব্ররী ।
দিনকাল ভালই যাচ্ছিলো । কারাশনিকভ মাঝে মাঝে এসে দোতলার উত্তরের ঘরে থাকে । আমি নিচের দক্ষিনেরটায় থাকি । জোড় করেও দোতলার দক্ষিনের ঘরটা নিতে পাড়ি নি । মনে দুঃখ থাকলেও কিছু করার ছিলো না ।
বেশ ভালই কাটছিলো দিনকাল । তবে একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে । প্রায়শ রাতেই শব্দ পাই কে যেন দোতালায় দৌড়ে বেড়াচ্ছে । ধুপ ধুপ শব্দ ।রাত বাড়ে শব্দও বাড়ে । কারাশনিকভের সাথে এ নিয়ে কথা বলব বলব করেও বলি নি । বেচারা আমাকে এমনিতেও থাকতে দিতে চায় নি । বাড়িটা খুবই পছন্দ আমার । কেমন যেন একটা গুমোট।পরিবেশ । দুপুর বেলা মনে হয় দখিনা বাতাসে বাড়ির চাপাকান্না কান্না আর দীর্ঘশ্বাসের গন্ধ পাওয়া যায় । এগুলোকে নিজের মস্তিষ্কের সৃষ্টি ভাবতেই পছন্দ করি আমি । চাকরী লেখালেখি নিয়ে একটা চক্রের মধ্যে ক্লান্ত হয়ে গেছি আমি । ভদকাতেও বিরক্তি এসে গেছে । বন্ধুরা একঘেয়েমি কাটাতে বিয়ে করতে বলে । আমি করি না । বেশ আছি । যখন একা থাকি,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস আর অরুর কথা মাথায় এনে স্মৃতির জাবর কাটি ।
শব্দটার বিরক্তি বাড়ছে । অফিসিয়াল কাজে সিংগাপুর হয়ে দেশে যাবো । একমাসের ব্যাপার । কারাশনিকভ কে মেইল করে বেড়িয়ে পড়লাম । ফিরলাম ২৮ ফেব্রুয়ারী । বইমেলার বইয়ের গন্ধে মনটা ভরে আছে ।
তেশরা মার্চ । অরুর ৮ম বিবাহবার্ষিকী । স্পষ্ট মনে আছে ৮ বছর আগে ছ্যাক খেয়ে দেশাত্মবোধক গান গেয়েছিলাম টানা ৩ ঘন্টা । সে সব পাগলামিই ছাদে বসে ভাবছি । হঠাৎ পরিচিত শব্দে চমকে উঠলাম । রবীন্দ্র সংগীত! রাশিয়াতে!
বিষ্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম যে গান গাচ্ছিলো সেই মেয়েটা আমার ছাদে ।
-কে আপনি ?
-নতুন ভাড়াটিয়া । দোতলায় সাউথ ফ্ল্যাটে এসেছি ।
মনে মনে কারসনিকভকে ইচ্ছা মত গাল দিলাম । হারমজাদা আমায় দিল না ঘরটা ।
ধীরে ধীরে মেয়েটার সাথে বন্ধুত্ব হয়ে গেলো । নাম নীরা রহমান । বাঙালি । একটা বহুজাতিক কোম্পানীর রিজিয়নাল ম্যানেজার । দেখতে দেখতে বেশ কিছু দিন কেটে গেল । আমি মেয়েটার প্রতি ভীষণ টান অনুভব করলাম । নীরা একটা কাজে বাইরে গেল ২ দিনের জন্য । এমন সময় করসনিকভ এসে উপস্থিত । আমায় অবাক করে দিয়ে ও রাতে কোনো শব্দ শুনি কিনা জিজ্ঞেস করল । আমি বললাম যে দেশ থেকে ফিরে এসে আর শুনি নি । আর কিছু বলার আগেই ও চলে গেল । নীরা ফিরলে ওর সাথে এ ব্যাপারে কথা বললাম । ও হেসেই উড়িয়ে দিল । আরো একমাস পর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম নিরাকে প্রপোজ করব । ওকে ভালবেসে ফেলেছি আমি । সেই আমি যে গত ৮ বছর কোনো মেয়েকে ছুই নি ।
সেই শনিবার আমি বাড়ি ফিরি নি । ফিরলাম পরদিন । হাতে চারটা গাঁদা ফুল আর একটা কার্ডে ভালোবাসার কথা লেখা । দুরুদুরু বুকে দোতলায় উঠলাম । কিন্তু একি ! নীরা বাড়িতে নেই । উল্টো কারাসনিকভ এসেছে । অগত্যা ওর ঘরেই নক করলাম আমি । ওকে নীরার কথা জিজ্ঞেস করতেই ও আমাকে ভিতরে নিয়ে বসাল ।
-নীরাকে কিভাবে চিনো ?
আমি সব খুলে বলতেই কারাসনিকভ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল ভাগ্যিস তুমি ভাল লোক । তারপর বলতে শুরু করল ,
আজ থেকে আট বছর আগের কথা । আমি তখন এই বাড়িতেই থাকতাম । তখন পাশের ফ্লাটে ভাড়া থাকতো নীরা । একদিন রাতে তোমার পাশের ফ্লাটের বাসিন্দা বরিস পেশকভ নীরাকে ধর্ষণ করে । ইন্ডিয়ান লেডি, তাচ্ছিল্য করে বলল ও । সুইসাইড করল । তারপরের দিনই পাশের ফ্লাটে খুন হয় বরিস আর ওর মদ্যপ স্ত্রী । ওদের ছোট্ট মেয়েটাকে পাওয়া যায় নীরার ঘরে অর্ধেক পচা অবস্থায় । সেটা ছিল শুরু । এরপর থেকে কেউ আর এই বাড়িতে থাকতে পারে না । আমি ছাড়া । আমার সাথে মেয়েটার খুব ভালই বন্ধুত্ব ছিল । ওর মৃত্যুতে আমিও ভেঙে পরি । এরপর থেকে কেউ এ বাড়িতে থাকতে পারে না । তুমি জোর করে থাকছ । নীরার ব্যপারে তোমায় বলি নি কারণ ও তোমার ফ্ল্যাটে থাকা ভয় দেখায় না ।
নিজের ঘরে ফিরতেই খুব কান্না পেল । কেন বারবার এমন হয় আমার সাথে । পরদিনই শুনলাম আমাকে লন্ডন বদলি করা হয়েছে । পরশুই জয়েন ডেট । বাসায় গিয়ে লোক জন নিয়ে সবকিছু ট্রাকে তুলেই এয়ারপোর্ট উদ্দ্যেশ্যে রওনা হলাম । কালাসনিকভ দূরে দাড়িয়ে হাত নাড়ছে । কি মনে করে যেন নীরার ঘরের দিকে তাকালাম । হার্ট একটা বিট মিস করল । নীরা দাড়িয়ে আছে চোখটা ভেজা । যতক্ষণ দেখা যায় ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম আমি । তারপর টের পেলাম আমিও কাঁদছি । মনে মনে বললাম,”নীরা……. আমি আবার ফিরব । আবার ।
পুনশ্চঃ এর প্রায় একবছর পর আবার আলেকজান্দ্রভে ফিরে আসি । ততদিনে বাড়িটা ভেঙে একটা বিশাল এপার্টমেন্ট তৈরি করেছে কারাশনিকভ । যার নাম দিয়েছে ,”নীড়া কমপ্লেক্স” ।

