somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কবি মাসুদ মুস্তাফিজ ও তার বহুমাত্রিক কবিতা।। দ্বীপ সরকার

০১ লা ডিসেম্বর, ২০২৫ দুপুর ১২:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




কবি মাসুদ মুস্তাফিজ ও তার বহুমাত্রিক কবিতা
দ্বীপ সরকার

কবি মাসুদ মুস্তাফিজ বাংলাদেশের সমকালীন একজন পরিচিত কবি ও প্রাবন্ধিক। জন্মঃ ২২ নভেম্বর ১৯৬৯ খ্রীষ্টাব্দে, দিনাজপুর,বাংলাদেশ। তিনি নব্বই দশকের কবি হিসেবে পরিচিত,সেই সময় থেকে বাংলা কবিতার পরিসরে তিনি সমানভাবে কাজ করে চলেছেন। কবির কবিতাগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, বিমূর্ততা এবং দৃশ্য-প্রতীকের ঘন সঞ্চারণ। প্রতিটি কবিতা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক চেতনাকে মিশিয়ে এক ধরনের পোস্ট-মডার্ন ভাষাভঙ্গি তৈরি করেছে, যেখানে অর্থের তেমন কেন্দ্র নেই; বরং বিচ্ছিন্ন চিত্র,চিত্রকল্প,হঠাৎ পরিবর্তিত বাক্যগতি। বাক্যের এক ঠাওর থেকে আরেক ঠাওরে,শক্তিশালী রূপকের মাধ্যমে পাঠককে নিজস্ব ব্যাখ্যার দিকে ঠেলে দেয়। তার অনেক কবিতায় খুঁজে পাওয়া যায়,ভাষার ভাঙন ও রূপকের বহুস্বর।


‘হারানো রুমাল’এ আমরা দেখি ভাষার এক ধরনের দেহীকরণ। ‘ক্রমবর্ধমান শরীরের ব্যাকুল অব্যয়পথ’, ‘রক্তবিভক্তির গোলাপ’ বা ‘সমর্পণ ঘ্রাণের জল’-এসব চিত্রকল্প ভষাকে সরাসরি অনুভূতির বদলে দেহ-সদৃশ এক চলমান কাঠামোয় পরিণত করেছে। এই ভাষাভঙ্গি অর্থকে স্থির হতে দেয় না; বরং ক্রমাগত পিছলে যেতে বাধ্য করে।‘যৌবন ভিজে গর্ভস্থ হয়েছে বিবর্ণ জানালা’-এখানে যৌবন, জল, জানালা-তিনটি স্তরের রূপক একত্রে এসে তৈরি করেছে সময়-দেহ-স্থানের এক যৌথ প্রতীক। এটি পোস্ট-স্ট্রাকচারাল কবিতার অভিব্যক্তি। এছাড়াও তার কবিতায় প্রকৃৃতি ও মানবসমাজের দ্বৈত সংঘাত ফুটে ওঠে।

কবিতা ‘নিমগাছের পাতায় রাহুপাত্রের হাওয়া’য় প্রকৃতি এবং অর্থনীতি, মানুষের ভুল ও প্রকৃতির নীরব দর্শন-এ দু’য়ের সংঘাত স্পষ্ট। ‘নব অর্থনীতির অবনতিদ্বার’, ‘গাণিতিক অসাড়তা’, ‘বহুমাত্রিক বৈষম্য’-এই শব্দচয়ন দেখায় কবি সামাজিক বাস্তবতার গভীরে নিহিত অসাম্য ও নিঃশ্বাসহীনতাকে প্রকৃতির প্রতীকে অনুবাদ করেছেন। এখানে মানুষের ব্যর্থতা পাঠককে একটি দার্শনিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়-প্রকৃতি কি আজও আমাদের শুদ্ধতার আশ্রয়, নাকি আমরা সবকিছুই দূষিত করে ফেলেছি?

