somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তবুও স্বপ্ন যখন বিসিএস

২১ শে অক্টোবর, ২০১৫ রাত ১০:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মাস্টার দা সূর্যসেন হলের রিডিং রুমে পড়তে গেলে বারান্দার থামে একটা লাইন চোখে পড়তো । কালো মার্কার বা কাঠ কয়লা দিয়ে একটু মেয়েলী ধরণের গোটাগোটা হরফে সাদা চুনের উপর লেখা - " রাসেল বিসিএস দেবে " ।

খুব বৈশিষ্ট্যহীন একটা লাইন, কিন্তু একটু চিন্তা করলে এ লাইনটাই যেন বিশাল বড় কোন গল্প নিয়ে হাজির হয় ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্টরা, বিশেষত কলা ভবনের শিক্ষার্থীরা, বিসিএস এর জন্য এক কথায় " অমানুষিক " পরিশ্রম করে । ক্যাম্পাসের হাকিম চত্বরে একটু সকাল সকাল গেলে দেখা যায় লাইব্রেরি বন্ধ গেইটের সামনে ত্রিশ - চল্লিশ জন মানুষ তীর্থের কাকের মতো চেহারায় জটলা পাকাচ্ছে; যেন বন্ধ গেইটের ওপাশে মিলাদ পড়ানো হচ্ছে, একটু পরই মিলাদ শেষ করে কেউ এসে জিলাপি দিয়ে যাবে । এরা আসলে বিসিএস পরীক্ষার্থী, সকাল সকাল চলে এসেছে লাইব্রেরির নিরিবিলি পরিবেশে একটা সিট দখল করতে । এরা সেই যে সকাল সাড়ে সাতটা - আটটা বাজে পড়তে ভেতরে ঢুকবে বের হবে দিনের আলো মেলাবার পর । সারাদিন একটানা পড়াশোনা, মাঝে উঠে খুব জরুরি ক্লাসগুলো করা এবং খাওয়া - দাওয়া সহ অন্যান্য কাজ । যারা মাস্টার্স দিয়ে ফেলেছে তারা বোধহয় পারলে খাওয়াটাও ভেতরেই সারে । একেকজন পড়েন দিনে দশ থেকে পনের ঘন্টা ।

হলগুলোতে থাকার অবস্থা ব্যাখ্যাতীত করুন । হলের একটা সিট পেতে এবং টিকিয়ে রাখতে আপনাকে রাস্তায় নেমে বিএনপি-র আমলে দিতে হবে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ আর আওয়ামী লীগের আমলে জয় বাংলা স্লোগান । ডিপার্টমেন্টের ক্লাস কোন জরুরি ব্যাপার না, সিট বাঁচাতে চাইলে আগে জাতীয়তাবাদ অথবা স্বাধীনতার চেতনাকে উদ্ধার করা আবশ্যক । না গেলে হল থেকে বের করে দেয়া, রড দিয়ে পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠানো, শিবির বানিয়ে দেওয়া সহ যে কোন ঘটনা ঘটতে পারে । সবচেয়ে অমানবিক কষ্ট করে প্রথম আর দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা । রুমে জায়গা পাওয়া বিরাট সৌভাগ্যের ব্যাপার, পেলেও পাখির বাসার মতো এক রুমে চার থেকে আটজনের থাকতে হয় যা কিভাবে সম্ভব আমি জানি না । অসংখ্য শিক্ষার্থী সে রুমেও জায়গা পায় না, তাদের জন্যে গনরুম বলে একটা ব্যাপার আছে । অন্ধকারাচ্ছন্ন বড় একটা রুমে মেঝেতে জাজিম পেতে সাড় দিয়ে শ'খানেক শিক্ষার্থী থাকে, পড়ে, ঘুমায় । আর সব থাক, রুমের ভেতরে নিঃশ্বাস নেয়ার মতো অক্সিজেন কিভাবে থাকে সেটাই রহস্য ..... অনেকের কপাল আরও খারাপ । গনরুমেও জায়গা না থাকলে ঘুমাতে হয় খোলা বারান্দায়, শীত - বর্ষা - গ্রীষ্ম কোন বিবেচ্য বিষয় না । বারান্দায় বহুবার আমি দেখেছি কোন ছাত্র গুটিসুটি মেরে মাদুরে শুয়ে আছে আর তার প্রায় গা ঘেষে কুকুর - বেড়াল ঘুমুচ্ছে বা প্রবল বেগে গা চুলকাচ্ছে । খাবারের ব্যাপারে কিছু বললাম না । ওদিকে গেলে আপনি হয়তো আজ রাতের খাবারটা আর খেতে পারবেন না । মনে অপরাধবোধ চলে আসবে ।

হলের রিডিংরুমে সবসময়ই থাকে পিন পতন নিরবতা । হলের স্টুডেন্টরা পড়ছে - কেউ ডিপার্টমেন্টের পড়া, আর কেউবা কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স, বাংলাদেশ সংবিধান, ওরাকল, অ্যাসিওরেন্স, MP3 গাইড সহ বিসিএস এর জন্যে নানা বই । এদের পড়া দেখে আমার সবসময়ই তপস্যার কথা মনে হয়েছে । প্রতিটা ছেলেই জানে তার দিকে চেয়ে আছে তার পুরো পরিবার, যারা গর্ব করে সবাইকে বলে বেড়ায় তাদের সন্তান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে । তার পড়া শেষ হলে সংসারে আর কোন অভাব থাকবে না । প্রিয় মানুষদের মনের এ কথাগুলো তারা মুখে না বললেও সন্তানেরা নিজেদের প্রতিটা রক্তবিন্দুতে টের পায় তাকে জীবনে কিছু করতে হবে, তার পরিবারের জন্যে, নিজের জন্যে । বাবা - মা অনেক কষ্ট করেছেন জীবনে, তারা যদি শেষ জীবনে একটু আরাম আয়েশ না করতে পারলেন তাহলে সন্তানের বেঁচে থেকে লাভ কি? তারা পড়ে, পায়ে হেঁটে, বাসের হ্যান্ডেলে ঝুলে পাঁচটা - ছটা টিউশনি করে । নিজের খরচ তো চালায়ই, খেয়ে না খেয়ে বাসায়ও প্রতি মাসে কিছু টাকা পাঠায় ।