২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

।।মাদার অব ড্রাকুলা হাসিনার রাস্ট্রীয় জঙ্গীবাদ।।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৮


মাদার অব ড্রাকুলা হাসিনা ভারতের প্রযোজনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীদেরকে দিয়ে জঙ্গী জঙ্গী নাটক মঞ্চস্থ করতো। বহিবিশ্বকে বোঝাতো দেশে ইসলামী জঙ্গী দিয়ে ভরে গেছে এবং সেই জঙ্গীরা ইউরোপ আমেরিকার ভয়াবহ ক্ষতি করবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

=শরত তুই যাস নে ! =

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:১৩



ভ্যাপসা গরমে নাভিশ্বাস জীবনে কেবল বৃষ্টির হাপিত্যেশ,
মেঘ বলেছে আসবো আসবো আমার উদ্দেশ,
শুভ্র মেঘেদের নাচন
উত্তাপ হাওয়ায় যায় না আর বাঁচন,
তবুও স্নিগ্ধ আবেশ মনজুড়ে,
হঠাৎ হাওয়ার ঝাপটা, বাজে পাতার বাঁশি সুরে।

বিকেলের হাওয়ায় দেহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

১ কোটি চাকরি: শর্ত প্রযোজ্য, মেধার প্রবেশ নিষেধ !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:২৫


ভোটের আগে বলা হয়েছিল, ক্ষমতায় এলে প্রথম আঠারো মাসেই এক কোটি মানুষকে চাকরি দেওয়া হবে। কথাটা শুনে দেশের বেকার তরুণেরা তো মহাখুশি, কেউ ভাবল সরকারি চাকরি হবে, কেউ ভাবল... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বে ঋণ খেলাপিতে বাংলাদেশ ১ নম্বর এবং দেশে ঋণ খেলাপিতে শীর্ষ ২০ জনের ১৯ জনই ওনাদের!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:০৫



শাস্ত্রীয় কথায় না গিয়ে সোজা কথায় কেউ ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করলে তাকে ঋণ খেলাপি বলা হয়। আপনি জানলে অবাক হবেন যে শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপির ১৯ জনই... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কি ডার্ক জাস্টিসকে ফলো করছেন?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:১০



ছোটবেলায় দেখা একটি টিভি সিরিয়াল তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিলো। একজন বিচারক যিনি দিনের বেলায় কোর্ট রুমে অপরাধের বিচার করতেন, আর, রাতেরবেলা আইনের ফাঁক -ফোকর গলে বেরিয়ে যাওয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

×