কবির ‘খহর’ কবিতায় অস্তিত্বের সংকট ও পারিবারিক-ঐতিহাসিক ছায়া খুঁজে পাওয়া যায়। ‘খহর’ কবিতাটি অন্যগুলোর তুলনায় বেশ ব্যক্তিগত। কিন্তু ব্যক্তিগত হলেও অভিজ্ঞতা আবার বৃহত্তর ও সামষ্টিক অস্তিত্ববাদের উদাহরণ। ‘আমার বাবা-মা রাতদিন হয়ে যাচ্ছে সময়’-এই লাইন অস্তিত্ববাদী উপলব্ধি-সময়ের ভেতর মানুষ কিভাবে নিঃশেষিত হয়-তার এক কাব্যিক উক্তি। ‘অপ্রেমিকার কোলাহল’, ‘তৃতীয় প্রজন্ম’-এগুলো সামাজিক ও পারিবারিক যোগাযোগের বিচ্ছিন্নতার দারুন প্রতীকীর স্বরুপ। কবিতাটি ভাষার অনির্দিষ্টতা নিয়ে খেলেছে-ইনয়নের আনয়ন অস্থানিক’-একটি পোস্ট-মডার্ন ফ্র্যাগমেন্ট, যা শব্দের অর্থ ভেঙে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। স্মৃতি, আবেগ ও শিল্প-ঐতিহ্যের পুনরালোচনা তার কবিতার আরো স্বরুপে নিয়ে যেতে পারে।‘রোদ্দুর পাহাড়ে’ কবিতাটি প্রকৃতি, স্মৃতি, সংগীত ও সময়-এই চারটি উপাদান দিয়ে নির্মিত। রবীন্দ্রসংগীত থেকে ডিলান-দুটি সাংস্কৃতিক মেরুর উল্লেখ কবিকে এক বৈশ্বিক স্মৃতিশিল্পের ভ্রমণে নিয়ে যায়। এটি ইন্টারটেক্সচুয়ালিটি-যেখানে পূর্ববর্তী সংস্কৃতির টেক্সট বর্তমান আবেগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন অর্থ তৈরী করে। এখানে বৃষ্টি, রোদ, মেঘ-প্রতিটি প্রকৃতিচিহ্ন একটি মানসিক অস্থিরতা ও প্রেমের ভ্রান্ত প্রতীক হয়ে ওঠে। প্রেম, শরীর ও ক্ষয়ের রূপতত্ত্ব‘ছায়া ঝরে পাতার শব্দে’ কবিতাটি প্রেম ও ক্ষয়কে কেন্দ্র করে। ‘ছায়ার বয়স বেড়ে যায়’, ‘ভবিষ্যৎ প্রতীক্ষার ফুল’-এগুলো প্রেমের বৃদ্ধি এবং মৃত্যুর ছায়াকে একসঙ্গে ধারণ করে। মেয়েটির ঠোঁটে ‘রক্তগোলাপ’-প্রেম ও যন্ত্রণা একাকার। শেষের লাইনগুলোতে ‘বিষ’, ‘রক্তাক্ত’-এই প্রতীক প্রেমকে নিছক রোমান্টিক না রেখে শরীরের আঘাত ও অভ্যন্তরীণ ভাঙনের সঙ্গে যুক্ত করে। এটি বোদলেয়ারীয় আধুনিকতার একটি ধারাকে স্মরণ করায়।

কবিকে এভাবে মুল্যায়ন করা যেতে পারে। এগুলো লিরিক নয়, বরং ফ্র্যাগমেন্টেড মনোলগ। সময়, প্রেম, শরীর, মৃত্যু, প্রকৃতি-সবকিছুই এখানে স্থির নয়; বরং চলমান, ভঙুর, ধ্বস্ত ও পুনঃর্নির্মিত। ভাষা তথ্য বহন করে না, বরং অনুভবের প্রক্রিয়া তৈরি করে। পাঠককে অর্থ ‘খুঁজে’ পেতে হয়-এটি কবিতার পোস্ট-মডার্ন গুণ।



সর্বশেষ এডিট : ০১ লা ডিসেম্বর, ২০২৫ দুপুর ১২:৩২
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ পাঠের সওয়াব

লিখেছেন শিমুল মামুন, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৪৬


লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। এর ফজিলত ও সওয়াব অনেক বেশি। আমলটি করার ব্যাপারে হাদিসে অনেক বর্ণনা এসেছে।

সাগরের ফেনা পরিমাণ গুনাহ মাফ হয়
আবদুল্লাহ ইবনে আমর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সী পার্ল এবং চারপাশ

লিখেছেন রোকসানা লেইস, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:১৪


খুব ভোরে ঘুম ভাঙ্গল। সূর্য তখনও জাগেনি। ব্যালকুনিতে গিয়ে বসলাম কিছুক্ষন। সামনে সাগর আপনমনে ঢেউ তুলে নাচছে। একজন মানুষও নাই সাগরপাড়ে। এমন নিরিবিলি সাগরপাড়ই চেয়েছিলাম। যেখানে পুরোটাই আমার থাকবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ড. ইরফান আল-হোসাইনীর রহস্যজনক মৃত্যু - জীবনের চেয়ে কোনো সম্পর্ক বড় নয়

লিখেছেন এমএলজি, ০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৪০

= ড. ইরফান আল-হোসাইনীর রহস্যজনক মৃত্যু - জীবনের চেয়ে কোনো সম্পর্ক বড় নয় =

বিশ্বখ্যাত আমেরিকান বহুজাতিক প্রযুক্তি কোম্পানি এনভিডিয়া (NVIDIA)-তে কর্মরত, বুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং অত্যন্ত সম্ভাবনাময় তরুণ বিজ্ঞানী ড.... ...বাকিটুকু পড়ুন

হয় না দেখা আর

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩৩


কতদিন হলো, হয় না দেখা
রঙধনু মেলা, শীত কাটে না
আর ঐশ্বর্য উষ্ণ বেলা
চঞ্চলতায় টিপুটিপু খেলা;
বিস্মৃতির পাতায় ডুবে যাচ্ছে
চাঁদ না দেখার আর্তনাদ,
ভেঙ্গে পরেছে অমোঘ
অপেক্ষায় দীর্ঘশ্বাস ঘুণ ধরেছে
নুনে পরেছে সময়ের ছলনা
মুখ ফিরেছে বাতাসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ শেষ জীবনে

লিখেছেন সামিয়া, ০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৯



ঘুমিয়ে থাকা একজন মানুষ কখনো কখনো জেগে থাকা একজন মানুষের চেয়ে অনেক বেশি ভালো থাকতে পারে? কথাটা শুনতে অদ্ভুত। কিন্তু বয়স হলে মানুষ অনেক অদ্ভুত কথাই বিশ্বাস করে চিন্তা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×