আমার সত্যি সত্যি চোখে পানি চলে আসে যখন দেখি জীবনে স্বপ্ন পূরণর জন্যে জান - প্রাণ দিয়ে কষ্ট করে যাওয়া মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত এ মানুষগুলোকে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য তো দূরে থাক, যতভাবে সম্ভব চেষ্টা করা হয় দাবিয়ে রাখতে । প্রতি পদে পদে বাধা । থাকার জায়গা নেই, খাওয়া - গোসল - ঘুমের ব্যবস্থা নেই । আছে পলিটিক্স । সব বাধা পার হয়ে পরীক্ষার হলে বসার পর আসে সবচেয়ে বড় অসভ্য ধাক্কাটা - " কোটা " । বিসিএস সহ সকল সরকারী চাকরিতে কোটা ৫৬% .... এতোদিন মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের কোটা ছিলো, এবার থেকে নাতি - নাতনিদের কোটা দেয়া হয়েছে । কেন তার কোন ব্যাখ্যা কেউ দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করেন নি । পৃথিবীর আর কোন সভ্য দেশে এমন অমানবিক নিয়ম আছে বলে আমার জানা নেই । এই শতভাগ অন্যায় নিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে আবার সরকার পক্ষ থেকে আসে হুমকি - যারা প্রতিবাদ করেছে তাদের ছবি দেখে দেখে বাদ দেয়া হবে । কি বিচিত্র আমার এ স্বদেশ!

মুক্তিযুদ্ধ আমার কাছে ততদিন পর্যন্তই অবিসংবাদী বিষয় ছিলো যতদিন এর মধ্যে কোটা আসে নি । যে মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করতে, সকলের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে যুদ্ধে গিয়েছিলেন, তারা কখনো কোটা চান নি, চাইতে পারেন না ।

কিন্তু রাস্তার মোড়ে মোড়ে কাঁটা বিছিয়েও ওইসব পরিশ্রমী স্বপ্নবাজ মানুষদের আটকানো যাবে না, কখনোই যায় নি .... আমার বিশ্বাস রাসেল ভাই বিসিএস দিয়ে আমাদের বিসিএস ক্যাডার রাসেল ভাই ঠিকই হবেন .... রাসেলদের থামানো অসম্ভব । কারণ এরা থামতে জন্মায় নি ।

সবার জন্য শুভ কামনা রইলো জীবনের সামনের চেষ্টাগুলোর জন্য ।

( শিক্ষার্থী , ফাইনান্স বিভাগ , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় )
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে অক্টোবর, ২০১৫ রাত ১০:৪১
৭টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

স্রেফ 'জিন্নাহকে স্মরণ আর বঙ্গবন্ধুকে গালি' রাজাকারি মানসিকতারই উদাহরণ

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৪



ভারতীয় উপমহাদেশের জাতিসত্তাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন নেতা হিসেবে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রতি কেউ 'যৌক্তিক' বা তাঁর 'প্রাপ্য' সম্মানটুকু জানাতেই পারেন; তাতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু, যখন সেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিন্নাহর ছবি প্রশ্ন জাগে, আমরা কোন দেশে বাস করি?

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৫৯

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিন্নাহর ছবি প্রশ্ন জাগে, আমরা কোন দেশে বাস করি?
যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, যে বাংলাদেশ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হয়েছে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু... ...বাকিটুকু পড়ুন

এগারটি বছর পার হয়ে গেল…. কিছু পরিসংখ্যান নিয়ে একাদশতম বর্ষপূর্তি পোস্ট

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৪১



পূর্বের বর্ষপূর্তি পোস্টের লিঙ্কঃ দশম বর্ষপূর্তি পোস্ট

সামহোয়্যরইনব্লগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখ রাত ১১টা ২৬ মিনিটে প্রকাশিত হয় আমার প্রথম কবিতা, বক্ষমাঝে থাকবে তুমি। বলা যায় খুব দ্রুতই, মাত্র তৃতীয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুঃখ খচিত পতাকা আমার

লিখেছেন এম ডি মুসা, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:২৪


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র প্রাঙ্গণে
আজ হঠাৎ কার ছায়া নামে?
কার দুঃসাহসী কালো হাত
ইতিহাসের বুকের ওপর আঁকে পরাধীনতার নাম?

যে নাম একদিন ভাষার কণ্ঠ রুদ্ধ করতে চেয়েছিল,
যে শাসন একাত্তরে ছড়িয়েছিল মৃত্যুর অন্ধকার
আজ কেন তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ হতো হায়দ্রাবাদ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৫

।।হায়দারাবাদের নিজাম।।


১৯৪৭ সাল ভারতবর্ষের মুসলমানরা যখন নির্যাতনের শিকার অনেকগুলো গণহত্যা হয়েছিল দাঙ্গা হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে বা তারও আগে এই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাজনীতি শুরু করেছিল কংগ্রেসের রাজনীতি দিয়ে তিনি কংগ্রেসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×